লকডাউন কিংবা ভ্যাকসিন করোনার স্থায়ী সমাধান নয়



ড. মো. আরিফুর রহমান, গবেষক, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়। প্রথম যখন বাংলাদেশে এসেছিল তখন দুর্বল ছিল, এখন আর সে দুর্বল নেই। বিভিন্ন দেশে করোনা ভ্রমণ করে রূপ পরিবর্তন কিংবা অসংখ্য নতুন ধরন সৃষ্টির মাধ্যমে সংক্রমণে এনেছে ভিন্নতা! বছর শেষ হয়ে গেলেও করোনা যায়নি, হয়ত কখনও যাবে না, প্রতিনিয়ত করোনার ধরন পরিবর্তন করবে, কখনও দ্রুত ছড়াবে, কখনো কম ছরাবে, কখনও আক্রমণের তীব্রতা বাড়বে, আমাদের ইমিউনিটি অর্জন করার পর হয়ত ভাইরাসের তীব্রতা কমবে।

কেন করোনা ভাইরাস রূপ বদলায় জানেন? করোনা ভাইরাস একটি আরএনএ (RNA) ভাইরাস। ভাইরাস নিউক্লিক এসিড সাধারণত আরএনএ (RNA) অথবা ডিএনএ (DNA) দ্বারা গঠিত। ডিএনএ ভাইরাসের একটা ক্ষমতা থাকে সেটা হল প্রুফরিডিং অর্থাৎ জীবন্ত জীব কোষের ভেতর বংশবৃদ্ধির সময় ভাইরাসে মিউটেশন ঘটতে দেয় না, জিনোম সিক্যুয়েন্সের কোনো কোনো জায়গায় মাঝেমধ্যে ভুল হয়ে গেলে সে ঠিক করে ফেলে। আরএনএ ভাইরাসের এই ক্ষমতা নেই, প্রুফরিডিং করতে পারেনা, আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমের প্রুফরিডিং কার্যকারিতার অভাবে ভাইরাসটি এ ভুলগুলো সংশোধনে অসমর্থ। বংশবৃদ্ধির সময় ভুল হয়ে গেলে সেই ভুল নিয়েই তাকে চলতে হয়, ফলে করোনা ভাইরাস রূপ বদলায়, যাকে আমরা বলি মিউটেন্ট স্ট্রেন। আর এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় মিউটেশন।

ভাইরাসের পৃষ্ঠে প্রোটিনের বিল্ডিং ব্লক হিসেবে প্রায় ১৩০০ অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে কিন্তু পরিবর্তনের ফল মিউটেন্ট ভাইরাসে অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে কম, অ্যামাইনো অ্যাসিডের প্রকারও ডি থেকে জি হয়ে যেতে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। মিউটেশন এর সুবিধা হচ্ছে সময়ের সাথে সে দুর্বল হয়ে যায়। অসুবিধা হচ্ছে সে শক্তিশালী হতে পারে, ভ্যাকসিন এর কাজে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে।

আরএনএ ভাইরাস ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রধান অন্তরায় ছিল এই মিউটেশন। ভ্যাকসিন ভালো কাজ করার ক্ষেত্রেও বাঁধা হচ্ছে এই মিউটেশন। আরএনএ ভাইরাসের মিউটেশন হার ডিএনএ ভাইরাসের চেয়ে বেশি হওয়ায় আরএনএ ভাইরাসের ভ্যাকসিন সাধারণত কার্যকর হয় না, আমরা আমেরিকায় প্রতি বছর টিকা নেই ফ্লু থেকে বাঁচার জন্য, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের আক্রমণে হয়। এক বছরের টিকা পরের বছর কাজ করে না। এখন সাথে যোগ হল করোনা ভাইরাসের টিকা। অন্যদিকে শীতপ্রধান দেশে গাছে নতুন পাতা গজানোর সময় অর্থাৎ বসন্তকালে পলেন অ্যালার্জির যন্ত্রনা কি যে ভয়ানক হতে পারে তা যারা ভুগেন তারাই জানেন! এখন মনে হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের টিকাও প্রতি বছর নিতে হবে।

করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ঘরে বসে থাকলে যেমন আমাদের চলবে না, তেমনি ঘর থেকে বের হয়ে করোনায় মরতেও আমরা চাই না। তাই, আমাদের উপায় বের করতে হবে কিভাবে করোনা মোকাবিলা করে অর্থনীতি সচল রাখা যায়। কোনও কিছুই বন্ধ রাখা যাবে না। কিছু কিছু জিনিস শুধু ঘরে থেকে পরিচালনা করতে হবে। আমরা নিজেদেরকে বদলাতে হবে কিভাবে ঘরে বসে কাজ করা যায়, অন্যদিকে কারা বাইরে থেকে দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করবে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে সৃষ্ট এন্টিবডি (রোগ প্রতিরোধ) হয়তো দীর্ঘ স্থায়ী হবে না এবং ভাইরাসটির মিউটেশন ঘটলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাবে।

তবে আশার কথা হল, নতুন ধরনের ভ্যাকসিনের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে মূলত ভাইরাসের সারফেস এন্টিজেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের সারফেস এন্টিজেনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটে ততক্ষণ পর্যন্ত ভ্যাকসিন কাজ করবে।

আমি কেন বলি করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করে আমাদের জীবন চালিয়ে নিতে শিখতে হবে? আমেরিকায় একদিকে দেয়া হচ্ছে ভ্যাক্সিন, অন্যদিকে করোনার সংক্রমন আবারও বাড়ছে, কেন জানেন? করোনার নতুন যে মিউটেশন (B117) পাওয়া গেছে ইংল্যান্ডে, এই নতুন বৈশিষ্ট্যের ভাইরাসটি অনেক বেশি সহজে এবং দ্রুত ছড়াচ্ছে। আগেরটির তুলনায় এই নতুন করোনাভাইরাস ৭০ শতাংশ বেশি হারে ছড়াচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারকে আবারও কঠোর লকডাউন জারি করতে বাধ্য করেছিল এই নতুন ভাইরাস।

আপনারা যারা ভাবছেন ভ্যাক্সিন নেয়ার পর আপনি নিশ্চিত হয়ে যাবেন যে আপনার আর করোনা হবে না, সেটাও সঠিক করে বলা যাচ্ছে না যদিও জনসন বলছে তাদের ভ্যাক্সিন দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরন বা স্ট্রেইন (B1351) এর বিরুদ্ধে কার্যকর।

আপনারা যারা ভাবছেন একবার করোনা হয়ে যাবার পর আপনি নিশ্চিত যে আপনার আর করোনা হবে না, দেহে এন্টিবডি আছে তাদের জন্য বলছি ব্রাজিলে যে নতুন ধরন বা স্ট্রেইন (P1) পাওয়া গিয়েছে সেটা আবারও আক্রমণ করতে পারে, অর্থাৎ আপনি পুনরায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন।

আক্রান্তের ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট, এটা একদিকে ছড়ায় বেশি, অন্যদিকে ভ্যাক্সিন কার্যকর নয়। তাই, সতর্কতা এবং সরকারের নির্দেশনা মেনে চলাই একমাত্র সমাধান।

আপনি যদি মনে করে থাকেন ২০১৯ সালের করোনা ভাইরাস আর ২০২১ সালের করোনা একই, তাহলে ভুল করছেন। আগেই বলেছি, এটা আরএনএ ভাইরাস, এটা নতুন নতুন রুপে পৃথিবীতে আসতেই থাকবে, আমাদেরকে এটা মোকাবিলা করে বাঁচতে হবে। যারা আক্রান্ত হয়েছে একমাত্র তারাই জানে এটা কতটা ভয়ানক! সেজন্য সতর্ক থাকুন, স্বাস্থ্যবিধি কিংবা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন।