সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতে শিখি!



কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশ যার এক গৌরবগাঁথা যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস, বিশ্ব ক্রিকেটে অবস্থান, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কিংবা পোশাক শিল্পে অভাবনীয় সাফল্য ছাড়া তেমন কোন প্রাপ্তি খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল।

ড. মুহম্মদ ইউনূস এ দেশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর হাজারো মাইল দূরে নরওয়ে থেকে ভেসে আসলো এক বাংলাদেশির বীরত্বগাঁথার স্বীকৃতি। যে কোন বিষয়ে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন থাকে নোবেল পুরস্কার বিজয়। আর সেই বিখ্যাত ব্যক্তিটি আমাদের বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণের জনক প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস। ক্ষুদ্র ঋণের ধারক-বাহক-প্রচারক ড. ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হন। একজন অর্থনীতিবিদ কিংবা ব্যাংকার হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ আপাত দৃষ্টিতে এক অভাবনীয় ব্যাপার মনে হতে পারে কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে অর্থনৈতিক মুক্তির চেয়ে বড় শান্তি পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।

গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতার প্রায় অধিকাংশই মহিলা। একজন মহিলা যদি স্বাবলম্বী হয়ে সংসার পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারে তবে অবশ্যই সেই পরিবারটি সময়ের পরিক্রমায় স্বাবলম্বী হতে থাকবে। স্বল্প সুদে বিনা জামানতে ঋণ প্রদান সারা পৃথিবীর ব্যাংকিং সেক্টরে দূরূহ ব্যাপার। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচনে বিজ্ঞ বিচারক প্যানেলের নির্বাচন নিয়ে বিগত সময়ে কোন প্রশ্নের অবতারণা হয়নি। ড. মুহম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের এ অর্জন নিয়েও কোন প্রশ্নের সুযোগ নেই। এ আমাদের গর্ব। এ আমাদের অহংকার। পৃথিবীর মানচিত্রে ড. মুহম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে শান্তিতে নোবেল বিজয়ের পর বাংলাদেশ এর নাম উচ্চারিত হতে থাকে সর্বক্ষেত্রে।

ড. মুহম্মদ ইউনূসের নোবেল বিজয়ের কয়েক বছর পূর্বে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হন আরেক বাংলাভাষাবাসী ভারতীয় নাগরিক ড. অমর্ত্য সেন। উনার প্রতিও রইল পরম শ্রদ্ধা। নোবেল বিজয়ী হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়ে ড. সেন অনেকবার বাংলাদেশে আসেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে ডক্টরেট ডিগ্রি অব লিটারেচর। সরকারিভাবে সম্মাননা প্রদান করেছে। সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দেখালে সম্মান কমে না বরং আরো বাড়ে। ভবিষ্যতে নিজের সম্মানিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

একজন ড. ইউনূস যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তখন থেকেই নিজের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যার প্রতিদান পেয়েছেন ড. ইউনূস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। বাংলাদেশের গর্ব, বাঙ্গালী জাতির গর্ব ড. মুহম্মদ ইউনূসের নোবেল বিজয়কে কিছু সংখ্যক কল্পনাবিলাসী মানুষ সহজভাবে নিতে পারেনি এমনকি নোবেল প্রদানের জন্য নির্বাচক প্যানেলকেও সমালোচনার তীর বিদ্ধ করতেও ছাড়েননি। বিভিন্ন আইনি জটিলতার কঠিন প্রাপ্তি নিজের প্রতিষ্ঠানে নিজেই এখন অবাঞ্চিত। আমাদের চিরাচরিত কিছু অভ্যাস সব কিছুর মধ্যেই রাজনৈতিক গন্ধ খুঁজে বেড়ানো। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশী এ জাতির।

সম্প্রতি শান্তিতে নোবেলবিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস অলিম্পিক লরেল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৬ সালে প্রবর্তনের পর তিনি অলিম্পিক লরেল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব। খেলাধূলার মাধ্যমে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শান্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অলিম্পিক লরেল অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

আমরাতো সংকীর্ণ মনের জাতি নই। আমাদের গর্ব আমরা পেয়েছি বঙ্গবন্ধুর মতো একজন দেশপ্রেমিক নেতা, পেয়েছি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বাংলার বাঘ শেরে-এ বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানীর মত নেতৃত্ব। আমরা সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান করতে জানি। এদেশে ড. অমর্ত্য সেনের মতো ড. ইউনূসকে সম্মানিত করার মানসিকতা তৈরী হোক।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সম্মান দেখানোর মানসিকতায় বড় হোক। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে। কারো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কারো হতে পারে জিয়াউর রহমান, শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া, আবার কারো হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড: কামাল হোসেন এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ড. মুহম্মদ ইউনূসকে একজন ব্যক্তি আদর্শের মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম নোবেল বিজয়ের মতো বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস পাবে।

একটি কথা না বললেই নয়, একজন তরুণ রাজনীতিবিদ সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ মহান জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে বলেছিলেন আমাদের সেলফোনে ভিভিআইপি কল লিস্টে আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া কিংবা জয়নুল আবেদীন ফারুকের নম্বর কিন্তু ড. মুহম্মদ ইউনূসের ভিভিআইপি কল লিস্টে আছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড কাইরন, হিলারি ক্লিনটন কিংবা জাতি সংঘের মহা সচিব মি. বান কি মুন এর মত ব্যক্তিত্ব। দয়া করে যার সম্মান যতটুকু পাওনা তাকে তা দিয়ে দায়মুক্ত হোন। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সম্মানিত ব্যক্তিকে অসম্মান করার জন্য মানবিক কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দিতে কার্পণ্য করবে না।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অথচ আজ নিজ দেশেই সামরিক সরকারের বন্দীদশায় কাটছে, তিনি লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে বিতারিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। আবার বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দিক বিবেচনা করে অধিক জনগোষ্ঠী হওয়ার পরও লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান দিয়ে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছেন। ভাসানচরে সব সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। শরনার্থীদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়ার অনন্য নজীর স্থাপন করেছেন।  নোবেল পুরস্কারের জন্য যদি মানবিক দিক বিবেচনা করে কখনো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিবেচনা করে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ঋণ এর ব্যাপক বিস্তার লাভে ব্র্যাকের স্যার ফজলে হাসান আবেদ এর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যদি আরো নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দেখতে পাওয়া যায় আমরা যারপর নাই খুশি হবো।   

ড. ইউনূসের গুরুত্ব যদি তুলে ধরা না হয় তাহলে আমাদের সন্তানদের কাছে নোবেল পুরস্কার অর্জন অন্য দশটা অর্জনের চেয়ে বড় কিছু মনে হবে না। নোবেল পুরস্কারকে সম্মান করতে শিখি, নোবেল বিজয়ীকে দাড়িয়ে স্যালুট দিতে শিখি তবেই না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে আরো নোবেল বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শিখবে। আসুন স্বপ্ন দেখাই, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার পরিবেশ তৈরি করি। আবারও ড. মুহম্মদ ইউনূসকে এবং গ্রামীণ ব্যাংককে স্যালুট এদেশকে অভূতপূর্ব সম্মান এনে দেয়ার জন্য।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, সভাপতি, সাস্ট ক্লাব লিমিটেড