শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তর



ড. মাহফুজ পারভেজ
শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তর

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তর

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ২৫ বছরের কালপর্ব স্পর্শ করবে। শান্তিচুক্তি পাহাড়ে দুই দশকের অধিককালের ভ্রাতৃঘাতী জাতিগত সংঘাত ও রক্তপাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের নবদিগন্ত সূচিত করেছে। সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাস্তাঘাট, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের নিরিখে পশ্চাৎপদ পার্বত্যাঞ্চল শান্তিচুক্তির ফলে চলে এসেছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সামনের কাতারে।

যেকোনও গবেষণা ও মূল্যায়নে শান্তিচুক্তির ইতিবাচক প্রভাব পার্বত্য-উপজাতি এবং পার্বত্য-বাঙালির সমাজজীবনে তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ মানবিক অধিকারের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলো গতিশীল হয়েছে। যদিও পাহাড়ে উগ্র-জাতিগত আঞ্চলিকতাবাদী কতিপয় নেতৃত্ব ও কয়েকটি সন্ত্রাসীদের সংগঠন শান্তির বিরুদ্ধে সরব এবং পার্বত্য-বাঙালি জনগোষ্ঠী সমঅধিকারের দাবিতে সোচ্চার, তথাপি মোটের উপর সেখানে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে।

গবেষণার তথ্যে শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে। সাধারণভাবে একটি ঢালাও প্রোপাগান্ডা করা হয় যে, 'পাহাড়ে ইসলামীকরণ' করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব্য তথ্যে এই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা, উদ্দেশ্যমূলক ও অবাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে উস্কানিমূলক এমন প্রচারণার সঙ্গে পার্বত্যাঞ্চলের প্রকৃত চিত্রে বিন্দুমাত্র মিল নেই। বরং বিদ্যমান বাস্তবতা ও তথ্যের আলোকে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তরের ভিন্ন চিত্রই দেখা যায়, যা পাহাড়ে বসবাসকারী উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের বিষয়।

সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পার্বত্যাঞ্চলে শান্তিচুক্তির আগে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সময়কালে মুসলমানদের মসজিদ ছিল ৭৫৬টি। হিন্দুদের মন্দির ছিল ২৭০টি। বৌদ্ধদের কিয়াং ছিল ১১১৯টি এবং খ্রিস্টানদের গির্জা ছিল ২৭৪টি।

কিন্তু শান্তিচুক্তির পর ২৫ বছরে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তথ্য-পরিসংখ্যানগত বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যেমন মসজিদ নির্মিত হয়েছে ৬৭৫টি, মন্দির ১৭৬টি, কিয়াং ৫৪১টি এবং গির্জা ৪৪০টি।

এসব তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বর্তমানে পার্বত্যাঞ্চলে সর্বমোট মসজিদর সংখ্যা ১৪৩৪টি, মন্দির ৪৪৬টি, কিয়াং ১৬৬০টি এবং গির্জা রয়েছে ৭১৪টি। অর্থাৎ, শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে মসজিদ, মন্দির, কিয়াং মোটামুটিভাবে সংখ্যাগত দিক থেকে দ্বিগুণ হলেও গির্জার বৃদ্ধি হয়েছে চারগুণ। স্পষ্টই, গির্জার সংখ্যা বৃদ্ধির হার পার্বত্যাঞ্চলে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির তথ্যকে প্রমাণ করে, যা সেখানে 'ইসলামীকরণ'-এর প্রচারণাকে মিথ্যা এবং 'খ্রিষ্টানকরণ'-এর তথ্যকে সত্য বলে প্রতিপন্ন করে। 

গবেষণাকালে আরও জানা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের চাকমা, মারমা, বম, খুমি ও চাক এবং হিন্দু ত্রিপুরাদের অনেকেই স্বধর্ম ছেড়ে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন। যে কারণে তাদের জন্য অধিক ধর্মস্থান তথা গির্জার প্রয়োজন হচ্ছে এবং সেগুলো তৈরি করাও হচ্ছে। একটি তথ্যানুযায়ী, শান্তিচুক্তির পর ১৯৯৮ সাল হতে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৩৪৪ জন খ্রিস্টান হয়েছে বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্ম হতে। অপর দিকে মাত্র ৪৫০ জন হয়েছে মুসলিম। হিন্দু হয়েছে ৭৬ জন। যে তথ্যটি দৈনিক জনকন্ঠ ২৪শে এপ্রিল ২০২১ সালে প্রকাশ করে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পার্বত্যাঞ্চলে ব্যাপক হারে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার তথ্য আদমশুমারি থেকেও প্রমাণিত হয়। উল্লেখ্য, গত ৩০ বছরে অর্থাৎ ১৯৯১ সাল হতে ২০১১ সাল পর্যন্ত সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান ধর্মান্তকরণের হার সর্বাধিক। খ্রিস্টান মিশনারি, খ্রিস্টান চ্যারিটি, এনজিও'র সংখ্যা ও তৎপরতা সবচেয়ে বেশি।

শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি পার্বত্য-উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যেই নয় বাংলাদেশের অন্যত্র বসবাসকারী সমতল-উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যেও খ্রিস্টানকরণ অব্যাহত গতিতে চলছে। গারো, সাঁওতাল, হাজং, মুন্ডা, মনিপুরী ইত্যাদি উপজাতি গোষ্ঠীতে বর্তমানে খ্রিস্টান প্রধান ধর্ম।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তরের প্রকৃত চিত্র বলতে গেলে চাপা পড়ে আছে। সন্তর্পণে সেখানে যে ধর্মান্তরকরণ চলছে, তার সম্পর্কে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টরা নিশ্চুপ। উপজাতিদের রাজনৈতিক নেতৃত্বও বিষয়টিকে ভুল ব্যাখ্যা করছে। তারা উগ্র বাঙালি-বিদ্বেষ ও ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে 'পার্বত্যাঞ্চলে ইসলামীকরণ' হচ্ছে বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। এর ফলে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়ে সকলের সামনে আসতে পারছে না।

তদুপরি, উপজাতি নেতাদের উগ্র জাতিগত বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক স্বার্থান্ধতার কবলে নিপতিত হয়ে ধর্মীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যগণ। কারণ, 'ইসলামীকরণ'-এর অপপ্রচার ও নেতাদের প্ররোচনার ফলে উপজাতিগণ ইসলাম ও বাঙালিদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করেন। আর এই সুযোগে দেশি-বিদেশি মিশনারি ও এনজিও অবাধে খ্রিস্টানকরণ করে চলেছে।

উপজাতি নেতৃত্ব হিংসার রাজনীতির কারণে ও আর্থিক লালসার বশবর্তী হয়ে স্বজাতি ও সম্প্রদায়ের আরও ভয়ানক ক্ষতি করছে। নেতাদের প্রত্যেকেরই একাধিক সাইনবোর্ড সর্বস্ব এনজিও রয়েছে, যারা বিদেশি সংস্থা ও এনজিও'র কাছ থেকে অগাধ অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে ধর্মান্তরকরণের সুযোগ করে দিচ্ছে। এদেরকে আশ্রয় করে খ্রিস্টান ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন এনজিও এবং মিশনারির প্রচুর লোক পার্বত্যাঞ্চলের অতি প্রত্যন্ত ও গহীন অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তারা আর্থিক প্রণোদনা, উন্নত জীবনের লোভ ও অন্যবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দরিদ্র উপজাতি গোষ্ঠীসমূহের সদস্যদের ব্যাপকভাবে ধর্মান্তরকরণ করছে।

অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এটাই যে, ভূ-কৌশলগত ও নিরাপত্তার নিরিখে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনশক্তি বিরুদ্ধে উপজাতি নেতৃত্ব কথা বললেও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা বিঘ্নকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কখনোই কিছু বলে না। উপজাতি নেতৃত্বের এহেন রহস্যজনক ও উদ্দেশ্যমূলক নীরবতার কারণ অনুধাবন করতে অসুবিধা হয় না।

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পার্বত্যাঞ্চলে প্রাপ্তি ও অগ্রগতি নিয়ে অনেক পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন নিশ্চয় হবে। চলমান শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ফলে অর্জনসমূহ যেমনভাবে চিহ্নিত করা হবে, তেমনিভাবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রতিবন্ধকতা নিয়েও অনুসন্ধান করা হবে। তবে পার্বত্যাঞ্চলে ধর্মীয় রূপান্তরের ফলে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা ও বিভেদের সৃষ্টি হচ্ছে, সে সম্পর্কে বেখেয়াল থাকার অবকাশ নেই। কারণ, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকির চেয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সঙ্কট কম বিপদজনক নয়।

ড. মাহফুজ পারভেজ, অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপিকে কী বার্তা আওয়ামী লীগের?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় অনেক কিছুর জন্ম দিয়ে গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে এই জেলার নাম। এবারও এসেছে এই নাম, তবে ঘটনা রাজনৈতিক। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি সাবেক এক নেতার সৌজন্যে ঐক্য ফিরেছে যেন আওয়ামী লীগে। বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যের হয়ে একাট্টা হয়ে নেমেছে প্রচারণায়। আওয়ামী লীগও নিজেদের দলের প্রার্থী না দিয়ে বিএনপি থেকে পদত্যাগী ও বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার বিজয়ের পথ প্রায় পরিষ্কার করে দিয়েছে।

আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচন। এই উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী নেই। বিএনপিরও দলীয় প্রার্থী নেই। প্রার্থী আছে কেবল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ জাতীয় পার্টির। যদিও প্রচার-প্রচারণায় নেই সে প্রার্থী। আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা চেয়ে না পাওয়া কয়েকজন উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন কাগজেকলমে কিন্তু নেই তাদের প্রচারণা। উপরন্তু দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সকল নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতা, এমনকি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য উম্মে ফাতেমা ওরফে নাজমা বেগমও প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যের পক্ষে।

দীর্ঘ ২৮ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে তিনি যেমন নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সবশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রথমবার বিজয়ী হয়েছেন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে। এরপর একে একে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এবং ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বিএনপিকে কেন্দ্র করেই, এবং ৮৪ বছর বয়স্ক এই নেতা বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির এক অপরিহার্য অংশ হয়েই ছিলেন।

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির যে নেতারা জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন তাদের মধ্যে ছিলেন উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াও। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেননি তিনি। এরপর ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর তিনি দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদসহ বিএনপির সবধরনের পদ থেকে ইস্তফা দেন। বিএনপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক করার পর ওই দিন রাতেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার মতো বিএনপির পরীক্ষিত নেতার দল থেকে পদত্যাগ, দল থেকে বহিষ্কার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ— বিষয়টি যদি এখানেই থাকত তাহলে কথা ছিল না। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলে বহিষ্কৃত হন অনেকেই, বহিষ্কারের আগে দল থেকে পদত্যাগও নতুন কিছু নয়; কিন্তু আলোচনা মূলত বিএনপির (সাবেক) নেতার সমর্থনে আওয়ামী লীগের একজোট হয়ে যাওয়া, দলীয় প্রার্থী না দেওয়া, বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগে বিএনপির সাবেক নেতাকে কেন্দ্র করে ঐক্যের সুর এবং দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ, যা আগে এভাবে কোথাও দেখা যায়নি। উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে কেন্দ্র করে তবে কি কোন বার্তা দিতে চাইছে আওয়ামী লীগ? কী সেই বার্তা?

সাত্তার ভূঁইয়া ভালো লোক, যোগ্য লোক, প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ার মতো লোক— নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে এই যে বিশেষণগুলো দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এর পুরোটাই রাজনৈতিক এবং বিএনপিকে বার্তা দেওয়া। এই বার্তা আসছে নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলে আওয়ামী লীগ কোন কৌশল অবলম্বন করতে পারে তার ইঙ্গিত। বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাসহ নিবেদিত বর্ষীয়ান নেতারাও যে আওয়ামী লীগের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে, এটা তার সুস্পষ্ট বার্তা। এখানে আওয়ামী লীগ লোক দেখানো প্রার্থী দিতেও পারত, কিন্তু সেটা করেনি। আওয়ামী লীগ পারত স্থানীয় নেতাদের দিয়েই কেবল দলছুট বিএনপির নেতার পক্ষে প্রচারণা চালাতে, সেটাও করেনি দলটি। স্থানীয় পর্যায়ের সকল নেতাসহ জেলার একাধিক সংসদ সদস্য, এমনকি কেন্দ্রীয় নেতাকে নির্বাচনী প্রচারণায় পাঠিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে দেখাল তাদের রাজনৈতিক কৌশলের কিয়দংশ!

দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে আন্দোলনও করছে তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এই আন্দোলন চলাকালে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টাইল কি বিব্রত করবে না বিএনপিকে?

বিএনপির দলীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতি অনুগত উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া গত মাসেই দলের সিদ্ধান্তে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আবার সেই দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনি ফের সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হয়েছেন। বয়সের ভারে ন্যূজ্ব তিনি, অসুস্থও; তবু ফের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে চান। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, কিন্তু দলবদল করে আওয়ামী লীগে যাননি। অথবা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের সহায়তা করলেও তাকে দলে ভেড়ায়নি আওয়ামী লীগ। এটাই হয়তো হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনের কৌশল। আওয়ামী লীগের এই কৌশলে কাবু হয়ে কি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে বিএনপি?

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের এক বছরের কম সময় বাকি। এরইমধ্যে বিএনপিকে দিয়ে বিএনপিকে মোকাবিলা করার যে কৌশল আওয়ামী লীগের, সেটা কীভাবে পার করবে এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি, সেটাই দেখার!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রোহিঙ্গা ক্যাম্প: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নতুন বছরের শুরু থেকেই রাখাইনে আপাত শান্তি বিরাজ করছে। এর আগের কয়েকমাস রাখাইন ও চীন রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলায় সেখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। নিপ্পন ফাউন্ডেশনের মধ্যস্থতায় আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ বিরতির ফলে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কিছুদিন পর রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আসছে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা। ঠিক এই সময়ে গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে শূন্যরেখার ওপারে রোহিঙ্গা শিবিরে দুটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা স্যালভেশন অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে সংঘর্ষের পর শূন্যরেখার ওপারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শিবির জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে এলাকাটা আরএসওর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাখাইনের পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে এবং প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হলেই সাধারণত মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে ও ক্যাম্পগুলোতে এ ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে।রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ভূমিকা ও আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এপিবিএনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শিবিরে নির্যাতন, হয়রানিসহ নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, আশ্রয় শিবিরে আত্মগোপনকারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে যা আশঙ্কাজনক। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালাতে পারে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকার থাকার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সীমান্তের ওপারে এসব অস্ত্র থাকায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে অভিযান চালিয়ে এগুলো উদ্ধার করতে পারছে না।প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে মাদক ও মানবপাচারের জন্য পরিচিত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে এসব অস্ত্রের চালান আসে। আরাকান আর্মিও থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়িদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনে, তাদের কাছে চীনের তৈরি অস্ত্র এবং গোলাবারুদও আছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেনবী হোসেনের দল প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদল। বলা হয়ে থাকে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে এবং তাদের সহযোগিতায় সে এই সন্ত্রাসীদল গঠন করেছে। মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে নবী হোসেন। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মাদকের চালান আসে নবী হোসেনের দলের মাধ্যমে, তারা মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে গড়ে ওঠা অনেক ইয়াবা ও আইসের কারখানাও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৯৬ শতাংশ ইয়াবা টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে আসে এবং বহু রোহিঙ্গা এই কাজে জড়িত। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মাদকপাচারের পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি ও নানা ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরসা ও আল-ইয়াকিন বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করছে। এইসব সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর নেতারা ক্যাম্পগুলোতে বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্তহয়ে উঠেছে। এই দলগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরোধী এবং তাদের নেতারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। এজন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা সংগঠনগুলোর সাথে তাদের বিরোধ চলমান এবং সুযোগ পেলেই তাদের নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। নানা ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে আরসা ও আল-ইয়াকিন রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষাকারী পক্ষের শক্তি নয় বরং তারা মিয়ানমারের চলমান পরিকল্পনার পক্ষে। বাংলাদেশের ভেতরে এধরনের সশস্ত্র সংগঠনের অপতৎপরতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তারা মিয়ানমারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকিয়ে রাখতে চায়।মিয়ানমার একদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বলছে অন্যদিকে সন্ত্রাসী দলগুলোকে মদদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পগুলোকে অশান্ত করে রাখছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদেরকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সন্ত্রাসী দলগুলো যে কোন সময় গোলাগুলি, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত পাঁচ বছরের বেশি সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩৫টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, সোনা চোরাচালানসহ ১৪ ধরনের অপরাধের অভিযোগে৫ হাজার ২২৯টি মামলা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন ব্লকের মাঝি ও জিম্মাদার, এ খুনগুলোর জন্য মিয়ানমারভিত্তিক সংগঠন আরসাকে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছোটবড় শতাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপসক্রিয় রয়েছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রাও নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলগুলোর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবাধ যাতায়াত ও সেখানে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা দেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে ও এই সমস্যা সমাধান করা বেশ কষ্টসাধ্য। ক্যাম্প এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা শনাক্ত এড়াতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি এবং মিয়ানমার পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনসের (এমপিটি) সিম ব্যবহার করে। এমপিটি ২০১৯ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে ১২টি টাওয়ার স্থাপন করেছে। এর ফলে ক্যাম্পের যেকোনো ঘটনা মিয়ানমার সাথে সাথে জেনে যায় যা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার জন্য উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ক্যাম্প ও সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে ক্যাম্পে নজরদারি বাড়াতে হবে সেইসাথে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় শরণার্থীদের মানবিক সেবায় নিয়োজিত দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আতঙ্কে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে এবং তা কাটিয়ে উঠতে প্রশাসন কাজ করছে। ক্যাম্প পরিচালনা ও শরণার্থীদের তদারকির জন্য মাঝিদের নেতৃত্বে ‘ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠিত হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে ৪০ থেকে ১২০ জন হেড মাঝি ও সাব-মাঝি নিয়ে এই ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ ক্যাম্পে প্রায় আড়াই হাজার হেড মাঝি ও সাব-মাঝি রয়েছে। উখিয়ার ১১টি ক্যাম্প৮ এপিবিএনের অধীনে এবং ১৪ এপিবিএনের অধীনে রয়েছে ১৫টি। প্রায় সোয়া ৯ লাখরোহিঙ্গা এই ২৬ টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। আরও সাড়ে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা টেকনাফের সাতটি ক্যাম্পে থাকে। ক্যাম্পগুলোতে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রাতের বেলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টসাধ্য হলে ও সামনের দিনগুলোতে ক্যাম্পেসার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আরসা ও আল-ইয়াকিনের সাথে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা মিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেফতারের আওতায় আনা হচ্ছে।রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও হতাহত হচ্ছে।ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসীদের দমন ও শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে যৌথ অভিযান চলার পরও সংঘর্ষ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতা শুধু বাংলাদেশ নয়—গোটা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বহু প্রতীক্ষিত মিয়ানমারবিষয়ক একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার পরও মিয়ানমারের পরিস্থিতির তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যেকোনো ধরনের আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং টেকসই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার প্রতিবছর ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করছে। ২০২১ সালে এই খরচের পরিমান ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার। রেহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমার এবং এর সমাধানও সেখানেই রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চায়।বাংলাদেশ সরকার এরপরও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করে যাচ্ছে। মানবতার ক্ষেত্রে উদারতা দেখালেও নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ছাড় দেবে না বাংলাদেশ। আরসা ও আরএসওর পারস্পরিক সংঘাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পাচ্ছে এবং দিন দিন তা আরো জটিলতার দিকে যাচ্ছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগঠিত বৃহত্তর জোট আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (এআরএনএ) আরসা, আরএসও ও অন্যান্য দলগুলোকে সাথে নিয়ে দ্রুত এ ধরনের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ তথা আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের যে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম শক্ত হাতে দমন করতে হবে এবং কোনভাবেই ক্যাম্পগুলো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

 

;

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যায়। এ পরিবর্তন শুধু পোশাক-পরিচ্ছদে নয় খাবার, খেলাধূলা আর উৎসবেও থাকে। তাই প্রত্যেক ঋতুতেই প্রকৃতির খেয়ালের প্রতি খেয়াল রেখে প্রস্তুতি নিতে হয় ঋতু বরণের, যা গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের জনসমাজের চিরায়ত ঐতিহ্যে পরম্পরায় এবং সমাজ প্রগতির রূপান্তরের ধারাবাহিকতায়।

পৌষ আর মাঘ মাস নিয়েই শীতকাল। কিন্তু আমার নানী বলতেন ‘শীতের জন্মের মাস হচ্ছে ভাদ্র মাস’। ভাদ্র মাসের শেষের দিকেই শীত অনুভূত হতে থাকে। বাঙালির সংস্কৃতিতে শীত একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শীতকে কেন্দ্র করে পুরো জাতি মেতে উঠে নানা রকম উৎসবে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় পিঠা উৎসব। হরেক রকমের পিঠা দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর অতিথি আপ্যায়নের চল রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো হয় আবার ক্ষেত্রবিশেষে আত্মীয়ের বাড়িতেও পাঠানো হয়।
কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে শীতকালে পিঠা মেলার আয়োজনও হচ্ছে। রসনাবিলাসী হিসেবে বাঙালির তো সুনামই রয়েছে। বিচিত্র রকমের পিঠা মনে যেমন আনন্দের সূচনা করে ঠিক তেমনি রসনার পূর্ণতাও দেয়। শুধু তাই নয়, পিঠা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ারও একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে এখন পিঠা বানানো হয়। হাতের সাহায্যে যেমন পিঠা বানানো হয় তেমনি মেশিনের মাধ্যমেও এখন পিঠা বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন রঙ আর নকশায় খচিত পিঠা দৃষ্টিনন্দন আর রুচির পরিচায়ক, যা বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির নান্দনিক উপমা।

শীতের সকালে গাঁছি কাঁধে করে খেঁজুরের রস বিক্রি করে। সামর্থ্যানুযায়ী যে যতটুকু পারে সংগ্রহ করে রসনা তৃপ্ত করে। শুধু তাই নয় আঁখের গুড় দিয়েও শীতকালে বিভিন্ন রকমের পিঠা বানানো হয়। খেঁজুরের রস দিয়ে রাফ বানানো হয় আর সেই রাফে ভাপা পিঠা ও চিতল পিঠা চুবিয়ে খেতে দারুণ লাগে।

শীতকালে চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি বড়ই বৈচিত্র্যময়। বাচ্চারা আমপারা বুকে জড়িয়ে মক্তবে ছুটে আর রাখাল গরু-ছাগলের পাল নিয়ে মাঠে যায়। কাঠুরিয়া কাঠ কাটতে যায় বনে। বিভিন্ন ধাচের পেশাজীবিরা পেশানুযায়ী কাজে বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যার আগে-ভাগেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা থাকে শীতের কামড় থেকে নিজেকে রক্ষার্থে। পাহাড় ও সমুদ্রের রাখিবন্ধনে চটগ্রামে দৃশ্যমান হয় বহুবিচিত্র এক সাংস্কৃতিক প্রভা, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনন্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ার প্রোজ্জ্বল।

কুয়াশামাখা ভোরেই চিড়া আর মুড়ির মোয়া কাঁধে বেপারি পাড়ায় পাড়ায় ডাক হাঁকে। গুড়ের জিলাপী মাটির হাঁড়িতে করে গ্রামের আনাচে-কানাচে ছুটে বেপারি। কনকনে শীতে তাজা মচমচে মোয়া আর গরম জিলাপীতে রসনা তৃপ্ত হয়।

টাকা অথবা ধান-চালের বিনিময়ে নগদ কিংবা বাকিতে বিকিকিনি হয়। বয়স্করা কাঁথা-কম্বল, শাল জড়িয়ে আর জাম্পার ও সোয়েটার গায়ে কম বয়স্করা রাস্তার দিকে খেয়াল রাখে কখন বেপারি আসে।

শীতকালীন পিঠার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফুলপিঠা, পাটিসাপটা, চিতলপিঠা, পাকনপিঠা, গুরাপিঠা, ভাপাপিঠা (ধুঁইপিঠা) বেশ জনপ্রিয়। দিন পরিবর্তনের পালায় এখন আরও বহু রকমের পিঠা বানানো হয়। এখন অবশ্য নানামাত্রিক ব্যস্ততার কারণে আগের সেই উৎসবমুখরতা নেই গ্রামীণ জীবনে।

গ্রামীণ জনপদে শীতের সকালে আগুন পোহানোর সংস্কৃতি বেশ পুরনো। উঠানের এককোণে লতাপাতা আর লাকড়ি দিয়ে আগুনের উত্তাপ নিতে সবাই গোল হয়ে বসে পড়ে। আগুন পোহানোর কালে নানা রকমের গল্প চলে আর লাল টুকটুকে কয়লায় ভাপাপিঠা পুঁড়ে খাওয়ার ধুম চলে। সত্যি বলতে কি এ সংস্কৃতি এখন অনেকাংশে সচরাচর গোচরীভূত হয় না। নগরায়নের আছরে গ্রামীণ সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন আর বিদায় নিয়েছে ইতোমধ্যে অনেক কিছু। পালাবদলের প্রহরে গ্রামীণ সংস্কৃতিও নানা রূপান্তরের সম্মুখীন।

ছোটবেলায় দেখেছি পাশ্ববর্তী কুমোরপাড়া থেকে মাটির তৈরি নানা রকমের তৈজসপত্র কাঁধে করে কুমোর ফেরি করতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে। নানা রঙের নকশা করা মাটির ব্যাংক আর ছোট আকারের হাড়ি যেগুলোকে আমরা কুয়াশা বলতাম তা কিনে খুশিতে আত্মহারা হতাম। মাটির ব্যাংকে পয়সা জমানোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা ছিল। এখন কুমোর পাড়া আছে কিন্তু কুমোরের পেশা নেই। তাঁরা পূর্ব-পুরুষের পেশা ছেড়ে বিভিন্ন রকমের কর্মে যোগ দিয়েছে।

স্কুল ও মক্তব বন্ধের দিন শীতের সকালে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিলে সদ্য ধানকাটা সারা হওয়ার পর ইদুরের গর্তে ধান কুড়োতে যেত। আইলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে কিংবা কোদাল দিয়ে ইদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান সংগ্রহ করতো আর সেই ধান দিয়ে নিজের পছন্দ মতো কিছু কেনাকাটা করতো কিংবা মোয়া ও জিলাপী খেত। এখনও প্রত্যন্ত গ্রামে এ সংস্কৃতি রয়েছে।

শীতকালে গ্রামে বিয়ের ধুমধামও বেশি হয়। আগে গ্রামের বাড়ির উঠানে বড় তাঁবু দিয়ে পাটি ও ছফ (বিশেষ ধরনের পাটি) বিছিয়ে আপ্যায়ন করা হতো এখন যেটা অতি নগন্য পরিমাণে হয় আর এখন সেটা কমিউনিটি ক্লাবে সম্পন্ন হয়।

মাঘ মাসে শীতের বেশ তীব্রতার কারণে মাঘের শীত নিয়ে বচনও রয়েছে যা আমি আমার নানীর মুখ শুনেছিলাম আর আঞ্চলিক প্রবচনে তা হচ্ছে ‘মাঘের শীতে বাঘ গুজুরে (কাঁদে)’। তাই মাঘ মাসের শীতে থাকে কামড়যন্ত্রনা। মাঘ মাসে পুকুরের পানিও কমতে থাকে আর এ সময় পুকুরের মাছ দিয়ে নানা পদের রেসিপি তৈরি করা হয়। শীতকালীন সবজি দিয়েও নানা প্রকার ভর্তা বানানো হয়।

শীতের সন্ধ্যায় আমরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে শিয়ালের ডাক শুনতাম। শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকের সাথে সাথে আমাদের কুকুর টাইগার আর রাজুইল্যাও ঘেউ ঘেউ ডাকে কানফাটা আওয়াজ তুলতো। দুই বিরোধী শিবিরের চিৎকার চেচাঁমেচিতে ছাগল আর মুরগীর ঘরে খিল দিতো আমাদের রাখাল মন্তাজ মিয়া। হালে চারপাশের অসভ্য মানুষের কুৎসিত চিৎকারের কাছে হার মেনেছে পশুদের প্রাকৃতিক কোলাহল!

জলবায়ু পরিবর্তনের এবং সামাজিক বিন্যাসের অধঃপতনের কারণে শীতের সেই আমেজ, অনুষঙ্গ ও তাৎপর্য হারিয়ে যাচ্ছে বহুলাংশে। ইতোমধ্যে ঋতুচক্রে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা যারা প্রত্যন্ত গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি তাদের কাছে শীতের যে অমোঘ স্মৃতি তা ভবিষ্যতে 'রূপকথার গল্পে' রূপ নেবে। শীতের রাতে উঠোনে ব্যাডমিন্টন খেলা, খড়ের গাদায় লাফালাফি, প্রতিবেশির বাড়িতে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া, কিচ্ছা-কাহিনী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাওয়া, মুয়াজ্জিনের আজানের পর আস-সালাতু খায়রুম মিনান নাউম বলে নামাজের দিকে আহ্বান জানিয়ে মসজিদে যেতাম।

আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক প্রভাবে গ্রাম এখন আর শাশ্বত-গ্রাম নেই। শীতের রাতে এখন আগের মতো প্রাকৃতিক কোলাহলও নেই। শীত মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে শীতের আগমনের আগে-ভাগেই কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়ে যেত। এখন এসব আর চোখে পড়ে না।

ঘন গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ গ্রাম এখন বিরান ভূমি। বন উজাড় করে ইটের ভাটায় লাকড়ি জ্বালানোর কারণে বাড়ির ফলদবৃক্ষও রক্ষা পাচ্ছে না। গ্রামীণ খেলাধূলায়ও ব্যাঘাত হচ্ছে মাঠ সঙ্কট ও রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে। শীতকালে রোদের তেজ কম থাকার কারণে দুপুরের পরেই বিলে ডাংগুলি, ফুটবল হা ডু ডু আর ভলিবল খেলার আয়োজন হতো। রাস্তার সরুপথে চলতো মার্বেল খেলা। এসব ক্রমশ চলে যাচ্ছে স্মৃতির অতল গর্ভে।

শীতকাল চট্টগ্রামবাসীর, বিশেষত লোকায়ত গ্রামীণ সমাজের কাছে শুধু একটি ঋতুর নাম নয়- সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, যা নানা পরিবর্তন ও রূপান্তরের আঘাতে ক্রমেই অপসৃত।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;

কুইজে পশুর হাসি ও বাম কান নড়ানো



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ছুটির দিন ছাড়া আজকাল শখের বাগানে কাজ করার সময় পাবার উপায় নেই। তবে বড়দিনের আগে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবার পরও কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া গেল। শীতের ঠান্ডা আমেজের সাথে দুপুরের রোদটা বেশ মিষ্টি অনুভূত হয়। তাই নিয়মিত বাগান তদারককারীদের কাজে সহায়তা করতে শুরু করলাম। কাজের ফাঁকে ওরা গল্প করতে ভালবাসে। ওদের কারো কারো সমসাময়িক ঘটনার জ্ঞান আমার থেকে অনেক গুণ বেশি। সেটা আগে থেকেই আমি জানি। কাজের দিকে মনযোগ দিয়েও একজন হঠাৎ কথার আসর জমিয়ে ফেলল।

তার প্রশ্ন ছিল- একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে। ছোট ছেলের সেই এমসিকিউ পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে- শুধু একটি পশু হাসতে জানে। সেটি কোনটি? চারটি প্রাণীর নাম লেখা আছে। একটিতে টিক চিহ্ন দিতে হবে। ছেলে ভুল হবে বলে কোনটিতেই টিক চিহ্ন না দিয়ে বাসায় এসেছে। সেখানে গরু, ঘোড়া, হায়েনা ও বানরের নাম দেয়া ছিল। সে দাদাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গরু, –মহিষ দেখেছে। চিড়িয়াখানায় হায়েনা ও অনেকগুলো বানরের লাফালাফি ও ঝগড়া দেখেছে। কোনটিকেই হাসতে দেখেনি। কিন্তু সেদিন টিভিতে খবরে শুনেছে- একটি রাজনৈতিক দলের ২৭ দফায় রাষ্ট্র মেরামত কর্মসূচির ঘোষণা শুনে গাধাও হাসে। সে ছোট্ট মানুষ, তাই ভেবেছিল গাধা আসলেই হাসতে পারে। প্রশ্নে চারটি অপশনের মধ্যে গাধা নামক পশুর নাম ছিল না। তাই সে উত্তর দেয়নি।

প্রাথমিকে পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর মনে টিভির সংবাদ এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে তা শুনে ওর বাবা তো অবাক! আমার কাছে সে জানতে চাইলো- এর সঠিক সমাধান কি হতে পারে স্যার?

আমিও ওর ছেলের কাণ্ড শুনে এই প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোন উত্তর দিতে না পেরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এমন জটিল প্রশ্নে উত্তর দিতে না পেরে শখের কাজ ফেলে বাসায় চলে এলাম। প্রাণীবিদ এক বন্ধুকে ফোন করলাম। তিনি জানালেন আজকাল কিছু গাইড বইয়ে অনেক আজগুবি তথ্য দেয়া থাকে। সেগুলো দেখে কুইজ এসব কুইজ টাইপ প্রশ্ন তৈরি করা হয়। আপনি ইন্টারনেট খুঁজলে পেতে পারেন।

কোন প্রাণী হাসতে পারে তা কোন বইয়ে লেখা আছে বা আমি কোথাও এমন কিছু পড়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। ছাত্রজীবনের সাধারণ জ্ঞানের সকল বই অন্যদেরকে দিয়ে দিয়েছি। অগত্যা গুগল খুঁজতে হলো। হ্যাঁ, সেখানে পাওয়া গেল। সেটাও একটি চাকুরির পরীক্ষার কুইজ। বলা হয়েছে, শুধু ‘হায়েনারা’ হাসতে জানে। তবে তাদের হাসির ভিডিও দেখে মনে হলো ওরা হো হো করে হাসতে জানে না। বরং শিকারকে ধরা বা ঝগড়া করা ও প্রজননের সিজনে নিজের ঘাড়ের লোম ও লেজ ফুলিয়ে শত্রুর দিকে তেড়ে আসে। এরপর বিশ্রি শব্দ করে দাঁত বের করে চোখে এক ধরণের জ্বলজ্বলে ভাব ফুটিয়ে তোলে। যেটাকে অনেকে সহজাত, হিংসা ও বিদ্রুপের হাসির সাথে তুলনা করেছেন মাত্র।
আমরা জানি ঘোড়া ডিম পাড়ে না। গাধারাও হাসতে জানে না। এগুলো প্রবাদ-প্রবচন। এসব প্রবাদ-প্রবচন দিয়ে অনেক শিক্ষামূলক ঘটনাকে বুঝানো হয়। আবার অনেক প্রবাদ-প্রবচন আছে যেগুলো মানুষ বানিয়ে বানিয়ে ভিন্নভাবে বলে। যেগুলোর মাধ্যমে অন্যকে তিরস্কার করা হয়, অনেকে আঘাত পান, কষ্ট পেয়ে থাকেন।

যতদূর জানা গেছে তাতে বলা যায়, রক্ত-মাংসের প্রাণীকূলের মধ্যে শুধু মানুষ হাসতে জানে। শিম্পাঞ্জি, বানর, ওরাংওটাং হাসির মতো করে ভেংচি কাটে। ঘোড়া, গাধা, জেব্রা ইত্যাদি হা করে সব দাঁত বের করতে পারে। কোন কিছু শুঁকে ঘ্রাণ নিয়ে দাঁত উচিয়ে নিজেদের মতো শব্দ করে অভিব্যাক্তি প্রকাশ করতে পারে। ছড়া-কবিতায় ‘খোলসে মাছের হাসি দেখে হাসেন পাঁতিহাস’ ও বালু সম্বলিত পরিষ্কার অল্প পানিতে পুঁটি মাছের ঝিলিক দিয়ে চলাফেরাকে অনেকে হাসের সাথে তুলনা করেছেন। কাণি ও সাদা বকেরা তখন সেসব পুঁটিমাছকে হাসিখুশি মনে ঠোঁট দিয়ে পটাপট শিকার করে গিলে ফেলে উদর পুর্তি করে। আদতে সেগুলো কোন হাসি নয়।

এমনকি ফেরেশতা, জ্বিন-পরী, দৈত্য-ভূত ইত্যাদি হাসতে জানে বলে গল্প শুনলেও আমি বাস্তবে তাদেরকে হাসতে দেখিনি। হয়তো তারা ভিন্ন জিনিষ দিয়ে তৈরি বলে আমাদের সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। যাক্ সেসব কথা। ঘণ্টাখানেক বাসায় কাটিয়ে আবার নিচে নেমে বাগানে ওদের নিকট গেলাম। আমি কিছু বলার আগে সে আবার প্রশ্ন করলো, স্যার, ‘গাধা হাসে, কিন্তু গাধা কি কখনো কাঁন্দে না?’

ওর জটিল প্রশ্ন শুনে আবার বিপদের আঁচ করলাম। এবার মনে করলাম গাধারা হাসতে পারে না। কিন্তু কাঁদতে পারে। গাধা বিপদের সময় কখনও কাঁদে। মনিবের পিটুনি খেয়ে কেঁদে দুচোখে পানি গড়িয়ে মুখে কালো দাগ করে ফেলে। অভিমান করে, রাগ করে, গোস্বা করে, ফুপিয়ে চিঁহিঁ-হিঁ করে চিৎকার করে মালিক বা মনিবের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

ভাল খাবার বিশেষ করে গাজর-মূলো তাদের প্রিয় খাবার। সামনে একটি মূলো ঝুলিয়ে দিয়ে গাধাকে যে সামনের দিকে চালিত করা যায়। পিছনে মূলো ঝুলিয়ে দিয়ে গাধাকে সামনে চলতে বললে সে সামনে যায় না-বরং পিছনের পা দিয়ে পেছাতে থাকে। এজন্য বলা হয় গাধারা লোভী ও স্বার্থপর। শুধু নিজের পেটের চিন্তা করে।

তবে গাধা প্রাকৃতিকভাবে কিছু গুণ ধারণ করে থাকে। বিশেষ করে ভারবাহী গাধারা সন্মুখের বিপদ আঁচ করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পথের মধ্যিখানে নিজের বিপদ ঘটতে পারে এমন কিছু আঁচ করতে পারলে গাধারা শুয়ে পড়ে। তখন গরুর মতো নাকে পানি ঢাললেও তারা উঠতে চায় না। সুদূর অতীতকাল থেকে বেদ্ঈুনরা ভারবাহী উট, ঘোড়া ইত্যাদি দিয়ে পণ্য পরিবহণ বা মরুপথে চলার সময় সংগে গাধা রাখতো। অতীতে হজ্জ কাফেলার সময় গাধাকে সঙ্গী করা হতো। গাধা যে মরুপথে চলতে চাইতো না সে পথকে পরিহার করে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো হতো।

গাধা খুব পরিশ্রমী প্রাণী। অনের ভারী বোঝা পিঠে নিয়ে দূর-দূরান্তের বন্ধুর পথ পাড়ি দেবার জন্য গাধার সুখ্যাতি রয়েছে। এজন্য তারা নিজের পিঠের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে না। এতকিছু শুনে সে বললো- স্যার গাধার এত গুণ। জানতাম না। আমি বাড়িতে ক’টি ছাগল পুষি। তবে এত এত গুণের সাথে যদি হাসতে জানে এমন একটি গাধা পেতাম সেটাকেও পুষতাম। তাহলে আমার বাড়িতে সেই হাসি জানা গাধাকে অনেকে দেখতে আসতো। তখন একটি মিনি চিড়িয়াখানা খুলে দর্শনীর বিনিময়ে মানুষকে সেই হাসি জানা গাধাকে দেখার সুব্যবস্থা করতাম। এই দুর্মূল্যের বাজারে আমার কিছু বাড়তি আয় হলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসারটা একটু ভালভাবে চালাতে পারতাম। অসুস্থ মায়ের চিৎিসার জন্য টাকা পাঠাতে পারতাম।

ওর চমৎকার ভাবনার কথা শুনে বললাম, বাস্তবে সেই হাসি জানা গাধা পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া গেলে তো! মনে মনে ভাবলাম আরা অনেকেই ঘোড়ার পিএচডি-র জন্য আবেদনের গল্প বলে মজার কৌতুক করে থাকি। ওকে একটা কৌতুক শোনালে কেমন হয়?

বললাম, তাহলে একটি কৌতুক শোনো।

‘এক রাজা যাবেন শিকারে। তিনি প্রিয় উজিরকে জিজ্ঞাসিলেন, আজকের আবহাওয়ার খবর কি? শিকারে গিয়ে ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ব না তো? উজির শুধালেন, আজ আবহাওয়া চমৎকার। ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই।

কিছুদূর যাবার পর পথিমধ্যে এক ধোপার দেখা হলো। ধোপা বলল, মহারাজ, শিকারে তো চললেলন, কিন্তু সামনে যে বড় ঝড়-বৃষ্টি অপেক্ষা করছে! রাজা আর কিছুদূর যেতেই প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়লেন। তখন তিনি ঐ উজিরকে বরখাস্ত করে সেই পদে বসালেন ধোপাকে।

রাজা ধোপাকে বললেন, তুমি কি করে ঝড়ের কথা আগেই জান? ধোপা বলল, মহারাজ, যখন ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে তখন আমার পোষা গাধাটি সামনে চলতে চায় না, ও গোঁ ধরে, আর তার বাম কান নড়ে। আমার গাধার বাম কান নড়া দেখে আমি বুঝেছি আজ ঝড়-বৃষ্টি হবে।

রাজামশাই তাৎক্ষণিক ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাটাকে উজির বানালেন।’

সে কৌতুকটা শুনে খুব খুশী হলো বলে মনে হলো। আর কোন প্রশ্ন করলো না।

গাধারা বাস্তবে হাসতে না জানলেও আমাদের চারদিকে মানুষরূপী গাধায় ভরপুর। তারা শুধু হাসেই না। বরং কপট হাসি দেয়। ইর্ষা ও শয়তানির হাসি দিয়ে অট্টহাসি করে। মানুষের দু:খ-কষ্ট শুনে তারা জোর করে হাসার চেষ্টা করে তিরস্কৃত হয়। চেহারায় ভয়, উষ্মা ফুটে উঠলেও সে সময় জোর করে মুচকি হেসে ফটোসেশন করে। মুখটা হাসি হাসি করে কি আর হাসি হয়? মানুষ মিনি পর্দায় কপটতাপূর্ণ সেসব দৃশ্য অবলোকন করে কষ্ট পায়, কেউ কেউ অভিশাপ দেয়। এরাই সেইসব গাধা যারা নানা চরিত্রে হাসতে জানে। মানুষরূপী গাধাদের এসব ভণ্ড হাসির ফলে সুনাগরিক তস্করপদী চোর-ডাকাত, বদমাশ, ঘুষখোররা আরো বেশি বেশি অন্যায় করার আস্কারা পায়। এসব গাধা তাদের পোষা অনুচরদের নিয়ে সাময়িক হাসাহাসি করে, তাচ্ছিল্য করে।

আর এসব পোষা অনুচররা সামনে কোন বিপদ দেখলে মনিবের নিরাপত্তার জন্য বাম কান নাড়িয়ে সংকেত না দিয়ে আগে নিজেরাই সটকে পড়ে। এজন্য মনিবকে একদিন তার হীন কৃতকর্মের জন্য একাই পস্তাতে হয়। কাঁদতে হয় জন্ম-জন্মান্তরে। তাইতো এসব ছোট কানওয়ালা মানুষরূপী গাধার চেয়ে লম্বা কানওয়ালা আসল গাধারাই মনিবের বিপদের বন্ধু হিসেবে প্রমাণিত।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;