আন্তর্জাতিক মানে দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নয়টার ফ্লাইট কয়টায় যাবে? ফ্লাইটের টাইম কি ঠিক আছে? আজ কি ফ্লাইট যাবে? লাগেজ ডেলিভারি পেতে আর কতো সময় লাগবে? আপনাদের ফ্লাইট কি নন এসি? আপনাদের প্লেনগুলো কি অনেক পুরাতন? আপনাদের কেবিন ক্রু দের ব্যবহার ভালো না? ফ্লাইটের খাবারের মান ভালো না? আপনাদের র‌্যাম্পকোচগুলোর কন্ডিশন যাচ্ছে তাই? আপনাদের বিমানে লাগেজ থেকে মালামাল খোয়া যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি নেতিবাচক বাক্য বাংলাদেশ এভিয়েশনের সঙ্গে শুরু থেকে মিশে আছে। যার ফলে বাংলাদেশী যাত্রীরা দেশীয় এয়ারলাইন্সের সেবা না নিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সের সেবা নিতে বেশী আগ্রহী হয়ে পড়ে, যা দেশীয় এয়ারলাইন্সের অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে আছে।

নেতিবাচক বাক্যগুলো ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এভিয়েশন থেকে দূর হতে শুরু হয়েছে। যা বাংলাদেশ এভিয়েশনের এগিয়ে যাওয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ৪টা ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ থেকে যাত্রা শুরু করা জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বাংলাদেশ এভিয়েশনের সূতিকাগার। যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের এগিয়ে চলার সাথেই বিমান বাংলাদেশের এগিয়ে চলা। নানা সমস্যাকে সঙ্গে নিয়ে দেশের এভিয়েশনের যাত্রা। প্রায় ২৫ বছর যাবৎ বেসরকারী এয়ারলাইন্সের পথচলা। নানা চড়াই উৎরাই পার হয়ে আজ দেশের প্রাইভেট এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইন্সের ফ্লেভার পেতে শুরু করেছে। এ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের অগ্রপথিক। তারই ধারাবাহিকতায় এয়ার পারাবাত, জিএমজি এয়ারলাইন্স, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, নভো এয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ বেশ কয়েকটি কার্গো এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের প্রাইভেট এয়ারলাইন্স চলার পথকে করেছে সমৃদ্ধ।

নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভো এয়ার ছাড়া অন্যান্য প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এখন ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে এয়ার পারাবাত ও এ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্সের বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের বিজনেস কনসেপ্ট ডেভেলপ করার পূর্বেই শেষটা দেখতে হয়েছে। ৬ এপ্রিল ১৯৯৮ সালে জিএমজি এয়ারলাইন্স নানা পরিকল্পনা সাজিয়ে আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইন্স কনসেপ্ট নিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। এক পর্যায়ে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের প্রথম আন্তর্জাতিক রুট চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় ফ্লাইট পরিচালনা জিএমজি’র হাত ধরে শুরু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মালিকানা পরিবর্তনসহ নানা উপায়ে এয়ারলাইন্সটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা ব্যর্থতায় পরাভূত হয়ে ১৪ বছর ফ্লাইট পরিচালনার পর বাংলাদেশের আকাশে বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সের মিছিলে সমবেত হয়েছে। জিএমজির যাত্রা শুরুর প্রায় দশ বছর পর ২০০৭ সালে ১০ জুলাই ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, ডিসেম্বর ২০০৭ এ বেস্ট এয়ার ও ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি এভিয়ানা এয়ারওয়েজ যাত্রা শুরু করে। ভুল পরিকল্পনা, আর্থিক অসংগতি, ভুল এয়ারক্রাফট নির্বাচন, আয়ের সাথে ব্যয়ের অসংগতি নানাবিধ কারণে আজ বন্ধ হওয়ার কাতারে শামিল হয়েছে একই সময়ে শুরু হওয়া তিনটি এয়ারলাইন্স।

বাংলাদেশ পুঁজি বাজারের একমাত্র নিবন্ধিত এয়ারলাইন্স কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। নানা রকম অসংগতির কারণে আজ লক্ষ লক্ষ শেয়ার হোল্ডার পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দিনানিপাত করছে। একটা সময় মনে হয়েছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এভিয়েশন ব্যবসা নয় শেয়ার ব্যবসার প্রতিই বেশী মনোযোগী। ১০ বছর ফ্লাইট পরিচালনার পর নিজেদের বহরে ১১টি এয়ারক্রাফট থাকার পরও বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। বন্ধ হওয়ার মিছিলে সর্বশেষ সংযুক্তি রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। ১০ নভেম্বর ২০১০ এ যাত্রা শুরু করার পর কোভিড-১৯ এর করাল গ্রাসে নানা সমস্যায় ধুঁকতে থাকা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ অবস্থায় আছে।

প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের বন্ধ হওয়ার মিছিল যতো সংকুচিত হবে ততোই মঙ্গল বাংলাদেশ এভিয়েশন সেক্টরের জন্য।

২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি নভো এয়ার ও ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরের সর্বশেষ সংযোজন। নভো এয়ার ৮ বছর পেরিয়ে নয় বছর যাবৎ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক রুট বলতে শুধু ঢাকা-কলকাতা। ঢাকা-ইয়াঙ্গুন ও চট্টগ্রাম-কলকাতা দু’টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিলো কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অল্প সময় পরে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছে নভো এয়ার। নভো এয়ারের বিমান বহরে সাতটি এটিআর ৭২-৫০০ রয়েছে। মূলত অভ্যন্তরীণ রুটে আন্তর্জাতিক মানের ফ্লাইট পরিচালনাকারী এয়ারলাইন্স হিসেবেই টিকে আছে বাংলাদেশ এভিয়েশনে।

বাংলাদেশ এভিয়েশনে সর্বশেষ সংযোজন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। যাত্রা শুরুর এক বছরের মধ্যেই দ্রুতগতি সম্পন্ন এয়ারক্রাফট ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এর মাধ্যমে সবগুলো অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। দু’বছর অতিক্রম করার পূর্বেই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। তৃতীয় বছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। চতুর্থ বছরে এয়ারলাইন্সের এয়ারক্রাফটগুলোর গড় আয়ু কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ব্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট বিমান বহরে যোগ করতে থাকে। বর্তমানে ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০সহ মোট চৌদ্দটি এয়ারক্রাফট রয়েছে ইউএস-বাংলার বিমান বহরে।

জাতীয় বিমান সংস্থার সাথে দেশীয় পতাকাকে সম্মুন্নত রাখার লক্ষ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বিদেশি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যাত্রী সেবায় প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে দুবাই, মাস্কাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, গুয়াংজু, চেন্নাই ও কলকাতা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। দেশীয় যাত্রীদের আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বিদেশি এয়ারলাইন্সের সমপর্যায়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে রুট ভিত্তিক এমিরেটস এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ারওয়েজ, ওমান এয়ার, ইত্তেহাদ, ফ্লাই দুবাই, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, এয়ার এশিয়া, থাই এয়ারওয়েজ, চায়না সাউদার্ন, চায়না ইস্টার্ন, এয়ার ইন্ডিয়া, স্পাইস জেটসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। যাত্রী সেবায় অনন্য ভূমিকা পালন করছে। দেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। দেশীয় এয়ারলাইন্সের প্রতি যেসকল নেতিবাচক শব্দচায়ন কিংবা বাক্যচায়ন ঘটতো তা বর্তমানে দূরীভূত হতে শুরু করেছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯০ শতাংশের উপর অনটাইম পারফরমেন্স নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অন্যতম ট্রাভেল বিষয়ক পাক্ষিক দি বাংলাদেশ মনিটর ২০১৯ সালে মনিটর এয়ারলাইন অফ দ্যা ইয়ার নির্বাচিত করা হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে।

২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালানোর পর থেকে ফ্লাইট অবতরনের পর মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই প্রথম লাগেজ বেল্টে চলে আসছে। এখানে একটি কনসেপ্ট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা, তা হচ্ছে- আপনি লাগেজের জন্য অপেক্ষা করবেন না, লাগেজ আপনার জন্য অপেক্ষা করবে।

দেশীয় এয়ারলাইন্স এর দূর্বলতার কারণে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো বাংলাদেশের মার্কেটকে টার্গেট করে তাদের ব্যবসা বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। মার্কেট শেয়ারের প্রায় ৭০ ভাগ বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে আর বাকী ৩০ ভাগ জাতীয় বিমান সংস্থাসহ অন্যান্য দেশীয় এয়ারলাইন্সের কাছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য বেসরকারী বিমানসংস্থাগুলোকে যদি অনেক বেশী সুযোগ সুবিধা প্রদান করা যায় তবে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে আন্তর্জাতিক রুটে মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবে। দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো এখন বিমান বহরে থাকা এয়ারক্রাফটগুলোর গড় আয়ু কমিয়ে আনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বহরে ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট যোগ করছে। সময়ানুবর্তিতা মেনে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। লাগেজ ডেলিভারিতে সময়ক্ষেপন করছে না।

সেবার প্রতি মনোযোগী হয়ে যতোবেশী নেতিবাচক বাক্যগুলো পরিহার করতে সক্ষম হবে ততোবেশী দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসায়িকভাবে সুদৃঢ় হবে।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, যোগাযোগ- ০১৭৭৭৭০৭৫৩৬, Email: [email protected]