সাফল্যের একটি যাত্রা, সাত পেরিয়ে আটে ইউএস-বাংলা



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

“সাফল্য একটি যাত্রা” এই যাত্রাকে সাবলিল রাখতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বিগত দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর ব্যর্থতাগুলি চিহ্নিত করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর সফলতার গল্পগুলিকে পর্যালোচনা করে যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার মানসিকতায় এগিয়ে চলেছে। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ এভিয়েশনের অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে আসলেও প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের বয়স টগবগে যুবকের যা থাকার কথা তাই। ২৪ বছর। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো প্রাইভেট এয়ারলাইন্স-ই কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে যুবক হতে পারেনি। তার আগেই যবনিকাপাত ঘটেছে। দুঃখজনক, খুবই দুঃখজনক চলার পথ একটি ইন্ডাস্ট্রির জন্য।

সবচেয়ে নবীন এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ একটি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা। সাত বছর পেরিয়ে আট বছরে পদার্পণ। ১৭ জুলাই ২০২১ বাংলাদেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে একটি অন্যতম সেরা দিন। ঢাকা থেকে যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে ইউএস-বাংলার পথচলা শুরু।

৭৬ আসনের দুইটি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরু করা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর বিমান বহরে এখন ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০সহ মোট ১৪টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক এয়ারক্রাফট নিয়ে প্রাইভেট সেক্টরে এগিয়ে রয়েছে ইউএস-বাংলা। যাত্রা শুরুর পর থেকে স্বপ্নকে সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা। পরিকল্পনায় ছিলো প্রথম বছরেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সকল বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা করে আকাশপথকে শক্তিশালী করে তুলবে। সেই স্বপ্নকে প্রথম বছরেই পরিপূর্ণতা দিতে সক্ষম হয়েছিলো ইউএস-বাংলা।

শুধু দেশের আকাশপথ নয়, ইউএস-বাংলা নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো যাত্রা শুরুর দু’বছর অতিক্রম হওয়ার পূর্বেই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাত্রার অভিলাষ। ১৫ মে ২০১৬ ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, যা ইউএস-বাংলাকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বিশ্ব এভিয়েশনে একটি স্থান করে নেয়।

ফ্লাইট শেষে আপনি লাগেজের জন্য অপেক্ষা করবেন না, লাগেজ আপনার জন্য অপেক্ষা করবে। পূর্বে ঢাকায় আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের যাত্রা শেষে লাগেজ ডেলিভারী পেতে ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে যেতো। সেখানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু হওয়ার সময় থেকে ফ্লাইট অবতরনের পর প্রথম লাগেজ বেল্টে আসতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। যার ধারাবাহিকতা আজ অবধি বিদ্যমান আছে। যা পরবর্তীতে অন্যদের কাছে অনুকরনীয় হয়ে আছে। এখানে অদম্য ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিমান সংস্থার ইতিহাসে ইউএস-বাংলাই প্রথম এবং একমাত্র এয়ারলাইন্স অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট  ব্যবহার করছে। যা যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণ ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে। বর্মানে ইউএস-বাংলার বিমান বহরে ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট রয়েছে। ব্র্যান্ডনিউ বিমান বহরে থাকায় ইউএস-বাংলার এয়ারক্রাফটগুলোর গড় বয়স অন্য যেকোনো প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর বিমানগুলো থেকে কম।

স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য পরিকল্পনায় থাকা তৃতীয় বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ফ্লাইট শুরু করে। সাথে বহরে যোগ করা হয়েছে ১৬৪ আসনের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট, যাতে রয়েছে ৮টি বিজনেস ক্লাস ও ১৫৬টি ইকোনমি ক্লাসের আসন। বোয়িং ৭৩৭ এয়ারক্রাফট দিয়ে মাস্কাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুরসহ কলকাতায় ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে ইউএস-বাংলা।

স্বাধীনতার পর প্রথম এবং একমাত্র এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা চীনের আকাশসীমায় বাংলাদেশী পতাকা নিয়ে কোনো প্রদেশে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। চীনের বিমান সংস্থাগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করে ইউএস-বাংলা গুয়াংজুতে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল। এখন পরযন্ত বাংলাদেশী অন্যান্য ক্যারিয়ারগুলো শুধু স্বপ্নই সাজিয়েছে চীন ভ্রমণে কিন্তু ইউএস-বাংলা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে গত তিন বছরের অধিক সময় যাবত গুয়াংজুতে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ রোগী চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করে থাকে। দেশের জনগনের সুবিধার্থে উন্নত চিকিৎসা সেবাকে সহজলভ্য করার জন্য ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স চেন্নাইতে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে ২০১৯ এর শুরু থেকে। যা স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো এয়ারলাইন্স চেন্নাইতে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। সাথে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা রুটেও ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা।

সারাবিশ্বের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় পরযটন শহর ও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রবাসীবান্ধব দৃষ্টিনন্দন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শহর দুবাইতে চলতি বছর ফেব্রুয়ারী থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। খুব শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যের জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম, আবুধাবীতে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা সাজিয়েছে। এছাড়া পরিকল্পনায় আছে সার্কভুক্ত দেশগুলোর অন্যতম পরযটন শহর কলম্বো-মালেতেও ফ্লাইট শুরু করার। ইউএস-বাংলার দেশের সব অঞ্চলের জনগনের অর্থ ও সময়ের কথা বিবেচনা করে খুব শীঘ্রই অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত ক্রস ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা আছে।

নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ার ছাড়া অন্যান্য প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এখন ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর যাত্রা শুরুর পর এয়ার পারাবাত, এ্যারোবেঙ্গল, জিএমজি, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা, ইউনাইটেড ও সর্বশেষ রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ভুল পরিকল্পনা, আর্থিক অসংগতি, ভুল এয়ারক্রাফট নির্বাচন, আয়ের সাথে ব্যয়ের অসংগতি নানাবিধ কারনে আজ বন্ধ হওয়ার কাতারে শামিল হয়েছে। প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের বন্ধ হওয়ার মিছিল যত সংকুচিত হবে ততই মঙ্গল বাংলাদেশ এভিয়েশন সেক্টরের জন্য।

মূলত প্রাইভেট এয়ারলাইন্স হিসেবে ইউএস-বাংলাই একমাত্র এয়ারলাইন্স হিসেবে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে যাত্রীদের উন্নতমানের সেবা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে বাংলাদেশ এভিয়েশনে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে রুট ভিত্তিক এমিরেটস এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ারওয়েজ, ওমান এয়ার, ইত্তেহাদ, ফ্লাই দুবাই, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, মালয়শিয়া এয়ারলাইন্স, এয়ার এশিয়া, থাই এয়ারওয়েজ, চায়না সাউদার্ন, চায়না ইস্টার্ন, এয়ার ইন্ডিয়া, স্পাইস জেট সহ আরো অনেক আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত এয়ারলাইন্স এর সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। দেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। দেশীয় এয়ারলাইন্স এর প্রতি যেসকল নেতিবাচক শব্দচয়ন কিংবা বাক্যচয়ন ঘটতো তা বর্তমানে দূরীভূত হতে শুরু করেছে। ইউএস-বাংলা যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯০ শতাংশের উপর অনটাইম পারফরমেন্স নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

সারাবিশ্ব আজ কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপরযস্ত। এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম বিজনেস মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তারপরও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় এগিয়ে চলেছে।

“আমরা কোভিড-১৯ এর বিপরীতে প্রমানিত যোদ্ধা। ”ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সকল ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী কেবিন ক্রু, ককপিট ক্রুসহ সকল এয়ারলাইন্স এক্সিকিউটিভ মনোবলকে সূদৃঢ় রেখে যাত্রীদেরকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

ইউএস-বাংলার খারাপ সময়গুলিতেও সম্মানিত যাত্রীরা আমাদের সাথে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন সেই প্রত্যাশাও করছি। অন্ধকার কেটে আলো আসবে, পরিবর্তিত বিশ্বে নতুন পৃথিবীর আগমনে আবার ইউএস-বাংলা এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এভিয়েশন।

এগিয়ে চলার নিদর্শন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। ইউএস-বাংলা, কখনই থেমে থাকবার নয়।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স