Barta24

শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬

English

এক খাটের সন্তান

এক খাটের সন্তান
অলঙ্করণ কাব্য কারিম
মেহেদী উল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

আম্মা বিছানা চাদরের আপডেট নিতে থাকন, ‘ওই যে বাটিকেরটা, তোমারে দিছিলাম, কী করছো ওইটা? খাটে হয়?’
‘হয় আম্মা। এখনো আগের মতোই নতুন রয়ে গেছে। কই থেকে কিনছিলা?’ বলি আম্মাকে। আম্মা হাসেন। বলেন, ‘কিনি নাই তো! ওইটা পয়লা বৈশাখের তোমার নানার দোকানের। তোমার নানা শাড়ি আর বিছানার চাদর দিয়ে দোকান সাজাইত। রামগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের বৈশাখী মেলায় দোকান ফাস্ট হইত, আব্বার দোকান টানা ছয়বার ফাস্ট হইছিল। তোমরা তখন হও নাই।’
‘জ্বি আম্মা’
‘এলাকার মহিলারা নিজেদের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা দিত আর বিছানা চাদর। শাড়ি কুঁচি করে দোকানের দেয়াল দেওয়া হইত, আর বিছানা চাদরও আনাচ-কানাচে গুঁজে দেওয়া থাকত। তোমার নানার পিঠা, মিষ্টির দোকানের নাম ছিল কালিতারা। কালিতারার বিছানাচাদর এইটা। সেইবার দোকান ফাস্ট হইলে পুরস্কারের আনন্দে চর বাতেন থেকে আসা আমাদের এক আত্মীয় বিছানাচাদরটা উপহার হিসেবে দিয়া দিছিল আব্বারে। তখন আব্বা আশপাশে তাকাইতেছিলেন আর আমাকেই আপনজন হিসেবে কাছে পাওয়ার আনন্দে বলছিলেন, তুই বিছাইয়া শুইস।’

আম্মার শেষ হবে না। তাই পরে আবার কথা হবে বলে রেখে দিলাম। আমাদের তিন ভাই, এক বোনকে আম্মা ঢাকা আসার সময় বিছানার চাদর দিয়ে দিছিলেন একটা করে। মেজভাই নিতে চায় নাই। জোর করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে নাকি ছোটভাইকে পাহারা দিতে পাঠাইছিল বাস পর্যন্ত, ফেলে যায় কিনা খবর দিতে! মেজ ফ্যালে নাই।
আমি বিয়ের পর ফারিয়াকে দেখিয়ে বলেছিলাম, এইটা আম্মার দেওয়া চাদর। সে বেশ যত্ন আত্তির সঙ্গে আলমারিতে রেখে দিছিল। বিছায় না দেখে আমি বললাম, ‘চাদরটাতে একদিন শুই? নাকি?’
‘স্টুডেন্ট লাইফে শোও নাই? আর কত?’
‘দেওয়ার সময় আম্মার ইঙ্গিত ছিল, যেন বিয়ের পর এইটা বিছাই, সেজন্য বললাম।’
‘আম্মা তো আরো অনেক কিছুই বলছিল! সব শুনছিলা?’
‘আম্মা ফোন করলে তুলে রাখছো বলার দরকার নাই, বলবা, বিছাও।’
‘মিথ্যুক! মার সাথে মিথ্যা বলব!’
আমি আর কথা বাড়াই না। ঠিকই একদিন আম্মা জানতে চাইল, ‘ফারিয়া, রিয়াজের কাছে আমার দেওয়া একটা চাদর আছে, পাইছিলা?’
‘জ্বি আম্মা, খুব সুন্দর চাদর। কিন্তু আম্মা, এইটা ছেলেরে দেওয়া আপনের একমাত্র স্মৃতি, বিছিয়ে নষ্ট করে ফেলা কি উচিত হবে?’
তারপর থেকে চাদর না বিছানোতেই দেখি আম্মার সুখ! মানুষের কথা না রেখেও যদি বোঝানো যায়, এটা তার স্বার্থেই রাখা যাচ্ছে না তবে মানুষ কষ্ট পায় না।

দুই.
‘কদমগাছের খাট! আর কতকাল ভালো থাকব?’ কদমগাছের কী সমস্যা আমরা সেকালে বুঝতাম না। আম্মা প্রায়ই আব্বাকে বলতেন এই কথাটা। আব্বা বলতেন, ‘কাঠ কি লোহা! ঘুণে তো ধরবেই।’

খাটটা ছিল বিরাট। মোটা মোটা পায়া, দুইপাশে রেলিং, হলুদ রঙ। কয় ফিট বাই কয় ফিট, আজ আর খেয়াল নাই। আম্মা-আব্বাসহ আমরা তিনভাই একবোন এঁটে যাইতাম। আমি সবার বড়, সবার ছোট ভাই, বোন আমার ছোট—সব পিঠাপিঠি। আমার ক্লাস সেভেন পর্যন্ত খাটটা শোয়ার উপযুক্ত ছিল। আমাদের ঘরটা ছিল দুই কক্ষ বিশিষ্ট। এক কক্ষে আমরা থাকতাম, আরেক কক্ষে আমাদের চাচা। চাচার দুয়ার উত্তরে, আর আমাদের দুয়ার পশ্চিমে। চাচার দুয়ারে ছিল একটা বেলগাছ আর আমাদের দুয়ারে ছিল হরিতকী। হরিতকীর উদীয়মান সবুজ মরিচা পড়া টিনের চাল আড়াল করে রাখত! পশ্চিম থেকে দক্ষিণে যেতে যেতে আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছিল, আমরা সেভাবে উত্তরে যাই নাই, সেজন্য বেলগাছ ঠিক দেখতে কেমন আমরা জানতাম না। শুনেছিলাম, বেলগাছের পাশে একটা পেয়ারাগাছও ছিল, সেই পেয়ারা আমরা কোনোদিন খাই নাই। এখন চাচাত ভাই-বোনের মুখে এর স্বাদের কথা শুনি, ভালো লাগে। বলি, তোমাদের পেয়ারার আর কী কী টেস্ট ছিল?

রাতে আব্বা হিসু করতে উঠলে, সিরিয়ালি আমি, তারপর আমার বোন, আমার ভাই, আমার ভাই উঠে পিছ পিছ যেতাম; আম্মা বলতেন, রাতে পানি কম খেয়ে শুতে পারিস না তোরা!

বৃষ্টি হয়ে যাবার পর যদি হতো সেই হাঁটা, তবে সকালে উঠে দেখতাম আব্বার প্লাস্টিকের জুতার দাগ উঠানে, আর বড় বড় দাগের মাঝে মাঝে ছোট ছোট স্যান্ডেলের দাগ! কিংবা শীতের কুয়াশার ভেতর অথবা অধিক অমাবশ্যার ভেতর আমরা কেউ কাউকে দেখতে পেতাম না, আমরা আওয়াজ শুনতাম একে অন্যের।
আমার বোনের চুলের ব্যান্ড হারিয়ে যেত; ঘরটা এতই ছোট যে আম্মা বুঝতেন কোথায় হারাইছে। খাটের কোনো এক কোনায় অথবা বিছানার চাদরের ভাঁজে অথবা বালিশের তল থেকে খুঁজে এনে দিতেন। আমার ছোটভাই যখন খুব ছোট ছিল; কয়েক ঘণ্টা পর পর সে খিদায় কাঁদত অথবা গরমে! তার সাথে সাথে আমাদেরও ঘুম ভেঙে যেত, খুব কাছ থেকে আমরা আমাদের ছোটভাইয়ের কান্নার শব্দ শুনতে পেতাম, এবং তা অনবরত। আমরা নিশ্চিত জানতাম, কয়েকবার আমাদের ঘুম ভাঙবে, সেই সুবাদে তিন ভাই-বোন একে-অন্যকে পাল্টা-পাল্টি করে কয়েকবার জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে যাবার সুযোগ পাব। আমার মেঝভাই রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁটতে পারত। সে খাট থেকে উঠে নিজে নিজে দরজা খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিত, যদিও জেগে থাকলে রাতে সে একা ঘরের মধ্যেই ভয় পেত। আব্বা কিভাবে যেন টের পেত, মেঝভাই দরজা খোলার আগেই আব্বা তাকে কোলে করে এনে খাটে শুইয়ে দিত। সবার মাঝখানে। বালিশ ছাড়া, যেন তার গভীর ঘুম না পায়!

এভাবেই গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ল, আমাদের মেঝভাইর মধ্যে অলৌকিক কিছু আছে। তারপর কোত্থেকে যেন শুনলাম, আমার মেঝভাইর সুন্নতে খতনা নাকি ঘুমের মধ্যে ফেরেশতারা করিয়ে দিয়ে গেছে। অথচ আমরা তো জড়াজড়ি করে একই খাটে ঘুমিয়ে থাকতাম, কোনো ব্যথায়, না কোনো দিন সে জেগে উঠে নাই! আমাদের আব্বার বালিশ রোজ সকালবেলা ঝাড়তে হতো। আম্মা সবার আগে ঘুম থেকে উঠে নিচ থেকে বালিশ কুড়াতেন আর বলতেন, ‘মাথা কই আর বালিশ কই!’ এভাবে বলতে বলতে তিনি ভোর আনতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আম্মার ঝাড়ু দেওয়ার শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত। আমরা সন্তান, একখাটে ঘুমন্ত পিতার পাশে উঠে বসতাম। বড়দের খেলনা থাকত খাটের নিচে, ছোটদের খেলনা খাটের উপরে; ঘুম থেকে উঠেই আমরা আগে দেখতাম যার যার খেলার সামগ্রী ঠিকঠাক জায়গায় আছে কিনা। কাঠ দিয়ে বানানো ব্যাট, পলিথিনের ফুটবল, সুপারির খোল, ঘুড়ি, বেত লাফানোর দড়ি ইত্যাদি থাকত খাটের নিচে। আর উপরে থাকত বিশেষত, সবচেয়ে ছোটভাইয়ের খেলনা, ঝুনঝুনি, প্লাস্টিকের গাড়ি, বন্দুক, চরকি ইত্যাদি। মেঝভাইয়ের গাড়ির চাকাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত বিছানার এদিক-ওদিক। ভালো করে খেয়াল না করলে দেখার উপায় নেই। সবাই বিছানা ছাড়লে সে একটা একটা করে খুঁজে নিত। আর সব পাওয়ার পর শুধু একটা যদি না পেত, সবাইকে বাধ্য করত তার চাকা খুঁজতে, যেন সবাই মিলে ঘুমানোর কারণেই তার চাকা হারাইছে!

মশারি নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় ওটা উপরেই ঝুলত! গোপনে আম্মা টানানোর ব্যবস্থা করতেন বেশি মশায়, আমরা ঘুমিয়ে গেলে। একটা খাটের জন্যে অনেকগুলো বিছানার চাদর ছিল আমাদের। কম করে হলেও দশ-বারোটা। বিভিন্ন রঙের আর ডিজাইনের চাদর। আম্মা বাপের বাড়ি যাবার সময় রেলস্টেশনে ট্রেন বদলানোর ফাঁকে কিনতেন। রাতে ঘুমানোর সময় আমরা আওয়াজ শুনতে পেতাম, কুটকুট কুটকুট। আম্মার মন খারাপ থাকত, ভেতরে ভেতরে পোকায় খাট খাচ্ছে; এতগুলা চাদর তিনি বিছাবেন কোথায়?

তিন.
মা কাকটা বাসাই ছাড়ছে না; ডিমে তা দিচ্ছে। বেশ কয়েকটা ছবি পাঠাল ফারিয়া, ম্যাসেঞ্জারে। আমাদের বাসার রান্নাঘরের পাশে কাঁঠালের ডালে হুট করে বাসাটা বানিয়েছে কাক দম্পতি, ডিম পাড়ার আগে আগে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মা কাক বাসায় বসা, আর পাশে পাহারা দিচ্ছে বাবা কাক। বাসায় জায়গা নেই তার জন্য। গ্রীষ্মের উত্তাপের মধ্যে শরীরে রোদের বাসা নিয়ে বাসায় বসে মা কাক। আমি যখন বাসায় আসব, তখন দেখব, কয়টা ডিম, যদি কাক ডানা গুটায় অথবা বাসা ছাড়ে কোনো ছুঁতায়। আমার বোনের কোয়েল পাখিগুলোকে এখন কে দেখে কে জানে! রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে ঢাকা ছেড়ে, সংসার ছেড়ে সে ওখানেই। মানবাধিকার সংস্থার হয়ে কাজ করছে, বাসা ভাড়া নিয়ে একা থাকছে কক্সবাজারে। শুরুর দিকে ওকে ফোন করলে সে জানায়, ‘ভাইয়া, ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসতেছে।’

মেঝভাইকে ফারিয়ার পাঠানো কাকের বাসার ছবিটা ফরোয়ার্ড করতেই সে রিপ্লাই দিল, ‘তোমার প্রিয় পাখি কাক, তুমি কাকের মতো সংসার করো গা। আমারে এসব পাঠিয়ে লাভ হবে না। আমি একাই ভালো আছি। নেক্সট উইকে আবার পাহাড়! তাঁবু করে থাকব ক মাস।’
কিছু দিন একটা মেয়ের সঙ্গে লিভইন করতো ও। তারপর কী যে হলো। ওদের আর এক করা গেল না। দুইজনেরই যোগাযোগ আছে, দেখা সাক্ষাতও হয়, কিন্তু একঘরে আর রইবে না, বিয়ে তো না-ই। এটাও একটা জীবন। আপত্তিটা একছাদের নিচে থাকায়, একসাথে থাকায় না। শুনলাম, মেয়েটাও পাহাড়ে যাবে সাথে!

রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়াতে বোনের সুবিধা হইছে। দুইজন দুই জায়গায় থাকায় সংসারের মেয়াদ কিছুদিন বাড়ল ওদের। ওদের সমস্যাটা কিসে, যদিও বেশি পরিষ্কার না আমার কাছে, তবুও ভাসাভাসা বুঝি, সামান্যতে বাঁধে। সম্পর্কে ইমোশন নাই আর। অথবা একত্রে থাকবার ইচ্ছাও। তবুও কেন জানি ছিল, একই বাসায়, হয়তো আলাদা ঘরে, হতে পারে একই ঘরে, আমাদের জানায় নাই, আমরা জানতে চাইও নাই। বোন মাঝেমধ্যে খুব চটলে আমাকেই ফোন করে আর একই বাক্য রিপিট করে, ‘ভাইয়া, এভাবে কি থাকা যায়, একটা বাসায়?’ বলে ফোন কেটে দেয়, আমিও আর ব্যাক করি না। এই একটা বাক্য শুনতে শুনতে আমার এমন মনে হয়, ওরা বোধহয় আলাদাই থাকে, একই ঘরে।

সবচেয়ে ছোটভাই সোশাল মিডিয়ায় তেমন একটা নাই, কানাডায় পড়তে গিয়ে আর আসছে না, যোগাযোগ কম। ওরে কিছু পাঠিয়ে লাভ হয় না, সিন করে না।

আমি আর মাহজাবিন চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ ক্যাপপরা একটা ছেলে, চুল ঝুটি করা, এলো। ব্যাগ থেকে বের করে কী একটা কাগজ ওর দিকে বাড়িয়ে দিল মাহজাবিন। তারপর আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘আমার বন্ধু, পরে পড়ো, আগে পরিচিত হও।’ আমি হাত বাড়িয়ে পরিচয় দিয়ে জানত চাইলাম, ‘ভালো আছেন?’ মাহজাবিন আমাকে শুধরে দিয়ে বলল, ‘ওকে আমি ছেলে ডাকি। আমার ছেলে। আপনি করে বলতেছো ক্যান!’ তবুও আমি, আপনি ছাড়লাম না। বললাম, ‘আপনার হাসিটা খুব সুন্দর! আপনার মায়েরই মতো।’ ছেলেটা আবার হাসতে হাসতে কাগজটায় চোখ বুলাচ্ছিল।

মাহজাবিন পরে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল। এই ছেলের বাড়ি বরিশাল। ঢাকায় এসে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সিনেমার সাথে যুক্ত হতে চাইছিল। এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয়। তারপর থেকে মাহজাবিনের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছে। মাহজাবিনকে মা ডাকে। বয়সে বড়জোড় দশ-বারো বছরের গ্যাপ ওদের। হঠাৎ গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলো এমনই, কোথা থেকে কী রূপে শুরু হয়, কিভাবে শেষ হয় ধারণা করা যায় না। এখন আমাকে বলতেছে, ওকে আপনি বলা যাবে না। ব্যাপারটা বিব্রতকর। সে দেখে সন্তানের মতো, আমাকে দেখতে হবে। আমি যেন অভ্রকে ছেলে হিসেবেই দেখি। আমি মাহজাবিনকে বললাম, এই কর্তব্য তো তোমার হাজব্যান্ডের। তাই না! আমি তো সামাজিক না এক্ষেত্রে। আমি তুমি পর্যন্ত মেনটেইন করলেই হলো। এর আগে-পরে আমার কোনো কর্তব্য নাই। ‘আরে, ও তো ছেলেই মনে করে, তুমি বলে। কিন্তু ওকে এর বাবা হিসাবে আমি কেন জানি মানতে পারি না। বেমানান লাগে। তোমারে ঠিক লাগে। আমার এমন মনে হয়, আমি কী করব বলো।’ বলল মাহজাবিন।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, নেক্সট টাইম তুমিই বলব। প্রথম পরিচয়ে কাউকে তুমি ডাকাটা সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট সীমা আগে থেকে ঠিক করে রাখার সামিল।’
মাহজাবিন ফোন করে একদিন জানাল, ‘শোন, তোমার ছেলে একটা খাট কিনতে চায়। তুমি একটু ওর সাথে যাবে, যেতে হবে।’
‘ও কি শিশু? নিজের খাট নিজে কিনতে পারে না!’
‘আহা! গেলেই বুঝতে পারবে, কেন যেতে বলছে। কাল বিকালেই যাবে, গুলশান অটবি শোরুমে।’
‘ভাগ্যিস ঢাকায় আছি, না থাকলে পেতে কোথায়?’

গিয়ে দেখি, খাটের বিজ্ঞাপন! মাহজাবিন বানাচ্ছে। আগেই পুরোটা ভেঙে বললে হয়তো রাজি হতাম না। অভিনয় ওরা শিখিয়ে দিল। একটাই ডায়লগ, ‘খাটের জন্য খেটে মরার কী আছে, এই তো চোখের সামনে কত খাট! কোনটা নিবে বাবা?’ অর্থাৎ আমি আমার আর মাহজাবিনের পাতানো, সরি মাহজাবিন শুনলে কষ্ট পাবে, আমি এভাবে ভাবি, আমার আর মাহজাবিনের ছেলেকে উদ্দেশ্য করে এমন বলব। ছেলে কিছুই বলবে না, শুধু শুনে বাবার সাথে থেকে খাট পছন্দ করবে।

চার.
কাকের বাসায় বাচ্চা চলে আসছে। চারটা। মা কাক একবার ওদের ঢেকে বসে, আবার বাইরে গিয়ে বসে।
বাবাটা পাশের ডালে বসা। ফারিয়াকে দেখিয়ে বললাম, ‘ওদের সংসার জমে উঠেছে। দেখছো, তিনটা ফুটফুটে বাচ্চা।’
ফারিয়া বলল, ‘আমাদের তো কোনো বাবু নাই। তাই বলে কি আমাদের সংসার জমেনি?’
‘তুমি মানুষের দিকে টানো ক্যান! আমি তো কাকেদের অর্থে বললাম। বাচ্চাগুলো বড় হলেই ওরা সংসার ভেঙে দিবে বা ভেঙে যাবে। মানুষ তো তেমন না, নিজেদের প্রয়োজনেই নিজেরা ভাঙে।’
‘শোনো, মাহজাবিন কোত্থেকে যেন পঁচিশ বছরের একটা ছেলে আনছে। আমাকে বলল, আমিও যেন তারে ছেলের মতোই দেখি। তুমি কি ডাকবে ওরে ছেলে?’
‘মাহজাবিন কেন এগুলা করে? তোমারে আবার এসবে জড়ায় ক্যান? বুঝছি, ওর হাজব্যান্ড নিশ্চয় এসব পাগলামোতে সায় দেয় না। তাই তোমারে পাইছে। বাহ্, ভালো তো, প্রেম করতেছিলা, করো, এখন আবার বাচ্চাও পয়দা হইচে! আর কী কী আছে তোমাদের? সিনেমা, বিজ্ঞাপন না বানিয়ে ওরে বলো নাটক বানাইতে।’
ফারিয়া বলতে বলতে রুটি ছিটিয়ে দিল কয়েক টুকরো, বাইরে জানালার কার্নিশে। কাক খাক বা না খাক কিংবা বাচ্চাদের খাওয়াক। তারপর বলল, ‘২৭ তারিখ আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী, গ্রামে টাকা পাঠিয়ে দিও, ওরা মসজিদে একটা আয়োজনের ব্যবস্থা করুক। আমি-তুমি ওইদিন গেলেই হবে, আম্মাকে বলে রেখো।’
‘আচ্ছা।’

ফারিয়া বলে চলে যায়। আমি কাকের পশমছাড়া চর্ম-কঙ্কালসার বাচ্চাগুলোকে দেখছি আর ভাবছি, বাচ্চাগুলো বড় হয়ে যদি শোনে কাক তাদের মা না, বাবা না অথবা কাক যদি জানে এরা তাদের সন্তান নয়। ফারিয়ার অবর্তমানে যদি কিছু ঘটে থাকে এই বাসায়! ফারিয়ার অদেখায় যদি কিছু হওয়ার থাকে। জানি না। এদিকটায় খুব গাছ-গাছালি; কোকিলও ডাকে!

পাঁচ.
আমার আর আমার ছেলের অভিনীত খাটের বিজ্ঞাপন টিভিতে প্রচারিত হওয়ার দিনগুলিতে আমার সত্যিই মনে হতে থাকল, ও আমার সন্তান। অভিনয় বেশিবার হয়ে গেলে আর অভিনয় থাকে না, অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।
আমি, মাহজাবিন আর আমাদের সন্তান! ফারিয়া কাকের বাসা পাহারা দিচ্ছিল। ওর আশঙ্কা হচ্ছিল, দিন-রাত পাহারা না দিলে যদি কোকিল এসে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে যায়! তাই! কাকের বাসায় কেন কোকিল বেড়ে উঠবে? কোকিলের অক্ষমতা কাক কেন নেবে? আর কতকাল নেবে? কোকিল কি কোনোদিনও শিখবে না ঘরবাঁধা?

আম্মা কাঁদতে থাকে ফোনে। টিভি বিজ্ঞাপনে আমাকে আর আমার ছেলেকে খাট কিনতে দেখলে তার নাকি অনেক খারাপ লাগে। আমি জানতে চাইলাম, কেন আম্মা? আম্মা জানায়, আমার এমন একটা সন্তান থাকলে তার খুব ভালো লাগত। আমি বলি, এইটাও আমাদেরই সন্তান! কিন্তু আম্মা মানতে রাজি না।
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের খাটের কথা মনে আছে তোমার, বাবা? আমরা একসাথে ঘুমাইতাম, সেই যে কদমগাছের খাট, ঘুণে খাইছিল।’
আম্মাকে সান্ত্বনা দিই, ‘জ্বি আম্মা, মনে আছে।’
তারপর আম্মা যা বললেন তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি শুধু একটা বাক্য বলে ফোনটা কেটে দিলেন। কথাটা হলো, ‘কেমন আছে আমার একখাটের সন্তানরা?’
আম্মা শুনছেন না জেনেও আমি উত্তর দিলাম, ‘তারা খুব ভালো আছে আম্মা, খুব ভালো আছে।’
কিন্তু ফোনটা কান থেকে নামাতে নামাতে উপলব্ধি হলো, আম্মার এক খাটের সন্তানদের কারোরই এখন আর বাস্তবিকই কোনো খাট নাই!

আপনার মতামত লিখুন :

রিজিয়া রহমান: রক্তের অক্ষরে জোনাকির আলো

রিজিয়া রহমান: রক্তের অক্ষরে জোনাকির আলো
কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান/ ছবি: সংগৃহীত

১.

ময়দান পেরিয়ে অভিজাত ভবানীপুর এলাকা থেকে দক্ষিণ কলকাতার শুরু। ৮০ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার সেই বনেদী পাড়ায় জোনাকি নামের একটি শিশুর জন্ম হলো। রাজনৈতিক দোলাচল, দেশবিভাগ ইত্যাদি কারণে শিশুটি সপরিবারে বাংলার পশ্চিমাংশ ছেড়ে চলে আসেন পূর্বাঞ্চলের আজকের বাংলাদেশে। চরম বিরূপতার মধ্যে থেমে থেমে অর্জন করেন উচ্চশিক্ষা। চালিয়ে যান গল্প-উপন্যাস রচনা।

তার হাত দিয়ে বের হয় ‘বং থেকে বাংলা’, ‘শিলায় শিলায় আগুন’, ‘রক্তের অক্ষর’-এর মতো মানুষ ও জীবনের সুগভীর বর্ণনা-সমৃদ্ধ, ঐতিহাসিক-বিন্যাসের আখ্যান। ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অর্জন করেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’, ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’সহ অনেক স্বীকৃতি। 

১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বরে জন্ম নিয়ে ২০১৯ সালের ১৬ আগস্ট মৃত্যু হয় যে জোনাকির, তিনি রক্তের অক্ষরের শরীরে জোনাকির মতো আলো ছড়িয়ে বেঁচে থাকবেন বাংলা কথাসাহিত্যে। তার মৃত্যু হলেও তার বইগুলো বেঁচে থাকবে বাংলাসাহিত্যের ভাণ্ডারে ও পাঠকের চিত্তে। অক্ষয় মলাটে লিপিবদ্ধ থাকবে তার নাম, রিজিয়া রহমান।

২.

রিজিয়া রহমান অসামান্য ভাষায় বহুবিধ বিষয়বস্তুর বর্ণনা দিয়েছেন তার রচনাসমূহের প্রতিটি অক্ষরে। শুধু পাঠেই নয়, অনুভূতির গভীরতম মর্মমূলে পৌঁছে যায় সেসব চিত্ররূপ কাহিনীপ্রবাহ। ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসে এই লেখকের কৃতিত্বের ছাপ সুস্পষ্ট: 

‘সবাই বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল কয়েকবার দাপাদাপি করে পেটে ছুরির ঘাই খাওয়া ইয়াসমীনের অর্ধনগ্ন দেহটা নিস্পন্দ হয়ে গেল। হীরুর চোখ টকটকে লাল! হাতে রক্তমাখা ছুরি। হীরু বাইরে এলো। 

মেঝেতে পড়ে থাকা ইয়াসমীনের বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে রক্ত মুছে কাগজটা ছুড়ে দিল হীরু কিছুক্ষণের জন্য বজ্রাহত, নির্বাক হয়ে যাওয়া মেয়েদের সামনে।

তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-দ্যাখ ছিনালেরা! এইবার চক্ষু মেইল্যা দ্যাখ হীরু কী করবার পারে।

পিছিয়ে গেল মেয়েরা। মার খাওয়া পরাজিত পশুর মতো বেদনাহত চোখে ইয়াসমীনের মৃহদেহের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

রক্তমাখা কাগজটা ওদের সামনে। ওরা শুধু কাগজের এক পিঠের রক্ত দেখল। ওরা জানল না কাগজের আরেক পিঠে লেখা সর্বকালীন সত্যের সেই বিখ্যাত বিদগ্ধ উক্তি: ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি, বাট এভরি-হোয়্যার ইজ ইন চেইন।’

নিস্তব্ধ বজ্রাহত বাড়িটায় তখন একটি শিশুর স্বাধীন প্রতিবাদের কান্না বেজে উঠল। ফুলমতীর বাচ্চা কাঁদছে প্রবল চিৎকারে।’     

৩.

‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসে নির্মম মৃত্যুবরণকারী নারী ইয়াসমীন কে? এই প্রশ্ন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবেই। ১৯৭৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত রিজিয়া রহমানের উপন্যাসটি ছিল নারী ও মুক্তিযুদ্ধের মিলিত সংগ্রামের ধারাভাষ্য। 

রেকর্ড রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে যারা সর্বাগ্রে এগিয়ে আসেন, তিনি তাদের অগ্রণী। বিশেষত নারী কথাশিল্পীদের মধ্যে রিজিয়া রহমানের সমকালে রাবেয়া খাতুন (ফেরারী সূর্য, ১৯৭৪ সাল), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (বন্দী দিন বন্দী শিবির, ১৯৭৬ সাল), সেলিনা হোসেন (হাঙর নদী গ্রেনেড, ১৯৭৬ সাল) ছাড়া আর কাউকে মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে কথাসাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসতে দেখা যায় নি।

রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধর্ষিতা, লাঞ্ছিতা বাঙালি নারীদের করুণ জীবনের আখ্যান। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা ধর্ষিত ও নির্যাতিত লক্ষ লক্ষ নারীকে স্বাধীনতার পর সরকার যে সম্মানসূচক বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেছিল, নৃশংস আঘাতে মৃত্যুবরণকারী ইয়াসমীন তাদের অন্যতম।

তৎকালীন সরকার রণাঙ্গণে ও যুদ্ধের সময় নিপীড়িত, নির্যাতিত নারীদের সামাজিক ভাবে পুনর্বাসন, তাদের বিয়ে ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছিল। এসব রাজনৈতিক উদ্যোগ-আয়োজন সামাজিক বাস্তবতায় বিভিন্ন ঘাত ও প্রতিঘাতের সম্মুখীন হচ্ছিল। যুদ্ধোত্তর সমাজের একটি অংশ বীরাঙ্গনা নারীদের স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করে নি। তাদের পরিবারও এইসব বীর নারীদের ফিরিয়ে নিতে ছিল কুণ্ঠিত। ফলে লাঞ্ছিতা মেয়েদের জায়গা হয়েছিল আশ্রয়কেন্দ্র, পতিতালয় বা অন্য কোথাও। 

রিজিয়া রহমান তার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে এমনই এক ভাগ্যাহত নারী ইয়াসমীনকে বেছে নিয়েছিলেন। ইয়াসমীন চরিত্রের মধ্য দিয়ে রিজিয়া রহমান তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের একটি ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে এইসব বীরাঙ্গনাদের জীবনকাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি অঙ্কিত হয়েছে পতিতাপল্লির অন্ধকারময় বীভৎস জীবনে নারীনির্যাতনের মর্মন্তুদ কাহিনীচিত্র।   

৪.

‘রক্তের অক্ষর’ আবর্তিত হয়েছে ইয়াসমীনের জীবন, সংগ্রাম ও অস্তিত্বের সঙ্কটকে ঘিরে। পটভূমিতে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল নামে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে পাকিস্তানি সৈন্যরা ইয়াসমীনের বাবা, মা, ভাই, বোনকে হত্যা করে। ইয়াসমীনকে ধরে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। মাসের পর মাসের পাশবিকতায় নিত্য জর্জরিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের শেষে বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পায় ইয়াসমীন। অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মুক্ত স্বদেশে নিপীড়িত ইয়াসমীনের ঠাঁই হয় একটি নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

কিন্তু কঠিন বাস্তবতা ইয়াসমীনের পিছু ছাড়ে না। আক্রান্ত ও ক্ষত-বিক্ষত ইয়াসমীনের জীবনকে অন্ধকারের স্তব্ধতায় রেখে আর সব কিছু চলতে থাকে ঠিক আগেরই মতো। পরিবারের সবাই পাকিস্তানি বর্বরদের হাতে নিহত ও ইয়াসমীন নিজে চরম লাঞ্ছিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যে প্রেমিক সারা জীবন সুখে-দুঃখে ইয়াসমীনের সঙ্গী হওয়ার সঙ্কল্প করেছিল, সে এখন আরেকজনের স্বামী। 

এমনই পরিস্থিতিতে ইয়াসমীন একদিন তার চাচার বাসা খুঁজে পায়। কিন্তু এতদিন পর তাকে দেখে চমকে উঠে চাচা। ইয়াসমীন বুঝতে পারে তাকে আর আগের মতো গ্রহণ করছে না। চাচা ইয়াসমীনকে চাকরি ও অন্যান্য সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও নিজের পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত। 

ক্ষুব্ধ ইয়াসমীন আবার ফিরে আসে তার শেষ ভরসাস্থল পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ইয়াসমীনের চাচা তার একটি চাকরির ব্যবস্থা করলেও ইন্টারভিউ বোর্ডে ইয়াসমীনকে সম্মুখীন হতে হয় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির। সর্বত্র তার বীরাঙ্গনা পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠে। উচ্চ শিক্ষিত ইয়াসমীনের যোগ্যতার চেয়ে তার লাঞ্ছিতা জীবনের কাহিনীই প্রশ্নকর্তাদের কৌতূহলের বিষয় হয়ে পড়ে। প্রশ্নকর্তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ ইয়াসমীনের বিক্ষুব্ধ উক্তির মাধ্যমে ঔপন্যাসিক নারীর আত্মসম্মানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত্ব করেন:

‘আমার সম্পর্কে আপনাদের আগ্রহের চেয়ে কৌতূহল বেশি। কারণ আমি সরকারের দেয়া বীরাঙ্গনা খেতাব নিয়ে এসেছি। আপনাদের দৃষ্টি, আপনাদের ভঙ্গি বলে দিচ্ছে যে, আমি সমাজ ছাড়া মানুষ। সরকার বোধ হয় বারাঙ্গনা বলতে ভুলে বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়ে ফেলেছে। ... পাকিস্তানি সৈন্যরা আমার দেহের ক্ষতি করেছে। আর আমার মনের ক্ষতি করছেন আপনারা। আপনাদের মতো মানুষেরা যারা কিছু না হারিয়েও স্বাধীনতার ফল ভোগ করছেন।’

৫.

ইয়াসমীনের সংক্ষুব্ধ বক্তব্যের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে তীব্র বিদ্রূপ, ঘৃণা এবং পুরুষশাসিত সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচত দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ। মুক্তিযুদ্ধের বীর নারীদের প্রতি সমাজ ও কতিপয় মানুষের হীন মনোভাবেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ইয়াসমীনের ঘটনায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষিত ও লাঞ্ছিতরা বীরাঙ্গনা খেতাব পেলেও সামাজিক ক্ষুদ্রতার কারণে কিছু মানুষ তাদেরকে গ্রহণযোগ্যতা ও যথাযথ মূল্যায়ন করে নি। পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় এবং সমাজের বিভিন্ন পেশায় আসীনরাও দেখাতে পারে নি উদারতা ও সম্মান।

ইয়াসমীনের জীবন-বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার এখানেই শেষ নয়। শারীরিক লাঞ্ছনা ও মানসিক পীড়নের পাশাপাশি তার ওপর নেমে আসে শোষণ ও অবদমন। উপন্যাসের এক পর্যায়ে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে একজনের সঙ্গে ইয়াসমীনের বিয়ে হলেও তার পেছনে ছিল নোংরা ষড়যন্ত্র, লোভ ও অসাধু মনোভাব। 

অল্প সময়ের মধ্যেই ইয়াসমীন আবিষ্কার করে যে, তার বিবাহিত স্বামীর আসল উদ্দেশ্য দাম্পত্য ও প্রেম নয়, অন্য কিছু। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে ইয়াসমীনের দখল হয়ে যাওয়া বাড়িটি উদ্ধার ও ভোগ-দখল করতে এবং ইয়াসমীনের শরীরকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার জন্যই বিয়ে নামক প্রহসন করেছে। প্রতিদিনই নিত্যনতুন পুরুষের শয্যাসঙ্গী হতে ইয়াসমীনকে তার কথিত স্বামী বাধ্য করছে। স্বামীর অত্যাচারে শেষপর্যন্ত ইয়াসমীনের ঠাঁই হয় নিষিদ্ধপল্লী পতিতালয়ের অন্ধকার জগতে। জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে প্রতিবাদী ইয়াসমীন তারপরেও বলতে থাকে তার ক্ষুব্ধ কথামালা:

‘যুদ্ধ যদি আমাকে বেশ্যাই বানাল, তবে তার ফলভোগ ওই ক্রীম খাওয়া লোকদের করতে দেব না। আমি বেশ্যা। আমি বেশ্যা হয়েই যাব।’ 

৬.

মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত রণাঙ্গণ আর জীবন-যুদ্ধের কঠিন ক্ষেত্র পেরিয়ে পতিতালয়ের অন্ধ-অন্ধকার জগতেই শেষপর্যন্ত ইয়াসমীনের করুণ মৃত্যু ঘটে বেশ্যাপল্লীর পাষণ্ড গুণ্ডার ছুরিকাঘাতে। এইভাবে উপন্যাসের সমাপ্তির মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে মহান মুক্তিযুদ্ধে সব কিছু হারানো এক বীরাঙ্গনা নারীর। 

ইয়াসমীনের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরুষশাসিত ও শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নারীর বিপন্ন অস্তিত্বকেই কেবল নির্দেশ করে না, একটি জাতির স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গজনিত ট্র্যাজেডির স্বরূপও উন্মোচিত করে। ব্যক্তির করুণ আখ্যান ও আত্মত্যাগ জাতীয় জীবনকে উজ্জ্বল করলেও সামাজিক অন্ধকার আর ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ ইয়াসমীনের মতো সেইসব উজ্জ্বল মুখচ্ছবিকে ঢেকে দেয়। জীবনের প্রয়োজনে ও জাতীয় তাগিদে এক মহান মানবীর ত্যাগ ও লড়াইয়ের গৌরবকে লুটেরা সমাজ ও স্বার্থান্ধ মানুষ নস্যাৎ করে। যার অবদান হওয়ার কথা কথা ইতিহাসের স্বীকৃতিতে ধন্য এবং তার অবস্থান হওয়ার কথা জাতীয় জীবনের উচ্চতর স্থানে, তাকে যুদ্ধোত্তর সমাজ বাস্তবতা লাগাতার শোষণ ও লাঞ্ছনার পর নৃশংসভাবে হত্যা করে পাঠিয়ে দেয় মৃত্যুর ঠিকানায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে এদেশের নারী সমাজের একটি ব্যাপক অংশের আত্মত্যাগ ও বীরোচিত ভূমিকা ইতিহাসের গৌরবময় অংশ হলেও সেইসব নির্যাতিতা নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন, পুনর্বাসন ও সম্মানজনক স্থান নির্ধারণ করতে ব্যক্তি, সমাজ ও প্রশাসন চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। রিজিয়া রহমান ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে নারীর আত্মত্যাগ, মানবিক বিপর্যয় এবং সেই বিপর্যয়কে কাটিয়ে উঠার ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ব্যর্থতার প্রকট চিত্রটিই তুলে ধরেছেন ইয়াসমীনের বিয়োগান্ত করুণ পরিণতির আখ্যান নির্মাণের মাধ্যমে।

৭.

শুধু ‘রক্তের অক্ষর’ নয়, রিজিয়া রহমান মুক্তিযুদ্ধকে বার বার এবং বহুমাত্রিকভাবে স্পর্শ করেছেন তার কথাশিল্পের মাধ্যমে। ‘একটি ফুলের জন্য’ উপন্যাসে তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সমাজজীবন ও সময়-প্রবাহকে নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাতে চিত্রিত করেছেন। তুলে ধরেছেন তৎকালীন সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি জীবনযুদ্ধে পরাজিত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার আখ্যান। মনে রাখা দরকার যে, সে সময় সমাজ বাস্তবতা বদলে গিয়েছিল বিপরীত মেরুতে এবং অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই বাস্তব জীবনে নিদারুণ অবহেলা ও করুণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন।

যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা, যারা রণাঙ্গণের কঠিন সমরে হারিয়েছিলেন তাদের হাত, পা এবং হয়েছিলেন পঙ্গু, তাদেরকে বড় গলায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নামে ডাকা হলেও, তাদেরকে যথাযথ সামাজিক সম্মান, স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে এক ধরনের অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকারে পরিণত করা হয়। বীরাঙ্গনার মতো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারেও সমাজ ছিল কুণ্ঠিত। এইসব বীরদের স্থান হয়েছিল সরকারি হোম-এ। কেউ কেউ জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার তাগিদে রিকশা চালিয়েছেন। অনেকে বেছে নিয়েছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। এমনই ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের অতি নির্মম আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা।

রিজিয়া রহমানের ‘একটি ফুলের জন্য’ উপন্যাসের নায়ক আলফু তেমনই একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে তার একটি পা হারিয়েছে। অন্যদিকে তার সহযোদ্ধা সাজ্জাদ পঙ্গু হয়ে সরকারি হোম-এ আশ্রিত হয়ে থাকে। রণাঙ্গনের আরেক সহযোদ্ধা ফরহাদ একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করে। অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সমীহ করলেও তারা তার মুক্তিযোদ্ধা ইমেজটাকেই বাণিজ্যিক স্বার্থে কাজে লাগাতে চায়। 

এমন বিরূপ পরিস্থিতি ও বাস্তবতা টের পায় উপন্যাসের চরিত্রসমূহ। যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তারা যে কখনো কখনো লৌকিক সম্মানের বাইরে বাস্তবে অবজ্ঞা-অবহেলা ছাড়া কিছুই পাচ্ছেন না, সেটাও অনুভব করেন। ফলে হতাশ ও ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা এক ধরনের অবসাদ ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হন। বঙ্গভবন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দাওয়াত দেয়া হলেও সেখানে এইসব পঙ্গু বীরযোদ্ধারা যেতে চান না। এই অব্যক্ত বেদনা ও প্রান্তিকীকরণের মনস্তত্ত্ব মূর্ত হয় রিজিয়া রহমানের প্রাঞ্জল ভাষায়:

‘গণ্যমান্য সম্মানী মানুষের ভিড়ের মধ্যে বুকের সেই ভয়টা ওদের প্রত্যেকটা মুহূর্তে সচেতন করে রেখেছে। কি যেন এখানে যে মুখগুলো ওদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে, তাদের দৃষ্টির গভীরেও কি সেই কথাটা লুকানো আছে কিনা, তোমরা পঙ্গু।’

উপন্যাসে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবহেলা এবং তাদের হতাশা ও গ্লানির স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সমাজে তারা যে অপাংক্তেয় ও করুণার পাত্র, তা-ও পরিস্ফুটিও হয়েছে। বিশেষ বিশেষ দিনে রাষ্ট্র ও সরকার তাদেরকে স্মরণ করলেও তা তাদের কোনও কাজেই আসে না। যে সত্য প্রকাশ পায় উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র পঙ্গু-যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মুনিরের হতাশামিশ্রিত কথায়:

‘ভোর থেকে সবাই সাভারের শহীদ মিনারে ছুটছে। এদেশে মানুষের চেয়ে মিনারের দাম বেশী; মরে গেলেই বোধ হয় দাম বাড়ে।’

যারা জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, হারিয়েছিলেন অঙ্গ, সেইসব জীবিত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ, বিদ্রূপ, হতাশার মধ্য দিয়ে যে বাস্তবতার দেখা উপন্যাসে পাওয়া যায়, তা হলো, দেশের বীর ও শ্রেষ্ঠ সন্তানরা রাষ্ট্র ও সমাজে প্রকৃত স্বীকৃতি বঞ্চিত ও চরম অবহেলার শিকার। রিজিয়া রহমান তাদের মর্যাদা না দেওয়ার বেদনাকে শিল্পিত করে তুলেছেন তার লেখায়। উন্মোচিত করেছেন নির্মম সমাজ বাস্তবতার প্রবঞ্চনা ও ব্যর্থতাকেও।

৮.

উপন্যাসের এক প্রান্তে প্রকৃত ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলিত পরিস্থিতির পাশাপাশি আরেক প্রান্তে দেখা পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আরেক নিকৃষ্ট খেলার। যে খেলায় জড়িত অসৎ রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসক ও স্বার্থান্ধ মানুষ। যারা মুক্তিযুদ্ধের মতো মহৎ ও ঐতিহাসিক প্রপঞ্চকেও ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যবহার করতে পিছপা হয় না।

আখ্যানে এ পর্যায়ে দেখা যায়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ভব, মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট ও নাম ভাঙিয়ে স্বার্থবাদী মহলের আখের গুছিয়ে নেওয়ার মচ্ছব। একই সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে পুনর্বাসন ও সামাজিক মর্যাদায় পুনরাধিষ্ঠানের ঘটনা অতি দ্রুততার সঙ্গে ঘটতে থাকে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক ঘুর্ণাবর্তে ও অবক্ষয়ের ফলে বিকৃত ও কোণঠাসা হওয়ার এই চিত্র উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। 

রিজিয়া রহমান সাহসের সঙ্গে এবং শৈল্পিক সুষমায় দেখান যে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ষড়যন্ত্রের ফলে সাধারণ জনমানসে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির একটা অপচেষ্টা সন্তর্পনে চলছে, তাদেরকে কোণঠাসা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপন্যাসে দেখানো হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা ফরহাদের ছোট ভাই আহাদ মুক্তিযুদ্ধে যোগদান না করেও কৌশলে দ্রুত প্রতিষ্ঠা লাভ করছে। বাংলাদেশের সমাজে এই নেতিবাচক রাজনৈতিক বিবর্তন উন্মোচন করেছেন তিনি পারঙ্গম বর্ণনায়:           

‘ফরহাদের দু’বছরের ছোট আহাদ। মুক্তিযুদ্ধে যায় নি সে। সেই আহাদ স্বাধীনতার পর মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হয়ে গিয়েছিল। অমুক্তিবাহিনী বন্ধুদের নিয়ে সে দল তৈরি করে ফেলেছে। … মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট যোগাড় করেছিল সে। ম্যাট্রিক পাশ আহাদ কি চমৎকারভাবে অন্ধকারের সিঁড়িগুলো টপকে গেলো। ব্যবসা করল। … এখন বিলাতে চাকুরী করে। ফ্ল্যাট কিনেছে।’

কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভাই ফরহাদ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে পারে নি বলেই পিছিয়ে পড়ল। এইসব মুক্তিযোদ্ধারা যারা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধে গিয়েছিল, তারাই দেশ ও সমাজ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের কয়েক বছরের মধ্যেই, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ এবং চেতনার বিলুপ্তি ঘটল রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে। উপন্যাসে সেই যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধবাদীদের উত্থান ও বিকাশের বাস্তবতাকেই রিজিয়া রহমান মূর্ত করেছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মজৈবনিক ধারাক্রমের বর্ণনার মাধ্যমে। 

এক সময় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির চরম শক্তি সঞ্চয়ের ফলে এমন একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, খোদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও উচ্চারিত হতে থাকে যে, কেন তারা যুদ্ধে গিয়েছিল? উপন্যাসে এই আত্মজিজ্ঞাসায় ক্রমাগত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে উপসংহারে একটি আশাবাদী প্রত্যয় তুলে ধরেন রিজিয়া রহমান। কোনও ব্যক্তিগত আকাক্ষা নয়, যুদ্ধ ও ত্যাগ শুধুমাত্র দেশের জন্য, স্বাধীনতার ফুলকে ধরার জন্য। এ চিরায়ত মনোভাব তিনি ব্যক্ত করেন উপন্যাসের শেষ দিকে, মুক্তিযোদ্ধা ফরহাদের কণ্ঠে:

‘আমরা চাই না কোনও বিদেশী ট্যাংকের নীচে আমাদের সে ফুল পিয়ে কলঙ্কিত করা হোক। অনেক দুঃখ নিয়েও অনেক কষ্ট করেও আমরা এই ফুলকে মুক্ত রেখেছি। এ ফুলকে আমরা বাঁচাবোই।’

স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে, স্বাধীনতাকে পেতেই মানুষের যুদ্ধযাত্রা সম্পন্ন হয়। শত ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও না-পাওয়ার বেদনাকে ভুলেই বীর যোদ্ধারা স্বাধীনতার ফুলকে ধরে রাখেন। উপন্যাসে রিজিয়া রহমান নৈরাশ্য, অন্ধকার, জীবনযন্ত্রণা ও হতাশার বিরুদ্ধে সন্ধান করেছেন আলোকিত ভবিষ্যতের সোনালী দিনের। ব্যর্থতা, যন্ত্রণা ও পরাজয়ের সর্বগ্রাসী প্রতিষ্ঠার মধ্যেও রিজিয়া রহমান সন্ধান করেছেন আলো ও শ্রশ্রূষা। তার জীবনবাদী মন ও মনন বিপন্ন মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিমেয় প্রেমশক্তিতে উত্তরণের শক্তিমত্তাকে আবিষ্কার করেছে।  

৯.

রিজিয়া রহমানের উপন্যাসে প্রত্ন-ঐতিহাসিক আবহ আধুনিক বাংলা উপন্রাসের এক উজ্জ্বল অর্জন। বেলুচিস্তানের পটভূমিতে তার রচিত উপন্যাস ‘শিলায় শিলায় আগুন’ শুধু শক্তিশালী রচনাই নয়, সুগভীর সমীক্ষাও বটে। তিনি প্রত্বতাত্ত্বিকদের মতো ইতিহাস আর ঐতিহ্য খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে এনেছেন তার প্রায় প্রতিটি উপন্যাসে। 

যেমন, ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটির ব্যাপ্তি বাঙালির জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তণের ইতিহাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। 

আবার নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে খুলনা অঞ্চলের এক বিপ্লবী রহিমউল্লাহর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বীরত্বগাঁথা নিয়ে লিখেছেন ‘অলিখিত উপাখ্যান’। 

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সাঁওতাল শ্রমিকদের জীবনচিত্র পর্যবেক্ষণ করে তিনি রচনা করেছেন ‘একাল চিরকাল’। 

‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’ উপন্যাসে লিখেছেন ঢাকার অতীত ও বর্তমান জীবনযাপন।

চট্টগ্রামে হার্মাদ পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন ‘উত্তর পুরুষ’ উপন্যাসে, যেখানে চিত্রিত হয়েছে আরাকান-রাজ-সন্দ-সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের গোয়া, হুগলি, চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস।

গভীর মননশীলতায় রিজিয়া রহমান নির্মাণ করেছেন তার লেখালেখির জগৎ। এতো বড় মাপের লেখক শুধু তার সমকালেই নয়, অনাগতকালেও আলো ছিড়াতে থাকবেন। শেষ জীবনে তিনি ছিলেন নিভৃতচারী, এবং অবশেষে জীবনের চেয়ে দূরের ঠিকানায় তিনি চলে গেছেন চিরকালের জন্য। তথাপি পাঠক চিত্তে তিনি জাগ্রত থাকবেন তার অক্ষয় অক্ষরমালায় সজ্জিত গল্প-উপন্যাস, কথাশিল্পের সম্ভারে।

১০.   

খুব কাছ থেকে পর্বতকে বড় ও বিশাল দেখায় না। মনে হয় দেয়াল মাত্র। তেমনি আশেপাশের বড় মাপের মানুষদের বিশালতাও আমরা টের পাই না। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা অজ্ঞতা বা ক্ষুদ্রতার জন্য নিজস্ব মেধাকে এড়িয়ে যাই। ঔপন্যাসিক রিজিয়া রহমান তেমনি বড় মাপের একজন কথাকার। যদিও আমরা আমাদের কাছের মেধাবীদের বিশালত্ব মূল্যায়ন করতে পারি না। দূরের কেউ হলে, সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার বন্যা শুরু হয় সাহিত্যের পাতায়। অথচ বিশ্ব বরেণ্য লেখকদের মতোই তার লেখার মান, তা আমরা মূল্যায়নের আলোয় আনতে পারি নি। 

রিজিয়া রহমান  ভারতের কলকাতার  ভবানীপুরে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তার পৈত্রিক বাড়ি ছিল কলকাতার কাশিপুর থানার নওবাদ গ্রামে। তার পারিবারিক নাম ছিল জোনাকী। তার বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন চিকিৎসক ও মা মরিয়াম বেগম একজন গৃহিণী। তাদের পরিবার ছিল সংস্কৃতিমনা। তার দাদা মুন্সী আব্দুল খালেকের পড়ালেখার অভ্যাস ছিল। তার ঘরে সেলফ ভর্তি ছিল ইংরেজি আর ফার্সি বই। তার বাবা ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী। তিনি এসরাজ ও বাঁশি বাজাতেন এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতেন।

রিজিয়া রহমানের বাবার চাকরীর কারণে তাদের ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর তারা বাংলাদেশে চলে আসে। দেশে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ফরিদপুরে। সেই সময় শখের বশে কবিতা লিখতেন। তখনই তার লেখালেখির সূচনা হয়।  পরে তিনি কষ্ট করে শিক্ষা জীবন এগিয়ে নেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। 

পুরোটা জীবন তিনি কাটিয়েছেন সাহিত্য সাধনায়। তার প্রচেষ্টায় আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্য ঋদ্ধ হয়েছে। তিনি তার অনন্য সাহিত্য সম্ভারের মধ্যে বেঁচে থাকবেন মৃত্যুর পরেও। নারী, মুক্তিযোদ্ধা, সংগ্রামী মানুষ, প্রান্তিক জনজীবনের কথা যে রক্তের অক্ষরে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন, তা জোনাকির আলোর মতো প্রজ্বলিত থাকবে বাংলাদেশের সাহিত্যের আকাশে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন
একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান মারা গেছেন। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

রিজিয়া রহমানের ছেলে আবদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, নানা ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন তার মা। রক্তের সংক্রমণের কারণে ঈদের পরদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।  

উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরে বাদ আসর রিজিয়া রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানান তার ছেলে।

১৯৩৯ সালে কলকাতার ভবানীপুরে রিজিয়া রহমানের জন্ম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন।

সাহিত্যের নানা শাখায় পদচারণা থাকলেও ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রিজিয়া রহমানের মূল পরিচিতি ঔপন্যাসিক হিসেবে। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান রিজিয়া রহমান। চলতি বছর তাকে একুশে পদক প্রদান করে সরকার।

তার উল্লেখযোগ্য গন্থগুলো হলো: অরণ্যের কাছে, শিলায় শিলায় আগুন, অগ্নিস্বাক্ষরা, ঘর ভাঙা ঘর, উত্তর পুরুষ, ধবল জোৎস্না, সূর্য সবুজ রক্ত, রক্তের অক্ষর, বং থেকে বাংলা, অলিখিত উপাখ্যান, একাল চিরকাল, হে মানব মানবী, হারুন ফেরেনি, উৎসে ফেরা।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র