চারে চার পাওয়া ওরা এত বোকা কেন?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ফাইনাল পরীক্ষায় সিজিপিএতে চারে চার পেয়েছে ওরা। কিন্তু দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত সাধারণ জ্ঞানের কিছু জিজ্ঞাসা করলে বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, জীবনে কোনো দিন এ ধরনের প্রশ্ন ওদের কর্ণগোচর হয়নি। দুঃখিত, উত্তরটা আমার জানা নেই, সেটাও মুখ ফুটে বলতে পারে না। ভাইভা দিতে বসে ওরা এত নির্বাক হয়ে যায় কেন? অথবা কোনো কিছু জানতে চাইলে ওরা এত দ্রুত ভড়কে গিয়ে বোকা বনে যায় কেন?

আসলে ওরা বোকা, না প্রশ্নকর্তারা বোকা, নাকি ওদের অভিভাবকরা ওদের ওপর চরম উদাসীন, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

আজকাল ফার্মের পাখি অথবা চারদিকে পাড় বাঁধানো পুকুর অথবা চৌবাচ্চার মধ্যে চাষের মাছের মত মানুষের বাচ্চাদের লালন পালন করা হয়ে থাকে। ওদের খাদ্য তালিকায় কৃত্রিমতা, নেই ব্যায়াম করার স্থান অথবা সুযোগ। এমনকি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ারও ফুরসৎ নেই। ওদের চারদিকে চোখ ঝলসানো আলো কিন্তু নিজের চোখের আলোর প্রখরতা কম। তাই ওদের অনেকেই ভারী কাঁচের চশমা পরে থাকে।

বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শহর-গঞ্জে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন, নার্সারি স্কুল, ক্যাডেট স্কুল, ক্যাডেট মাদ্রাসা ইত্যাদিতে বাচ্চাদের বিদ্যাশিক্ষার জন্য ভর্তি করানোর প্রতিযোগিতা চলে আসছে। পরিবারের মধ্যে বাচ্চারা ভালোভাবে কথা বলতে শেখার আগেই শিক্ষালয়ে ভর্তি করানোর পাঁয়তারা শুরু হয়ে যায়। বছরের পর বছর একই ক্লাসে ড্রপ দিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী বাচ্চাদের সুযোগমত ছোট ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। এটাও এক শ্রেণির বাবা-মায়েদের হীন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

এরপর শুরু হয় ভালো হাইস্কুল, ভালো কলেজে ভর্তি করানোর প্রাণপণ প্রচেষ্টা। যেহেতু আমাদের দেশে সব সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, জনবল ও লেখাপড়ার মান একই মানের নয়, তাই এ বিষয়টি নিয়ে চরম হতাশা ও প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। সন্তানরা চায় এক বিষয়ে পড়তে, অভিভাবকরা চান অন্য বিষয়ে পড়ুক। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ অথবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার বেলাতেও পছন্দ ও প্রাতিষ্ঠানিক গুণ-মানের বৈষম্যের বিষয়টি অদ্যাবধি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে।

আমার এক পরিচিতজনের সন্তান এ বছর একটি ছোট জেলা শহরের একটি পাবলিক মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। ওরা ঢাকা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। দুর্বিষহ যানজট, দূষণ ও নগর যন্ত্রণার সব খারাপ দিক ওদের চারিদিকে থাকা সত্ত্বেও ঢাকার আলো-বাতাস, পানি ওদের কাছে ভালো লাগে। তাই ঢাকা ছেড়ে কোনোভাবেই জেলা শহরে পড়তে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আমার আরেক পরিচিত জনের একমাত্র সন্তান শুধু মেডিকেলে পড়বে বলে এ বছর বিভাগীয় বা জেলা শহরের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা দেয়নি। যদিও ওরা সীমান্তের একটি জেলা শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। কোনো কারণে সেও ঢাকায় থাকতে চায়, পড়তে চায়।

সে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু সেখানে ভর্তি ফি অনেক বেশি, যা তার পরিবারের পক্ষে বহন করা কষ্টকর। এছাড়া ঢাকার যানজট, দূষণ ও নগর যন্ত্রণাগুলো হয়তো এখনও তার অজানা। ঢাকার মানুষের ভিড়, কোলাহল তার কাছে নাকি বেশ ভালো লাগে। তাই জেলা শহর ছেড়ে যেভাবেই হোক ঢাকায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়তে যাবে বলে বায়না ধরেছে। এভাবে সবার মন-মানসিকতায় ঢাকাকেন্দ্রিক অবগাহন আমাদের দেশে প্রান্তিক ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্যের দুষ্ট বলয় তৈরি করেছে। সেটা রাজধানী ঢাকাকে পৃথিবীর সবচে’ দূষিত ও বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত করে ফেলেছে।

সরকারি বা বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে মোট কত টাকা লাগে, সে তা জানে না। তার অভিভাবক ইতি-উতি খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে মোট কত লাখ টাকা লাগবে। এটা জানার পর মেয়ের বায়না পূরণ করতে গিয়ে তার রাতের ঘুম হারাম হবার যোগাড়। এছাড়া একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই বা মোট কত টাকা লাগে? একটি ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই বা মোট কত টাকা লাগে? জানা আছে কি সব অভিভাবকের? সেটার যোগান কোন অভিভাবক কীভাবে দিয়ে থাকেন, সেটাও হয়তো আমাদের অনেকের কাছে অজানা!

গতকাল একজন ডাকসাইটে মন্ত্রী মহোদয় আক্ষেপ করে বললেন-রাস্তায় নতুন ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করতে গেলাম। দেখি তার আগেই রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আইন বাস্তবায়ন করতে চাওয়ায় কারো কারো ব্যক্তি স্বার্থ অথবা ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত লেগে গেছে।

তাই ইতিবাচক পরিবর্তনে তাদের পর্যাপ্ত সাড়া নেই। সেজন্য এই ইতিবাচক পরিবর্তনে অবক্ষয় লেগে গেছে।

বর্তমান যুগে সবাই নামডাক অর্জন করতে চায়। সেজন্য বড় কোনো কাজের দায়িত্ব পেতে মরিয়া হয়ে লম্ফ-ঝম্প দিতে শুরু করে দেয়। যে যেটা করতে জানে না, সে সেটা করতে চায়। কিছু লোক আছে, যারা হম্বি-তম্বি করে পদবি বাগিয়ে নেয়, কিন্তু কাজের বেলায় ঠনঠন। এসব বড়কর্তাদের হাতে যখন প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব বর্তায় তখন স্বভাবতই ইতিবাচক উন্নয়ন না ঘটে নেতিবাচক উন্নয়ন বা অঘটন ঘটতে শুরু করে। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের উন্নয়ন প্রবণতা শুরু হওয়ায় উন্নয়ন কাজের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এতে উন্নয়নের বহিঃতহবিল দাতা থেকে শুরু করে স্বয়ং সরকারও অনেক ক্ষেত্রে বিব্রত।

অনেকে ভাবেন, মাথা কেন অপরাধ করবে? কেন ঘুষ খাবে? সৃষ্টিকর্তা সবাইকে কোনো প্রতিষ্ঠানের বস বা মাথা হবার দায়িত্ব দেন না। কোনো কিছুর বস হবে ক্লিন মানুষ, নিষ্কলুষ চরিত্রের ধারক ও বাহক। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু দুনিয়ার সবচে’ বড় বস, তিনি তো ঘুষ খান না। তাই আমরা তার আদেশ মেনে চলি। কিন্তু দেশের রাজারা তো নিষ্কলুষ নন। তারা আত্মগরিমায় ভেসে অনেক সময় বড় অপরাধ করেন। তাই তাদের কেন শ্রদ্ধা করব? আমার বস কোটি কোটি টাকা মেরে খেলেও সেটা অপরাধ হয় না, চুনোপুঁটিরা খেলে কেন অপরাধ হবে?

কঠিন প্রশ্ন। তাইতো সেদিন রাস্তায় অবৈধ গাড়ি পাকড়াও করতে গেলে চালক আক্ষেপ করে চিৎকার দিয়ে বলল- আমার গাড়ি ধরার আগে বিআরটিএকে বলুন ঘুষ নেয়া বন্ধ করতে। একই ধরনের কথা এক বছর আগে বলেছিলেন কুমিল্লার একটি আদালতের একজন সাধারণ কর্মচারী।
এসব কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। কারণ, মাথা পচলে পায়ের চিকিৎসা করে কোনো লাভ হতে পারে না। মাথার ব্যারামের চিকিৎসা পূর্বাহ্ণেই করা উচিত বলে আমি মনে করি।

অবক্ষয়টা কোথায় বেশি ঘনীভূত হয়েছে, তা আজ ওপেন সিক্রেট। এটাই সাড়ম্বরে প্রচার করা উচিত। দেশের সব প্রতিষ্ঠানের মাথাদের এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া উচিত।

কিছু দিন আগে রাজধানীর নামকরা স্কুলে ভর্তি হতে চাইলে বড় অংকের ডোনেশন দিলেই কাজ হয়ে যেত। এখন কয়েকটি নামকরা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ভর্তি হতেই ১৮-২০ লাখ টাকা লাগে বলে শুনেছি। তাদের গোপন ডোনেশন সিস্টেম রয়েছে। ভর্তির পর সেগুলোতে একজন শিক্ষার্থীর লাঞ্চ বা স্ন্যাকস খেতে প্রতিদিন পাঁচশ’ বা হাজার টাকায় সংকুলান হয় না। তাহলে মাসে কত লাগে? অথবা বছরে কত টাকা লাগে? কারো কারো জন্য সে এক এলাহি ব্যাপার। তাহলে দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার দরজা কি গরীব শিক্ষার্থীর জন্য খোলা নয়? কোথাও কোথাও স্কলারশিপের কথা বলা হয়। সেটাও তো মুখ চেনাদের জন্য বরাদ্দ। দেশে এই অবস্থা কেন সৃষ্টি হয়েছে? এর উত্তরটাও ঢাকাকেন্দ্রিক অনৈতিক শিক্ষা ব্যবসার নামান্তর। এটাও পরিবর্তনের অবক্ষয় বটে।

এদের শিক্ষার্থীরা ফাইনাল পরীক্ষায় সিজিপিএ-তে চারে চার পেয়ে যায় কীভাবে? সাধারণত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হারিয়ে এরা নিরুপায় হয়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। হঠাৎ করে এত ভালো ফলাফল সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। অথচ এদের সিংহভাগই দেরিতে ভর্তি হয় ডোনেশন দিয়ে।

চারের মধ্যে চার পাওয়া বেশ চমকপ্রদ একটা ব্যাপার। কিন্তু চারের মধ্যে চার পাওয়া ওয়ালারা যখন স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ইত্যাদি করে বিনা কষ্টে দেশের বড় বড় দায়িত্ব পেয়ে গদিনশীন হবে, তখন জবাবদিহিতা উধাও হয়ে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়ে যাবে। এভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়-ব্যয় সব কিছুতে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি হতে হতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বোকা হয়ে গেলে অচিরেই ভয়ংকর সামাজিক ভাঙ্গন সূচিত হয়ে দেশ রসাতলে যাবে। তাই এখনই অনৈতিক সুবিধাভোগী এসব চারে চার পাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নীতিমালা করার সময় এসেছে।

 

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :