'ভাবনা'-একান্তই আমার

মুত্তাকিন হাসান
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘লোকে কী ভাববে বা বলবে’ কথাটার সঙ্গে আমরা খুবই পরিচিত। লোকে তো কিছু একটা ভাববেই। কেউ খারাপ ভাববে, কেউ বা ভাববে ভালো। কেউ আপনাকে সমর্থন দিবে, কেউ আবার সমালোচনা করবে। সব মানুষকে আপনি খুশি করতে পারবেন না। আপনার আচার ব্যবহার, পোশাক বা কথাবার্তায় কেউ খুশি হবে আবার কেউ নাও খুশি হতে পারে। কিন্তু পছন্দটাতো সম্পূর্ণই আপনার।

ধরুন আপনি কোনো একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য পোশাক পরে আপনার আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বান্ধবকে বললেন, কেমন লাগছে? কেউ বলবে খুব সুন্দর লাগছে আবার কেউ বলবে আরেকটু এরকম হলে আরও ভালো লাগতো। যারা পোশাকটি পছন্দ করছে না, তারাও হয়তো আপনাকে খুশি রাখার জন্য ভালো বলবে। নানাজনের নানা মত। কাকে ঠেকাবেন? বরং আয়নার সামনে গিয়ে আপনি একবার নিজেকে দেখেন। আপনি কী ভাবছেন বা করছেন, সেটাই বড় কথা। আগে প্রয়োজন নিজের মনের সমর্থন।

বিধাতা সব মানুষকে একভাবে সৃষ্টি করেননি। তাই একেকজনের পছন্দ একেক রকম। মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব তাই একে অপরের সাথে মেলামেশা করেই চলতে হয়। আপনি যদি আপনার নিজের মতো করে ভাবেন তাহলেই জীবন হবে সুন্দর। অন্যরা কী ভাববে এই ভয়ে যদি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন তাহলে আপনি অনেক দূরে সরে যাচ্ছেন।

কিন্তু অসীম সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী মানুষরা এমন প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণে প্রতিজ্ঞ থাকে। নিজের স্বপ্ন পূরণে তারা কোনো প্রতিযোগিতাকেই ভয় পায় না। সব কিছুকেই তারা সহজ করে নেয়।

অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে আপনি আপনার গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, আপনি যদি হর্ন না বাজিয়ে ভিড় ছাড়ার আশায় বসে থাকেন, তাহলে আপনি এমন ভিড়কে জয় করতে পারবেন না। অন্যদিকে অনেকে পাশ কাটিয়ে টেকনিক করে সুন্দরভাবে নিজের এগিয়ে যাওয়ার পথ করে নিচ্ছে। আর আপনি যদি ভাবেন চিপাচাপার মধ্য দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাব, কে আবার কী ভাবে? অন্য কারো গাড়িতে খোঁচা লাগে কিনা। অর্থাৎ আপনি একটা দ্বিধার মধ্যে রয়ে গেলেন, যা আপনার মনের শক্তি বা সামর্থ্যকে অনেক কমিয়ে দিলো। আপনি ভিড়ের মধ্যেই রয়ে গেলেন।

গবেষকরা বলেন, এমন অনেকে আছেন যারা নিজের সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক ধারণা নিজের মধ্যে লালন করে, যেমন তারা দেখতে আকর্ষণীয় নন, কাজ করতে গিয়ে যদি ব্যর্থ হই তাহলে মানুষ ব্যঙ্গ বা তিরস্কার করতে পারে। এই ধরনের চিন্তা ভাবনা মনের ভেতর গেঁথে যাওয়ার ফলেই তারা নার্ভাস হয়। জীবনের সবচেয়ে বড় জয় হলো নিজের নার্ভাসনেস কাটিয়ে এমন কিছু করে দেখানো; যা সবাই ভেবেছিলো তুমি কখনোই করতে পারবে না।

কেউ গ্র্যাজুয়েট হলেই পিএসসির অধীন বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু প্রচণ্ড কম্পিটিশনের জন্য অনেক ভালো ছাত্রও এ পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে। কিন্তু আমার মতো নগণ্য ছাত্রের ইচ্ছা পোষণ হয় আমি অংশগ্রহণ করবো। তাই টিউশনির ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সময় পেতাম সময় দিয়েছি পড়ালেখায়।

আমার ইচ্ছাই ছিল অন্তত ভাইভার মুখোমুখি হওয়া। বিসিএসএ উত্তীর্ণ হওয়াটা আমার মুখ্য বিষয় ছিল না। কিন্তু আমি পরপর দুইবার (২৪ ও ২৫) ভাইভায় অংশগ্রহণ করি। বিসিএসএ না উত্তীর্ণ হলেও আমি জেনেছি অনেক যা নিজেকে ডেভেলপ করতে সহায়তা করেছে। অথচ বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেবার সময় অনেকে বলেছে তুই বেহুদা সময় নষ্ট করছিস।

ফলাফল যাই হোক আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি অনেক। আপনাকে যে বিষয়গুলো অনুপ্রাণিত করে, সে বিষয়গুলো অন্যের কাছে শেয়ার করা দরকার। আপনার অনুপ্রাণিত হওয়ার কোনো বিষয় অন্যকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে। সহজ কথাটা আবার বলতে হয়, অন্যরা কী ভাববে সেই ভাবনা নিয়ে আমাকে কেন ভাবতে হবে? কারণ নিজের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আমাকে এভালুয়েট করার সুযোগ পেয়েছি যা বাড়িয়ে দিয়েছে আমার আত্মবিশ্বাস, খুঁজে পেয়েছি আনন্দ।

আমার গভীরতা কতটুকু আমি নিজেই উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছি। নিজেকে ছোট করে দেখার অর্থ নিজের আত্মবিশ্বাসকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া।

আত্মবিশ্বাস মরে গেলে মানুষ নিজের মধ্যে আর শক্তি খুঁজে পায় না। আমরা যখন রাতের অন্ধকারে গ্রামের পথে হাঁটতাম, সাথে থাকতো ছোট্ট একটা টর্চ যা দিয়ে পুরো পথ আলোকিত না হলেও নিজের চলার পথটা কিন্তু আমরা সুন্দরভাবে খুঁজে নিতাম এবং নিরাপদে গন্তব্যস্থলে ঠিকই পৌঁছে যেতাম। সফলভাবে গন্তব্যে পৌঁছা আনন্দের বিষয়। তবে গন্তব্যের প্রতিটি ধাপেও আনন্দ থাকে, তা নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।

আনন্দ একটা লেজের ডগার মতন। একটা বিড়াল যদি নিজের লেজের ডগা ধরতে যায় তাহলে সে সারা জীবন ঘুরেই যাবে, কিন্তু যদি সে নিজের মতো চলতে থাকে তাহলে লেজটাও তাকে অনুসরণ করবে।

 

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

 

আপনার মতামত লিখুন :