স্মরণঅলিন্দে সৈয়দ লুৎফুল হক



মাহমুদ হাফিজ
শিল্পী, গবেষক ও কবি-সাংবাদিক সৈয়দ লুৎফুল হক

শিল্পী, গবেষক ও কবি-সাংবাদিক সৈয়দ লুৎফুল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

২৭ জানুয়ারি বনানীর একটি ঠিকানা খুঁজতে গাড়িতে বসে গুগলিং করছি। নেটের গতি স্লো বলে লোকেশনটি ওয়েব থেকে নামতে সময় নিচ্ছে। চালক দোলন হাজঙকে বললাম, রাস্তার পাশে গাড়ি থামাও, ঠিকানাটি এখানেই কোথাও। সড়কের দুদিকে সারবাঁধা বাড়ি। মাঝখানের রাস্তা দিয়ে হুশহাস গাড়ি চলছে। একটি নিরিবিলি বাড়ির সামনে কম ব্যস্ত রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে চালক বললো, স্যার, সামনে যে বাড়িটি দেখছেন, এই বাড়িতেই উনি থাকেন। বললাম, উনি কে? দোলনের উত্তর: যাকে মাঝে মাঝে প্রেসক্লাব থেকে গাড়িতে লিফট দেন। ওই ভদ্রলোক এই বাড়ির গেটেই নামেন। 

এ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দিকে তাকালাম। সামনে বিশালকায় কয়েকটি গাছ। গাছের শাখায় মধ্যগগণের সূর্যালোক বাধাগ্রস্থ হওয়ায় সবুজাভ ভবনটি ছায়াময়-মায়াময় হয়ে উঠেছে। বাইরে লাশবাহী ফিজিং ভ্যান। গাড়িতে মৃতদেহ নেই বলে লোকজনও নেই। আমার ড্রাইভার বললো, মনে হয় ওনাদের বাড়িতে কেউ মারা গেছে। ঠিকানার খোঁজার অন্যমনস্কতার মধ্যে মুখ থেকে অস্ফুট বেরিয়ে গেল-দ্যাখো উনিও হতে পারেন হয়তো। পরক্ষণে ভাবলাম, নেমে রিসিপশনে খোঁজ নিই। এতোদিনের ঘনিষ্ঠতা, লিফট দিই, কিন্তু এ বাড়িতে তো আসিনি।

তিন বাংলা আয়োজিত সংবর্ধনায়

যদি খোঁজ করতাম, এক বেদনাবিধুর শোকময় চরমসত্যের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে সামলাতে পারতাম কিনা জানি না। এরই মধ্যে আমার উদ্দিষ্ট ঠিকানাটি মোবাইলে ভেসে ওঠায় চালককে পাশের সড়কে গাড়ি চালাতে বলি। ড্রাইভারের বলা সেই উনি হচ্ছেন চিত্রশিল্পী, গবেষক, কবি-সাংবাদিক আমার অতি ঘনিষ্ঠ সৈয়দ লুৎফুল হক। কয়েকঘন্টা আগেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন অনন্ত অজানালোকে। সময় তার নিথর মরদেহটির সামনে দাঁড়ানোর সুযোগটি দেয়নি। অফিসে এসে প্রেসক্লাব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে একটি ক্ষুদে বার্তায় এই তথ্য জানতে পারি।  গাড়িচালকের সঙ্গে কথোপকথনে মুখ ফস্কে বের হওয়া কথাটিই চরম সত্য হয়ে গেছে আজ প্রত্যূষে!

.

জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার সুবাদে সৈয়দ লুৎফুল হক এর সঙ্গে সপ্তাহের দু’তিনদিন আড্ডা ও দেখা হতো। আমাদের বাসা একই দিকে বলে মাঝে মাঝে একসঙ্গে বাসায় ফিরতাম। গাড়িতে তাকে লিফট দিতাম। লুৎফুল ভাই স্কুটার, রিকশা বা উবারে যাতায়াত করতেন নিজের গাড়ি ছেলেদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে। কোন কোনদিন সাংবাদিক মনোয়ার ভাইও ফিরতিযাত্রায় সঙ্গী হতেন। কাছাকাছি বয়স ও বাসা হওয়ায় লুৎফুল ভাই ও মনোয়ার ভাই মানিকজোড় হয়ে উঠেছিলেন। একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। প্রেসক্লাব-পল্টন-মতিঝিল এলাকায় একসঙ্গে যেতেন, ফিরতেন। দু’জনের পেশাগত পথ ও প্রকৃতি ভিন্ন হওয়ায় মাঝে মাঝে তাদের আলাদাও ফিরতে হতো। কোন কোনদিন বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার হলে এবং সময়ের সঙ্গে মিললে তিনজন এক গাড়িতে ফিরতাম। আমাদের পথ এক হলেও গন্তব্য ভিন্ন। আমাকে আগে নামতে হতো। চালককে বলতাম, দুই সিনিয়রকে বাসায় নামিয়ে দিতে। চালক বাসায় নামিয়ে  ফিরে আসতো। দু’জনের কারো বাসাতেই আমর  যাওয়া হয়নি।

প্রেসক্লাবের বনভোজনে-আলাদীনস পার্কে

এই তো এ মাসের শুরুতেও তিনজন একসঙ্গে ফিরলাম। ৮ জানুয়ারি রাতে লুৎফুল ভাইকে ফোন করি পরদিন ভ্রমণগদ্য এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ দিতে। বললেন, ‘কয়েকদিন বের হচ্ছি না। কাশি আর সামান্য শ্বাসকষ্ট থাকায় ওষুধ খাচ্ছি। ডাক্তাররা বলেছে, ফুসফুসে পানি জমার লক্ষণ, ওষুধ দিয়েছে। ওষুধেই ভালর পথে। ডাক্তারের বারণ না থাকলে  তোমার অনুষ্ঠানে না এসে কি পারতাম?’ কোন  ডাক্তার জিজ্ঞেস করলে জানালেন, ‘তুমি বোধ হয় জানো না, আমার পরিবারে অনেকেই ডাক্তার’। সপ্তাহখানেক বাদেক ১৫ জানুয়ারি মনোয়ার ভাইকে ক্লাবে একা  আড্ডা দিতে দেখে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি একা? লুৎফুল ভাই কোথায়?’ বললেন, ‘লুৎফুল তো ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি আছে’। সেদিন মনোয়ার ভাইসহ  গল্প করতে করতে বাসায় ফিরি। সে গল্পের বেশিরভাগই ছিল লূৎফুল ভাইকে নিয়ে। 

১৬ জানুয়ারি বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই পরিকল্পনা করি, দুপুরে প্রেসক্লাবে মধ্যাহ্নার সেরে ঢাকা মেডিক্যালে লুৎফুল ভাইকে দেখতে যাবো। সেমতে, ফোন দিলে রিসিভ হলো না। পরে ফোনব্যাক করেছেন লূৎফুল ভাই। বললেন, ‘ ঘুমিয়ে ছিলাম’, ধরতে পারিনি। বলো কি খবর!’ ফোনে তাঁর কন্ঠ প্রাণবন্ত ও উচ্ছল শোনাচ্ছিল। আমার যাওয়ার কথা শুনে বললেন, ‘আসার আর দরকার হবে না। আমি ভাল হয়ে গেছি। ডাক্তাররা আজ বা কাল ছুটি দিয়ে দেবে’। ২২ জানুয়ারি শুক্রবার ঢাকার বাইরে একটি চড়ুইভাতিতে অংশ নিই।২৩ জানুয়ারি শনিবার প্রেসক্লাবে নিয়মিত সপ্তাহানাতের আড্ডায় যোগ দিলেও সাংবাদিক অরুণ কর্মকারের সঙ্গে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যেতে হয়। ফলে আড্ডায় বেশিক্ষণ বসা হয়নি এবং লুৎফুল ভাইয়েরও খোজ নিতে পারিনি। তিনি প্রেসক্লাবে নিত্য গেলেও শুক্র ও শনিবার আমার সঙ্গে গল্প- আড্ডা জমতো। শিল্প, সাহিত্য, আত্মকথার স্মৃতিচারণ করতেন। আমরা সমৃদ্ধ হতাম।

প্রেসক্লাবের আড্ডায় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে

.

সৈয়দ লুৎফুল হকের সঙ্গে আমার দুইদশকের সম্পর্ক। কখন যেন তিন আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছি, টের পাইনি কেউ। আজ দীর্ঘদিনের স্মৃতিময়তার ফিরিস্তি দিতেই বসেছি। আমার সাহিত্যমূলক খামখেয়ালি বা নানা কর্মকান্ডের সঙ্গে অগ্রজ একজন হিসাবে যুক্ত করে নিয়েছিলাম। কারণে অকারণে তাঁকে ডাক দিতাম নানা অনুষ্ঠানাদিতে। বহুদর্শী বয়োজৈষ্ঠ্য একজন মানুষকে পাশে রাখার বিকল্প নেই। লুৎফুল ভাইও অনুজপ্রতিমের খামখেয়ালি বর্ষীয়ান চোখ দিয়ে উপভোগ করতেন,  নির্দ্বিধায় যোগ দিতেন যেখানে যা বলছি, সেখানেই।

জাতীয় প্রেসক্লাবের বার্ষিক বনভোজনে সৈয়দ লুৎফুল হক নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। বর্ণাঢ্য পোশাকসজ্জার  ওপর গলায় বিশেষ ধরনের মাফলার, মাথায় হ্যাট চাপাতেন। হাতে থাকতো ড্রইংখাতা ও পেন্সিল। ২০০৯ সালে বনভোজন হলো গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে। লুৎফুল ভাই গলায় লাল রংএর স্কার্ফ আর খয়েরি রঙের বেতের কাউবয় হ্যাট পরে যোগ দেন। গায়ে তার সাদা টি শার্টের ওপর খয়েরি জ্যাকেট। অঙ্কনরত অবস্থায় তার ছবি তুলে দিলে তিনি খুব খুশি হন। এই খুশিতে আগস্ট মাসের এক দুপুরে আমাকে প্রেসক্লাবে ডেকে বলেন- তোমার সঙ্গে কথা আছে চুপ করে বসো আমার সামনে। দেখি ড্রইং খাতা খুলে আমার স্কেচ আঁকা শুরু করে দিয়েছেন।  দশমিনিটেই স্কেচখাতায় আমর মুখাবয়ব ফুটে উঠলো।

ওয়েস্টিন হোটেলের এক পার্টিতে, সেলফি

২০১৪ সালের ২০ জুন শিলাইদহে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের দাবিতে কুষ্টিয়ার বিশিষ্টজনেরা প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করে। উপস্থিত ছিলাম। পরে প্রেসক্লাবের আড্ডায় লুৎফুল ভাই এ দাবির প্রতি সহমত পোষণ করে বললেন, ময়মনসিংহের কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি হিসাবে বলছি, শিলাইদহে মুল ক্যাম্পাস হওয়া যুক্তিযুক্ত এবং সেখানে চারুকলা বিভাগ থাকারও প্রয়োজন আছে।

২০১৬ সালের আগস্টে গুলশান ক্লাব অগ্রজ কবি হেলাল হাফিজকে কেন্দ্র করে একটি বর্ষামুখর সাহিত্য আসরের আয়োজন করে। পুরো আয়োজন-আমন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কবি-সাহিত্যিকদের আয়োজনটিতে লুৎফুল ভাইকেও যুক্ত করি। তিনি সানন্দে এতে যোগ দেন এবং নিজের কবিতা পাঠ করে শোনান।

ভারতের কবি সাহিত্যিকরা জাতীয় প্রেসক্লাব পরিদর্শন করতে এসে পরিচিতরা আমাকে খোজেন। প্রেসক্লাব ঘুরিয়ে দেখানোসহ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়া নিয়মিত হয়ে দাড়ায়। সবসময় লুৎফুল ভাই আমার সঙ্গে থেকে সহযোগিতা করেছেন।

২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট কবি সালেম সুলেরীর তিনবাংলা পশ্চিমসঙ্গের একদল সাইকেল ভ্রামণিককে সংবর্ধনা দেয় সেগুনবাগিচা তিনবাংলার মিলনায়তনে। প্রেসক্লাব থেকে যোগ দিতে লুৎফুল ভাইকে সঙ্গে নিই। আয়োজকরা বিশিষ্ট শিল্পীকে পেয়ে  মঞ্চে নিয়ে বসান।

ভ্রামণিক কামরুল হাসান ও ভ্রমণপ্রিয় সৈয়দ জাফরের সঙ্গে ভ্রামণিকদের একটি প্রাত:রাশ আড্ডা চালু করেছি কয়েকবছর। ২০১৯ এর ৩ আগস্ট বনানীর স্টার কাবাব রেস্তোরায় আয়োজিত আড্ডায় লুৎফুল ভাইকে আমন্ত্রণ জানাই। নিজের জীবনের নানাগল্প বলে সেদিন তিনি সবাইকে মাতিয়েছিলেন।

ভ্রমণগদ্য এর মোড়ক উন্মোচনে, ফেব্রুয়ারি ২০২০

একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০য়ে ভ্রমণগদ্য বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। বইমেলার মোড়কমঞ্চে এটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব কবি কামাল চৌধুরী। এতে আমার আমন্ত্রণে সৈয়দ লুৎফুল হক যোগ দেন। মেলায় ভ্রমণগদ্য এর স্টলে প্রতিদিন লেখক-ভ্রামণিকদের আড্ডা বসতো। লুৎফুল ভাই মাঝে মাঝেই যোগ দিতেন আমার অনুরোধে। ১৯ ফেব্রুয়ারি স্টলের সামনে কুষ্টিয়ার খোকসার কমিউনিটি লাইব্রেরীর জন্য প্রতিষ্ঠাতা জসিমউদ্দিনের হাতে কিছু বই-পত্রিকা উপহার তুলে দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি আড্ডায় যোগ দেন শিল্পকলার সাবেক পরিচালক লেখক আবাম ছালাহউদ্দিন এর সঙ্গে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের আড্ডায় প্রায়ই লুৎফুল ভাইকে পেতাম। এ সময়ে তোলা সব ছবিতেই তিনি পক্কেকেশ ও  শ্রুশ্মুমন্ডিত মুখাবয়ব নিয়ে উজ্জ্বল। প্রেসক্লাব কবিদের প্রকাশনা কবিতাপত্র আয়োজিত মাসিক সাহিত্য আসরের প্রতিটিতেই লুৎফুল ভাইকে পেয়েছি একজন নিবেদিত কবি ও অংশগ্রহণকারী হিসাবে।

শিল্পী, গবেষক ও কবি-সাংবাদিক সৈয়দ লুৎফুল হক পাড়ি জমিয়েছেন অজানা অনন্তলোকে। গবেষণা নিবেদিত, তারুণ্য ও প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত এই বয়োজ্যেষ্ঠকে হারিয়ে আমার কান্না থামছে। স্রষ্টা তাঁকে শান্তিতে রাখুন। তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের স্মৃতি আর তার সৃজনে।