ঘোর লাগা ভোর



টোকন ঠাকুর, অতিথি লেখক
অলংকরণ: রুদ্র হক

অলংকরণ: রুদ্র হক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল গল্পের পাশে জেগে উঠে ভোর দেখছিলাম। ভোর আমাকে দোর খুলে বাইরে নিয়ে গেল। ভোর আমাকে বড় মাঠের শিশির প্রান্তরে নিয়ে গেল। ভোর, ঘোর উন্মোচন করে দিল। আমি দেখলাম, ঘাসের ওপরে হাঁটতে হাঁটতে পা ভিজে যায়, মাথা ভিজে ওঠে, সমস্ত শরীর ঢেকে যায় কুয়াশায়। কুয়াশা আসে দিগন্তপ্লাবনে। কুয়াশা আসে সুহাসিনী থেকে, সুহাসিনী সেই শহর, যেখানে স্থাপত্য নেই।

সুহাসিনী সে রকম এক শহর, একদিন ছিল, এখন নেই। সুহাসিনী তবে অতীতের বিলুপ্ত নগরী! শুধু এক পরিত্যক্ত রেলস্টেশন- চুপচাপ, স্তব্ধতার রহস্যে রেলস্টেশনটি রোল প্লে করে চলেছে। স্টেশনে যাত্রী নেই, কুলি নেই, স্টেশন মাস্টার নেই, কোনো ওয়েটিং রুম নেই। সমগ্র স্টেশনই একটি শহর হয়ে আছে, খাঁ খাঁ হয়ে মনের মধ্যে ছাপচিত্রের শহর হয়ে আছে।

সেই শহরের ভোর, সেই শহরের ঘোর আমাকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তোলে। ঘোর বলে, আজ তুমি বসে আছ পরিত্যক্ত স্টেশনে, আজ তুমি একা এক যাত্রী। কিন্তু কোনো ট্রেন আসবে না এই স্টেশনে, কোনো শব্দ হবে না, কোনো হুইসেল বাজবে না। তাহলে তুমি কোথায় যাবে? অব্যবহৃত প্লাটফরমে বসে আছ কেন, একা?

দূর থেকে দেখি, কুয়াশায় শাদা হয়ে আছে সমস্ত শহর। এই শহরের নামই সুহাসিনী। সুহাসিনী, তোমাকে আমার মনে পড়ে, একদিন তুমি মুখর মুখর ছিলে। একদিন, তুমি ছিলে অপেক্ষা, ছিলে গগনবিস্তারী রহস্য-বাস্তবতা, শাদা শাদা। আজ ভোর সেই রহস্য-বাস্তবতার সামনে ডেকে এনেছে আমাকে। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। ভূমি-দিগন্ত আকাশ মিলে মিশে গেছে। বুঝতে পারছি না, এই ঘোর রহস্য বাস্তবতা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়! আমাকে কী কুয়াশা প্রান্তরে বিলীন হতে হবে আজ? ভোর বলল, ঘোর বলল, তুমি বসে আছ, একা। আমি তোমার জন্যই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি আজ, পুব আকাশে আলোর সংকেত।

অবশ্যই এই কুয়াশার মধ্যেই উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকপাখি, পাখিরা কি জানে, আজ তুমি আমার জন্য বসে আছ পরিত্যক্ত স্টেশনে, একা! ঘাসের শিশির জেনেছে, আমি কেন হেঁটে যাচ্ছি পা ভিজিয়ে। আমার মাথায় জমে যাচ্ছে শিশির। আমার সমস্ত শরীর জমে যাচ্ছে হৈম হাওয়ায়। কাঁপতে কাঁপতে, হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে, এক মহাকাল ইতিহাস ভাবতে ভাবতে আমি তোমার কাছে যাচ্ছি। শীত ভোরে তুমি অপেক্ষা করছ আমার, আমি অপেক্ষা করেছি গোটা একটা জীবন। এই জীবন আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?

চলে এসেছি নদীপাড়ে। এ নদীর নাম কী? নদীর ওপরে এমনভাবে জমেছে কুয়াশা, মনে হয়, নদী বলে কিছু নেই। সবই সমতলের মাটি। মাটি বলে কিছু নেই, শাদা শাদা শূন্যতা। আমি শূন্যতার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছি বহু পথ, বহু জনপদ। বহু মানুষের সঙ্গে কি আমি কথা বলিনি? বহু মানুষের চোখের দিকে কি আমি তাকাইনি? কিন্তু আমি আজ শুধু তোমার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছি, আজ আমি তাকিয়ে দেখতে চাই শুধু একজোড়া চোখ, তোমার চোখ।

তোমার চোখের ভেতর দিয়ে আমি প্রবেশ করতে চাই সেই সময়ের মধ্যে, যেখানে আরও আরও ভোর সব জমে আছে, অজস্র ভোর একত্রিত হয়ে আছে। তোমার চোখের ভেতর দিয়ে আজ আমি ঢুকে পড়ব সেই ভোরসমগ্রে, শুনেছি সেখানে আজও ফাঁকা পড়ে আছে কুঁড়েঘরের রাজপ্রাসাদ, স্বপ্নভূমির অট্টালিকা। আমি সেই স্থাপত্যের ভেতরে ঢুকব। কী দেখব, কী পাব সেখানে?
তার আগে, এখন এই ভোরনদীর কুয়াশার ওপারে যাব কী করে?

ভোরনদী। ভোরমাঠ। ভোরস্টেশন। ভোরশহর। ঘোরশহর। আমি ঘোরশহরের গলিতে গলিতে ঘুরতে ঘুরতে কাটিয়ে দিয়েছি অনেক বছর। তোমাকে পাইনি। তোমাকে নিয়ে তেপান্তরের ঘোড়সওয়ারে যাব, যাওয়া হয়নি। তোমাকে নিয়ে নদীর ধারে গ্রামীণ মেলায় যাব, যাওয়া হয়নি। আমি সারারাত, অজস্র রাত, আদিগন্ত রাতসহস্র জেগে থেকেছি ভোরে তোমাকে দেখব বলে। ভোরের প্রথম রোদে চিকচিক করে উঠবে তোমার মুখ, আমি সেই মুখ দেখব বলে আমারই চোখের মধ্যে রাতসহস্রের ইতিহাস গ্রন্থনা করেছি। আমি রাত্রির কালো খোড়লে বসে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো প্রহর গুনেছি। আমি জানতাম, একদিন অন্ধকার পরাজিত হবে, একদিন অপেক্ষার সমাপ্তি হবে, একদিন ভোর হবে। ভোরের আলোয় তোমাকে দেখব অনেক।

ভোরের শিশিরে তোমাকে নিয়ে হাঁটব বহু দূর। ভোরের রেললাইন আমাদের ডেকে নিয়ে যাবে। আমরা কেবলই সামনে এগিয়ে যাব, পেছনে ফিরব না। মানুষ তো পেছনে ফিরতে পারে না। মানুষের পেছনে ফেরার কোনো রাস্তা নেই। মানুষের কেবল সামনে এগিয়ে চলা। মানুষ ফেরে না। মানুষ শুধু সামনে যায়। সময় শুধু সামনে ধায়।

মানুষই কি সময়? কত জন্ম, কত গ্রহণসাপেক্ষে তবে আজ এই ভোরে আমি শিশিরে পা ভিজিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, আমি কিংবা সময় এগিয়ে যাচ্ছি, আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি কালপর্বের একেকটি অধ্যায় : এই মহাশীতকাল পাড়িয়ে যাচ্ছি। আমি জানি, তুমি এই ভোরে একা অপেক্ষা করছ, সুহাসিনী স্টেশনে। তুমিও কি জেগেছিলে রাত? করেছ প্রতীক্ষা, প্রহরের পর প্রহর, আমার জন্য! সময়ের জন্য! আজ আমরাই সেই সময়। তাহলে সময়ই অপেক্ষা করেছে, সময়ের?

সারারাত ঝরে ঝরে পড়েছে ফুল। টুপটুপ করে ঝরেছে শূন্যতার অশ্রু। ঝিরঝির করে ঝরেছে জলের হিমকণা। শুকনো বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে, আমি নদী পেরিয়ে এলাম। পৃথিবীতে এত ভোর আছে, কোনোদিন জানা হয়নি। পৃথিবীতে এত অপেক্ষা আছে, কোনোদিন বুঝতে পারিনি। পৃথিবীতে এত ভালোবাসা আছে, এত ঘোর আছে, এত স্বপ্ন আছে_ কোনোদিন টেরই পাইনি। এখন আমার মধ্যে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে প্রেম, স্বপ্ন, ছুঁয়ে ফেলার ঘোর। টের পাচ্ছি, ঘোর আমাকে গ্রস্থ করে ভোরবেলা ডেকে নিয়ে এলো, বলল, তুমি একা বসে আছ।

দেখতে পাচ্ছি, মাঠতক শর্ষে ফুলের হলুদ সংসার। কুয়াশার শাদা ভেদ করে হলুদের চিত্রিত লেপন। আমি এই হলুদ মাঠ পাড়ি দিয়ে যাই। মাঠের পরে আরও আরও মাঠ। ইলেকট্রিকের পিলারগুলো স্থির, পাহারা দিচ্ছে সৈনিকের মতো। মাঠের মধ্য দিয়ে চলে গেছে মহাসড়ক। মহাসড়ক আবৃত কুয়াশায়। দূরে, গ্রাম প্রান্তের শ্যামলরেখা আর চোখে পড়ে না। ঝাপসাতিঝাপসা। আমি তবু জানি, আমাকে পৌঁছুতে হবে তোমার কাছে।

তুমি কি জানো, আমি তোমার কাছেই ছুটে আসছি? একমাত্র তোমাকেই পাব বলে আমাকে আজ ঘোরগ্রস্থ ভোর ডেকে নিয়ে এত দূর এই মাঠ পেরুনো মহাসড়কে নামিয়ে দিয়েছে। আর তুমি অপেক্ষা, আর তুমি প্রতীক্ষা, আর তুমি পাবার নেশা, আর তুমি ছোঁবার নেশা, আর তুমি জীবন নেশা, তুমি মরণ নেশার মতো আমাকে টান দিয়ে ঘর থেকে বের করে এনেছ। কী বলব তোমাকে, প্রথম দেখায়?
কেমন আছ?
তুমি এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে সেই কবিতার পংক্তি- 'তোমাকে এমন বিদীর্ণ করল কে?'
বলব, চলো।
কোথায়?
আরও কিছু দূর।
কোন দিকে?
যে কোনো দিকেই।
এখনই? এত ভোরেই?
হ্যাঁ। এই ভোর আমাদের নিয়ে যাবে গগনতলার দিকে, আমরা গগনতলায় যাব। আমরা আকাশের নিচে ছাদ বাঁধন না। আমরা সুহাসিনী স্টেশনের প্লাটফরম থেকে হাঁটতে হাঁটতে আবার বেরিয়ে পড়ব। এবার আর আমি একা নই, তুমিও একা নও। এখন আমরা দু'জন। দু'জনে মিলেই শুধু বহু দূর যাওয়া যায়। দু'জনে মিলেই পাখি হওয়া যায়। দু'জনে মিলেই উড়ে যাওয়া যায়। দু'জনে মিলেই পাহাড়ে যাওয়া যায়। দু'জনে পাহাড়ের চূড়ায় ঘর বাঁধা যায়। দু'জনে মিলে বাঁচা যায়। সব হাহাকার বিদায় হয়ে যায়_ দু'জনে মিলে গেলে। চলো, মিলি আমরা দু'জন।
চলো।
চলো তবে।
কোথায়?
যেখানে মিলেছে নদী, যেখানে মিলেছে ট্রেনলাইন।
ট্রেনলাইন কি মিলেছে কোথাও?
মিলেছে। ঐ যে, দূরে, দেখতে পাচ্ছ না?
চোখের সীমানা নয় তো?
তা কি না তা দেখতে তবে হেঁটে যাই চলো।
তারপর তুমি তাকাবে, আমি দেখব তোমার চোখ। তোমার চোখের ভেতর সেই কুঁড়েঘরের স্থাপত্য।

হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাব আমরা। তুমি কি জানতে চাইবে, কেমন করে গেল এতকাল, এমন একাকী? তুমি বুঝতে চাইবে, কীভাবে কাটল এত এত বছর? এত দিন-রাত? নিঃসঙ্গতার মাইল মাইল চরাচরে কেমন লেগেছে একা একা হেঁটে বেড়াতে? নিস্তব্ধতার বিছানায় শুয়ে আমি এত বছর ঘুমিয়েছি কি-না_ তা কি তুমি জেনে নেবে একবার, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে? বহু ধ্বংস, বহু বিপ্লব-বিদ্রোহে ক্লান্ত আমার চোখের মধ্যে যে জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত, তুমি কি তা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেবে না? তুমি কী আমার খুব কাছে এসে একবার বলবে না, যা হয়েছে আর না, আর কোনো রাত নেই, আর কোনো অন্ধকার নেই, আর কোনো বিভ্রান্তি নেই_ এখন শুধু ভোর!

আমি হাঁটছি তোমার দিকে, এ জীবনে আমার কাটবে না ঘোর!


লেখক: কবি ও নির্মাতা

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;

‘মুঘল ঐতিহ্যে দারাশিকোহ পরাজিত হয়েও চিন্তা-মননে বিজয়ী’



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
চবি জাদুঘর লেকচার সিরিজে ড. মাহফুজ পারভেজ। বার্তা২৪.কম

চবি জাদুঘর লেকচার সিরিজে ড. মাহফুজ পারভেজ। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

"ধর্মীয় উদারতা, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের শিক্ষার জন্য দারাশিকোহ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দাপটে ভিন্নমতের সংখ্যালঘুরা যখন তটস্থ, তখন দারাশিকোহ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক" বলে মন্তব্য করেছেন প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ।

তিনি বলেন, "মুঘল রাজনৈতিক ঐতিহ্যে দারাশিকোহ পরাজিত হলেও চিন্তা-মননের দিক থেকে বিজয়ী হয়েছেন।"

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) জাদুঘর লেকচার সিরিজের উদ্বোধনী প্রবন্ধ "দারাশিকোহকে কেন স্মরণ করা জরুরি" উপস্থাপনকালে শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, "জ্ঞানমনস্কতা ও শুভবোধের বিকাশে মুক্তমন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আবহ অপরিহার্য। দারাশিকোহ এমনই ঋদ্ধ চেতনা লালন করেছিলেন।" উল্লেখ্য, ড. মাহফুজ পারভেজ "দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো" গ্রন্থের লেখক।

চবি জাদুঘর মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর) সকালে অনুষ্ঠিত লেকচার সিরিজে চবি বঙ্গবন্ধু চেয়ার, ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন প্রবন্ধের উপর আলোচনাকালে বলেন, "দারাশিকোহ চিন্তার বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন উদারপন্থী মুঘল।"

কথাসাহিত্যিক, কলা অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজ বলেন, "দারাশিকোহ রাজনীতিতে পরাজিত হয়েও ইতিহাসের বিচারে স্থায়ী হয়েছে নন্দনতাত্ত্বিক বহুমাত্রিকতায়।"

কলা অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. সেকান্দার চৌধুরী বলেন, "ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার অনেক উপাদান রয়েছে দারাশিকোহর চিন্তায়।"

কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মাহবুবুল হক বলেন, "উচ্চতর গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আলোকিত সমাজ গঠনে জাদুঘরের বহুমুখী কার্যক্রম ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।"

চবি জাদুঘরের পরিচালক, ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ বশির আহাম্মদের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন চবি নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক প্রফেসর ড. আনোয়ার সাঈদ, প্রফেসর ড. সাবিনা নার্গিস লিপি, প্রফেসর ড. সালমা বিনতে শফিক, লেখক-অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসহাক প্রমুখ।

চবি জাদুঘর লেকচার সিরিজ সঞ্চালনায় ছিলেন চবি সঙ্গীত বিভাগের অধ্যাপক মিশকাতুল মোমতাজ মুমু।

উল্লেখ্য, ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশ শাসনকারী মুঘলদের ইতিহাসে শাহজাদা দারাশিকোহর মতো চরিত্র আরেকটিও নেই। পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তম জ্যেষ্ঠপুত্র, দার্শনিক-বুদ্ধিজীবী দারাশিকোহকে উত্তরাধিকারী রূপে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোহিনূর-খচিত মুকুট আর ময়ূর সিংহাসন পাওয়ার বদলে তিনি ভাগ্যাহত হয়ে প্রাণ হারান ক্ষমতার ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে।

তথাপি পরাজিত ও নিহত দারা প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্রাট না হয়েও সম্রাটের মতোই আলোচিত। মহান মুঘল আকবরের দর্শনচর্চা, সমন্বয়বাদ, উদারনীতির উত্তরাধিকার তিনি। বিশ্ববিশ্রুত মুঘল মিনিয়েচার আর্টের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক দারার অ্যালবাম এখনো সংরক্ষিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।

দারার চিন্তা ও কর্মের নানা দিক অদ্যাবধি বিশ্বব্যাপী আলোচিত। বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষ ও সহনশীল ভারতের বীজমন্ত্র লুকিয়ে রয়েছে দারার চিন্তাধারায়। রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ব্যর্থ, কিন্তু শিল্প ও দর্শনচর্চায় সমুজ্জ্বল দারাশিকোহ যেন মুঘল সাংস্কৃতিক পরম্পরার এমনই এক ব্যক্তিত্ব, যাকে তুলনা করা যায় শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর প্রিন্স অব ডেনমার্কের সঙ্গে। এক বিয়োগান্ত চরিত্র হয়ে তার মস্তক সমাহিত তাজমহল প্রাঙ্গণে আর শরীর দিল্লির হুমায়ূন মাকবারার কবরগাহে।

মুঘল সিংহাসন বঞ্চিত শাহজাদা দারাশিকোহর জীবন ও কর্মের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ আখ্যানগুলো উন্মোচিত হয়েছে ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্রাজিক হিরো' গ্রন্থে। শাহজাদা দারাশিকোহর বহুমাত্রিক ও বেদনাময় জীবনালেখ্য ২০২১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে প্রকাশনা ঐতিহ্যে ৭০ বছরের আভিজাত্যে ঋদ্ধ প্রতিষ্ঠান 'স্টুডেন্ট ওয়েজ'।

;