চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশ



মামুন হাসান বিদ্যুৎ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমান বিশ্বের বহুল আলোচিত  বিষয়ের মধ্যে চতুর্থ  শিল্পবিপ্লব অন্যতম একটি বিষয়। "চতুর্থ শিল্প বিপ্লব  হলো আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত উৎপাদন এবং শিল্প ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণের একটি চলমান প্রক্রিয়া।"

আজকের যুগের ডিজিটাল বিপ্লব, যাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটির উৎপত্তি ২০১১ সালে, জার্মান সরকারের একটি হাই টেক প্রকল্প থেকে। একে সর্বপ্রথম বৃহৎ পরিসরে তুলে নিয়ে আসেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান ক্লস শোয়াব।

ইন্টারনেটের আর্বিভাবে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের পর তথ্যপ্রযুক্তির বাধাহীন ব্যবহার ও দ্রুত তথ্য স্থানান্তরের মাধ্যমে গোটা বিশ্বের জীবন প্রবাহের গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারনেট অব থিংকিং (আইওটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়বে যেটি কিনা মানব সম্পদের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এই ডিজিটাল বিপ্লবের ছোয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থার ঘটবে অকল্পনীয় পরিবর্তন। যেখানে উৎপাদনের জন্য মানুষকে যন্ত্র চালাতে হবেনা, বরং যন্ত্র সয়ংক্রীয়ভাবে কর্ম সম্পাদন করবে এবং এর কাজ হবে আরও নিখুঁত ও নির্ভূল।চিকিৎসা, যোগাযোগ, প্রকাশনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এর প্রভাব হবে অত্যন্ত জোরালো।

বাংলাদেশে এই বিপ্লবের সুযোগ গ্রহন করতে হলে আগাম ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আইওটি,ব্লকচেইন ও রোবটিক্স ইত্যাদির ব্যবহার করতে দ্রুত কৌশলগত পরিকল্পনা করতে হবে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রধানতম লক্ষ্য হতে হবে ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী সুদক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আর এজন্য প্রয়োজন হবে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।

বাংলাদেশে বর্তমানে তরুণের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৬ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৩০%। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগামী ৩০ বছর জুড়ে তরুণ বা উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। বাংলাদেশের জন্য ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করার এটাই সব থেকে বড় হাতিয়ার। জ্ঞানভিত্তিক এই শিল্প বিপ্লবে প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদই হবে বেশি মূল্যবান। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুল পরিমাণ মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার নানাবিধ কর্মক্ষেত্র।

এই বিপ্লবের ফলে দেশের মানুষের আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবন মান বাড়বে। এছাড়া মানুষ তার জীবনকে বেশি মাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভর করবে।আমদানি - রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ থেকে সহজতর হবে। ফলে বর্হিবিশ্বের আধুনিক জীবন ও জীবিকার উপকরণ দ্রুত পৌঁছে যাবে মানুষের হাতে। দেশে বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখের বেশি তরুণ তরুণী অনলাইনে কাজ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে। দেশিয় হার্ডওয়ার, সফটওয়্যার রপ্তানির হার দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং এর বাজার সামনে আরো বিস্তৃত হবে। অনলাইন প্লাটফর্মকে পুঁজি করে কর্মসংস্থানকারীদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গী করতে দেশের সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতাকে আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দেশের নির্মিত ও নির্মাণাধীন হাইটেক পার্কগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।

তবে এই বিপ্লবের ফলে গোটা দুনিয়ার একটি বিশাল অঙ্কের মানুষের কাজ হারানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এর প্রভাব আমাদের দেশেও অতি মাত্রায় লক্ষণীয় হতে পারে। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয় বিষয়গুলোও হুমকির সম্মুখীন হতে পারে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সমাজে বৈষম্য তৈরি করতে পারে। যেমন ‘কম-দক্ষতা স্বল্প-বেতন’ বনাম ‘উচ্চ-দক্ষতা উন্নত-বেতন’ কাঠামো অর্থনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেজ্ঞ মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ,  ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি যন্ত্রগুলো আপডেট  করার পাশাপাশি প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি আপডেটের মাঝে সমন্বয় সাধনের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পুরো জীবনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষ, প্রকৃতি এবং সমাজের সর্ম্পক বৃহত্তর রূপান্তর হতে পারে।

লেখক: মামুন হাসান বিদ্যুৎ, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সংঘাত নয় সংলাপের মাধ্যমে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা আনতে হবে



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর জান্তাবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো মিয়ানমার। চলমান সেনাশাসনের অবসান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষে বিক্ষোভকারীরা পথে নামে। অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন-বিক্ষোভ শুরু করে দেশটির গণতন্ত্রকামী শক্তি ও সাধারণ জনগণ। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) গঠন করার পর তাঁদের সমর্থন করতে সারা দেশের গণতন্ত্রপন্থিদের সংগঠিত করে পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) গঠন করা হয়। গণতন্ত্রকামীদের ওপর সামরিক বাহিনী যখন দমন পীড়ন শুরু করে, তখন তাদের অনেকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে সহায়তা ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করে। পিডিএফ মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং গ্রামগুলোতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ২০২১ সালের অক্টোবরের মধ্যে দেশের প্রায় সব শহর এলাকায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। মিয়ানমারের আরাকান, কাচিন, কারেন, শান এবং ওয়া বাহিনীর মতো ১১টি জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে সামরিক অভিজ্ঞতা লাভ করছে পিডিএফের যোদ্ধারা।

মিয়ানমারের জাতি গোষ্ঠীর সশস্ত্র গ্রুপগুলো এর আগে আলাদাভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা করত। বর্তমানে তাঁরা  পি ডি এফ এর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমন পরিচালনা করছে। সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সাথে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্রবাহিনী এবং পিডিএফ-এর মধ্যে প্রায় ২৮০০ বার সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়েছে। এনইউজি’র অনুগত পিডিএফ ও এথনিক রিভল্যুশনারি অর্গানাইজেশনের (ইআরও) যোদ্ধারা গত এক বছর ধরে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের অর্ধেকের বেশি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনী সারাদেশে পি ডি এফ এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলির দ্বারা প্রতিদিন আক্রমণের সম্মুখীন হচ্ছে।  মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখন আরাকান আর্মির (এ এ) পাশাপাশি কাচিন, শান, কারেন, চিন এবং কায়া জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।  মিয়ানমারের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কায়াহ রাজ্যে ২০২১ সালের মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত গেল ১৫ মাসে পি ডি এফ যোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষে দেশটির দেড় হাজার সেনা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন দেড় শতাধিক পি ডি এফ যোদ্ধা। অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে মিয়ানমারে ২ হাজার ২০০ জনের বেশি নিহত, প্রায় ১৫ হাজার মানুষ গ্রেফতার ও ২৮০০০ বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। জান্তা ও সেনাশাসনবিরোধীদের সংঘর্ষ এবং সামরিক অভিযানের কারণে দেশটিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখন  ত্রিমুখী প্রতিরোধের মুখে রয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধ এবং নিজস্ব ভামার গোত্রের সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে তাঁরা দেশটির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের জন্য লড়াই করছে।

ইতিপূর্বে সেনাবাহিনীর নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার ছিল ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর মানুষেরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার সম্প্রদায় এই সংঘর্ষে যুক্ত ছিল না। ২০২১ সালে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহনের পর সংখ্যাগুরু ভামার জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সংখ্যালঘু জনগণের বিরুদ্ধে যে সংঘাত চলছে তা মিয়ানমারের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি। বর্তমানে মিয়ানমারের জনগণ সেনাবাহিনী রচিত সংবিধানে ফিরে যেতে চাচ্ছে না। ফলে তারা সারা দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন করতে শুরু করে। এই বিক্ষোভে যুক্ত হয়  তরুণ জনগোষ্ঠী এবং গণতান্ত্রিক সরকারের কর্মীরা। সাধারণ জনগণের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁরা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলন বেগবান ও সংগঠিত করে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশের ভেতর তিনটি সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। এগুলো হলো- এ এ,  ওয়া আর্মি ও কাচিন ইনডিপেন্ডেন্ট আর্মি। এই তিন সশস্ত্র সংগঠন  'নর্দান অ্যালায়েন্স' নামে পরিচিত ছিল, বর্তমানে নর্দান অ্যালায়েন্স নাম বদলে 'ফ্রেন্ডশিপ অ্যালায়েন্স'  হয়েছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি দমনে নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার শুরুর পর গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন শক্তিও নিজেদের মধ্যে সংগঠিত হওয়া শুরু করে। নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষে রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং ওয়া রাজ্যের ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির শীর্ষ নেতারা সাক্ষাৎ করেছেন। বর্তমানে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।

২০১৭ সালের পর প্রায় দুই বছর এ এ’র সাথে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলে। ২০১৯ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এ এ’র সাথে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ বিরতি বজায় রেখেছিল।২০২১ সালে সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর রাখাইন প্রদেশে আপাত শান্তি বিরাজ করছিল। যুদ্ধ বিরতি কালে সীমান্ত এলাকায় এ এ শক্তি সঞ্চয় করে এবং রাখাইনে তাঁদের অবস্থান সুসংহত করে। সম্প্রতি এ এ’র সদস্যরা সীমান্তের কাছে মিয়ানমার আর্মির কয়েকটা অবস্থানের ওপর আক্রমণ করে এবং এরপর সামরিক বাহিনীর সাথে তাঁদের লড়াই শুরু হয়। এ এ’র বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আক্রমন শুরু হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী ওয়া আর্মি ও কাচিন আর্মি এ এ কে সহযোগিতা করে। মিয়ানমার সশস্ত্রবাহিনী এবং এ এ’র মধ্যে মংডু, বুথিডং, রাথিডং, ম্রাউক-উ এবং পালেতোয়া এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলছে। দেশটিতে চলমান সহিংসায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনগণের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে ।

সশস্ত্র প্রতিরোধ মোকাবেলায় সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সামরিক বাহিনীকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানা যায় যে,  মিয়ানমারের কেবল ১৭ শতাংশ এলাকা সামরিক বাহিনীর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হয় প্রতিযোগিতা চলছে, নয়তো তা জান্তাবিরোধীদের দখলে। অভ্যুত্থানের পর থেকে মোট সাতটি অঞ্চলে- কাচিন, কায়াহ, কায়িন, চিন, রাখাইন এবং দেশের মধ্যাঞ্চলের রাজ্য ম্যাগুয়ে এবং সাগাইং অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সাথে সশস্ত্র দলগুলোর ব্যাপক সংঘর্ষ হচ্ছে। চিন প্রদেশ থেকে মিজোরামে প্রায় প্রতিদিন শরণার্থী আসছে এবং এর মধ্যে চিন ও আরাকানের প্রায় ৩০ হাজার শরণার্থী সেখানে আছে বলে অনুমান করা হয়। সাগাইং অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলার পর সেখানকার পাঁচটি গ্রামের কয়েক শত বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

এসব রাজ্যের মধ্যে চিন, কায়াহ, ম্যাগুয়ে এবং সাগাইং রাজ্যে কোনো সংঘাত ছিল না।  বর্তমানে এসব অঞ্চলেও সেনাবাহিনী বিরোধীদের দমন করতে ব্যাপক শক্তি ব্যবহার করছে। মিয়ানমারের কোনো কোনো অঞ্চলে একাধিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হচ্ছে সামরিক জান্তাকে। এই মুহূর্তে চারটি রাজ্যে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাত তীব্র রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে রাখাইন অন্যতম, এবং এই সহিংসতার ছোঁয়া এসে লেগেছে বাংলাদেশেও।  বাংলাদেশের ঘুমধুম ও উখিয়া সীমান্ত এলাকায় অব্যাহত গোলাগুলির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে গোলা পড়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কয়েকবার সতর্ক করেছে।

বর্তমানে উত্তর রাখাইন রাজ্য, চিন রাজ্য, শান ও কাচিন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা ভারী অস্ত্র ও ট্যাংকের সহায়তায় অনেকগুলো শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তারা সেখানকার একাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি যেসব জায়গাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আক্রমন চালাচ্ছে সেখানকার বেশির ভাগ মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে এই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যের সংখ্যাই বেশি। ভামারদের মধ্যে থেকে বিদ্রোহী তৎপরতা শুরু হওয়ায় এটা বোঝা যাচ্ছে যে সামরিক সরকারের প্রতি তাদের মনোভাব বদলে যাচ্ছে। সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের শীর্ষ সাতটি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর নেতারা ওয়া রাজ্যের পাংসাংয়ে বৈঠকে বসার সিধান্ত নিয়েছে। ধারণা করা হয় এসব গোষ্ঠীগুলোর প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য রয়েছে। নিজেদের মধ্যে একতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তাঁরা একত্রে বসে আরও সংগঠিত ভাবে কিভাবে আক্রমন পরিচালনা এবং নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার গোত্রের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ও নিয়ন্ত্রিত। এত দিন সেনাবাহিনীকে ভামার অধ্যুষিত মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে কোন সংঘাতে জড়াতে হয়নি। দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি এখন মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ৬ দশক ধরে চলমান এই সংঘাতে এ পর্যন্ত অর্জন প্রায় নেই বললেই চলে। লাভের মধ্যে আছে হত্যা, রক্তপাত, সংঘর্ষ, ঘৃণা, বাস্তুচ্যুতি ও বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী, যা কখনও কাম্য নয়। এই সহিংসতা বন্ধে সবাইকে একতাবদ্ধ হতে হবে। মিয়ানমারের জনগণের মধ্যে বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই সংগঠনগুলো সামরিক সরকারে বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাঁদের একছত্র ক্ষমতা চালেঞ্জের মুখে পড়বে। কট্টর বৌদ্ধ সংগঠনগুলো অনেকবছর ধরে সামরিক শাসকদেরকে সমর্থন দিয়ে আসছিল এবং অন্যান্য ধর্মের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর দমন পীড়নের বিষয়ে নীরব ছিল। মিয়ানমারের জাতিগুষ্ঠির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান ফিরিয়ে আনতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে।

আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে এখন দেশের অভ্যন্তরে চলমান সহিংসতা বন্ধ করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত দেশের আভ্যন্তরীণ সংঘাত বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোকে ও এগিয়ে আসতে হবে। মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটে গেলে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মানবিক সমস্যা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গতি ফিরবে বলে আশা করা যায়। তাই মিয়ানমারের উচিত বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংঘাত পরিহার করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর সাথে সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

;

ধরে রাখতে হবে এ জাগরণ



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আগে ফুটবলার সানজিদা আখতারের একটা ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসের প্রসঙ্গ এসেছিল। আক্ষেপ কিংবা বাস্তবতা যা-ই থাকুক না কেন সামাজিক মাধ্যম লুফে নিয়েছিল সে পথ, সংবর্ধনার বিপুল আয়োজনের পথ রচনা হয়েছিল ওখানে। সামাজিক মাধ্যমের সেই তোলপাড় পৌঁছেছিল গণমাধ্যম হয়ে সরকারের উচ্চ মহলে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল সানজিদার ইঙ্গিতবহ আকুতি কিংবা স্বপ্ন আর সামাজিক মাধ্যমের ঝড়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ব্যবস্থা করেছিলেন একটা ছাদখোলা বাসের।

রাজধানীতে আমাদের ছাদখোলা বাস ছিল না। ছাদসহ বাসকে ছাদখোলা বাসে রূপান্তরের ব্যবস্থা হয়েছে বিদ্যুৎ গতিতে। সরকারি পর্যায়ের সেই কর্মোদ্যম আমাদেরকে নাড়া দিয়েছিল, পুরো দেশে আলোড়ন তুলেছিল। সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ফুটবলাররা তুমুল সংবর্ধনা পেয়েছেন রাষ্ট্রের। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে করে বিমানবন্দর থেকে বিজয়ীরা এসেছেন মতিঝিলের বাফুফে ভবনে। সেখানে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ছিলেন, প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, সচিব ছিলেন; ছিলেন আরও অনেকেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঢাকাবাসী বিজয়ী ফুটবলারদের তুমুলভাবে গ্রহণ করেছে। দিনভর অপেক্ষায় থেকেছে লক্ষ লোক, পথে পথে ছড়ানো হয়েছে ফুল, হয়েছে মিষ্টি বিতরণ। এ অভূতপূর্ব জাগরণ এক, নবজন্ম যেন ফুটবলের!

ফুটবল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। আমাদের জাতীয় ফুটবল দল আন্তর্জাতিক ম্যাচ খুব বেশি খেলে না, খেললেও সাফল্য পায় না। কিন্তু যখনই ফুটবলের কোন অর্জন হয়েছে তখনই বিপুল জাগরণ হয়েছে দেশে। নিজেদের দেশের খেলা ছাড়াও এখনও রাত জেগে মানুষ ইউরোপীয় বিভিন্ন লিগের খেলা দেখে, আর বিশ্বকাপ ফুটবল এলে তো কথাই নেই-পুরো দেশ বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তির পুরোভাগে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ঠিক, তবে অন্য কিছু দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থকও আছে দেশে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়ে সারাদেশ ছেয়ে ভিনদেশের পতাকায়। পছন্দের দেশের ফুটবল দলের জয়ে উল্লাস করে, হারে ব্যথিত হয়; আবার বিভক্তিতে ঝগড়াফ্যাসাদেও জড়ায়। মানুষের শিরায়-শিরায় যে ফুটবল সেটা বিশ্বকাপ এলে টের পাওয়া যায়। গল্পটা যদিও ভিনদেশের ফুটবলকেন্দ্রিক, তবে এটা যে মানুষের আনন্দের অনুষঙ্গ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাতীয় দলের ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য না পাওয়ায় আমাদের মাঝে হতাশা আছে, ফুটবল সংগঠকদের প্রতি খেদ আছে। তাদের ব্যর্থতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বাদ-প্রতিবাদও আছে। তবে যখনই উপলক্ষ হয়েছে আনন্দের তখন সবাই বরণ করতে চেয়েছে ফুটবলারদের। সদ্যসমাপ্ত সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপে ফুটবলাররা যখন শিরোপা জিতেছে তখন অন্তর্গত সেই উল্লাসে প্রকাশিত হয়েছে ফের। তৃতীয় পক্ষ হয়ে উল্লাস করে আসা আমরা এবার নিজেদের অর্জন নিয়েই আনন্দ করেছি, করছি। যদিও এটা বৈশ্বিক এমনকি এশিয়ারও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নয়, আঞ্চলিক একটা টুর্নামেন্টের শিরোপা; তবুও। ফাইনাল জেতার আগ থেকে শুরু হয়েছে আলোচনা, ফাইনাল জিতে হয়েছে তার বড়সড় প্রকাশ। এই কিছুদিন সামাজিক মাধ্যমে একটাই আলোচনা ছিল; ফুটবল এবং ফুটবল!

আমাদের কৃষ্ণা-সানজিদা-রূপনা চাকমারা যে পরিবেশে বেড়ে ওঠছে সেখানে পদে-পদে মৌলবাদের চোখ রাঙানি, ভয় আর অপবাদ। নারীর পোশাক নিয়ে যখন খোদ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা অঙ্গনে একশ্রেণির লোক ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে যায়, তখন প্রান্তিক এই মেয়েরা ও তাদের পরিবার কী অবস্থার মধ্যে তা ভাবা যায়? তার ওপর আছে অনেকের আর্থিক দৈন্য। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া লোকজন সামাজিকভাবেই পিছিয়ে থাকে, এ চিত্র অজানা নয় আমাদের। সেই অবস্থা থেকে ওঠে আসা আমাদের মেয়েরা দেশে খেলতে এবং বিদেশে সাফল্য পেতে কী পরিমাণ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে তা কেবল তারাই জানে। তারা একেকজন একেক সংগ্রামী। আর সে সংগ্রামের পথ ধরে তারা রচনা করেছে সাফল্যের সিঁড়ি।

শিরোপাজয়ী আমাদের ফুটবলারদের নিয়ে আমরা গর্ব করছি। প্রতিক্রিয়াশীলদের ধারাবাহিক চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বলছি, এটা আঞ্চলিক এক ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জয়ই কেবল নয়, এটা মানুষের মানুষ হিসেবে প্রকাশের বার্তা। আমরা বলছি, সামাজিক মাধ্যম, গণমাধ্যমসহ নানা জায়গায় এই বার্তা দিতে চেষ্টা করছি, কিন্তু তাদের যে সংগ্রাম সেটা তাদেরকেই করতে হয়। উদযাপন শেষে আমরা প্রত্যেকেই নিজস্ব পরিমণ্ডলে ফিরব, তারাও ফিরবে তাদের জায়গায়। সে সময় যদি ফিরে যায় পূর্বতন সময়ে, তখন কী হবে? এখানে দায়িত্ব নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। উদযাপন পর্ব শেষে এটাও যেন আমাদের মোহমুক্তির আরেক অনুষঙ্গ না হয়। বাসে ওঠলে কেউ যেন তাদের লাঞ্ছিত না করে, কেউ যেন টিপ্পনী না কাটে ফুটবলারদের।

একটা টুর্নামেন্টে জেতা নারী ফুটবলারদের নিয়ে সমাজে বিরাজমান সকল অপ-ধারার বিলোপ হয়ে যাবে এমনটা ভাবছি না। সম্ভবও না। তবে শুরুটা হতে পারে। টিপ্পনী কাটা, পোশাক নিয়ে কটু মন্তব্য ও খেলাধুলা নিয়ে সামাজিক যে সমস্যা তার সমাধানের পথে এই বিজয় অনুঘটক হতে পারে। নারীদের অবরোধবাসিনী করে রাখার যে ধারা সেটা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার আরেক উপলক্ষ হতে পারে। যদিও কঠিন, তবু শুরু তো হতেই পারে।

বিজয়ী ফুটবলাররা নারী, অনেকের আর্থিক দৈন্য রয়েছে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আর্থিক সমস্যাও রয়েছে; সবকিছু আমলে নিতে হবে। প্রথমে নারী ফুটবলারদের সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে। পুরুষ ও নারী ফুটবলারদের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে তার সন্তোষজনক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। যখন নারী ফুটবলার কিংবা ক্রিকেটাররাও পুরুষদের মতো সমান কিংবা সম্মানজনক পর্যায়ের বেতন-ভাতা পেতে শুরু করবে তখন আর্থিক বৈষম্য কমার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও কমতে শুরু করবে। অনেক নারী ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্য খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠবে। আর যখন বিপুল সংখ্যক নারী খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে তখন সামাজিক বৈষম্যও ক্রমে কমতে শুরু করবে, সমাজে সম-অধিকারের বার্তা প্রতিষ্ঠা হবে।

সাফ উইমেন চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ফুটবলাররা দেশে এক জাগরণের সৃষ্টি করেছেন। এই জাগরণ ধরে রাখতে হবে। সানজিদা-কৃষ্ণা-রূপনারা জাগরণের ঢেউ তুলেছেন, এই ঢেউ স্তিমিত যেন না হয়!

;

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষের গুরুত্ব



ড.মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এটি আমাদের ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, প্লাবনভূমি, উচ্চ দারিদ্রের হার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অত্যাধিক নির্ভরতার কারণে।

এটি এখন ক্রমাগত দৃশ্যমান যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসাথে খাদ্য উৎপাদনশীলতা এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও পরিবেশগত বিপর্যয় ও দ্বন্দ্ব–সংঘাত বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অভিবাসন বাড়ছে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ-ব্যাধি বাড়ছে। আমরা ইতোমধ্যে করোনা মহামারীর মত সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলা করছি। এছাড়াও ডেঙ্গু. ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং কলেরার মতো অসুখও ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যাদি ঘটনা আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছি।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে অন্য কোনো দেশ এর প্রভাব ভালো জানে না, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া বা আকস্মিক, মারাত্মক বিপর্যয়মূলক বন্যা হওয়া এবং তাপমাত্রার তীব্রতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ক্ষয়, ঘূর্ণিঝড়, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, কৃষি জমি সঙ্কুচিত হওয়া এবং স্থানীয় অভিবাসনের মতো নির্মম প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি জমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে, আগামীতে পরিবেশগত উদ্বাস্তু ক্রমেই বাড়বে।

সুতরাং পরিবেশগত এই বিপর্যয়ের মুখে আমাদের ভবিষ্যত পরিবেশগত, প্রতিবেশগত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে গ্রামীণ এবং শহর অঞ্চলে বেশি করে গাছ লাগানোর জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।

বলা হয়ে থাকে প্রতিটি জীব কোন না কোন উপায়ে গাছের উপর নির্ভর করে। গাছপালা এবং বনের অভাব আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা যে ক্রমবর্ধমান জনাকীর্ণ কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি তার পরিপ্রেক্ষিতে, আরও গাছ লাগানো অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে, এবং এটি আমাদের অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচও বাঁচাতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছ $৩১,৫০০ মূল্যের অক্সিজেন তৈরি করতে পারে, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য $৬২,০০০ সাশ্রয় করতে পারে, $৩৭,৫০০ মূল্যের পানির পুনর্ব্যবহার করতে পারে এবং $৩১,৫০০ মূল্যের মাটির ক্ষয় রোধ করতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৭৪% বনভূমির অবদান।

গাছ সেচ ও পানিবাহী কাঠামো রক্ষা করে এবং নদী ও বন্দরকে চলাচলের উপযোগী রাখে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের অবদান অপরিসীম। বনায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন ব্যবস্থা, এবং সভ্যতার শুরু থেকেই বন সম্পদের একাধিক ব্যবহার স্বীকৃত।

গাছ একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসাবে কাজ করে, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। তারা খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি বনে আশ্রয় খুঁজতে থাকা বন্যপ্রাণীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করে।

গাছ বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং বায়ু দূষণকারী পদার্থকে সরিয়ে দেয়, যার মধ্যে সালফার ডাই অক্সাইড, ওজোন এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড রয়েছে। বিনিময়ে, তারা আমাদের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়। এমনকি জীববৈচিত্র্যও পালাক্রমে সমৃদ্ধ হয়।

গাছ সূর্য, বাতাস এবং বৃষ্টির প্রভাবকে পরিমিত করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ ছায়া প্রদান করে গ্রীষ্মের তাপমাত্রাকে প্রশমিত করে এবং শীতকালে বাড়ির জন্য উষ্ণনায়ন হিসাবে কাজ করে। গাছ মাটির ক্ষয় কমায় এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সাহায্য করে এবং সমৃদ্ধ মাটি খাদ্যে পুষ্টি তৈরি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যে অবদান রাখে।

গাছের সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্যে রঙ যোগ করে এবং এর সৌন্দর্য বাড়ায়। বাড়ির চারপাশে লাগানো গাছ এবং গুল্মগুলি বাষ্পীভবন শীতল করার সুবিধা প্রদান করে এবং এটি চমৎকার শব্দ শোষণকারী। ফলজ গাছ বিভিন্ন প্রকার ফল দিয়ে আমাদের খাদ্যের অভাব পূরণ করে।

বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমানো যায়। গাছ লাগানোর ফলে বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা হয় এবং গাছ বৃষ্টির পানিকে মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত না করে মাটিতে প্রবেশ করতে দিয়ে বন্যার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।

নতুন গাছ লাগিয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদাও মেটানো যায়। বন এবং গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানির প্রবাহকে ধীর করে দেয়, যার ফলে এটি ফিল্টার হয়। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ স্টোরেজ ট্যাঙ্ক বা জলাশয়ে সংরক্ষণ করে আমরা নিরাপদ পানির ব্যবহার বাড়াতে পারি।

এছাড়াও, গাছ সমুদ্রের নোনা জলের সাথে বিশুদ্ধ পানির মিশ্রিত হতে বাধা দেয়। বাংলাদেশে, স্থানীয় জনসংখ্যার বনজ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে এবং পরিবেশগত ও জলবায়ুগত অবক্ষয় রোধ করতে তৃণমূল পর্যায়ে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি চালু শক্তিশালী করতে হবে।

এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মাটি ও পানির সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি এবং আমাদের জনসংখ্যার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারি। বিশেষ করে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করতে পারে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বেশি করে বৃক্ষ রোপণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

স্বপ্ন দেখতে অন্যের সহায়তা প্রয়োজন



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত পচিশ বছর বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশনে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে বাস্তবিক চিত্র কোনোভাবেই সুখকর নয়। ৮ থেকে ৯টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স শুরু থেকেই ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক দাবিই অপূর্ণ ছিলো।

অনেক দাবির মধ্যে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের জন্য হ্যাঙ্গার সুবিধা ছিলো অন্যতম। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর পর রেগুলেটরি অথরিটি সিভিল এভিয়েশন সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে পরিশেষে গুরুত্বারোপ করে এয়ারক্রাফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্সগুলোকে হ্যাঙ্গার সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বিগত দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোও হ্যাঙ্গার প্রাপ্তির জন্য বহুবার তাগাদা দিয়েছে কিন্তু দাবী পূরণ হওয়ার পূর্বেই সেই এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ। এই চার্জের মধ্যে সাধারণত ল্যান্ডিং, পার্কিং, রুট নেভিগেশন, সিকিউরিটি অন্যতম। ব্যবসায়িক গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো সিভিল এভিয়েশনের কাছে সবসময়ই চার্জ কমানোর জন্য যৌক্তিক দাবি তুলে আসছে। এইসব চার্জের কারনে সরাসরি অপারেশন খরচ বেড়ে যায়, যা যাত্রী ভাড়ার উপর প্রভাব পড়ে। যাত্রী ভাড়াকে সহনীয় রাখার জন্য চার্জ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

দেশীয় এয়ারলাইন্স এর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা চার্জ সমহারে নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে। বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রায় নয় থেকে দশ শতাংশ বেশী, যা একটি দেশীয় এয়ারলাইন্স কখনো প্রত্যাশা করে না।

সঠিক সময়ে চার্জ প্রদান না করতে পারলে মাসে ৬ শতাংশ হারে বাৎসরিক ৭২ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান করতে হয়। যা পার্শ্ববর্তী যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশী। সারচার্জ ১২ শতাংশ হারে নির্ধারণ করার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সে দাবি পূরণ না করার কারনে এয়ারলাইন্সগুলো চার্জ ও সারচার্জ বকেয়া রেখেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অধিক হারে চার্জ নির্ধারণ সময়মতো চার্জ প্রদান না করার প্রধান কারণ বলেই মনে হয়ে্ছে।

বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্স বিশেষ করে বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলো আর জাতীয় বিমান সংস্থার কাছ থেকে চার্জ আর সারচার্জ মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের। যৌক্তিক হারে চার্জ ও সারচার্জ নির্ধারণ করলে সিভিল এভিয়েশনকে বিশাল অংকের টাকার হিসাব বহন করতে হতো না।

বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্স জিএমজি, ইউনাইটেড ও রিজেন্ট এর কাছে প্রায় হাজার কোটি টাকার হিসাব আছে বকেয়া হিসাবে, যা আদৌ কোনোদিন আদায় করার কোনো সুযোগ আসবে কিনা সন্দেহ আছে। এছাড়া স্বল্প সময়ে অপারেশনে থাকলেও এ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবাত, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ এর কাছেও বকেয়া হিসেবে পাওনা আছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। যা অনেকটা ”জনম বাকী” হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এছাড়া অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স এর কাছেও বিভিন্ন চার্জ বাবদ পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের।

নন- এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ বিমানবন্দরের ভিতরে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন জায়গা ভাড়া নেয়ার সুযোগ আছে। ব্যবসা হোক কিংবা না হোক বছরান্তে ভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা যায় কর্তৃপক্ষের। নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখলে এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার জন্য সহজ হবে।

সময়কে বিবেচনা না করে অনেক সময়ই বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ করতে দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ কোভিড কালীন সময়ে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাত বিশ্বব্যাপী চরমভাবে বিপর্যস্ত ছিলো, বিভিন্ন দেশ যেখানে এখাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য যারপর নাই চেষ্টা করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এভিয়েশনে এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ও সিকিউরিটি খাতে নতুন করে চার্জ আরোপ করেছে। যা সময়ের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। কারন এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্টও যেমন দরকার তেমনি সিকিউরিটিও প্রয়োজন কিন্তু চার্জ আরোপের ক্ষেত্রে সময়কে বিবেচনায় রাখা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যাকে একনামে বিপিসি হিসেবে খুবই পরিচিত। সেবা ধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিপিসির কার্যক্রম দেখলে মনে হয় যেন মনোপলিস্টিক বিজনেস-ই লক্ষ্য। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে দেশের এভিয়েশন খাতকে বিবেচনায় না রেখে লাভ-ক্ষতির হিসেবকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। জেট ফুয়েলের উচ্চ মূল্য বাংলাদেশ এভিয়েশনের অস্থিরতার পিছনে মূখ্য ভূমিকা রাখছে। কারন হিসেবে যেকোনো রুটের অপারেশনাল খরচের প্রায় ৫০ শতাংশই হচ্ছে জেট ফুয়েলের খরচ। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন না করলে বাংলাদেশের এভিয়েশন কখনই বিদেশি এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মূল্য নির্ধারনে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। কোভিড কালীন ও কোভিড পরবর্তীতে বিদ্যূত গতিতে পূর্বের ক্ষতিকে কাটিয়ে উঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলো বিপিসি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের মূল্য কমলেও কচ্ছপ গতিতে লিটার প্রতি জেট ফুয়েলের মূল্য কমানোর হার দেখা যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাতে গ্রীষ্মকালীন সূচিতে যাত্রী বৃদ্ধির হার থাকে নিম্নমূখী, সেই সঙ্গে দেশে মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রী হ্রাস পাওয়ায় বরিশাল ও যশোর রুটে ফ্লাইট সংখ্যার সাথে যাত্রী ভাড়া কমিয়ে সেবার মান ঠিক রাখার চেষ্টা করছে এয়ারলাইন্সগুলো।

দেশের আকাশ পথের গতিশীলতা বজায় রাখতে দেশের অভ্যন্তরে বন্ধ হওয়া বিমানবন্দরগুলোকে পুনরায় চালু রাখলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার সুযোগ পাবে। সাথে সারাদেশকেই আকাশ পথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।

নানারকম সুযোগপ্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকা জাতীয় বিমানসংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর সাথে বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবী শুরু থেকেই। জ্বালানি তেল প্রাপ্তিতে কিংবা সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পাওনা পরিশোধে ”এক্সট্রা খাতির” বরাবরই দেখা যায়। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা না পরিশোধ করেই প্রায়ই লাভের হিসাব দেখা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

দেশের এভিয়েশনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি কিংবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর দ্বি-নীতি পরিহার করলে ভবিষ্যতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো সুসংহত হবে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর বন্ধ হওয়ার মিছিলের লাগাম টেনে ধরে এগিয়ে যাওয়ার মিছিল শক্তিশালী হবে।

বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই আকাশ পরিবহনের ব্যবসায় টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সেবা মূলক ও নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার ওপর।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;