করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে আতঙ্ক নয় সচেতনতাই জরুরি



আব্দুল খালিক
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। তবে এ নিয়ে যেন কারো মাথা ব্যথা নেই। সবাই মনে হয় করোনাকে মানিয়ে চলতে শিখে গেছেন। কোনো রাখঢাক নেই, যার যেমন ইচ্ছে চলাফেরা করছেন। লোকসমাগমে জড়ো হচ্ছেন, মেলার আয়োজন করছেন, হাট বাজারে, শপিং মলে ও পর্যটন স্পটগুলোতে দিব্যি ঘুরছেন, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে মাখা-মাখি করছেন। আর এতে করে দ্রুত বাড়ছে করোনা সংক্রমণ।

গণমাধ্যমে বার বার করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সম্পর্কে সতর্ক বাণী প্রচার করলেও মানুষ তাতে কর্ণপাত করছে না। অথচ, শুরুর দিকে এই ভাইরাস নিয়ে মানুষ কতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিল, স্বেচ্ছায় লোকডাউনসহ বিভিন্ন রকম সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিজ থেকে করেছিল। আর এখন? দেখা যায়,  প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে লোকডাউন তুলে নেওয়ার পর পরই মানুষ হাট-বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ঢালাওভাবে পালন করা হয়। শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন রকম ইভেন্ট। খুলে দেওয়া হয় সিনেমা হলসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট। আর সেসব জায়গায় মানা হয়নি কোনো স্বাস্থ্যবিধি।

এদিকে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরুর পর থেকে সংক্রমণের প্রকোপ দিন দিন বাড়তে থাকে। এতে নড়েচড়ে বসে সরকার। কঠোর হতে বলা হয় প্রশাসনকে। কিন্তু তেমন কঠোরতা চোখে না পড়লেও গত দুই/তিন দিন থেকে পুলিশোর উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এটি অবশ্যই আরও আগে করা উচিত ছিল। ফ্রিতে মাস্ক বিতরণ করলেও মাস্কবিহীন জনতাকে কোনো আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। ঢিলেঢালা কর্মসূচিতে সচেতনা চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। মাঝে মাঝে সারা দেশের দু’একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও বেশিরভাগ সময় গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার, মার্কেট, শপিংমল রয়েছে অভিযানের আওতামুক্ত। ফলে দিন দিন করোনা সংক্রমণ আরও বৃদ্ধির পাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয় ওয়েভে করোনা শুরু হলেও অবস্থা ঠিক আগের মতই থেকে যায়। মানুষ অবহেলার ছলে করোনাকে পাত্তা দিতে নারাজ। মুখে মাস্ক নেই, স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। যে যেভাবে পারছে চলাফেরা করছে। হাত মিলানো থেকে বুক মিলানো সবই চলছে। এ যেনো সুস্থ পরিবেশে স্বস্তির চলাফেরা। এসব দমনে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ জেল জরিমানাও চালাতে হবে। কারণ, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের এখনই সময়।

মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা শনাক্ত হয়েছেন তিন হাজার ৫৫৪ জন। এর আগে সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই একদিনে শনাক্ত ছিল তিন হাজার ৫৩৩ জন। এরপর গত আট মাসে একদিনে সাড়ে তিন হাজার অতিক্রম করেনি করোনা শনাক্ত।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে তিন হাজার ৫৫৪ জন এবং মারা গেছেন ১৮ জন। দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ জন। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন আট হাজার ৭৩৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয় ২৬ হাজার ৩৫৭টি। অ্যান্টিজেন টেস্টসহ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৫৪টি। এখন পর্যন্ত ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৮৩৫ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ পাঁচ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসেব মতে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ১০০ নমুনায় ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত বিবেচনায় প্রতি ১০০ জনে সুস্থ হয়েছে ৯১ দশমিক ১২ শতাংশ এবং মারা গেছের ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ এবং নারী ছয় জন। এখন পর্যন্ত পুরুষ ছয় হাজার ৬০৭ জন এবং নারী মৃত্যুবরণ করেছেন দুই হাজার ১৩১ জন।

বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায় যায়, ৬০ বছরের ওপর ১০ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ছয় জন এবং ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে দুই জন মারা গেছেন।

বিভাগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ১৪ জন, চট্টগ্রামে তিন জন এবং রংপুরে একজন। ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭ জন এবং একজন বাড়িতে মারা গেছেন।

কথা হচ্ছে, দ্বিতীয় ওয়েভে করোনা শুরুর পর থেকে ধরণ পাল্টাতে থাকে ভাইরাসটি। কোনো উপসর্গ ছাড়াই বাসা বাঁধতে শুরু করে মানবদেহে। একদম সুস্থ ব্যক্তিটির শরীরেও এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সুতরাং, শুধুমাত্র উপসর্গের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। সুস্থ থাকতেই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, সরকার করোনা প্রতিরোধ যারপর নাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের আমদানি করা হয়েছে এবং তা স্তরবেঁধে প্রয়োগ করা হচ্ছে। টিকাদান দানকালে অনেকেই সরকারের সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, টিকা দিয়ে করোনাকে আটকানো যাবে না। এই সমালোচনায় জোর দেয় সাংসদ মাহমুদ উস সামাদের মৃত্যু। তিনি করোনার টিকা গ্রহণের এক মাসের মাথায় আবারও করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। ইতিপূর্বে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) সাংসদ ও বিরোধীদলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ ও তাঁর স্ত্রী মাশকুরা হোসাইন দীনার করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে তারা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর জানতে পারেন ।

অন্যটি কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসের লাইন ডিরেক্টর মিজানুর রহমান ও ডিজির ব্যক্তিগত সহকারীরও (পিএস) করোনা শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যের ডিজি ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চার থেকে পাঁচজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারা ফ্রন্ট-লাইনার হিসেবে নিশ্চয়ই টিকা নিয়েছেন এবং তারপরও আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ, তারা এর আগে করোনা টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন। অবশ্যই স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর আগে এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, করোনা টিকার প্রথম ডোজ নিয়েই কেউ করোনার আশঙ্কামুক্ত বলতে পারেন না। কারণ, দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ ঝুঁকিমুক্ত নয়।

সুতরাং, শুধুমাত্র টিকা গ্রহণ আর এন্টিবডির দিকে চেয়ে থাকলে আমাদের চলবে না। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সেই সাথে নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে নিজেদের কর্মস্থলে নো মাস্ক নো এন্ট্রি বা নো মাস্ক নো সার্ভিস ব্যবস্থা চালু করতে হবে। হাত মেলানো ও লোক সমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধির উপর জোর দিতে হবে এবং ঘর থেকে বের হলে মুখে মাস্ক পরিধান করতে হবে। নিজেরা সচেতন হলে ইনশাআল্লাহ করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ। (সিলেটের দৈনিক)