আফগানিস্তানের যুদ্ধবিগ্রহের আরম্ভ-ইতিহাস এবং তালেবানদের যত কর্মকাণ্ড

যাকওয়ান সাঈদ, কন্ট্রিবিউটর
যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান

  • Font increase
  • Font Decrease

আফগানিস্তান এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধ-বিগ্রহ, বছরের পর বছর ধরে এর একটি থেকে অন্যটিকে আলাদা করে দেখবার জো নেই। আফগানিস্তানের নাম শুনলেই আমরা আজকে অনুভব করি, দেশটির মানুষ শান্তিতে নেই। আদতে শান্তি কী বা কেমন, এই ব্যাপারটিই হয়তো তারা ভুলে গিয়েছেন। আফগানিস্তানকে শাসন করেছে অনেক ধরনের মত এবং অনেক ধরনের শাসক। বিশেষত রাশিয়া এবং আমেরিকা, দুই পরাশক্তিরই কবলে পড়তে হয়েছে এই দেশের মানুষকে। আমরা হয়তো আর ভাবতেও পারি না যে, এই দেশে সাধারণ শান্তিকামী মানুষও রয়েছে। হয়তো ভাবি সবাই-ই দিনে দিনে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু পৃথিবীর আর সব দেশের মতোই এই দেশটিতেও সাধারণ মানুষ রয়েছে, এবং তারাই পৃথিবীর অন্যতম দুর্ভাগা মানুষেরা। যারা তালেবান ও মার্কিনিদেরসহ অন্যান্য আরো অনেক গোষ্ঠীর যুদ্ধবাজির নিচে দীর্ঘকাল যাবত দিনাতিপাত করছে।

আল কায়েদা টুইন টাওয়ারে হামলা করার এক মাসের মধ্যে দেশটিতে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল, যা আজও প্রত্যাহার করা হয়নি। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ধরার উদ্দেশ্যেই মার্কিনিরা আফগানিস্তানে এসেছে, এমনটাই তারা বলেছিল। কিন্তু আফগানিস্তানে যেভাবে তাদের বিন লাদেনকে ধরা হয়ে ওঠেনি, সেভাবেই আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনীর সঙ্গে শুরু হওয়া যুদ্ধও কোনোদিন থামেনি।

প্রথমদিকে তালেবানরা মার্কিন সৈন্যদের দ্বারা নিশ্চিহ্ন হতে চললেও, ২০০৪/৫ সাল থেকেই এই সংগঠনটি পুনরায় সংগঠিত হয়ে মার্কিনিদের সঙ্গে এবং মার্কিন মদদপুষ্ট আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছে। আজকের ২০১৯-এ এসেও সেই যুদ্ধ খণ্ড-খণ্ডভাবে চলছে। এই যুদ্ধের বলি হতে হয়েছে অগণিত সাধারণ মানুষকে।

তালেবান আর আল কায়েদা, এই দুই সংগঠন একই চিন্তাধারার অনুসারী হওয়ায় আফগানিস্তানে আল কায়েদার ঘাঁটি গড়ে ওঠা নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। ধারণা করা হয়, ১৯৯২ সালের দিকেই আল কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে তালেবান সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের সখ্য গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। গত কয়েক বছর ধরেই আমেরিকা ধরে নিচ্ছে যে, তারা আফগানিস্তানকে আল কায়েদা মুক্ত করতে পেরেছে। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরীণ উগ্র-ইসলামপন্থীরা আবার আফগানিস্তান সরকারকে কাবু করে ফেলে কিনা, আর পুনরায় সেখানে আল কায়েদা সংগঠনটি ঘাঁটি গাড়ে কিনা, তেমন আশঙ্কায় তারা এই দেশ ছেড়ে যেতে পারছে না।

যদিও মিডিয়ার তরফে এমন অনেক খবর আমাদের কাছে এসেছে যে, প্রতিনিয়ত আফগানিস্তানে মার্কিনিদেরকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। এছাড়া, বেশ কয়েকবার তালেবান নেতাদের সঙ্গে আমেরিকার শান্তিবৈঠক সংগঠিত হলেও তা কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। যেই দেশটি পৃথিবীতে আজও এমন যুদ্ধবিগ্রহের শিকার, বার্তার এই বিশেষ ফিচারটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই আফগানিস্তানকে নিয়েই করা। তবে, পাঠকেরা লক্ষ করে থাকবেন, ফিচারটির নামকরণ করা হয়েছে ‘আফগানিস্তানের যুদ্ধবিগ্রহের আরম্ভ-ইতিহাস এবং তালেবানদের যত কর্মকাণ্ড’ নামে। কাজেই এতে মার্কিন বনাম আফগান-তালেবান যুদ্ধের ইতিহাসটি নেই। সেটি নিয়ে বার্তা২৪ পরবর্তীতে আরেকটি ফিচার করবে।

এই ফিচারটি পড়লে আপাতত বুঝতে পারা যাবে, কী কী কারণে আফগানিস্তানে এই দীর্ঘযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়েছে। মোটাদাগে আফগানিস্তানীদেরকে কী কী যুদ্ধ আর অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নোট দিয়ে শুরু করব। যেগুলোর মধ্য দিয়েই ‘আফগানিস্তানের যুদ্ধবিগ্রহের আরম্ভ-ইতিহাস’ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়া সম্ভব। পরবর্তীতে আমরা ‘তালেবানদের যতো কর্মকাণ্ড’ বিষয়টিতে যাব। ফুটনোটগুলো হলো—

ক. আপাতদৃষ্টিতে দেখলে ঘটনার প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। তখন আফগানিস্তানে চলছে রাজা জহির শাহের ক্ষমতার শেষ সময়। জহির শাহ ১৯৩৩ সাল থেকে আফগানিস্তান শাসন করে আসছিলেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি উদার প্রকৃতির এবং প্রগতিশীল ধরনের মানুষ ছিলেন, আর রাজা হিসেবে তিনি ছিলেন নিতান্ত অলসপ্রকৃতির। ১৯৭৩ সালে, সম্পূর্ণ আফগানিস্তান সমাজ যখন আধুনিকতা আর মৌলবাদিতা—এই দুইয়ের মিশ্রণে একপ্রকার অন্ধমতন হয়ে গিয়েছিল, সেসময়ে জহির শাহের আধুনিকতামুখী বেশ কয়েকটি নিয়মকানুন আফগানিস্তানকে আরো বিক্ষিপ্ত করে দিল।

এরই সূত্রে, রাজপরিবারের মহিলাদের বোরকাহীনভাবে রাস্তায় বের হওয়াকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তানের উগ্রপন্থী ইসলামিস্টরা রাস্তায় নেমে আসলো, এবং জহির শাহ তাদেরকে কারাবন্দি করলে ঘটনাটি আরো চাগড়ে উঠল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তানের বিদ্যালয়গুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো করে নানান সংগঠন গড়ে উঠতে আরম্ভ করল। তথাপি জহির শাহের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষও এই সংগঠনগুলোকে নির্মমভাবে দমন করছিল।

মনে রাখার বিষয় হলো, এই দলগুলো যে কেবল একপক্ষীয়—অর্থাৎ ইসলামপন্থীদেরই ছিল তা নয়। পাল্টা প্রতিপক্ষ হিসেবে এমন দলের সংখ্যাও প্রায় সমান ছিল, যারা কমিউনিজমে বিশ্বাসী, এবং ধর্মীয় উগ্রতাকে নির্মূল করতে সদা খড়গহস্ত।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562646643522.jpg
রাজা জহির শাহ

 

খ. আফগানিস্তানে কমিউনিজমের চিন্তা প্রসিদ্ধি পাবার কারণ ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন তার পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানকে নানাভাবেই সহায়তা প্রদান করে আসছিল, দীর্ঘকাল যাবত। যে বছর ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশরা ফিরে গিয়েছিল সেই বছরেই অফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছিল অনেকটা কাগজে-কলমে। কিন্তু এর আগেও, ১৯১৯ সালে রুশ বিপ্লবের সময়েও সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল। তৃতীয় ইঙ্গো-আফগান যুদ্ধের সময়েও আফগানিস্তানকে তারা প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ও যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছিল। ১৯৪২ সালে তসখন্দ নামক একটি এলাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তিতে সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানকে শক্তিশালী যুদ্ধরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল।

১৯৪৭ সালে আফগানিস্তান খাতাকলমে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবাধীন হওয়ার পর, বিশেষত ১৯৫৬ সাল থেকে দুটি দেশ সাহায্য-সহযোগিতামূলক এক অভ্যন্তরীণ নিয়মমাফিকতা তৈরি করে নিয়েছিল। এই মর্মে তারা অনেক ধরনের চুক্তিও করেছিল। সেসবের ভিত্তিতে একটা পর্যায়ে সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তানে তাদের নিজস্ব সামরিক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের প্রেরণ করল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562646833765.jpg
আফগানিস্তানে সোভিয়েত আর্মির বহর

 

গ. ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তান যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল, ঠিক ওইসময়েই রাজা জহির শাহ ইটালিতে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। আর তখনই তার চাচাত ভাই মুহাম্মদ দাউদ খান এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ব করে নেন। এর আগে রাজা জহির শাহের শাসনাধীন হয়ে দাউদ খান ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত ছিলেন।

দাউদ খান তার চাচাত ভাই জহির শাহকে হটিয়ে ক্ষমতা করায়ত্ব করার পরে, তিনি আফগানিস্তানের উগ্রপন্থী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপুল সমর্থন পেয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এতকালের রাজতন্ত্রের প্রত্যক্ষ বিলোপকারী। আর কমিউনিজমে বিশ্বাসী সমাজের জন্য তিনি ছিলেন একজন নিপীড়ক শাসক।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562647046573.jpg
আফগানিস্তানে রাজতন্ত্র বিলোপকারী দাউদ খান

 

ঘ. আফগানিস্তানে কমিউনিজমে বিশ্বাসী প্রধান দলটির নাম ছিল পিডিপিএ। মুহাম্মদ দাউদ খানের ক্ষমতার পরে ১৯৭৮ সালে পিডিপিএ আফগানিস্তানের ক্ষমতায় এসেছিল। তাদের ক্ষমতায় আসার গল্পটি এমন ছিল যে, দাউদ খান কর্তৃক পিডিপিএ-র ওপর নানাবিধ নির্যাতনের ফলশ্রুতিতে একটা পর্যায়ে পিডিপিএ-র নেতারা আফগানিস্তান সেনাবাহিনীকে আরেকটি অভ্যুত্থানের পক্ষে রাজি করাতে সক্ষম হয়।

আফগান সেনাবাহিনী যেহেতু নানাভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল, তাই এটা স্বাভাবিকই ছিল। দাউদ খানের পরিবারের কনিষ্ঠ শিশুটিকে পর্যন্ত হত্যা করে সেনাবাহিনী যখন কমিউনিস্ট পার্টি পিডিপিএ-কে ক্ষমতা এনে দিল, তখন আফগানিস্তানের নতুন শাসক হলেন নূর মুহম্মদ তারাকি। এই সময়ে আফগানিস্তানের কারাগারগুলোতে তিল ধারনের ঠাঁই ছিল না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562647282302.jpg
তারাকির শাসনামলে জেলগুলোতে তিল ধারণে ঠাঁই ছিল না

 

তারাকির আমলে মূলত দুইটি বিষয় ছিল, এবং এই দুই বিষয়ের মধ্যদিয়েই দেড় বছরের মাথায় তার পতন ঘটেছিল। প্রথমটি হলো, পিডিপিএ-র মধ্যে একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। ‘খালক’ এবং ‘পারচাম’ নামে দুটি গ্রুপে তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর তারাকি ছিলেন ‘খালক’ গ্রুপটির প্রধান, ফলত ‘পারচাম’ গ্রুপের বিরুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করতে আরম্ভ করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, তারাকি অতিশয় কমিউনিজমের চিন্তা লালন করতেন। এমন কিছু আইন চালু করেছিলেন, যেগুলো দেশটির মৌলবাদী জনগোষ্ঠীকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। এবং তারাকির অপজিট গ্রুপ ‘পারচাম’ এই সুযোগকে অবহেলা করেনি। তারা একবছরের মধ্যেই আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

আফগানিস্তান কেন লাগাতারভাবে গৃহযুদ্ধের শিকার হয়েছে, এই ঘটনা থেকে সেটি ধারণা করতে পারা যায়। যার মূলে ছিল এর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার যোজন যোজন ফারাক, আর উপরন্তু তাদের নিতান্ত বোকা-বোকা যুদ্ধবাজি আচরণ।

তারাকির পরে ‘পারচাম’ গ্রুপ থেকে দেশটির শাসক হন হাফিজুল্লাহ আমিন, ১৯৭৯ সালে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562647581550.jpg
হাফিজুল্লাহ আমিন

 

ঙ. আমিনের ক্ষমতায় আসা আর না-আসা আদতে একই ঘটনা ছিল। যেহেতু পূর্বতন গৃহযুদ্ধ এতে থেমে যায়নি। আর দেশটির গ্রামে-গ্রামে কমিউনিজম বিষয়ে অর্থাৎ আধুনিকায়ন নিয়ে যেই বিরূপ ধারণা ছিল, সেটা আমিন ক্ষমতায় আসার পরেও পুনর্বহাল ছিল। আমিনের ক্ষমতা ছিল খুব অল্পদিনের। আফগানিস্তানের ওই চলমান গৃহযুদ্ধের বরাতে—১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্মিরা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে অবতরণ করে। এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের ওপর তাদের সশস্ত্র নাক-গলানো আরম্ভ করে।

তারা তখন আমিনকেও হত্যা করে, কেননা দেশটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল আমিনের চাইতেও আরো প্রভূভক্ত কোনো ব্যক্তি। এই মর্মে তারা পিডিপিএ-কে বাদ দিয়ে সোভিয়েতপন্থী অপর একটি দল থেকে বাবরাক কামাল নামক একজনকে ক্ষমতায় বসায়। ১৯৮০ সালে।

সোভিয়েত আর্মিদের আগমনের মধ্য দিয়ে দেশটি গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে আরো বৃহৎ এক যুদ্ধে শামিল হয়। ‘সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ’ যার নাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562647746337.jpg
শুরু হয়ে যায় সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ

 

চ. সত্যিকার অর্থে তখনও আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকার গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষকে পটিয়ে কমিউনিজম কায়েম করতে সচেষ্ট ছিল। আর রক্তপাত ছিল তার অনুষঙ্গ। গভীর ধর্মীয় নানাবিধ মৌলবাদিতা ছিল আফগান জনগণের অভ্যন্তরীণ চেতনা, ফলত তাদেরকে আরো বেশি চটিয়ে তুলেছিল কমিউনিস্ট সরকার কর্তৃক গঠনকৃত আইন ‘যৌথ কৃষিব্যবস্থা’।

কমিউনিজমের চিন্তা প্রয়োগ করে রাষ্ট্রটি অনেক ধনী-জোতদারের কাছ থেকে জমিজমা হরণ করে সেইসব জমিতে সাম্যতা বসাতে চেয়েছিল। অর্থাৎ, ধনী জোতদারের জমিনে গরিব কৃষককেরও ভাগ রয়েছে, এই মর্মে ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট সরকারের এই পরিকল্পনা সফল হলো না, কেননা গরিব কৃষকরা সেইসব জমিতে চাষ করতে সম্মত হলো না এই বলে যে, চুরি-করা জমিতে চাষবাস করা ইসলামসম্মত নয়। উল্টা আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলগুলো সরকারের এমন পদক্ষেপে আরো প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্মিরা মূলত যুদ্ধ করেছিল সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে। যেসকল সরকারি ভবন ছিল, যেই যোগাযোগকেন্দ্রগুলো ছিল, সেগুলো তারা দখল করে ওইসব জায়গা থেকে যুদ্ধ চালাচ্ছিল। অপরদিকে ইসলমপন্থী আফগানরা, যাদেরকে মুজাহিদিন বলা হতো এবং যারা একটি সংগঠনেরও আওতাধীন ছিল, তারা যুদ্ধ চালাচ্ছিল দলে দলে ভাগ হয়ে গেরিলা হামলার ভিত্তিতে।

সোভিয়েত আর্মিরা এই গেরিলা হামলাকে প্রতিহত করত যুদ্ধবিমান দিয়ে। বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে তারা মাইলের পর মাইল নিশ্চিহ্ন করে দিত। যেহেতু আফগানিস্তান আরো আগে থেকেই অস্ত্র ও যুদ্ধসামগ্রীর স্বর্গরাজ্য ছিল, কাজেই একপর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেরাই বিপুল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলো। এই ক্ষয়ক্ষতি তারা আর বাড়াতে চাইল না, ১৯৮৭ সালে মিখাইল গর্ভাচেভের সোভিয়েত সরকার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিল। এই ঘোষণা বাস্তবায়ন হতে আরো কয়েকবছর লেগেছিল।

অপরদিকে এই যুদ্ধ আফগানিস্তানের মানুষের জীবনের শেষ সঞ্জিবনীটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। দশবছর ধরে চলা এই যুদ্ধের বলি হয়েছিল ১৫ লাখ আফগান।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562648121245.jpg
সোভিয়েত আর্মিরা যুদ্ধবিমান দিয়ে আফগান গেরিলা হামলা প্রতিহত করত

 

ছ. মর্মান্তিক হলেও সত্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘটনা আফগানিস্তানে শান্তি বিধান করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল, রাশিয়ানরা চলে গেলেও তাদের সমর্থিত শাসক নজিবুল্লাহ আফগানিস্তানের শাসক হিসাবে বহাল ছিল। ফলে মুজাহিদিনরা নজিবুল্লাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালু রেখেছিল।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে মুজাহিদিনরা রাজধানী কাবুল দখল করল বটে, কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। পুনরায় গৃহযুদ্ধ বাঁধল। বিরক্তিকর হলেও এটাই সত্য যে, দেশটি কোনোভাবেই তাদের কাঁধ থেকে অস্ত্রের বোঝা নামাতে পারছিল না। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলল মুজাহিদিন যুদ্ধবাজ নেতাদের এই নিজেদের ভিতরকার খেলা, তাতে দেশটির ৫০ হাজারেরও বেশি নাগরিক মারা গেল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562649295570.jpg
পাঁচ বছর ধরে চলে মুজাহিদিন যুদ্ধবাজদের নিজেদের ভিতরকার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

 

জ. ১৯৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর, যুদ্ধবিধ্বস্ত কাবুলবাসী ঘুম থেকে জেগে উঠে এক নিস্তব্ধ থমথমে কাবুলকে আবিষ্কার করল। তারা জানতে পারল, আগের সন্ধ্যাতেই মুজাহিদিন শাসিত সেনাবাহিনীর প্রধান তার দলবল নিয়ে পানশির উপত্যকায় পালিয়ে গেছে।

তারা প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে আরিয়ানা স্কয়ারে এসে দেখতে পেল দুইটি মৃতদেহ, যেগুলো খুঁটি দিয়ে ঝোলানো ছিল মানুষজনদের দেখাবার উদ্দেশ্যেই। একটি দেহ ছিল গুলিতে করে হত্যা করা। অপরটি ছিল মোটাসোটা এক ব্যক্তির, যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত রক্তে ভেজা ছিল। দেহটির পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিল, আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেতলে দেওয়া হয়েছিল। এই দেহটি ছিল সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত প্রাক্তন শাসক নজিবুল্লাহর। আর গুলি করে মারা দেহটি তার ভাইয়ের।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562648761801.jpg
প্রাক্তন শাসক নজিবুল্লাহ ও তার ভাইয়ের ঝুলন্ত লাশ

 

নজিবুল্লাহ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না বটে, রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুজাহিদিনরা। কিন্তু যাদের আগমনে এরা নিহত হয়েছিল, সেই তালেবানরা প্রধানত এদেরই শত্রু ছিল। তালেবান প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যেই মোল্লা ওমরের হাতে, সেই মোল্লা ওমর সর্বপ্রথম সোভিয়েত আর্মি ও সোভিয়েত শাসিত সরকারের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমেছিল। ফলে সোভিয়েত সমর্থিত প্রাক্তন রাজা নজিবুল্লাহকে হত্যা করা তাদের দায়িত্বের মধ্যেই ছিল।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা মুজাহিদিনরাও তালেবানদের এই আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারল না। তারা রাতারাতি রাজধানী কাবুলের কর্তৃত্ব হারাল। আর এইভাবে তালেবানদের আফগান-শাসনের সূচনা ঘটল।

আশা করা যায়, তালেবানদের আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার আগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটি এই নোটগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এবার তালেবানদের কর্মকাণ্ডের আলাপে অগ্রসর হওয়া যাক—

মোল্লা ওমর নামক এক ব্যক্তির হাতে এই তালেবান সংগঠনটির গোড়াপত্তন হয়েছে। ১৯৯২ সালে নজিবুল্লাহর পতনের পর যখন রাজধানী কাবুল মুজাহিদিনদের করায়ত্ব হলো, এবং মুজাহিদিনরা নানান দলে ভাগ হয়ে নিজেরা-নিজেরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, তখনই মোল্লা ওমর সিঙ্গেসর নামক একটি এলাকায় গিয়ে অর্ধশত মাদ্রাসাছাত্রকে নিয়ে একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। তালেবান শব্দের অর্থও ছিল ছাত্র। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি আফগানিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে এবং শরণার্থী শিবির থেকে সদস্য সংগ্রহ করে করে আকারে বৃহৎ হয়ে উঠেছিল।

দীর্ঘকাল ধরে কমিউনিজম আর ইসলামপন্থা এই দুইয়ের যুদ্ধে ও বিরোধে আফগানিস্তানে যেই বিপুল মৌলবাদিতার শিকড় ছড়িয়েছিল, তাতে করে এই সংগঠনটির সমর্থন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে তালেবান সমর্থকরা মোল্লা ওমরকে আমিরুল মুমিনীন উপাধিতে ভূষিত করে, আর একই বছরের ডিসেম্বর মাসে মুজাহিদিনদের হঠিয়ে তালেবানরা আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। যা আমরা ইতঃপূবেই জেনেছিলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562652591429.jpg
মোল্লা ওমর

 

১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে তালেবানরা আফগানিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। তালেবান শাসিত এই রাষ্ট্রকে তখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান স্বীকৃতি দিয়েছিল।

কাবুলের অধিবাসীরা যেদিনটিতে নজিবুল্লাহকে মৃত অবস্থায় খুঁটির সঙ্গে ঝুলতে দেখেছিল, সেদিন নিশ্চয়ই তারা আনন্দিত হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, যুদ্ধ শেষ। অর্থাৎ তালেবানদের আগমনে যুদ্ধ রহিত হয়েছিল তো বটেই, কিন্তু আফগান নাগরিকদের এই সমর্থনের অন্তরালে যেটা ঘটে গিয়েছিল তা হলো, এবার আফগানিস্তানের ঐতিহ্য ও দীর্ঘকালের ইতিহাস, মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা আফগানিস্তানের কৃষ্টি-কালচার, শিল্প-সাহিত্য—এইসব কিছুই তালেবানদের হাতে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন হতে চলল।

তালেবানরা ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা ব্যতিরেকে আর সব কিছুতেই মরার আঘাত হানল। শুরু হলো অদ্ভুত এক রাষ্ট্রপরিচালনা। কেমন ছিল সেইসব দিনগুলো, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত, তালেবানরা আফগানিস্তানের কী ক্ষতি করেছিল, সেইসবই আমাদের আলোচ্য বিষয়।

আস্’নে সিয়েরস্ট্যাড নামের একজন মহিলা সাংবাদিক, যার বাড়ি নরওয়েতে, তিনি ‘দ্য বুকসেলার অব কাবুল’ অর্থাৎ ‘কাবুলের বইবিক্রেতা’ নামে একটা বই লিখেছেন। নাইন ইলিভেনের ঘটনার পরে, মার্কিন সৈন্যরা আফগানিস্তানে ঢুকে পড়বার পরেই বইটি লেখা। তদুপরি বইটি যেই চিন্তা থেকে বা যেই পন্থায় লিখিত হয়েছিল, তাতে করে বইটিতে তালেবান শাসনামলের নানান বিষয় স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। বইটি সারাবিশ্বে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল।

২০০১ সালের হেমন্তে আস্’নে সিয়েরস্ট্যাড নরওয়ের কয়েকটি মিডিয়ার সংবাদ সংগ্রহক হিসেবে আফগানিস্তানে আসেন। আসার পরপরই তার সঙ্গে ওই বুকসেলার অর্থাৎ গ্রন্থবিক্রেতার পরিচয় হয়। যার নাম ছিল সুলতান খান। সুলতান খান অনেকটাই প্রগতিশীল মনোভাবের নাগরিক ছিলেন, বিশেষত আফগানিস্তানের সংস্কৃতির ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড অনুরাগী, এবং রক্ষণশীল। তার দুঃখের অন্ত ছিল না এই কারণে যে, ইসলামপন্থী মুজাহিদিনরা এবং তালেবানরা আফগানিস্তানের ঐতিহ্য ও কালচারাল সংগ্রহকে নষ্ট করে দিয়েছিল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562650330334.jpg
দ্য বুকসেলার অব কাবুল

 

আস্’নে সিয়েরস্ট্যাডকে তিনি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলেছিলেন, ‘কমিউনিস্টরা আমার বই পুড়িয়েছে, মুজাহিদিনরা আমার বই লুট করেছে, আর তালেবানরা এসে আমার বইয়ের তাকগুলোই জ্বালিয়ে দিয়েছে’। আস্’নে সিয়েরস্ট্যাড এই সুলতান খানের বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করেছিলেন বইটি লিখবার জন্য। ফলশ্রুতিতে তিনি অন্দরমহল থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন আফগান নারীদের অবস্থা। কিভাবে তারা আফগান পুরুষদের হাতে নির্যাতিত ও অসম্মানিত হতো। সেখানে থাকাকালে, আস্’নে সিয়েরস্ট্যাডের প্রায়ই সুলতান খান ও ঘরের অন্যান্য পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া বেঁধে যেত। কেননা তার পক্ষে মানা কঠিন হয়ে যেত, যেভাবে সুলতান খানরা পুরুষতান্ত্রিকভাবে মেয়েদের সঙ্গে আচরণ করত।

যদিও একথাও ঠিক যে, সুলতান খানের পরিবার ছিল আর দশটা আফগান পরিবারের তুলনায় উন্নত। যেমন অর্থনৈতিকভাবে তেমনই শিক্ষার দিক থেকে।

সাধারণত আফগানিস্তানে মেয়েদের পড়ালেখার গুরুত্ব এমনিতেই কম ছিল। তালেবান শাসনামলে তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। আস্’নে সিয়েরস্ট্যাড এই ব্যাপারটি ব্যক্ত করেছেন এভাবে, ‘যদি আমাকে আফগানিস্তানের আসল অবস্থা নিয়ে এই বই লিখতে হতো, তাহলে আমাকে থাকতে হতো গ্রামাঞ্চলের কোনো একটা পরিবারে। যেই পরিবারের কেউই পড়ালেখা জানত না, আর যাদের পক্ষে প্রতিটি দিনই হতো একটা সংগ্রামী দিন। আমি সুলতান খানের পরিবারকে বেছে নিয়েছিলাম এই কারণে না যে, এটা আমাকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে বাস্তবিক ধারণা দিতে পারবে। বরং এই কারণে যে, পরিবারটি আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।’ বইটির অনেক জায়গাজুড়ে আফগানিস্তানের তালেবান শাসনামলের নানান অবস্থাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

তালেবানদের শাসন শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে তারা কাবুল জাদুঘরে হামলা করল। যেই লোকটি তাদের সংস্কৃতিমন্ত্রী মনোনীত হয়েছিল, মূলত তার হাত দিয়েই জাদুঘর হামলার কাণ্ডটি ঘটেছিল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562650512550.jpg
তালেবানদের সংস্কৃতিমন্ত্রী কাবুল মিউজিয়াম ধ্বংস করেন

 

লাগাতারভাবে চলা গৃহযুদ্ধগুলোর কারণে এমনিতেই কাবুলের জাদুঘরটির অনেক জিনিসপত্র আগেই চুরি হয়ে গিয়েছিল, বাকি যা ছিল এবার তালেবান বাহিনী সেইসবের উপরেই কুড়াল বসাল। যার মধ্যে ছিল হাজার বছরের প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি ও ম্যুরাল, বহুপুরনো চিত্রকলা ও ভাস্কর্য, লিপিফলক, এমনকি চেঙ্গিস খান ও তার দস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত যুদ্ধসামগ্রীরও কিছু কিছু অংশ, যেগুলো ইতঃপূর্বে চুরির হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল।

আস্’নে সিয়েরস্ট্যাডের বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনায় জাদুঘরের গার্ডরা আর্তরব করছিল। তারা বহুকষ্টে একটি লিপিফলক রক্ষা করতে পেরেছিল, কেননা তাতে কোরানের বাণী খোদাই করা ছিল।

হাজার বছরের ইতিহাসকে ভেঙে গুঁড়ো করে দিতে তালেবানদের লেগেছিল মাত্র অর্ধদিন। এছাড়া, তালেবান আমলের শেষদিকে তারা বামিয়ানের নামকরা সুবিশাল মূর্তিগুলোকেও শক্তিশালী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। ডিনামাইটগুলো এতই শক্তিশালী ছিল যে, মূর্তিগুলোর ক্ষুদ্র একটি কণাও আর অবশিষ্ট ছিল না।

আস্’নে সিয়েরস্ট্যাডের বইয়ের মূল চরিত্র সুলতান খাঁন যেহেতু বইয়ের ব্যবসা করতেন, তাই তালেবান শাসনামল রহিত হলে তিনি ভাবলেন, পাঠ্যপুস্তকগুলোকে নতুন করে ছাপানো যায় কিনা। তার এই ইচ্ছা অত্যন্ত দরকারিও ছিল। কেননা, তালেবান শাসনামলে বাচ্চাদের বইগুলোও যুদ্ধহাঙ্গামা বৈ ভিন্ন কিছু ছিল না। যেমন সেইসব বইয়ে বাচ্চারা শিখতো, ‘জ’ তে জিহাদ আমাদের জীবন, ‘আই’ তে ইসরাইল আমাদের শত্রু, ‘এম’ তে মুজাহিদ আমরা বীর, ‘টি’ তে তালিবান, ইত্যাদি। অংকের বইগুলোও এর থেকে মুক্ত ছিলো না। যেমন পাটিগণিত অংকের সময়ে বাচ্চারা এভাবে অংক করত যে, ‘ধরি, ওমরের একটি রাইফেল ও তিনটি ম্যাগাজিন আছে। প্রতিটি ম্যাগাজিনে গুলি আছে বিশটি করে। ওমর তার গুলির এক তৃতীয়াংশ খরচ করে ষাটজন বিধর্মীকে হত্যা করল, তাহলে প্রতিটি গুলিতে কয়জন করে বিধর্মী হত্যা হয়েছে?’

হাস্যকর হলেও সত্য যে, এর আগে কমিউনিস্টরাও এই ধরনের কাজ করেছিল। তারা বাচ্চাদের বইয়ে যুক্ত করেছিল ভূমি বিতরণ আর সাম্যবাদের ধারণা। তালেবানদের মতো তারাও ভেবেছিল, লাল সালাম আর যৌথ খামারের ধারণা শিশুদেরকে কমিউনিস্ট আদর্শে উজ্জীবিত করবে। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার আগে যুদ্ধের কারণে প্রচুর স্কুল ভেঙে গিয়েছিল, অথবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তালেবানরা ক্ষমতায় এসে নিজেরা স্কুল আর ভাঙল না বটে, কিন্তু সেইসব স্কুলের মধ্যে যেসব ছিল মেয়েদের স্কুল, সেগুলোকে আর খুলতে দিল না। এবং মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিল। তখন একধরনের নামকাওয়াস্তে পড়াশোনা আরম্ভ হলো আফগানিস্তানে। যুদ্ধের কারণে যারা দেশান্তরি হয়েছিল, তারা দেশে ফিরে আসলেও তাদের মেয়েরা আর কোনো স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পেল না। এভাবেই আফগানিস্তানের মেয়েদের জীবন থেকে চিরতরে চাকরির সম্ভাবনা আর আর্থিক স্বাধীনতাকে বিতারিত করে দেওয়া হয়েছিল তালেবান শাসনামলে।

তালেবান সরকার আফগানিস্তানকে ইসলামিক রাষ্ট্র ঘোষণা করতে ১৫ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। যেগুলো তারা রেডিও শরিয়া থেকে দেশব্যাপী সম্প্রচার করত।

এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে প্রথমটি ছিল, বোরকাহীন নারীদের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা। গাড়িচালকদেরকে বলা হয়েছিল, কেউ কোনো বোরকাহীন নারীকে গাড়িতে তুললে তাকে গ্রেফতার করা হবে। বোরকাহীন কোনো মহিলাকে রাস্তায় দেখা গেলে, তার বাড়িতে গিয়ে তার স্বামীকে শাস্তিবিধান করা হবে। দ্বিতীয়ত বলা হয়েছিল, দোকানে, হোটেলে বা গাড়িতে ও বাড়িতে গানবাজনা বাজানো যাবে না। তৃতীয়ত, দাড়ি কাটা যাবে না বা ছাঁটা যাবে না। কেউ যদি তা করে, সেক্ষেত্রে তার দাড়ি পুনরায় ইসলামসম্মত না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলে দিন কাটাতে হবে। তৃতীয়ত, নামাজের সময়ে দোকানপাট এবং গাড়িচলাচল বন্ধ রাখতে হবে। মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। এর ব্যতিরেক হলে তা হবে বড় শাস্তির অপরাধ।

তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে ‘পাপ নির্মূলকরণ মন্ত্রণালয়’ নামে একটি মন্ত্রণালয় তৈরি হয়েছিল। এই মন্ত্রণালয়টি বাধ্যতামূলক নামাজের বিধানের জন্য দোকানপাট বন্ধের সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছিল।

চতুর্থ অধ্যাদেশ ছিল, কবুতর পালন এবং পাখি লড়াই খেলার ওপরে নিষেধাজ্ঞা। পঞ্চম অধ্যাদেশ ছিল, মাদকদ্রব্যে নিষেধাজ্ঞা। ষষ্ঠ অধ্যাদেশ, আকাশে ঘুড়ি ওড়ানো যাবে না। সপ্তম অধ্যাদেশটি ছিল আরো অদ্ভুত, গাড়িঘোড়া, দোকানপাঠ, বাড়িঘর, হোটেল বা যেকোনো স্থানে কোনো প্রকার প্রাণীর ছবি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। এধরনের ছবি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কোনো গাড়িতে প্রাণীর ছবি থাকলে সেটিকে রাস্তায় চলতে দেওয়া হবে না। অষ্টম অধ্যাদেশ ছিল, কোথাও কোনো প্রকার জুয়াখেলা চলবে না। এই মর্মে তালেবান পদাতিকেরা জুয়াখেলার আড্ডাগুলো খুঁজে বের করত, এবং জুয়াড়িদের একমাস কারাদণ্ড বিধান করত। নবম অধ্যাদেশ ছিল, ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান স্টাইলে চুল কাটা যাবে না। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী পদাতিকেরা দীর্ঘ চুল বিশিষ্ট পুরুষদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে চুল কর্তন করে দিত। দশম, ঋণের ওপরে সুদ, বিনিময়, লেনদেন চার্জের নিষেধাজ্ঞা। কেননা এগুলো ইসলামের বিধান অনুযায়ী নিষিদ্ধ ছিল। একাদশ, নদীর তীরে কাপড় ধোয়া যাবে না। এই অধ্যাদেশের লক্ষ্য ছিল মেয়েরা। কোনো মেয়েকে প্রকাশ্যে নদীর ধারে কাপড় ধোয়া অবস্থায় পাওয়া গেলে তার স্বামীকে কঠিন শাস্তির বিধান করা হতো। দ্বাদশ ছিল, বিবাহ অনুষ্ঠানে নাচগানের ওপরে নিষেধাজ্ঞা। ত্রৈয়দশ, ড্রাম বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা। চতুর্দশ, পুরুষ দর্জি কর্তৃক মহিলাদের জামা সেলাই এবং মাপ নেওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা। এই অধ্যাদেশের সংযোজনী ছিল, দর্জির দোকানে কোনো প্রকার ফ্যাশন ম্যাগাজিন রাখা যাবে না। আর পঞ্চদশ নিষেধাজ্ঞাটি ছিল ডাকিনীবিদ্যার ওপর। তালেবান সরকার কর্তৃক এই বিদ্যা সংশ্লিষ্ট সকল বই পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

আফগানিস্তানের প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানই কেবল বড় পরিসরে তালেবানদের সমর্থন করত। তালেবানদের বেশিরভাগ সদস্য ছিল পশতুন, আর আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের উভয়দিকে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিল এই পশতুনরাই। কাজেই পশতুনরা ক্ষমতায় থাকলে সেটা পাকিস্তানের জন্য ফলদায়ক, পাকিস্তান এমনটা মনে করত। আর আফগানিস্তানেরও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পশতুনরই ছিল সবচাইতে বেশি, যা ছিল মূল জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে আমেরিকানদের প্রবেশের পর তারা যে উত্তরাঞ্চলীয় জোটটিকে সমর্থন করল, সেই জোটটি মূলত গঠিত হয়েছিল তাজিক জনগোষ্ঠীর লোকদের দ্বারা। পাকিস্তানের চোখে পশতুন জনগোষ্ঠী যতটা বিশ্বাসভাজন ছিল, তাজিক জনগোষ্ঠী ছিল ঠিক ততটাই সন্দেহজনক।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/09/1562650882159.jpg
তালেবান উৎখাতে মার্কিনি আক্রমণ

 

যদি ২০০১ সালে মার্কিনিদের মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ ব্যতিরেকে, অন্য কোনোভাবে আফগানিস্তানের মানুষ তালেবান শাসন থেকে মুক্ত হতে পারত, তাদের জন্য সেটা কতই না শান্তিদায়ক হতো। দেশটি শেষপর্যন্ত কবে এই যুদ্ধবিগ্রহ থেকে মুক্ত হতে পারবে, শান্তিকামী পৃথিবীবাসীর এই জিজ্ঞাসাও এখন পুরোনো ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। তবে গতকাল সোমবার (৮ জুলাই) কাতারের রাজধানী দোহায় সপ্তমবারের মতো তালেবান নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানি এবং কাতারের মধ্যস্ততায় দুইদিনব্যাপী চলবে এই বৈঠক। তালেবানদের পাশাপাশি এই বৈঠকে আফগান সমাজের প্রতিনিধিরাও থাকবেন। আমরা আশা করব, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে এবার শান্তির বিধান হবে।

আপনার মতামত লিখুন :