যে বাড়ি ফেরাকে গ্লোরিফাই করা গেল না!

মাহমুদ মেনন, সাংবাদিক ও শিক্ষক
করোনার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মানুষ

করোনার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

‘নাঁড়ির টানে বাড়ি ফেরা’, ‘শেকড়ের টান’, ‘উৎসমূলে ফিরে যাওয়া’ এসব বলেই এই বাড়ি ফেরাকে আমরা গ্লোরিফাই করেছি অনেক। সংবাদমাধ্যমই এসব শব্দের আবিষ্কারক ও বহুলভাবে ব্যবহারকারী। বাঙালিতো এমনই। সামান্য সুযোগেও ঘরে ফিরে যেতে চায়। কী সুখে, কী দুখে। পরিবার পরিজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে চায় তারা হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা। এই মানুষগুলোর অধিকাংশই কোভিড-১৯ বুঝতে চায় না। বুঝতে চায় না নোভেল করোনাভাইরাস। না বুঝলে যে চলবে না-সে আমরা অনেকেই বুঝি। হয়তো তারাও বোঝে। জনসমাগম হলে এই ভাইরাস ছড়াবে- তাতে তাদের নিজেদেরই যে পড়তে হবে বিপাকে, বেঘোরে প্রাণ হারাতে হবে তাদেরই সে খবরও হয়তো এখন তাদের জানা। কিন্ত তাদের করারই বা কী আছে?

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দুটি উদাহরণ দিচ্ছি। বাসায় যে ছুটা বুয়া কাজ করে, তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে সপ্তাহখানেক আগেই। গতকাল এসেছিলো একমাসের মজুরি বাড়তি দেওয়া হচ্ছে সেটি নিতে। তখনই জানালো- বাড়ি চলে যাবে। কেনো যাচ্ছো? জানো না বাইরে বের হওয়া নিষেধ? সে প্রশ্নে বুয়ার উত্তর- ‘এক সপ্তাহ বইসা খাইছি- এই আপনাদের ছুটা কাম করি, আপনাদের মতো কয়েকটা বাসা থেইকাই দুই মাসের বেতন দিছে। কিন্ত আমার বেতন আর কয় টাকা। আমার স্বামী সিএনজি চালায়। তার তো ইনকাম বন্ধ হইয়া গেছে। বইসা খাইলে রাজার গোলাও ফুরায়। গ্রামে গেলেও তো খেতে হবে, সে মন্তব্যে বুয়ার উত্তর, জানিনা- মনডায় কইতেছে গ্রামে গিয়াই থাহি’।

কী উত্তর দেবেন এর!

ড্রাইভার ছুটি পেয়েই স্ত্রী-কন্যা নিয়ে বাড়িতে ছুটেছে। কারণ সে জানে, পুরো মাসের বেতন পেলেও গাড়ি চলছে না, ওভারটাইম মিলবে না। মানে মাসিক আয় কমেই যাবে। সুতরাং তার হিসাব নিকাশ বলছে কোনও রকম বাড়ি পৌঁছাতে পারলে সে পরিবার পরিজনের সঙ্গে ভাল কাটাতে পারবে। এই কথারও কোনো উত্তর নেই। হয়তো ঠিক একই গল্প অনেকের জন্য প্রযোজ্য। হয়তো নয়। কিন্তু এটা সত্য- প্রায় দুই সপ্তাহের ছুটি পেয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ফিরেছে গ্রামে। নাড়ির টানে কিনা জানিনা- তবে তারা ফিরেছে।

কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকিটের লম্বা লাইন

এখন ফিরেছে গ্রামে। পরিস্থিতি সামলে উঠলে আবার ফিরবে জীবিকার টানে। এই শহরেই। সংকটে যে শহরকে ছেড়ে যেতে দুইদণ্ড সময় নেয়নি সেখানেই ফিরবে। এরা গ্রামে ফেরে ভালোবাসার তাগিদে। শহরে ফিরে আসে স্রেফ জীবিকার আশে।

শহর থেকে এই যে মানুষগুলো চলে গেলো- তাতে করোনা বিস্তারের ঝুঁকি বেড়েছে তা সন্দেহ না রেখেই বলা যায়। এদের মধ্যে একজনও যদি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তিনি কিন্তু এরই মধ্যে শত মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়েছেন। পুরোটাই সন্দেহের। কিন্তু এই সন্দেহটি সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আর এর মধ্য দিয়ে গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হবে করোনা।

তবে এই ঘরে ফেরার কিছু ভালো দিকও রয়েছে। আমরা যে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের কথা বলছি- তা গ্রামে-গঞ্জে মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলে কিছুটা বেশিই সম্ভব হবে। এত চাপাচাপির শহরে মানুষগুলো থাকলে সংস্পর্শ এড়ানো কঠিনই হতো।

শহুরে মানুষের মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরা দিন আনে দিন খায়। শহরে যখন কাজ থাকেনা তখন তাদের রুজি-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা গ্রামে চলে যেতে চায়। কারণ সেখানে তাদের খরচ কম লাগে। বিষয়টি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা সঠিক তা অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলবেন। তবে ছুটা বুয়া যখন বললেন- ‘গ্রামে শাঁক-পাতা খাইয়াও থাহন যায়’- সে কথা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

যে কোনও দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলোই। আমরা তাদের সমালোচনাই করছি শুধু। কিন্ত ঘরে বসে তাদের পেটে যাতে দু-বেলা দুমুঠো ভাত পড়ে, সে দিকটা কি দেখেছি? না দেখিনি। এই করোনা সংকটে আমাদের সামনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা খবর মিডিয়ার কল্যাণে এসেছে। কানাডার সরকার এক মাসের জন্য বাড়িভাড়া মওকুফ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এক হাজার ডলার করে দিচ্ছে প্রতিটি পরিবারকে, জাপান সরকার নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তা দেবে বলে সরকারি তহবিল থেকে অনেক কিছুই করেছে। এবার জানা গেলো উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে তা নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বণ্টন করছে।

ট্রাকে করে ঘরে ফিরছেন মানুষ

আমাদের তো সে ব্যবস্থাগুলো নেই। আমরা যেখানে করোনা শনাক্ত করার কিটই পাচ্ছি না... চিকিৎসা ব্যবস্থা এরই মধ্যে অনেকটা ধসে পড়েছে বলা চলে, সেখানে এই মানুষগুলো শহরে থাকবেই বা কী করে? আর থেকেই বা কী করবে? যে দোকান কর্মচারীরা দোকানেই ঘুমাতেন দোকানেই খেতেন, তাদের দোকানগুলো আজ বন্ধ, তাদের গ্রামে যাওয়া ছাড়া আর গতিই কী। রাজধানীর প্রায় সবগুলো অফিসে যে অফিসবয়রা কাজ করতেন, তাদেরও অধিকাংশই অফিসের ভিতরে থাকেন। অফিস বন্ধ করা হলে তারা কোথায় যাবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ভ্যাকেড করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা কোথায় যাবে? রাজধানীতে বিভিন্ন মেসে থেকে পড়ালেখা করে যে শিক্ষার্থীরা কিংবা ছোট ছোট কাজ করে যে ব্যাচেলররা তাদের পক্ষে ওইসব ঘিঞ্জি মেসে অবস্থান করার চেয়ে গ্রামে যাওয়াই ভালো লাগবে। হ্যাঁ যাওয়ার পথে কিছুটা ঝুঁকি ছিলো বৈকি তারপরেও তারা গ্রামে ফিরে যেতেই পছন্দ করবে। তাদের আটকানো যাবে না।

আর ওই যে, নাড়ির টান, সে কথাটিকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না।

এখানে আমাদের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কিছুটা খামতি রয়েছে, সে কথা বলতেই হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও একটু আগে বন্ধ করে দেওয়া যেতো। তাতে অনেকেই স্ত্রী-পরিজন নিয়ে গ্রামে যেতে পারতো। সাধারণ ছুটি যেটা দেওয়া হলো সেটিও এক সপ্তাহ আগেই ঘোষণা করা যেতো। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের প্রয়োজন প্রকট হয়ে ওঠার আগেই মানুষগুলো বাড়ি যেতে পারতো। আর সেই যাওয়াকে গ্লোরিফাই করতে পারতো মিডিয়া। যা এখন আর করা সম্ভব হচ্ছে না। 

লেখক: মাহমুদ মেনন, সাংবাদিক ও শিক্ষক

আপনার মতামত লিখুন :