রাষ্ট্রপতি এরশাদের জন্য ৮ আনার পতাকা

আরিফ আহমেদ সিদ্দিকী, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, পাবনা
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সদ্য প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাঁর জন্য আট আনা (পঞ্চাশ পয়সা) খরচই তখন আমার মতো প্রাথমিকে পড়ুয়ার জন্য ছিল বেশি। তবুও তিনি রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনীর প্রধান। তাইতো সেদিনে তাঁকে সম্মান জানাতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম আট আনার জাতীয় পতাকা নিয়ে। তখন আমি প্রাথমিকের একেবারেই নতুন ছাত্র।

দিনক্ষণ মনে পড়ে না। তবে স্মৃতিতে যুতটুকু আসে তাতে ১৯৮৮ বা ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি সময়ের কোনো একদিন সকালে। তখন রাস্তাঘাটের তেমন উন্নতি হয়নি।

ঢাকা থেকে সড়ক পথে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ রংপুর যাচ্ছিলেন। তখন আরিচা থেকে ফেরি যোগে নগরবাড়ী পার হয়ে উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করতে হতো। আগের দিন স্কুল থেকে জানানো হল- রাষ্ট্রপতি এরশাদ পাবনা হয়ে রংপুরে যাবেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তাঁকে সম্মান জানাতে হবে।

সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা। রাত শেষে সকাল আসল। তখন আমি পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের টেবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর (ছোট্ট ওয়ান) ছাত্র। স্কুলে যাওয়ার পরপরই সবাইকে রাস্তার পাশে নিয়ে দাঁড় করানো হলো।

এর আগে, রাষ্ট্রপতি যাবার আগের দিন আমাদেরকে ক্লাসের স্যাররা বলেছিলেন, রাস্তায় দাঁড়ানোর আগে জাতীয় পতাকা সবার হাতে থাকতে হবে। তিনি যাবার সময়ে ঐ পতাকা নাড়তে হবে।

টেবুনিয়া বাজারের সোনাই চাচার দোকান থেকে আট আনা দাম দিয়ে একটি জাতীয় পতাকা নিলাম। কিন্তু তার আগে আমাকে একটি পাটকাঠি (সোলা) নিয়ে যেতে হয়েছিল সোনাই চাচার দোকানে। তিনি দেড় হাত পাটকাঠি ভেঙে তার মাথার উপরে সবুজ কাগজ আর মাঝখানে লাল বৃত্তের মতো লাল কাগজ লাগিয়ে দিলেন আঠা দিয়ে।

আমিসহ আমার সহপাঠীরা সবাই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম সকাল থেকে। স্যাররা মাঝে মধ্যেই এসে বলতেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি চলে আসবেন। তোমরা অপেক্ষা কর।

ততক্ষণে স্কুলের মাঠে বুড়ো চাচার বরফ কয়েকটি খেয়ে ফেলেছি। এক একটি বরফ ছিল ১০ পয়সা। তখন মনে হয়েছিল আট আনা দিয়ে জাতীয় পতাকা না কিনে পাঁচটি বরফ খেলেও তো হতো।

প্রচণ্ড রোদ ছিল। সে সময়ে বেলা সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হতো ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে ছেড়ে আসা নৈশকোচগুলোর বেপরোয়া যাওয়া-আসা।

রাস্তার পাশে দাঁড়ালেও তখন রাস্তা ছিল খুব সরু। বিপরীতমুখী দুটো গাড়ি পার হলে যেকোন একটি রাস্তার নিচে ধুলোয় চলে আসত। আর নৈশকোচগুলো যাবার সময়ে দিয়ে যেতো প্রচুর ধুলা।

মনে পড়ে সকাল সাড়ে ৯টায় স্যাররা আমাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়েছিলেন। দুপুরের পর তিনি একটি কালো রংয়ের হুড খোলা জিপ নিয়ে গাড়িবহর যোগে পার হলেন ধীরগতিতে। এ সময় হুড খোলা স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে চলে গেলেন টেবুনিয়া ছেড়ে।

দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, সোনাই চাচার দোকানের জাতীয় পতাকা, বুড়ো চাচার বরফ, রাস্তার গাড়ি দেখা, ধুলা খাওয়া আর রাষ্ট্রপতি এরশাদকে স্বচক্ষে দেখা। সবই এখন ইতিহাসের মতো লাগছে। খারাপ লাগছে, সেই ব্যক্তি আজ আমাদের মাঝ থেকে চিরদিনের জন্যই না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেন। কিন্তু রেখে গেলেন নানা স্মৃতি। তাঁকে যখন কবরস্থ করা হচ্ছিল, গণমাধ্যমে এমন দৃশ্য চোখে পড়তেই ভেসে উঠল পুরনো সেই স্মৃতি।

আপনার মতামত লিখুন :