বিশ্ববিদ্যালয় ও উপাচার্যদের আমলনামা আমলে নিন

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সোনার বাংলায় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার অভাব নেই। অভাব হল পরিচর্যার। যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত স্থানে না বসানো, কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্টিত করার আগে তার সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় সংবেদনশীলতার পরিচয় না দেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান না করা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক চরিত্র এবং দূর্নীতিগ্রস্ততার সম্ভাবনা আছে কিনা তা না জেনেই কোনো কোনো ব্যক্তিকে পদায়ন করার ফলশ্রুতি যে কখনো ভালো হয় না, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এবং তার উপাচার্যদের সীমাহীন দূর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারি, নিয়োগ বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতি তারই ফলশ্রুতি। ফলে, উপাচর্যগণ যা মন চায় তা করতেও দ্বিধাবোধ করেন না।

স্বাধীনতা পরে বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের পরে রাজনীতির ছত্রছায়ায় অনেকে উপাচার্য হয়েছেন, যাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা উন্নয়নের অনেক কিছু নির্ভর করে একজন উপাচার্যের ওপর। অথচ আজ উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতি বড়ই হতাশার।

পত্রিকায় প্রকাশ, দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও পূর্বের উপাচার্যরা রাষ্ট্র, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়কে বিব্রত এবং উচ্চশিক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে সামান্যতম গণনার মধ্যে না রেখে যার যা খুশি তাই করে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয়কে এক প্রকার হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।

দুই.
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদেরকে একদিকে হল বন্ধের অফিস আদেশ জারি করে অন্যদিকে বহিরাগতদের দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে রামদা, চাপাতি এবং নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হতাহত করার ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা একজন বিবেকবান শিক্ষকের কাছে সন্তান সমতুল্য, আত্মা ও প্রাণের স্পন্দন। অথচ দু:খজনক হলেও সত্য, হতাহত শিক্ষার্থীরা আজ হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। বাদ যায়নি ছাত্রীরাও। যে যেভাবে পেরেছে ছাত্রীদেরকেও পিটিয়ে জখম করেছে।

এই উপাচার্যের মুখের ভাষাসহ সামগ্রিক কর্মকাণ্ড আজ রাষ্ট্র ও সরকারকে বিব্রত করেছে। তিনি বেশ চাতুর্যের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডকে ‘ম্যানেজ’ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে অনৈতিক এক শতাংশ (১%) ‘ভিসি কোটা’ চালু করে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষাকে কলঙ্কিত করেছেন।

তিন.
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় টানা ১২/১৫ বছর থেকে অত্যন্ত অশান্ত। যিনিই উপাচার্য হন, তাকে নামানোর জন্য কিছুদিন পরই তৎপর হয়ে যান ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিত্য-নৈমিত্তিক রূপ পেয়েছে।

বর্তমান উপাচার্য ফারজানা ইসলামের কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত না হলেও তাকে পদত্যাগের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করে রেখেছে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

চার.
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্যকে প্রথম মেয়াদের পরে বিরতি দিয়ে অন্য একজন উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হলে সরকার তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ দিয়েছেন। অথচ, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত প্রথিতযশা অধ্যাপক আছেন যারা উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে যথেষ্ট পারদর্শী। ব্যতিক্রমভাবে এক মেয়াদ বিরতির পরে ২য় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে বর্তমান উপাচার্য শিক্ষক নিয়োগে ইতিহাস রচনা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

গত ২১ নভেম্বর ২০১৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিনের মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬২তম সিন্ডিকেট সভায় যে কোনো বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় মেধা তালিকায় ১ম থেকে ৭ম এবং প্রতিটি বিভাগ বা ইনস্টিটিউটে শিক্ষক নিয়োগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৫০ থাকা আবশ্যক করা হয়।

কিন্তু বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭৫তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিথিল করে (ন্যূনতম ৩.২৫) তার মেয়েকে (২১তম) ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে’ এবং জামাতাকে (যার ব্যাচে ৩.৫০ বা এর ওপরে সিজিপিএ পেয়েছেন ৬৬ জন) ‘ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ)’ প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়েছেন।

এগুলো অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিত্য-নৈমিত্তিক দৃশ্যপট।

পাঁচ.
পত্রিকায় প্রকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি চিরকুটের মাধ্যমে সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা বা কোনো প্রকার মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই ছাত্র ভর্তি করিয়ে ডাকসু নির্বাচনের সুযোগ করে দিয়েছেন।এটি যদি সত্য হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরতো আর একা দোষ দেওয়া যাবে না। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক শিক্ষক, বিশেষ করে ঐ অণুষদের ডীন, বিভাগের চেয়ারম্যান, কোর্সটির কো-অর্ডিনেটর সকলেই একই দোষে দোষী।

ছয়.
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর আলোচিত-সমালোচিত। শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশের অভাব, সেশনজট প্রভৃতি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে লেগেই আছে।

পত্রিকায় প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ৩৪০ দিনের মধ্যে ২৫০ দিনই ক্যাম্পাসে যাননি। তিনি ঢাকার লিঁয়াজো অফিসে বসে রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পরিচালনা করেন। দেশের স্বনামধন্য ও প্রথিতযশা একজন শিক্ষাবিদ উপাচার্যের কাছে নিশ্চয় এর উপযুক্ত ব্যাখা আছে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই কাম্য কি?

আবার, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য রাতের আঁধারে বলা যায় এক কাপড়ে পালিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এমন কেন হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদানের সময় ফুলের মালা, আর মেয়াদ শেষ হলে অসম্মানের সাথে চলে আসা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির করার আছে অনেক কিছুই।

পরিশেষে বলতে চাই, চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলী; উচ্চশিক্ষা-গবেষণা, সমাজ ও দেশ সেবায় অবদান; মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের প্রতি অবিচল দৃষ্টিভঙ্গি; বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় পারদর্শিতা বিবেচনা, দক্ষতা; ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যক্তিত্ববোধের মত গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল বিষয়গুলো পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন উপেক্ষা করে একজন শিক্ষককে ‘উপাচার্য’পদে অধিষ্টিত করা বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য যে কতটা ক্ষতিকর তা নিশ্চয় সরকার নতুন করে ভেবে দেখবেন।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :