ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে পরিবর্তন কি রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট?



ড. সুলতান মাহমুদ রানা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জের ধরে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে শোভন-রাব্বানীর বিদায়ের ঘটনাটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান সংকট কিংবা বাড়াবাড়ির পথে এক ধরনের সতর্ক চিহ্ন হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই।

অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো আমাদের সামনে আসছিল। বিশেষ করে দীর্ঘ দিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ছাত্রলীগের ক্ষমতার আধিপত্য, বড়াই-লড়াই, হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, চাটুকারিতা, পকেট নেতা তৈরি প্রভৃতি লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছিল। এ ক্ষেত্রে শুধু ছাত্রলীগ নয়, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীসহ এর অন্যান্য সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষমতা, আধিপত্য ও দম্ভের বাড়াবাড়ি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণেই সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের বিষয়টির তাৎপর্য একটু আলাদা অনুভব করছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র রাজনীতি থেকে আগাছা উপড়ে ফেলার আহ্বান জানাচ্ছিলেন অনেক দিন থেকেই। এবার নিজ হাতে আগাছা উপরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে আমরা লক্ষ্য করি, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে অনেকেই নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়ে নিজেদের প্রিয় সংগঠনকে কলুষিত করেন। ক্ষমতার দাপটে বর্তমান সময়ে তৃণমূল থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরে এই প্রবণতা লক্ষ্য করছি। ফলে এই মুহূর্তে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে শুধু সহযোগী কিংবা অঙ্গ সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে নয়, মূল দলকেও আগাছামুক্ত করতে হবে। আর যদি মূল দলকে আগাছামুক্ত করা না যায়, তাহলে লেজুড়বৃত্তির ছাত্র সংগঠনগুলোকে কোনোভাবেই সম্পূর্ণ আগাছামুক্ত করা যাবে না।

এখন একটি বিষয় অনেকটা ওপেন সিক্রেট যে দলের কমিটি গঠন ও শাখা কমিটি গঠনের জন্য যোগ্যতার পাশাপশি চলে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য। এই অপরাজনীতির দাপটে ক্রমেই ছাত্র রাজনীতি হয়ে উঠেছে অসৎ ও অশুভ।

প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখি, ছাত্রলীগের অনেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নির্বাচিত কিংবা মনোনীত হচ্ছেন, যাদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না। বরং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সংগঠনের সক্রিয়দের পারিবারিক উত্তরসূরিরা ছাত্রলীগের পদ ধারণ করছেন। আর এতে সহযোগিতা করছেন আওয়ামী লীগের অনেক হাইব্রিড নেতা।

প্রায়ই শুনে থাকি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সাধারণ ছাত্র নির্যাতন, অতঃপর হুমকি-ধমকি ও হল থেকে বিতাড়নের ঘটনা। মাঝে মধ্যেই এমন অভিযোগের মুখোমুখি হই শিক্ষক হিসেবে। অভিযোগ শুনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে শঙ্কিত হই। লজ্জায় মাথা নুয়ে পড়ে যে বঙ্গবন্ধু তো এমন রাজনৈতিক আদর্শকে প্রশ্রয় দেননি, কখনো শেখাননি। তাহলে কেন এগুলো ঘটছে? ধরে নিতে পারি যে যারা এমন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তারা কোনোভাবেই প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নয়।

শুধু ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নয় এমন নেতিবাচক প্রশ্রয় মূল দলেও লক্ষণীয় মাত্রায় রয়েছে। আর এ কারণে বলা যায়, ছাত্র রাজনীতির বর্তমান দশার জন্য শুধু ছাত্ররাই দায়ী নন।

আমি শিক্ষক হিসেব দেখেছি, অনেক ছাত্রই বঙ্গবন্ধুকে পছন্দ করেন, শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন। আর এই পছন্দ থেকেই একজন সাধারণ ছাত্র তার পরিবারকে যথাযথ আদর্শের মাধ্যমে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। সব শিক্ষার্থীই যে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে থাকবেন, আবার সবাই যে মিছিল মিটিংয়ে যাবেন, এমনটি কোনোভাবে প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন ছাত্রলীগের দ্বারা লাঞ্ছিত হন, তখন এর প্রভাব কেমন হতে পারে কিংবা কতদূর পৌঁছাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে চান। আর এই সুযোগে কতিপয় সুযোগসন্ধানী অন্যায়-অপকর্মের মাধ্যমে বেকায়দায় ফেলতে চান তার স্বপ্নকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাব আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ছাত্র রাজনীতির নীতি-নৈতিকতা ধ্বংস করা হয় লাইসেন্স-পারমিটবাজিতে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ছাত্র সংগঠনগুলোকে অবাধ সুযোগ দানের ব্যবস্থা দ্বারা।’

ইদানীং যারা ছাত্র রাজনীতি করেন, তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক কোনো আদর্শ ধারণ করেন না। তারা আসলে ক্ষমতার আদর্শে মগ্ন।

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটাবস্থা, আস্থাহীনতার প্রেক্ষিতে আদর্শিক এজেন্ডার সামঞ্জস্যতার প্রশ্নটি সামনে আসছে বারবার। যেহেতু বর্তমানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা কেন্দ্রিক বাস্তবতা, সেহেতু এই দলের নানান ফাঁকফোকর দিয়ে দলের আদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন বহু নীরব ঘাতক দলটিতে স্থান করে নিয়েছেন। তবে দলটির নানান স্তরে সেই রঙ দূষণকারী উপাদানের উপস্থিতি দলটির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর ছাত্রলীগের বর্তমান যে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটির পেছনেও হয়তো ষড়যন্ত্রপূর্ণ ইন্ধন রয়েছে।

এখন যারা ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের আদর্শকে অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দিয়ে দলের ভাবমূর্তি খাটো করছেন, তারা আসলেই আদর্শের শুভাকাঙ্ক্ষী কিনা- তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এমনকি যারা আদর্শকে কলুষিত করার খেলায় নেমেছেন তাদের চিহ্নিত করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলকে আরো অধিকতর পরিশুদ্ধতার দিকে নিতে পারার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই আগামী দিনের অন্যতম লক্ষ্য ধরা উচিত।

লেখক: ড. সুলতান মাহমুদ রানা, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়