বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক নিয়োগ : প্রস্তুতি ও পড়াশোনা

নাজমুল হুদা, পেশা বিষয়ক লেখক ও, উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক নিয়োগ : প্রস্তুতি ও পড়াশোনা

বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক নিয়োগ : প্রস্তুতি ও পড়াশোনা

  • Font increase
  • Font Decrease

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করার স্বপ্ন যাদের, তাদের জন্য আবারো সুবর্ণ সুযোগ! গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৮৮ টি সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে।

যেকোন বিষয়ে ন্যূনতম স্নাতক (কমপক্ষে দু’টি প্রথম শ্রেণিসহ) ডিগ্রি থাকলে আবেদন করতে পারবেন। আগ্রহী ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা নিশ্চয় অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেহেতু তথাকথিত ব্যাংকিং সেবা দিতে হয়না, বরং বিভিন্ন বিশেষায়িত বিষয়ে পড়াশোনা করেও সামগ্রিক অর্থনীতি, উন্নয়ন ও ব্যাংকিং খাতের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্ত থেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের সুযোগ থাকায় ক্রমেই চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ক্রমবর্ধমান এই আবেদনকারীদেরকে টপকে কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পড়াশোনা, পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি। নিয়োগ পরীক্ষা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে এখন থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি নিলে সাফল্য আসা সময়ের ব্যাপার। অবশ্য বেশিরভাগ চাকরিপ্রত্যাশী অনেক আগ থেকেই প্রস্তুতি পর্ব শুরু করেছেন।

শুরুটা হতে পারে বিগত কয়েক বছরের প্রশ্ন দেখে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

সহকারী পরিচালক পদের বাছাই প্রক্রিয়া সাধারণত তিনভাগে ৩০০+২৫ নম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপটি নকআউট ভিত্তিক বহুনির্বাচনী প্রশ্নোত্তরপর্ব বা এমসিকিউ। চাকরি প্রার্থীদের জন্য এটি টিকে থাকার লড়াই। তাই স্কোর যা-ই তুলতে পারেন না কেন টিকে থাকলেই চলবে। ক্রিকেটে ব্যাট হাতে সব বল খেলার মত সব প্রশ্নের উল্টর দিতে যাবেন না। হিতে বিপরীত হতে পারে। কারো পক্ষেই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনও নেই।

প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ৬০ মিনিট সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১০০টি প্রশ্নের প্রতিটির জন্য গড়ে ৩৩ সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা হবে ০.২৫ নম্বর।

স্বাভাবিকভাবেই মনস্তাত্বিক চাপ থাকবে। তাই এই অংশে ভাল করার জন্য সময় সতকর্তা, তাতক্ষনিক বুদ্ধিমত্তা, মনোযোগ ও মনোবল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথোপযুক্ত প্রশ্ন বাছাই করে উত্তর দিতে পারা এক ধরণের বাড়তি দক্ষতা। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে হাতে যতটুকু সময় পান প্রতিদিন অনুশীলন করুন। সাফল্য আসবেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষায় সাধারণত বাংলায় ২০, ইংরেজিতে ২০, গনিতে ৩০,সাধারণ জ্ঞান থেকে ২০ এবং কম্পিউটার প্রযুক্তি অংশে ১০ নম্বরের প্রশ্ন থাকে। বাংলার ক্ষেত্রে সাহিত্য ও ব্যাকরণ থেকে সমান সংখ্যক প্রশ্ন হতে পারে তবে ইংরেজিতে সমার্থক শব্দ, বিপরীত শব্দসহ অ্যানালজি, বাক্যে ভুল নির্নয়, বাক্য সম্পূর্ণ ক্রিয়ার ব্যবহার সংক্রান্ত বেশি প্রশ্ন দেখা যায়। বাংলায় প্রশ্নের ক্ষেত্রে সমসাময়িক সাহিত্যকর্মের প্রাধান্য থাকে। এছাড়া শুদ্ধিকরণ, প্রবাদ প্রবচন, বাগধারা, সন্ধি, সমাস, প্রকৃতি ও প্রত্যয় ও এককথায় প্রকাশ থেকে প্রশ্ন হয়। এ অংশে পড়াশোনার জন্য নবম-দশম শ্রেণীর ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ বইটিসহ প্রচলিত ভাল মানের গাইড বই রাখতে পারেন। তবে আনুপাতিকভাবে গনিতে নম্বর বেশি এবং পরীক্ষায় উত্তর করতেও বেশি সময় লাগে বলে অনুশীলন বাড়াতে হবে। ক্যালকুলেটর ছাড়াই বিভিন্ন বই থেকে ইংরেজিতে অংক করার অভ্যাস করুন। ভয় কেটে যাবে। মনোবল বৃদ্ধি পাবে। কম্পিউটার ও প্রযুক্তি নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। এ অংশ থেকে দশটি প্রশ্ন থাকে। সিলেবাস সীমিত তাই নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ভালভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারলে এ অংশে পূর্ণ নম্বর পেতে পারেন। কম্পিউটার প্রযুক্তির জন্য নবম-দশম বা উচ্চমাধ্যমিকের কম্পিউটার বইসহ বাজারের যেকোনো গাইড বই আদ্যেপান্ত ভালভাবে পড়ে ফেলুন। পাশাপাশি দৈনিক পত্রিকার টেক বা প্রযুক্তি পাতা নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করলে কাজে আসবে। পত্রিকায় প্রতিদিন সমসময়িক নানা ঘটনার বিবরণ-বিশ্লেষণ পড়লেই সাধারণ জ্ঞান অংশের প্রস্তুতি অনেকখানি হয়ে যাবে। বাকিটা যেকোনো বই থেকে পড়লেই প্রিলিমিনারীর জন্য চলবে। 

প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষার বৈতরনী পার হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল লিখিত পরীক্ষা। দুই ঘন্টার দুইশত নম্বরের এই পরীক্ষার উপরই অনেকটা নির্ভর করে চূড়ান্ত নিয়োগের সম্ভাবনা।

যেহেতু প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষার নম্বর যোগ হবেনা এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর তুলনামূলক কম তাই লিখিত অংশে ভাল করার বিকল্প নেই। ভাল করতে চাওয়া মানে বাড়তি চাপ নেওয়া নয়। যেহেতু সবচেয়ে কঠিন এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ ধাপ পেড়িয়ে এসেছেন তার মানে আপনার প্রস্তুতি যথেষ্ট ভাল। প্রয়োজনীয় খুটিনাটি বিষয় আপনার দখলে। লিখিত পরীক্ষায় সেগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরাই আপনার কাজ। তাছাড়া লিখিত’র জন্য যে কয়েক মাস সময় পাবেন তা কীভাবে কাজে লাগাবেন সে পরিকল্পনা করে ফেলুন এখনই। এজন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করতে থাকুন। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজিতে ফোকাল রাইটিং (নির্দিষ্টি বিষয়ে নির্ধারিত জায়গার সংক্ষিপ্ত রচনা) ক্রিয়েটিভ রাইটিং, বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ অনুশীলন করতে পারেন। এগুলো প্রিলিমিনারী ও লিখিত উভয় অংশে কাজে লাগবে। যেমন বাংলাদেশের প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স, বৈদেশিক মুদ্রার বিজার্ভ, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়ন, দরিদ্রতা হ্রাস, কয়েক বছরের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি(জিডিপি), রপ্তানী বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিস্তিতি, ব্যাংকিং বিকাশ ও আর্থিক অন্তভূক্তিসহ সমসাময়িক বিষয়গুলো সূত্রসহ ছক আকারে কয়েক পৃষ্টার মধ্যে লিখে রাখতে পারেন। বাংলা কিংবা ইংরেজি যে মাধ্যমই হোক, লিখতে গেলে এ তথ্যগুলো কাজে আসবে। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান বা বিশিষ্ট ব্যক্তির পর্যবেক্ষন নির্ভর মন্তব্য বা উক্তিও আরেক পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে রাখলে লেখার প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়া ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম, অর্থ ও বানিজ্য পাতা, বিঞ্জান ও সাহিত্য সাময়িকী নিয়মিত পড়লে ভাল লেখার পাশাপাশি অনুবাদ দক্ষতাও বাড়ে।

এখন থেকে আপনার ধারাবাহিক পড়াশোনা নিয়োগের সর্বশেষ ধাপ মৌখিক পরীক্ষায়ও ইতিবাচক ফল দেবে, এগিয়ে রাখবে সাফল্যের দৌড়ে। প্রস্তুতি পর্বে এগিয়ে থাকলে দেখা হবে বিজয়ে।

 পরামর্শ দিয়েছেন:

 নাজমুল হুদা
 পেশা বিষয়ক লেখক ও
 উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক