আমার দহনের কথা



লতিফা নিলুফার পাপড়ি
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। এই শিক্ষকতা নিয়ে প্রায়ই অন্তদহনে পুড়ি। অনেকেই প্রশ্ন করবেন কেনো পুড়ি? পুড়ি এই কারণে আমি আমার দায়িত্ব ঠিক মতো পলন করি না কিংবা পালন করতে পারছি না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো তাদের আগের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে না। কেনো পারছে না; তা নিয়েই আমার এই লেখা। না, লেখার কলেবর এক্কেবারেই বাড়াবো না। আমার দহনের কথা খুব সংক্ষেপেই তুলে ধরছি।

আমার ক'দিন ধরে মনে হচ্ছিল দেড়বছরের মতো গেলো তো কোভিড-১৯ কালের ছুটি। শিশুরা একেবারেই লেখাপড়ার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে এর আগেও কি খুব একটা ভালো ছিলাম? আমার তো মনে হয়, না।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিয়েছে সুসজ্জিত একাডেমিক ভবন। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো করে দিচ্ছে বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, পাঠ পরিকল্পনা, নিয়মিত বিদ্যালয় মেরামত, শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণ এবং শিক্ষা উপকরণ কেনার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দও রয়েছে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকও রয়েছেন। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা তেমন জোড়ালো নয়। আর এটাই আমার অন্তদহনের কারণ।

আমি এই কথাটা অকপটে স্বীকার করি। অবশ্যই সবাই (সকল শিক্ষক) একরকম নন। আমাদের রয়েছে  অনেক অনেক দক্ষ  শিক্ষক। তবে বিরাট অংশ পেশার প্রতি মোটেই আন্তরিক নন।

এটাও সত্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা সন্তানদের পাঠাচ্ছেন তার মধ্যে বেশির ভাগ অভিভাবকই অস্বচ্ছল। কেউ কেউ আবার অসচেতন। বিদ্যালয়ই এসব অসচেতন অভিভাবকদের শিশুর একমাত্র নির্ভরশীলতার স্থান। অথচ শিক্ষাকতা এখন এক ধরনের ‘শো অফ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে যত বেশি চাটুকারি আর তৈলমর্দন করতে পারে সে-ই সেরা শিক্ষক।

কত কত শিক্ষক দেখি স্কুল কামাই করে শহরের  বিভিন্ন  সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, বিভিন্ন অফিসে আড্ডা দেয়া, বিয়ে-শাদী, দাওয়াত রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে নিজের ব্যবসাও দেখভাল করেন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে কেজি স্কুলের ছাত্র পড়াতে চলে যান। কিছু কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজেদের বিদ্যালয়ের ফলাফল ভালো দেখানোর জন্য কেজি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নাম-হাজিরা খাতায় তুলে রাখেন। একসময় দেখতাম কেজি স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীদের এনে তাদের বিদ্যালয়ের হয়ে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষাও দেওয়াচ্ছেন। আমরা শিক্ষকরা কতটা নীচ হলে এমন করতে পারি! এখন অবশ্য এমনটা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। এখন সমাপনী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণকারীদের নাম আগেই তালিকাভুক্ত করতে হয়।

আসলে সঠিক জবাবদিহি নেই সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ কারণে পাঠদানে আগ্রহী নন শিক্ষকরা। একই সঙ্গে সরকারি চাকরি খোয়াবার ভয় না থাকায় নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি থাকার তাড়া নেই তাদের মধ্যে। অফিসার কতটুকুই আর ব্যবস্থা নিতে পারেন। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কিংবা ফাঁকিবাজ, দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে দেখা যাবে অভিযুক্তদের হাত অনেক লম্বা। অনেক ক্ষমতাশালীরা সেই ফাঁকিবাজ দূর্নীতিবাজের পক্ষে তদবিরে লেগে যান।

আমি পূর্বে একটি স্কুলে কর্মরত থাকা কালে এক শিক্ষককে দেখতাম সকালে (আমি যখন স্কুলে যাচ্ছি) তার পারিবারিক দোকানে বসে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন, ফেরার পথেও দেখতাম একই অবস্থায়। এই কোভিডকালে স্কুল খোলার পর সেদিন আমার বিদ্যালয়ের একটি কাজে আমাদের বিভাগীয় অফিসে যাবার সময় সেই শিক্ষককে দেখলাম সেই আগের মতোই তার দোকানে বসে আছেন!

আসলে অবস্থার পরিবর্তন খুব একটা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান দিন দিন আরো কমে যাচ্ছে। তাছাড়া, পাঠদান নিয়মিত দেখভাল না করায় শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদানে উদাসীন হয়ে পড়ছে। তবে এটাও ঠিক নিজে থেকে যদি আন্তরিকতা না আসে, কোন তদারকিতে কাজ হয়না। অনেক শিক্ষককে দেখি পাঠদানে মনযোগী না হয়ে, ক্লাসে গিয়ে কেবল উঁকিঝুঁকি করেন, কোন অফিসার আসল কিনা। আর মোবাইলে মনোযোগের কথা সেটা কি যে বলবো! ফাঁকিবাজরা ছটফট করে কি ভাবে তড়িঘড়ি করে ক্লাসের সময় কাটিয়ে শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করবে।

অনেকেই আছেন সময়মতো বিদ্যালয়ে আসেন, আবার সময়মতো আসেন সময়মতো বিদ্যালয় ত্যাগ করেন; তবে কোন গুণগত সময় বিদ্যালয়কে দেন না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা এইসব শিক্ষকদের কাছে থেকে কিছুই অর্জন করতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে অর্থ ব্যয় করে হলেও সচ্ছল মা-বাবারা সন্তানদের কেজি স্কুলে পাঠান।

সবচেয়ে লজ্জার বিষয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ খোদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের সন্তানকে কেজি স্কুলে পাঠাচ্ছেন। শহরে তো পাড়ায় পাড়ায় কেজি স্কুল আছেনই, এখন গ্রামেও কেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো কোনো গ্রামে একাধিক কেজি স্কুল রয়েছে। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন ‘গরিবের সন্তানদের স্কুলে’ পরিণত হয়েছে। যাদের নিয়ে আমরা মরন খেলায় মেতে উঠেছি। অযোগ্য শিক্ষকরা শ্রেষ্ঠত্বের পদক গলায় পরি।

মনিটরিং করে একজন শিক্ষককে বদলি করার সুপারিশ করা গেলেও তাকে দক্ষ করার সুযোগ নেই। এছাড়া সরকারি চাকরি একবার হয়ে গেলে তা হারানোর কোনো ভয় তাদের মধ্যে থাকে না। কেজি স্কুলে চাকরি হারানোর ভয় থাকায় শিক্ষকরা বেশ আন্তরিক থাকেন। প্রাথমিক শিক্ষার মান ফেরাতে, শিক্ষকদের দক্ষ করতে  ফাঁকিবাজদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করা প্রয়োজন।

সর্বোপরি সরকারি শিক্ষকরা আন্তরিক না হলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে শিক্ষকদের আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করতে হবে।

যদিও সারা দেশের সকল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এমন কি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোও) একই চিত্র, তবে আমি আমার ডিপার্টমেন্টের কথা বললাম।

লতিফা নিলুফার পাপড়ি: শিক্ষক, কবি, গল্পকার কলামলেখক।