মুক্তি মেলে না সহজে!



আনিসুর বুলবুল
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনা পরবর্তী বেশ কিছু সমস্যা আমাকে এখনও পীড়া দেয়। মানসিক কষ্ট দেয়। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে খুবই সমস্যা ও বিব্রতকর অস্থায় ফেলে দেয় আমাকে।

আমি এখনও সিম্পল জিনিসগুলো মনে করতে পারি না; ড্রয়ারের চাবিটা কোথায় রাখলাম বা মানি ব্যাগটা ড্রয়ারে নাকি পকেটে মনে থাকে না।

ছোটখাটো কথা-বার্তায়ও মেজাজ ধরে রাখতে পারি না! যে কারো সাথে হঠাৎ করেই রেগে যাই; সন্তান-স্ত্রী-স্বজন-সহকর্মী কেউই বাদ যায় না। একটা বিব্রতকর অবস্থা।

ঘুম কম হয়। কখনো গভীর রাতে; কখনো শেষ রাতে হঠাতই ঘুম ভেঙে যায়। একবার ঘুম ভেঙে গেলে আর চোখের পাতা বন্ধ হয় না!

খাবারে এসেছে চরমভাবে অরুচি। পছন্দের খাবারও খেতে পারি না! এখন ইলিশ ভাজি বা গরুর মাংশ টেবিলে পরে থাকলেও খেতে ইচ্ছে হয় না।

মনে প্রচণ্ডভাবে শঙ্কা চলে এসেছে; একটু জ্বর বা হালকা গলা ব্যথা হলেই ভয় পাই। শুধু তাই নয়, কোথাও একটু জোরে শব্দ হলেও আঁতকে উঠি!

এখনো বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না; বেশিক্ষণ হাটতেও পারি না; দুর্বলতাটা রয়েই গেছে! বাজার করতে যাওয়া; ছেলের সঙ্গে খেলা করা বা বাসার একটু কাজ করা- সম্ভব হয় না।

দীর্ঘদিন পর আজ বিবিসির একটি প্রতিবেদন পড়ে জানতে পারলাম, যারা কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশের মধ্যে 'লং কোভিড'-এর উপসর্গ রয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই ১৫ শতাংশের মধ্যে আমিও একজন। আমিও লং কোভিডের শিকার!

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করে বলছেন, কোভিড তো বটেই, নতুন করে উদ্বেগের বিষয় হতে যাচ্ছে এই লং কোভিড। তারা বলছেন, কোভিড পরবর্তী সময়েও নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাই মূলত লং কোভিডের লক্ষণ আর দেশে কোভিড আক্রান্তদের এক বড় অংশের মধ্যেই নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা গেছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৭ জন গবেষকদের একটি দল লং কোভিড নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোভিডের বিভিন্ন উপসর্গ ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, এ ক্ষেত্রে, মাথাব্যথা, ভুলে যাওয়া, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, হৃৎস্পন্দনের ওঠানামার মতো উপসর্গ থাকে। আর এটি তিন মাস থেকে শুরু করে দেড় বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তাদের গবেষণা অনুযায়ী, মধ্যবয়সীদের মধ্যেই লং কোভিডের উপসর্গ বেশি পাওয়া যায়। ৩০ থেকে শুরু করে ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের মধ্যে লং কোভিডে ভোগার প্রবণতা বেশি।

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার তথ্য অনুযায়ী লক্ষণগুলো হচ্ছে- চরম ক্লান্তি বা অবসন্নতা; শ্বাস নিতে কষ্ট বা হাঁপিয়ে ওঠা, হৃৎপিণ্ডের ঘন ঘন স্পন্দন বা বুক ধড়ফড় করা, বুকে ব্যথা বা টানটান ভাব; স্মৃতি শক্তি বা মনঃসংযোগের সমস্যা - যাকে বলা হয় 'ব্রেন ফগ' বা বোধশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া; স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিতে পরিবর্তন এবং হাড়ের জোড়ায় ব্যথা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, যাদের কোভিড থেকে সেরে উঠতে দীর্ঘদিন লাগে, তাদের দরকার প্রচুর বিশ্রাম, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ এবং প্রচুর পানি পান করা। কোন কোন রোগীর হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পেতে ফিজিওথেরাপি দরকার হয়।

সাধারণভাবে বলা যায়, ধূমপান না করা, মদ্যপান কমানো, শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা - এগুলো মেনে চলতে পারলে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে অল্পদিনেই সেরে ওঠা সম্ভব।

চিকিৎসকরা বলেছেন, এখন কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার নির্ধারিত ঢাকায় সরকারি কয়েকটি হাসপাতালে সুস্থ হওয়াদের ছাড়পত্র দেয়ার সময় ফলোআপ চিকিৎসার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

ভেবেছিলাম, করোনা থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমার সে আশায় গুঁড়েবালি। গজল সম্রাট জগজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতেই হচ্ছে- 'বেশি কিছু আশা করা ভুল / বুঝলাম আমি এতদিনে / মুক্তি মেলে না সহজে / জড়ালে হৃদয় কোনো ঋণে।'