ফারাক্কা ও নদী ভাঙন



হাসিবুর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখেছেন, 'ফারাক্কায় গঙ্গার গতি রুদ্ধ করা হয়েছে, লক্ষ্মী মেয়ের মতন গঙ্গা তা মেনে নেবে কেন, তাই সে দু'ধারে আয়তন বিস্তার করছে বর্ষার সময় জলরাশি নিয়ে ধাক্কা মারছে পাড়ে, আরো বিস্তৃত হবার জন্য গ্রাস করছে গ্রামের পর  গ্রাম।'

নদীর এহেন তাণ্ডব পলিবিধৌত বাংলার প্রকৃতিতে এক অমোঘ নিয়তি। বিশেষত, ভরা বর্ষা শুরু হলেই উত্তর মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা, সুতি, সমশেরগঞ্জ, জঙ্গিপুর, লালগোলা, ভগবানগোলা, রানীনগর, জলঙ্গি ব্লকের গঙ্গা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ম করে গ্রাস করে চলেছে । গ্রামের পর গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পরবর্তী চার দশক জুড়ে ভাঙনের তীব্রতা কোনদিন কমেনি, বরং বেড়েছে।

দীর্ঘ গতিপথে গঙ্গা নদী রাজমহল পাহাড়ের পাশ প্রবাহিত হওয়ার সময় ফারাক্কার উত্তর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব সুবিশাল এলাকাজুড়ে অববাহিকার সৃষ্টি করেছে। ধুধু বিশাল জলরাশি চোখে পড়লে সমুদ্র তটের কথা ভেসে আসে । একথা সত্যি যে, সর্পিল আকৃতির গঙ্গার গতিপথে ভাঙনের ইতিহাস নতুন নয়, ফারাক্কা ব্যারেজের বহু পূর্ব থেকেই গঙ্গা ভাঙনের তথ্য পাওয়া যায়। যদিও শুখা মওসুমে ভাগীরথীতে কোন জল প্রবাহ থাকত না, অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জেমস রেনেল লিখেছেন, 'The Cossimbazar river is almost dry from October to May'.

গঙ্গা থেকে ভাগীরথীতে জাহাজ ঢুকতে পারত না। পণ্যদ্রব্য সুতিতে জাহাজ থেকে নামিয়ে স্থলপথে জঙ্গিপুরের নিয়ে আসা হতো এবং ছোট ছোট ডিঙিতে বোঝায় করে কাশেম বাজারে পৌঁছাতো। ভাগরথী গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর পূর্ববঙ্গ ও আসামের স্টিমারগুলো জলঙ্গি-মাথাভাঙ্গা দিয়ে যাতায়াত করতো। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দশকে এই নদীপথ পরিত্যক্ত হয়।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চেম্বার অব কমার্সের প্রস্তাব অনুসারে ব্রিটিশ সরকার মুর্শিদাবাদের ভাগীরথীর উৎস মুখটি কেটে জল আনার চেষ্টা করেও বারে বারে ব্যর্থ হয় । যেহেতু গঙ্গা বা পদ্মার খাতটি ভাগীরথীর তুলনায় প্রায় এক মিটার নিচে অবস্থিত, সেই কারণে শেষোক্ত নদীটি মূলধারা থেকে বছরে প্রায় ৯ মাস বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, কেবল বর্ষার সময়ে গঙ্গার জল ভাগীরথীতে প্রবেশ করত।

কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখতে গঙ্গার জল ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহের কথা ব্রিটিশ সরকার চিন্তা করেছিল। স্বাধীনতার প্রাক্কালে প্রবল গণআন্দোলন শুরু হলে ব্রিটিশ সরকার বিষয়টি নিয়ে আর চিন্তা করেনি। কিন্তু স্বাধীন ভারতে কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করতে ভাগীরথী নদীতে পর্যাপ্ত জলের প্রবাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলে গড়ে উঠলো ফারাক্কা ব্যারেজ পরিকল্পনা (১৯৬৬-১৯৭৫)।

কিন্তু নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ রুদ্ধ হলে দেখা যায় নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফারাক্কার বাঁধ নির্মাণের তাৎক্ষণিক ফলস্বরুপ ভাগীরথী নদীর জন্য প্রয়োজন ছিল ৪০ হাজার কিউসেক জলের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। কিন্তু তৎকালীন প্রতিবেশী পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) সরকারের সঙ্গে গঙ্গার জল চুক্তি অনুযায়ী বর্ষাকাল ছাড়া শুখা মরশুমে ওই পরিমাণ জল পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে চার দশক পরেও আজও কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নাব্যতার সমস্যার সমাধান হয়নি, স্বল্প প্রবাহের জলে হুগলি নদীর মোহনায় জমে যায় প্রায় দুই হাজার কোটি ঘনমিটার পলি।

ফারাক্কা প্রকল্প রূপায়নের ফলে বর্তমানে উজানে নদী খাতে প্রচুর পলি জমেছে। মালদহে ভূতনীর চর থেকে ফারাক্কার মধ্যে গঙ্গা ক্রমাগত বাম পাড় ভেঙে এক বিরাট বাঁক সৃষ্টি করেছে। গঙ্গার এই গতিপথ পরিবর্তন করার ফলে মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার তেরোটি ব্লক থেকে হারিয়ে গেছে কয়েক হাজার একর কৃষিজমি ও বসতি এলাকা। গঙ্গার ভাঙন ও গতিপথ বদলের ফলে ফারাক্কা প্রকল্প বিপন্ন হয়ে পড়েছে।  জঙ্গিপুরের কাছে পদ্মার পাড় ভেঙে ভাগীরথীকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জলপ্রবাহের আশিভাগ অংশ বয়ে যায় জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে। ফলে অস্বাভাবিক জলপ্রবাহের কারণে এবং নদীর আঁকাবাঁকা পথ তীরবর্তী এলাকাকে ভাঙতে বেশি কার্যকরী হয়। নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র লিখেছেন, 'আমরা মূল গঙ্গার মৃত্যুর ত্বরান্বিত করছি।' একই অভিযোগ মালদা-মুর্শিদাবাদের বহু মানুষেরও।

মুর্শিদাবাদের ভাঙনের ব্যপ্তি সর্বত্র সমান নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারেবারে বদলে গেছে ভাঙনের কেন্দ্রস্থল। ১৯৪২ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে গঙ্গার ভাঙনে সাকোপাড়া থেকে লোহাপুর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার বিচ্ছিন্ন রেলপথ নতুন করে তৈরি করতে হয়। আহিরণ থেকে ধুলিয়ান পর্যন্ত ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের অংশটি আরো পশ্চিমে নির্মাণ করতে হয় । ধুলিয়ান শহরটি অন্তত ছ'বার ভেঙে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়েছে । সাঁকোপাড়া থেকে গঙ্গার দূরত্ব এখন কমে এসে ১৫০ মিটারে দাঁড়িয়ে আছে ।

কল্যাণ রুদ্র আরও লিখেছেন, ব্যারেজের উজানের তীর্যক প্রবাহকে সোজা পথে চালিত করতে না পারলে সাঁকোপাড়া বা ধুলিয়ানের ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় । শুধু তাই নয়, এই নিরবিচ্ছিন্ন ভাঙনের ফলে জাতীয় সড়ক বিপর্যস্ত হতে বাধ্য। গঙ্গার ভাঙন রোধ করতে ব্যর্থ হলে আগামীদিনে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র ।

বিগত একশো বছরের এই অঞ্চলের মানচিত্র দেখলে ভাঙ্গনের ভয়াবহ রূপ দৃষ্টিগোচর হয়। তবে আধুনিককালের উপগ্রহ চিত্রে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে । আশির দশকে ধুলিয়ান অঞ্চলে ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও গিরিয়া, খেজুরতলা, মিঠিপুর সেখালিপুর, ফাজিলপুর অঞ্চলে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয় । ১৯৯৬ সালে ভয়ঙ্কর ভাঙনের ফলে পদ্মা ভাগীরথীর দূরত্ব ১.৪০ কিলোমিটারে বিপদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। অ্যাফ্লেক্স বাঁধ থেকে পদ্মা দূরত্ব এখন মাত্র দেড়শো মিটার। গঙ্গা যদি আবারো এগিয়ে এসে ভাগীরথীকে গ্রাস করে তাহলে জঙ্গিপুর ব্যারেজ অকেজো হয়ে যাবে।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভগবানগোলা রানীনগর থানার বিস্তীর্ণ এলাকা গঙ্গা গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় । ভাঙনে তলিয়ে যায় আখেরিগঞ্জের ২৭৬৪ টি বাড়ি , স্থানীয় বাজার, স্কুল, ব্যাঙ্ক; বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় জলঙ্গিগামী পাকা সড়ক । সরকারি হিসাবে গৃহহীনের সংখ্যা ২৩,৩৯৪ । আখেরিগঞ্জে ভাঙন কিছুটা স্থিতিশীল হলে ১৯৯৪ সালে আক্রান্ত হয় জলঙ্গি শহর। বাজার ও এলাকার অর্ধেক এবং করিমপুরগামী ১১ নম্বর রাজ্য সড়কের খানিক অংশ গঙ্গা গ্রাস করে। আমাদের নির্মিত-কাণ্ডজ্ঞানে যদি নদীর সহজাত প্রবৃত্তিকে বশ করতে চাই তাহলে বিপ্রতীপ গতিই একদিন সমূহ বিপর্যয়ের সূচনা করে ।

নদী ভাঙন সহজাত, যেমন স্বাভাবিক, নদীর আপন বেগ । ফারাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প জাতীয় উন্নয়নের সূচক না হয়ে বিপর্যয়কেই ত্বরান্বিত করল । ক্রমাগত ভাঙনের গঙ্গার তীরে বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনযাপন, ঘরবসতি, ভাঙনের কারণ ও প্রতিরোধের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। মনে হয় বিষয়টি যেন পশ্চিমবঙ্গ তথা মালদা-মুর্শিদাবাদের নিজস্ব সমস্যা ।

অথচ ফারাক্কা ব্যারেজের উজান-ভাটিতে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের। বাকি অংশ জেলা পরিষদ ও সেচ দপ্তরের করার কথা । প্রতিবছর ভাঙন প্রতিরোধের নামে মালদা-মুর্শিদাবাদের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বোল্ডার দিয়ে নদীর পাড় বাঁধানো হয় বর্ষার শুরুতে । ভাঙন প্রতিহত করার জন্য পাড় থেকে নদীর মধ্যে কিছু দূর পর্যন্ত পাথরের দেয়াল বা স্পার তৈরি করা হয় । ভারি বর্ষণে সব ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যায়। ভাঙনের কবলে পড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষ হন্যে হয়ে আশ্রয় খোঁজে। জলে ভেসে যায় গবাদিপশু, হাঁস-মুরগী। ফেলা- বোল্ডারের অপসারিত জল স্পারে ভাঙন তৈরি করে। সে ভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম, বসতি উজাড় হয়ে যায় । মজার ব্যাপার হলো স্পারের গায়ে ধাক্কা খেয়ে স্রোত প্রতিহত হলে উজানেও আবার নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।

২০২০ সালের আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সমসেরগঞ্জ ব্লকের প্রতাপগঞ্জ, চাচন্ড, নিমতিতা অঞ্চলের গঙ্গা তীরস্থ ধানঘরা,  হীরানন্দপুর, নতুন শিবপুর, ধুসুরি পাড়া, কামালপুর ইত্যাদি কয়েকটা গ্রাম ভয়ঙ্করভাবে ভাঙনের মুখে পড়েছে। গোটা ধানঘরা গ্রামের প্রায় দুশো বাড়ি নিশ্চিহ্ন, ধুসুরি পাড়া, হীরানন্দপুর গ্রাম নদী বক্ষে প্রায় বিলীন হয়ে হওয়ার মুখে ।জনহীন কয়েকটা বাড়ি ভাঙনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে মাত্র।  তিনটি গ্রামের তিন শতাধিক বাড়ির আর কোন চিহ্নেরই অস্তিত্ব নেই। ভাঙনের আশঙ্কায় প্রায় চারশো বাড়ি ভেঙে নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার গৃহহীন মানুষ হন্যে হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা। স্থানীয় ক্লাব, পঞ্চায়েত অফিস, স্কুলগুলোতে কোনরকমে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো পর্যন্ত স্থায়ী পুনর্বাসন, পানীয় জল বা খাদ্যের কোন সংস্থান করা যায়নি। প্রতিবেশী গ্রামের মানুষজন, কয়েকটা এনজিও, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অন্নসংস্থান করে চলেছে। বেশিরভাগ মানুষ তাদের গৃহ, আম লিচুর বাগান, কৃষি জমি, ফসল হারিয়ে পথে বসেছেন।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ধানঘরাকে গ্রাস করে রাক্ষসী গঙ্গা যখন গুটি গুটি পায়ে ধুসুরিপাড়ার দিকে এগিয়ে আসছিল ঠিক তখনই কিশোরী সিংহের হৃদকম্প শুরু হয়েছিল। ঘড়ির কাঁটার তালে তালে সেই কম্পন থেকে শেষতক তার আর নিস্তার মেলেনি । দিবালোকে তিল তিল করে বহু কষ্টের দু কামরা বাড়িটা ভাঙনের গ্রাসে চলে যেতে দেখে নির্বাক হয়ে যান তিনি । স্বচক্ষে নিজের বাসস্থান ভাঙনের দুঃখ সহ্য করতে না পেরে বেঘোরে জীবনটাই হারালেন । এই দুঃখের কোনো হিসাব নেই ।

দুর্গত মানুষদের জন্য প্রতিবেশী গ্রামের মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছেন , স্থানীয় বাসুদেবপুর বাজারের উদ্যোগী যুবকরা কমিউনিটি কিচেন সেন্টার খুলে দুবেলা খিচুড়ি, ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করে মানবিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন। সিভিক ভলেন্টিয়ারদের মত যৎসামান্য বেতনের কর্মীরাও যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তা কম কথা নয়। এই আন্তরিকতা তাদের মহত্ত্বেরই পরিচয় বৈকি। সেইসঙ্গে সরকারি ,বেসরকারি অনেক উদ্যোগও চোখে পড়েছে। আবার ভাঙনের পাড়ে বসেই ধানঘরা ও হীরানন্দপুরের কয়েকজন সাহসী যুবক মিলে গড়ে তুলেছিলেন 'গঙ্গা ভাঙন কমিটি' । সীমিত সাধ্যের মধ্যে তারাও আর্থিক সাহায্য নিয়ে গৃহহারা ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

লেখক: হাসিবুর রহমান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ইতিহাস গবেষক।