বায়ু দূষণ: দিল্লি বনাম ঢাকা

সৈয়দ ইফতেখার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কথায় আছে, দিল্লি অনেক দূর। সে অনেক আগের কথা। বায়ু দূষণে দিল্লি ও ঢাকা এখন খুব কাছাকাছি। দুই রাজধানী শহরই পাল্লা দিয়ে দূষণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যা নিয়ে দিল্লিবাসীর চেয়েও উদ্বেগের যথেষ্ট বেশি কারণ রয়েছে ঢাকাবাসীর।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি তথা বৃহত্তর দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকায় বায়ু দূষণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দূষণ কমে, বাড়ে এই হলো হাল-হকিকত। অক্টোবর মাসের প্রথম থেকে বায়ু দূষণের শুরু। নভেম্বরের শুরুতে যা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে। গাড়ি চলাচল শিথিল করা (জোড় ও বিজোড় নম্বরের ভিত্তিতে চলাচল), সব রকম নির্মাণ কাজ বন্ধ ঘোষণাসহ নেয়া হয় নানা পদক্ষেপ। বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। ঠিক এমন সময় জানা যায়, বিপর্যস্ত দিল্লিকে ছাড়িয়ে গেছে ঢাকা।

দিল্লিকে টপকে যাওয়ার কথা তিলোত্তমা ঢাকার ছিল না। তার কারণ দিল্লিতে দূষণের সৃষ্টি বহু পুরোনো। বিগত কয়েক বছরে যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সাল, তার আগের বছর ২০১৭ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। তারা ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নিয়ে চলতি বছর (২০১৯) খানিক নিয়ন্ত্রণে এনেছে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ের চেষ্টাই হলো একযোগে কাজ করে দূষণ কমানো। যদিও দূষণ অত্যন্ত বেশি তাই দৃশ্যত ফলাফল মিলছে না। আর জনসংখ্যার চাপও অতিরিক্ত। তবে ভারতীয় পরিবেশমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দিল্লিতে কোনো দূষণ থাকবে না, তিনি ও তার বিজেপি সরকার এ ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানান।

দিল্লিতে মূলত দূষণ হয়, পাকিস্তানের বড় বড় পাহাড় থেকে হিম শীতল হাওয়া এসে ধুলাবালির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হওয়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়, প্রতিবেশী রাজ্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের ফসলি জমির উচ্ছিষ্ট অংশ বা নাড়া পুড়ানোর কালো ধোঁয়া। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পরিষ্কার করতে আগুন দেয়া হলে; তা পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এছাড়া অধিক জনসংখ্যার চাপে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, গাড়ির কালো ধোঁয়া, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ, নির্মাণ কাজের ধুলা-ময়লা- সব একাকার হয়ে কুয়াশার মতো ধোঁয়ার কুণ্ডলী সৃষ্টি হয়। যাতে করে বাতাস আর নিরাপদ থাকে না। বাতাসের গুনগত সূচক, এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বেড়ে যায়, এতে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ তাই নানান সমস্যা নিয়ে দৌড়াচ্ছেন হাসপাতালে। দিল্লির দূষণের প্রভাব পড়েছে প্রায় চারশ' কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের লাহোরেও। সেখানেও তীব্র দূষণ দেখা দিয়েছে। লাহোর তাই দূষণের তালিকায় তৃতীয়।

দিল্লি-লাহোরের এমন জটিল পরিসংখ্যানের মধ্যে ঢাকার এক নম্বর হওয়া প্রকৃত অর্থেই উদ্বেগের। বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ভিজ্যুয়াল বলছে, ঢাকা ক্রমেই দূষিত শহর হয়ে উঠছে। নয়াদিল্লি, লাহোর বা মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোর, ইরানের তেহরান, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, চীনের বেইজিং যখন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তখন আমরা শুধু পানি ছেটানোর কার্যক্রম দিয়ে কতটুকু সাফল্য পাবো তা ভাবার দরকার রয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। অথচ দিল্লির মতো ধুলাবালি মিশ্রিত কুয়াশার মতো ধোঁয়াশা দূষণ আমাদের নয়, আমাদের দূষণ আমাদের নিজেদের অসচেতনতার কারণে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গেলো ১২ থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত একটা জরিপ করে। তাদের জরিপের বিষয় ছিল, ঢাকার খোঁড়াখুঁড়ি। বাপার তথ্য বলছে, রাজধানীর ৪৬টি রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে, যা সাতদিন বা আরও বেশি সময় ধরে খোলা অবস্থায় আছে। ঢাকার আনাচে কানাচে, অলিগলি মিলিয়ে আরও বহু রাস্তা রয়েছে যা খোঁড়াখুঁড়ির কবলে পড়েছে, সেই তথ্য যোগ করলে সংখ্যাটা আরও বেড়ে যাবে সন্দেহ নেই। শরৎ, হেমন্তকালেই আমাদের মূলত রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি বেশি হয় (ওয়াসার কাজ, সিটি করপোরেশন কাজ, সড়ক নির্মাণ-সংস্কার ইত্যাদি)। শীত অব্দি যা চলে। এতে ধুলা-বালু-শুকনো মাটি উড়ে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে ক্রমান্বয়ে।

পরিবেশ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণ, রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মেট্রো রেল প্রকল্পের কারণে ঢাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কারণ এই রেলের কারণে যে পরিমাণ খোঁড়াখুঁড়ি চলছে এবং তা থেকে যে পরিমাণ ধূলিকণা বাতাসে মিশছে তা অকল্পনীয়। বায়ুদূষণ কমিয়ে আনতে নিয়মিত পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখাসহ বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে দফায় দফায় মেট্রো রেল প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে চিঠিও দেয়া হচ্ছে। নিয়ম না মানায় বাধ্য হয়ে সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ আর হচ্ছে কই! নির্দেশনার কিছুই প্রতিপালিত হচ্ছে না। তাই দূষণও কমছে না।

এই তো বছর দুয়েক আগেও মেট্রো রেলের কাজের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা হতো অথচ এখন তা হয় না। দেদারসে ধুলা উড়তে থাকলেও দেখার কেউ নেই! উল্টো কালশী, বৃহত্তর মিরপুর থেকে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বহু গাছ কেটে ফেলা হয়েছে প্রকল্পের স্বার্থে। সবচেয়ে বড় বড় গাছ কাটা পড়েছে, আগারগাঁও থেকে বিজয়স্মরণী পর্যন্ত। আমরা যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সোচ্চার, একটি গাছ কাটলে কম করে হলেও দুটি গাছ লাগানোর স্লোগান দেই, ঠিক এমন সময় গাছগুলো কেটে ফেলে বছরের পর বছর পার করে দেয়ায় বায়ুদূষণ তাই জেঁকে বসেছে।

ঢাকার বায়ুদূষণের আরও একটি বড় কারণ অবৈধ ইটভাটা। যার বেশিরভাগই চলে রাজনৈতিক পরিচয়ে। ঢাকাসহ এর আশপাশের পাঁচ জেলার সব অবৈধ ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২৬শে নভেম্বর নির্দেশনা দেয়া হয়, অর্থাৎ ১১ই ডিসেম্বরের মধ্যে এগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। এ কাজ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে আলোর মুখ দেখবে না নির্দেশনাটি। ঢাকা সংলগ্ন প্রায় ৫০ শতাংশ ইটভাটাই যথাযথ পরিবেশবান্ধব নয়। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরের এসব ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মোট দূষণের ৩০ শতাংশ অনায়াসে কমানো যাবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অর্থাৎ পরিস্থিতি এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, শুধু উদ্যোগ নিলেই প্রতিকার সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে ভাবলে, ধীরে ধীরে ইটের বিকল্প এবং ইটভাটার বিকল্প গড়ে তুলতে হবে। ইতোমধ্যে দেশে বিভিন্ন বহুতল ভবন তৈরিতে ইটের ব্যবহার না করে সিমেন্টের ব্লক কাজে লাগানো হয়েছে। সিমেন্ট আর নুড়ি পাথর দিয়ে কংক্রিটের ব্লক তৈরি করা হয়। ইট তৈরি করতে লাগে কৃষি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি, যা ইটভাটাতে পুড়িয়ে ইট বানানো হয়। এতে ধ্বংস হয় গাছপালা ও বনজসম্পদ। প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে এ কারণে। ২০৫০ সালের পর কৃষি জমি খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও রয়েছে, ২০২০ সালের মধ্যে সিমেন্টের ব্লকের ব্যবহার বৃদ্ধি করার। সেদিকেও নজর দিতে হবে এখনই। কারণ শুধু পরিবেশ নয়, এর সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিও।

এছাড়া সিটি করপোরেশনের ময়লা আবর্জনা ঠিকঠাক মতো পরিষ্কার করলে দূষণ আরও দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব। বহু রাস্তার মোড়ে পড়ে থাকে বর্জ্য। করপোরেশনের কর্মীরা নিজেদের খেয়াল খুশি মতো তাতে হাত দেন। দুই-তিনদিনেও তাতে হাত পড়েনি, এমন আবর্জনাও রয়েছে। তাৎক্ষণিক ময়লা পরিষ্কার করে ফেলা হয় এমন নজির কম। তাই তো নগরবাসীর সাধারণ অভিযোগ, এসব রাস্তা দিয়ে নাক চেপে হাঁটতে হয়। ময়লায় রাস্তার অর্ধেক দখল হয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় যানজটও। আবার যানবাহন ধীরে চলায় বেশি সময় ধরে দুর্গন্ধ সহ্য করতে হয় যাত্রী ও পথচারীদের। যেন খোলাভাবে কোনো ময়লা না পড়ে থাকে সেদিকেও নজর দিতে হবে শিগগির।

ফুটপাতের পাশে, রাস্তার কোণায় জমে থাকা বালু, শুকনো মাটির ধুলা পরিষ্কার করতে হবে প্রতিদিন এবং অবশ্যই তা মধ্যরাতে। পানি ছিটানোর কাজ প্রত্যেকটি সড়কে দুইবেলা করে করতে হবে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক করতে আইনের ব্যবহার করা হয়, কিন্তু পরিবেশ দূষণরোধে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে এখন মাঠে নামার সময় এসেছে। কারণ গাড়ির কালো ধোঁয়া কোনোভাবেই ছাড় পেতে পারে না। একই সঙ্গে মেট্রো রেলসহ সব রকম সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন নির্মাণ কাজে ডেঙ্গু দমনের সময়কালের মতো অভিযান জোরালো করতে হবে। রাস্তার পাশে বালু ফেলে রেখে নির্মাণ কাজ চালালে চাই জরিমানার বিধান। যেন কোনোভাবেই বালু, ধুলা, ময়লা, সুরকির গুড়া এসব পরিবেশের সঙ্গে মিশে না যায়।

একইভাবে বুড়িগঙ্গা ও হাতিরঝিলের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। বুড়িগঙ্গা ও হাতিরঝিলের দূষিত পানি বাতাসে উৎকট গন্ধ ছড়ায়। যা বায়ুকে আরও ক্ষতিকর করে তোলে বটে। বায়ুদূষণের প্রসঙ্গের আগেও এ নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। এবারও কি হবে? সে প্রশ্ন থেকেই যায়! অন্যদিকে সরকারের আরও এক উদাসীনতায় অবৈধ দখলে ঢাকার অধিকাংশ খাল। সেগুলো উদ্ধার করে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করাও জরুরি। যেগুলো খাল সচল আছে, সেগুলোও যে খুব পরিষ্কার তা নয়, তাই নজর দিতে হবে সার্বিক খাল পরিষ্কারেও।

জাদুর শহর ঢাকাকে নতুন করে বনায়নের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়েও চাই সমন্বিত উদ্যোগ। না হলে মুক্ত বাতাস নিশ্চিত করা দুরূহই হয়ে থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কী পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে, তার খতিয়ান প্রকাশ সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে ঢাকার ওপর অধিক জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ শুধু করতে হবে ধীরে ধীরে। সরকারি হিসেবে এ শহরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৬ হাজার মানুষ বসবাস করে। অর্থাৎ বাস্তবে এ হিসেব আরও লম্বা। প্রতিদিন বহু মানুষ ঢাকায় আসছে জীবিকা কিংবা পড়ালেখার কাজে। অফিস, ব্যাংক, পোশাক কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয় অনেক কিছুই ঢাকামুখী হওয়ায় ঢাকার এ দশা। ঢাকাবাসীকে বাঁচাতে তাই ঢাকার সংস্কার জরুরি।

দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকলে যে কারোই হতে পারে মারাত্মক রোগ। বৃদ্ধ, শিশু ও গর্ভবতী নারীর সমস্যা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। যারা ডাস্ট এলার্জিতে ভোগেন তাদের জন্যও এই পরিবেশ খুবই বিষাক্ত। হৃদরোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ-ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ (সিওপিডি), নিউমোনিয়াসহ চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে এমন বায়ুদূষণের কারণে। গর্ভবতী মা যখন দূষিত বাতাস থেকে শ্বাস নেন, তখন সন্তানের ফুসফুস ও মস্তিষ্কেও তা পৌঁছে যায়। এর কারণে গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়। ভূমিষ্ঠ শিশু হতে পারে প্রতিবন্ধীও। যা আমাদের গভীর উদ্বেগের কারণ। জাতিসংঘ বলছে, বায়ুদূষণ বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্যই বড় হুমকি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলন-২০২০-এর সমাপনী অধিবেশনে তুলে ধরা হয়, ঢাকার ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। যার বেশিরভাগই বায়ুদূষণ সংক্রান্ত রোগ। এ শহরের মানুষের মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়ুদূষণ, সংখ্যার হিসেবে যা, ১০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ (শ্বাসকষ্টে মারা যাচ্ছেন ৮ শতাংশ, কিডনি রোগে ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফুসফুসের রোগে মারা যাচ্ছেন ০ দশমিক ৫ শতাংশ)।

ঢাকার বর্তমানে বায়ুতে ব্ল্যাক কার্বনের উপস্থিতি রয়েছে ৬৫ মাইক্রো গ্রাম কিউবিক মিটার। কিন্তু সহনীয় মাত্রার এ কার্বন থাকা প্রয়োজন ২৫ মাইক্রো গ্রাম কিউবিক মিটার। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু থেকে প্রায় ২২ মাসের বেশি কমে যাচ্ছে। ভারতে যা কমেছে প্রায় ২০ মাস।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসের কারণে ঢাকায় দূষণের মাত্রা বেড়ে গেছে। এরমধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২.৫-এর কারণেই ঢাকায় দূষণ অতিমাত্রায় বেড়েছে। বায়ু দূষণের সূচকে ঢাকার সূচক ৫০ হলে তা দূষণের পর্যায়ে পড়ে না। কিন্তু ঢাকায় রয়েছে তারচেয়ে বেশি। এমনকি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের অবস্থাও করুণ। চট্টগ্রামেও বায়ুদূষণ ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকার মতোই সমস্যা বন্দরনগরীতেও। তাই শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয়, বাংলাদেশের বড় বড় শহর নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা জরুরি। অসচেতন হয়ে থাকলে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

বাংলাদেশে বায়ু দূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদফতর ও বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, দেশে বায়ু দূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে, ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এ তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। এই বাড়ন্ত গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অচিরেই। আদালতের নির্দেশনা মেনে ঢাকাবাসীকে বাঁচাতে অবৈধ ও পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করে দিতে হবে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া যেন না ছড়ায় সেজন্যে সড়কে সড়কে প্রয়োজন অভিযান, আর নির্মাণকাজে ডেঙ্গু দমনের মতো সিটি করপোরেশনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মীদের। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে জনপ্রতিনিধিদেরও। না হলে দিল্লিবাসীর চেয়েও করুণ পরিস্থিতি হবে ঢাকাবাসীর।

সৈয়দ ইফতেখার: সংবাদকর্মী ও লেখক

আপনার মতামত লিখুন :