‘ঈশ্বরের দরজা’ ব্যাবিলন

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানের চিত্র, পেছনে বাবিলের দূর্গ / ছবি: সংগৃহীত

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানের চিত্র, পেছনে বাবিলের দূর্গ / ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্যাবিলন নামটি এসেছে সুপ্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা থেকে। সুমেরিয়ানদের ভাষা আক্কাদিয়ায় ব্যাবিলনের অর্থ হলো ‘ঈশ্বরের দরজা’।

বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেল ব্যাবিলন

ব্যাবিলনের অবস্থান প্রাচীন মেসোপটোমিয়া রাজ্যের একটি শহর হিসাবে আজকের ইরাকের বাবিল প্রদেশে। ব্যাবিলন ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার বা ৫৫ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত।

প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে ব্যাবিলন পবিত্র শহর এবং রাজধানী রূপে সমাদৃত ছিল। উন্নতি ও সুখ্যাতির পাশাপাশি পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যাবিলন চিহ্নিত হয়ে আছে আধুনিক ও পরিকল্পিত মহানগরের প্রথম উদাহরণ হিসেবে।

মেসোপটেমিয় সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ব্যাবিলন ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে ওঠা এক জাঁকজমকপূর্ণ মহানগর। চারকোণা এ শহরটি তখন প্রশস্ত প্রাচীরে ঘেরা ছিল, যা উচ্চতা এবং প্রশস্তের দিক থেকে ছিল বিস্ময়কর। শহরের সামনে ছিল মজবুত ও উঁচু প্রবেশ পথ। আবার শহরের মধ্যে একটি বড় স্তম্ভও তৈরি করা হয়েছিল। যার নাম ছিল ‘ব্যাবিলন টাওয়ার’। টাওয়ারটির সঙ্গে সম্ভবত ব্যাবিলন নামটির সম্পর্ক ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ সালে প্রথম ব্যাবিলন নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। কারিগরি ও প্রকৌশলে ব্যাবিলনবাসী সভ্যতার বহু উৎকৃষ্ট নিদর্শনের নির্মাতা। ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া বা আজকের ইরাকের ইউফ্রেটিস নদীর তীরে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে নির্মিত হয় ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান। সম্রাট নেবুচাদনেজার সম্রাজ্ঞীর প্রেরণায় এটি নির্মাণ করেন। প্রথমে নির্মাণ করা হয় বিশাল এক ভিত, যার আয়তন ছিল ৮০০ বর্গফুট। ভিতটিকে স্থাপন করা হয় তৎকালীন সম্রাটের খাস উপাসনালয়ের সুবিস্তৃত ছাদে। ভিত্তি স্থাপন করার পর মাটি থেকে এর উচ্চতা দাঁড়িয়েছিল ৮০ ফুট। এই ভিত্তির ওপরেই নির্মিত হয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং বিস্ময়কর পুষ্পবাগিচা। ৪০০০ শ্রমিক রাতদিন পরিশ্রম করে তৈরি করেছিল এই বাগান। বাগান পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত ছিল ১০৫০ জন মালী। ৫ থেকে ৬ হাজার প্রকার ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছিল এই ঝুলন্ত বাগানে। ৮০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত বাগানের সুউচ্চ ধাপগুলোতে নদী থেকে পানি ওঠানো হতো মোটা পেঁচানো নলের সাহায্যে। ৫১৪ খ্রিস্টাব্দে পার্শ্ববর্তী পারস্য রাজ্যের সাথে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এই সুন্দর উদ্যানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।

গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার প্রাচ্য দেশ আক্রমণের পথে ব্যাবিলনে দশ লক্ষ মানুষের বসবাস পেয়েছিলেন। একটি সুসজ্জিত ও সুপরিকল্পিত মহানগরের সকল বৈশিষ্ট্য সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ব্যাবিলনে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল।

ব্যাবিলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মেসোপটেমিয়ার নাম। প্রাচীন রাজ্যটির নামের অর্থ হলো দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি। যে নামটি গ্রিকদের দেওয়া। বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা ও ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল রাজ্যটি।

খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ এর দিকে সুমেরীয় সভ্যতার পতন হলে ব্যাবিলন সে অঞ্চলের শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ব্যাবিলনের প্রথম সম্রাট সারগন ছিলেন মোটামুটি সফল। ব্যাবিলনের সভ্যতা সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে সম্রাট হামুরাবির সময়ে (১৭৯২ - ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব), তখন সংস্কৃতি ও জ্ঞানবিজ্ঞানে উন্নয়ন ঘটে। পাঠাগার স্থাপিত হয়। মাটির চাকতিতে পৃথিবীর প্রথম লিপি অঙ্কিত হয় এবং আইন ও অনুশাসনের বিকাশ সাধিত হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/06/1562398844156.png

হামুরাবির শাসনামলে (১৭৯২-১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ব্যাবিলন / ছবি সংগৃহীত

 

অধুনা আধুনিক ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরস্কের উত্তরাংশ এবং খুজেস্তান প্রদেশের অঞ্চলগুলোই প্রাচীন কালে মেসোপটেমিয়ার অন্তর্গত ছিল বলে মনে করা হয়।

মেসোপটোমিয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ হতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে মেসোপটোমিয়ায় অতি উন্নত এক সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল, যা ‘সভ্যতার আঁতুরঘর’ হিসাবে পরিচিত।

এই সভ্যতা প্রাচীন অন্যান্য সভ্যতা, যেমন সিন্ধু বা মিশরীয় সভ্যতার থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। বহির্শত্রুদের থেকে খুব একটা সুরক্ষিত ছিল না বলে বারবার এর ওপর আক্রমণ চলতে থাকে এবং পরবর্তীকালে এখান থেকেই ব্রোঞ্জ যুগে আক্কাদিয়, ব্যাবিলনিয়, আসিরিয় ও লৌহ যুগে নব্য-আসিরিয় এবং নব্য-ব্যাবিলনিয় সভ্যতা গড়ে উঠে।

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ সালের দিকে মেসোপটেমিয়া পার্সিয়ানদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল কিন্তু পরে এই ভূখণ্ডের আধিপত্য নিয়ে রোমানদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং রোমানরা এই অঞ্চল ২৫০ বছরের বেশি সময় শাসন করে। দ্বিতীয় শতকের শুরুর দিকে পার্সিয়ানরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চল তাদের শাসনেই থাকে। তারপর এলাকাটি মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। মুসলিম খিলাফত শাসনে এই অঞ্চলের বৃহত্তর অংশ পরবর্তীকালে ইরাক নামে পরিচিতি লাভ করে।

আপনার মতামত লিখুন :