ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরেকবার

ফরিদুল আলম
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্ক দীর্ঘ সময় ধরেই। একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেবল নয়, ব্যবসায়িক এবং মানুষ হিসেবেও বিতর্ক যেন তার নিত্যসঙ্গী। তার সমালোচকরা যতই তার বিরুদ্ধে বলুন না কেন, তার পুরো ব্যক্তিজীবন বিশ্লেষণ করে যা বোঝা যায়, তা হচ্ছে তিনি সর্বদাই লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থেকে সফলকাম হয়েছেন।

দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাকে অভিশংসনের সম্মুখীন হতে হবে এবং তিনি পুরো মেয়াদ দায়িত্ব পালন না করে অভিশংসিত হবেন – এমন পূর্বাভাস ব্যাপকভাবেই করা হয়েছিল। এতো কিছুর পরও রাজনীতিতে বিরোধীপক্ষ এমনকি নিজ দলের ভেতর থেকেও সব প্রতিবন্ধকতা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছেন।

সম্প্রতি তার মেয়াদের শেষ বছরে আবারও বিরোধী শিবির ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে তাকে অভিশংসনের সম্ভাব্য পথ বের করতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত গত ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক ফোনালাপে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছেলের দুর্নীতি তদন্তের বিষয়ে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জেলেনস্কিকে চাপ দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাইডেনের ছেলে একটি গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এই কোম্পানিটির দুর্নীতির বিষয়ে সে সময়ের ইউক্রেন সরকার তদন্তের উদ্যোগ নিলে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হস্তক্ষেপে সেই তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ৩৯১ মিলিয়ন ডলার ছাড়ের শর্ত হিসেবে এই তদন্ত প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে যে অনুরোধ করেছেন, ডেমোক্রেটিক শিবির এটিকে দেখছে নৈতিক স্খলন হিসেবে- একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পদের অপব্যবহার করা হচ্ছে এই মর্মে।

গত ২৪ জুলাই প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ডেমোক্র্যাট নেতা ন্যান্সি পেলোসি এইসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেন, যা প্রমাণের ওপর প্রতিনিধি পরিষদে এই প্রক্রিয়া নেয়া হবে কি না তা নির্ভর করবে। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ফোনালাপের একটি কপি করেছেন এবং তা প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত নৈতিকতার স্খলনজনিত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানিয়েছেন যে এই আলোচনায় তিনি দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন এবং প্রাসঙ্গিকভাবেই জো বাইডেন এবং তার ছেলের বিষয়টি এসেছে। তিনি এও জানিয়েছেন যে এই অভিশংসন প্রক্রিয়া বাস্তবে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

এর আগেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের কতিপয় সদস্য উদ্যোগ নিলেও এই অভিশংসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোদ নিজেদের শিবিরের ভেতরেই মতপার্থক্য থাকায়, তা আর বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। এর মধ্যে গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় তার পক্ষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়ের ওবামা সরকারের নীতিপ্রণয়ন সংক্রান্ত কিছু স্পর্শকাতর বিষয়, সেই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ই-মেইলের ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আনার বিষয়ে রাশিয়ার গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন যে এর মাধ্যমে অভিশংসনের প্রক্রিয়া নেয়া হলে এর ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই অভিশংসন আসলে একটি প্রক্রিয়াগত বিষয় এবং এর চূড়ান্ত ফল যে দিকে যাবে পরবর্তী নির্বাচনে তারাই লাভবান হবে। এই বিবেচনায় চূড়ান্তভাবে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও উচ্চকক্ষ সিনেটে রয়েছে রিপাবলিকদের প্রাধান্য। অভিশংসনের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটে পাশ হলেও সিনেটে সেটি অনুমোদন পেতে লাগবে ১০০ জন সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৭ জনের সমর্থন।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংসদদের দলের পক্ষে ভোটদানের কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, বর্তমানে সিনেটে ক্ষমতাসীনদের (৫৩ আসন নিয়ে) যে আধিপত্য, তা গত বছর মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং নির্বাচিতদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের অনুসারী এবং তার রাষ্ট্র পরিচালনায় জনসমর্থনের সুবিধাপ্রাপ্ত। সুতরাং যে কোনো বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি আসনের (সবাই তাদের পক্ষে ভোট দিলেও) সঙ্গে রিপাবলিকানদের আরও ২০ জনকে নিজেদের দলে ভেরানোর প্রচেষ্টা সুদূরপরাহত।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের অভিশংসন আইনে যে ব্যাখ্যা রয়েছে, যেমন নৈতিকতার স্খলন এবং উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয় তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যতই প্রমাণিত হোক না কেন, প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই (কংগ্রেস এবং সিনেটে ভোটাভোটি) এই অভিশংসনের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। সেক্ষেত্রে ট্রাম্প অনেকটা নিশ্চিত হতে পারেন এই ভেবে যে নিজ দলে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিরোধী শিবিরেও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের খাতিরে অনেকেই ট্রাম্পের হাতে রয়েছেন।

ট্রাম্প পেশাদার রাজনীতিবিদ না হলেও মার্কিন রাজনীতি মোটামুটিভাবে তার নখদপর্ণে রয়েছে। এর প্রমাণ ঝড়ের গতিতে এসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়া। আর তাই তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের পরও নিজের স্বভাবজাত কায়দাই তিনি চলছেন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর টেক্সাসের হিউস্টনে ৫০ হাজার ভারতীয়র উপস্থিতিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হন ট্রাম্প। উদ্দেশ্য, মোদিকে দিয়ে কিছু বলানোর চেষ্টা, যা পরবর্তী নির্বাচনে তার জন্য কাজে লাগবে, কারণ এইসব ভারতীয়দের অধিকাংশই ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেন। মোদিও ট্রাম্পের উপস্থিতিকে সম্মান জানাতে গিয়ে বলে বসেন, ‘আবকি বার ট্রাম্প সরকার’, অর্থাৎ এবার ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসবেন। দুই দেশেই এটি নিয়ে সমালোচকরা সমালোচনায় মুখর।

ইত্যকার বিষয়গুলো যখন ট্রাম্পের জন্য নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে, এহেন পরিস্থিতিতে নীতি-নৈতিকতা এবং আইনের যতই ব্যাখ্যা থাকুক না কেন একটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা ট্রাম্পবিরোধীদের জন্য দূরাশা বৈ কিছুই নয়। সেই সঙ্গে রাজনীতি, দেশের অর্থনীতির ইতিবাচক উন্নয়ন, বেকারত্ব হ্রাস, সরকারের ভেতর নিজের দৃঢ় অবস্থান এবং বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে তার অর্জনগুলো আগামী নির্বাচনের দৌড়ে তাকে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই অনেকটা এগিয়ে রেখেছে। এই অবস্থায় ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ ধরনের অনাস্থা আনয়নের প্রচেষ্টা বিরোধীদের দুর্বল করবে এবং আগামীতে তার বিজয়কে অনেক মসৃণ করবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে তার বক্তব্যের বিরোধীতা করার তেমন একটা সুযোগ নেই।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :