গুজব ভয়াবহ, নৃশংস

বাশার খান
বাশার খান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

বাশার খান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

ছোটবেলায় ক্লাসে শিক্ষকরা প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় পেলেই ‘চিলে কান নিয়েছে’ এই প্রবাদটি বলতেন, এ বিষয়ে সতর্ক করতেন। বর্তমানে শহুরে জীবনেও বিভিন্ন আড্ডা-গল্পে কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। অর্থাৎ গ্রাম কিংবা শহর সবখানেই ‘চিলে কান নিয়েছে’- এমন গুজবের ব্যাপারে আলোচনা হয়, আছে সচেতনতাও।

গুজব নিয়ে এত কথা ও সচেতনতার পরও সম্প্রতি ছেলে ধরা গুজবে ছেয়ে গেছে দেশ। ‘চিলে কান নিয়েছে’ শুনে কানে হাত না দিয়েই চিলের পিছনে ছুটে চলছে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ। ঘটাচ্ছে নির্মম-নৃশংস কাণ্ড। কোনো রকম যাচাই করার চেষ্টা করছেন না কেউ। রাস্তায়ই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে সন্দেহভাজনকে। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ভবঘুরে মানসিক ভারসাম্যহীন ও অপরিচিত ব্যক্তিরা।

প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি কিংবা হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে গুজব রটনাকারী অতি উৎসাহীরা। পদ্মা সেতু নির্মাণে নাকি শিশুর মাথা লাগবে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কুচক্রীমহল এমন গুজব ছড়ানোর পরই শুরু হয় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যার মত জঘন্যতম অপরাধের ঘটনা।

আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। প্রায় সপ্তাহেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে বাড়ি যাই। সম্প্রতি এই সড়কে তিনটি বড় সেতু (দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী) নির্মিত হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের যানজট থেকে মুক্ত হয়েছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাখো যাত্রী। গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি সেতু নির্মাণে তো কোনো শিশুর মাথা লাগেনি। এ নিয়ে কেউ গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করেছে বলেও জানা নেই। সেতু বা উঁচু ভবন বানাতে শিশুর মাথা লাগে- এগুলো ডাহা মিথ্যা কথা। আধুনিক যুগে এমন অযৌক্তিক কথা মানুষ বিশ্বাস করে না। দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণে কোনো গুজব না রটালেও পদ্মা সেতুর বেলায় নিয়ে আসা হলো শিশুর মাথা লাগার মিথ্যে রটনা।

এই গুজব ছড়িয়ে কুচক্রীমহল অনেকটা সফলও হল। পদ্মা সেতুর বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক, ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সাহসের কাছে সব বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র পেছনে পড়ে গেছে। ইতোমধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ এই সেতুর। এত এত বাঁধা ও ষড়যন্ত্রের পরও যখন পদ্মা সেতু হয়েই যাচ্ছে- কাজেই গুজব ছড়িয়ে এর নির্মাণকাজ নানভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে কোনো একটি মহল রাজনৈতিক বা অন্য কোনো ফায়দা লুটার চেষ্টা করতেই পারে। এমন সন্দেহ অমূলক নয়।

২.

গুজব সাধারণত সমাজের এমন শ্রেণির লোকজনের মধ্যে রটিয়ে দেওয়া হয় যে স্তরে লেখাপড়া, সমাজ ও জীবন নিয়ে ভাবনাচিন্তা কম। যারা যে কোনো কিছুর মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়।

এর আগে একটি পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩ মার্চ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলোওয়ার হোসেন সাঈদীর চেহারা চাঁদে দেখা যাচ্ছে- সেদিন রাতে এমন গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। এরপর শত শত অতিউৎসাহী মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। লোকজন বাইরে বেরিয়ে সাঈদীর মুক্তি ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর করে। দেশবাসীর বুঝতে বাকি থাকে না যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করা ও সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করাই ছিল ওই গুজবের মূল উদ্দেশ্য।

আতঙ্ক, নৈরাজ্য, অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা ছড়াচ্ছে কারা?

সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে গুজবটি ছিল গ্রামে সীমাবদ্ধ। কিন্তু চলমান গুজবে আক্রান্ত হয়েছে শহরও। বাদ যায়নি রাজধানীও। গুজবে শুধু লেখাপড়া না জানা লোকে বেশি প্রভাবিত হয়, এই ধারণাকেও ছাপিয়ে গেছে ছেলেধরা গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকের কারণে এটি পেয়েছে গতি। মুহূর্তেই মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছেন না শিক্ষিত নগরবাসীও।

মাইক্রোসফটের ‘ইন্টারনেটের বিপদ’ শীর্ষক রিপোর্ট বলছে, সারা পৃথিবীতে ৫৭ শতাংশ মানুষ ভূয়া খবরের শিকার। গুজব এখন সারা পৃথিবীর কাছেই উদ্বেগজনক বলে দাবি করা হয়েছে মাইক্রোসফট ওই রিপোর্টে। [সূত্র: নজরদারি, ভুয়ো খবর আর গুজব ছড়ানোয় শীর্ষে ভারত, বলছে মাইক্রোসফটের রিপোর্ট] বোঝাই যাচ্ছে, আধুনিকতার চরম উৎকর্ষের যুগে যেখানে গুজব বিলিন হয়ে যাওয়ার কথা সেখানে গুজব নতুন মাত্রা পাচ্ছে। যেটিকে ইন্টারনেটের বিপদ বলেই আখ্যায়িত করছে মাইক্রোসফট।

৩.

গুজব বানের পানির মত আসে, ছড়ায়। আবার চলেও যায়। এখন ইন্টারনেটের উৎকর্ষতার যুগে গুজব ছড়ায় মুহূর্তেই, সুপার গতিতে। বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন কথাসাহিত্যিক মার্ক টোয়েনের ভাষ্যই যেন সত্যরূপে দেখা দিয়েছে এখন। তিনি বলেছেন, ‘সত্য তার জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে গুজব বা মিথ্যা সমস্ত পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আসতে সক্ষম।’

তবে গুজব যতই সুপার গতিতে ছড়াক, তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর সেটি চাপা পড়ে যায়। সমাজ যখন সত্যটা বুঝতে পারে গুজব তখন হারিয়ে যায়। কিন্তু গুজবের বলি ব্যক্তি ও তার পরিবারের কাছে এটি থাকে নির্মম স্মৃতি, ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে।

বিনাদোষে, শুধু সন্দেহের জেরে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মত উম্মাদ আচরণ মানুষ কীভাবে করতে পারে! তাও আবার সংঘবদ্ধ হয়ে। রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা গুজবে তসলিমা বেগম রেনু নৃশংস হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে সরকার ও প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বাড়ছে সচতেনতামূলক প্রচার।

তসলিমা বেগম তাঁর সন্তানকে ভর্তির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়েছিলেন স্কুলে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ায় তিনি কিছুটা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলেও জানা যাচ্ছে। গুজবে প্রভাবিত উত্তেজিত-উগ্র জনতা তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে পিটিয়ে হত্যা করে। কেউ একটিবারও যাচাইয়ের চেষ্টা করেনি তিনি আদৌ ছেলেধরা ছিলেন কি না? স্রেফ সন্দেহের জেরে একজন নারীকে রাস্তায় পিটিয়ে মেরে ফেলল গুজবে আক্রান্ত এই সমাজবাসী। কী নৃশংস, নির্মম কথা! ভাবতেই গাঁ শিউরে উঠে।

কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায় গুজব নিয়ে বলেছেন, ‘এই নিয়েছে ওই নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে/চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।’ না বুঝে না জেনে চিলের পিছে দৌড়ানোর ঘটনায় শুধু তসলিমা বেগমরাই মরেনি, মরছে আমার সামাজিক দায়বোধ-বিচারবোধ ও মানবিকতা।

আর দেরি নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা দরকার। অনতিবিলম্বে এসব গুজবের মূল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে আইনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা করে গুজব রোধের চেষ্টাও করছে। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও উদ্যোগ দরকার। স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, বাস ও রেলস্টেশন, পরিবারসহ সর্বত্র যার যার জায়গা থেকে সচেতনতা দরকার। তাতে নিজে যেমন বাঁচব, বাঁচবে সমাজও।

বাশার খান: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন :