Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ধানের দেশ ছেড়ে মরণ সাগরে ভাসি কেন?

ধানের দেশ ছেড়ে মরণ সাগরে ভাসি কেন?
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম/ ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

এখন দেশে ধানের দাম কম, অনেকের ঘরে ভাত আছে। তবে কেন মরণপণ করে অবৈধপথে দেশান্তরী হতে চাই? কোন দু:খে, কেন চোরাই পথে এই সবুজ-শ্যামল ভূমি, সোনালি ধানের দেশ ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মরণ সাগরে ভাসি? সীমান্তে কাঁটাতার আছে, দু’দেশের পাহারাদার আছে। এয়ারপোর্টে পাসপোর্ট-ভিসা দেখে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হয়। তারপরেও ওরা অবৈধপথে সীমান্ত পার হয় কিভাবে?

তিউনিশিয়ার সাগর সীমান্তে ৬৪ জন বাংলাদেশি ক’দিন ধরে সাগরে ভাসার সংবাদ প্রসঙ্গে একজন তীর্যক স্বরে জানালেন- দেশে ভাত আছে, তবে ভালো কাজের অভাব প্রকট। যাদের কাজ আছে তাদের কষ্ট করে কাজ করার মানসিকতা নেই, তাই এদের কারো কারো সুখ-শান্তি নেই। সেজন্য পাসপোর্ট ছাড়াই পাইলট-ইমিগ্রেশন পার হয়ে বিদেশ চলে যায়। ইয়াবা সম্রাটের দেশের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ হলেও মক্কায় ওমরাহ করতে দেখা যায়। ফেরারি রাজনৈতিক নেতাকে সীমান্তের ওপারে শিলং এর পথে ঘুড়তে দেখা যায়। আবার একজন ওসিকে দেশেই খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। এদেরকে বিদেশে পালিয়ে যেতে দেয় কে বা কারা? নিশ্চয়ই সেটা ঘুষ-অথবা স্বজনপ্রীতি? পথে পথে অবৈধভাবে ছেড়ে দেয়ার সুযোগসন্ধানীরা সবসময় ওঁৎ পেতে আছেই। তা না হলে ধানেভরা সোনার দেশ ছেড়ে বার বার মরণ সাগরে ভেসে বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছি কোন দু:খে?

এতে কি জাতি হিসেবে আমাদের বৈশ্বিক মান-মর্যাদা কমে না? ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাবার সময় সাগরের ওপারে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ক্রিকেটের জয়ে আমরা যখন উল্লাস করছি অন্যদিকে এপারে তখন আফ্রিকার আরেকটি দেশ তিউনিশিয়ার সমুদ্র জলসীমায় মিসকিন শরণার্থী হয়ে ভেসে মৃত্যুর প্রহর গুণছি- এটা আমাদের জন্য চরম অমর্যাদাকর।

সেজন্য সীমান্তে ও বিমানবন্দরে যারা অবৈধ অর্থ লেনদেন করে ওদেরকে সীমান্ত পার করার সুযোগ করে দেয় তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ, চারদিকে তাদের অনৈতিকতার চর্চা, অদৃশ্য আয় ও অবৈধ অর্থ ব্যয়ের বাহারি ফুটানি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে। এসব দুর্নীতিবাজদের জন্য আমরা বিশ্বদরবারে কেন বার বার হেয় প্রতিপন্ন হব?

এখানে ব্যক্তিমানুষের মর্যাদা নাই আবার সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ভয় আছে পদে পদে। তাই বড় বড় ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সবাই ভিসার জন্য উন্নত দেশের দূতাবাসে অফিসের কাজ ফেলে লাইন দেন।

আর একটা দিক হলো- এখানে অনেকেই রাজনৈতিক লেবাস লাগিয়ে কাজে ফাঁকি দিয়ে ফুটানি দেখানোর সাহসই শুধু করেন না-অন্যের কাজ করার স্বাধীনতার ওপরও অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন। বিশ্বের মহান রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন ত্যাগী ও নির্লোভ। তাদের ধন-সম্পত্তি তেমন ছিল না। তারা জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক দিয়ে মানুষের কল্যাণ করতেন। বিন্তু এখনকার যুগে বিশ্বের বড় ব্যবসায়ীরাই বড় দেশের রাজনৈতিক নেতা বনে গেছেন। কারণ, টাকা ছাড়া রাজনীতি করা যায় না। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে- বাংলাদেশেও শতকরা আশিভাগ রাজনীতিবিদ ও সাংসদ ব্যবসায়ী।

নানা কারণে দেশে ভাতের আবাদ হলেও তার সঠিক সংরক্ষণ ও সুষম বণ্টন নেই। আবাদিরা ক্ষতিগ্রস্থ ও হতাশ। একজন প্রান্তিক ধানচাষীর বার্ষিক উৎপাদন ও আয় আর একজন ছোট চাকুরীজীবীর বার্ষিক আয়ের মূল্য ও ব্যবধান অতি চরম। এই ধরনের আর্থিক ব্যবধান ও বৈষম্যের কাছে কল্যাণ অর্থনীতির সূত্র গোলমেলে হয়ে পড়েছে। এছাড়া আছে লাগামহীন দুর্নীতির সুযোগ। এছাড়া শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের অভাব রয়েছে। তাইতো সবকিছু ভুলে, সবাইকে ফেলে অবৈধভাবে দেশান্তরী হয়ে মরণসাগরে ভাসতে দ্বিধা নেই!

এজন্য কেউ কেউ ভিটে-মাটি সহায় সম্বল বিক্রি করে হলেও বিদেশ যেতে চায়। বিদেশে পাড়ি জমানোর এই হিড়িক দেখে সুবিধাবাদী দালাল শ্রেণি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদের কেউ মানব পাচার করে, কেউ পাচারে সহায়তা করে লাভবান হবার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। এই ব্যবসা দেশের সংসদ থেকে শুরু করে গ্রামের ভাঙ্গা কুঁড়েঘর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এজন্য একদিকে সাংসদ, অন্যদিকে ফেলানীরা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরুনোর সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্য হলো-মহারথীরা পার পেলেও ফেলানীদেরকে গুলি খেয়ে কাঁটাতারে ঝুলতে হয় অথবা অথৈ সাগরে ডুবে মরতে হয়!

তবে এখন কেউ আর দেশে বড় দু:খের কারণে সখিনাকে দুবাই যেতে পীড়াপীড়ি করে না। সখিনারা নিজেই সুখের আশায় দুবাইয়ে পাড়ি জমাতে চায়। কারণ, ঘরে ধান থাকলেই ধনী হওয়া যায় না, দাম না থাকায় সোনার ধান ফলানোর পরেও হতাশা-কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।এর অর্থ হলো- দেশে ভাল কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের ব্যক্তিমর্যাদার যথার্থ স্বীৃকতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক বৈষম্য কমাতে অদৃশ্য ও অবৈধ আয়ের মানুষদের সম্পদের সঠিক জরিপ করে ও তা নিরুপণ করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এরা দেশের কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে তাই সঠিক পরিমাণ কর দেয় না অন্যদিকে ধর্মীয় ও নৈতিকতাবোধ না থাকায় যাকাত প্রদানেও বিরত থাকে। তাই এদের দ্বারা রাষ্ট্রের আর্থিক কোন মর্যাদা বাড়ে না, দরিদ্র মানুষের কল্যাণও হয় না।

দেশে যাদের বড় চাকরি আছে তারা কেন সেটা ছেড়ে দিয়ে একবারে বিদেশে যাবেন? দেশের একজন ব্যাংকের এজিএম কেন চাকরি ফেলে কানাডায় গিয়ে স্বল্প বেতনে আবাসিক ভবনের দারোয়ানগিরি করবেন- এ যুক্তি মাথায় আসে না। দেশে অসহনীয় যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা না থাকার বিষয়টি অনেকে মেনে নিতে পারেন না। লাগামহীন দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন পিছু ছাড়ছেই না।

এদিকে অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই.ই.পি-র প্রতিবছরের মতো এবারের রিপোর্টে প্রকাশ- ২০১৮ সালে বিশ্ব শান্তি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯২-তে থাকলেও ২০১৯ সালের জুনে এসে তা ৯ ধাপ পিছিয়ে ১০১তম হয়েছে। বিশ্ব শান্তি সূচকে এক বছরে নয়ধাপ অবনমন আমাদের দেশের জন্য ভয়ংকর অশনি সংকেত। মানুষ আসলে শান্তির আশায় হন্যে হয়ে বিদেশে ছুটে যেতে চায়। তাইতো দেশের সব মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তিতে বসবাসের জন্য কর্মসূচি নিয়ে আজকেই ভাবনা শুরু করা দরকার ।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র