লকডাউনে দরিদ্রদের পাশে থাকা চাই

শরিফুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে দেরিতে হলেও সরকার ও জনগণ করোনার ভয়াবহতা বুঝতে শুরু করেছে। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে লকডাউন বা স্থবিরতা। চলবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। শুধু অতি প্রয়োজনীয় কিছু সেবা ছাড়া অন্য কোনো কারণে বাড়ির বাইরে বের হওয়া নিষেধ। এই নির্দেশ বাস্তবায়নে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে মাঠে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনীকে। সেনাবাহিনী নামানোর আগে মানুষ সতর্কতা অমান্য করে ঘুরতে বেড়িয়েছে, বিয়ের আয়োজন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি সরকারি দলও করোনার ‘করো না’ নির্দেশ তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি ঢাকায় একটি উপ-নির্বাচনও হয়ে গেছে।

সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করে সরকার দাবি করতে পারে, তারা তাদের চেষ্টা চালিয়েছে। সেটি হতে পারে। কিন্তু মানুষকে সেনাবাহিনী দিয়ে, পুলিশ-র‌্যাব দিয়ে ঘরে রাখার আগে ভাবতে হবে তার জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থা আছে কিনা। করোনা জীবাণু আক্রমণের শঙ্কা থাকলেও এর প্রভাব কিন্তু শ্রেণী ও অবস্থান ভেদে ভিন্ন। লকডাউনে বিত্তশালী ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের অযথা বের না হলেও চলবে। তাদের ঘরে হয়তো সঞ্চিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীর অভাব হবে না। সমস্যা হচ্ছে গরিবের।

কিন্তু যাদের দিনে এনে দিনে খেতে হয়, যাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, যারা রাস্তায় বাস ঘরে, ভিক্ষুক এবং শরণার্থী তাদের কতদিন ঘরে আটকে রাখা যাবে। তাদের কথা ভাবতে হবে সরকারকে। তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন জরুরি অর্থ প্রদান বা নিত্য দ্রব্যসামগ্রী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রতিবেশী ভারতের রাজধানী দিল্লির সরকার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। মহামারী করোনা যে গরিব মানুষদের ওপর অসহনীয় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে তা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেয়েছে দিল্লি সরকার। ২১ মার্চ অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সরকার গরিবদের জন্য সরকারি জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী, যেসব নিম্ন আয়ের ৭২ লাখ মানুষ সরকারি বিপণিবিতান থেকে নির্ধারিত মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী কেনে তাদেরকে আগামী মাসের জন্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত দেয়া হবে।

চলতি মাসের জন্য বিধবা, বিশেষভাবে সামর্থ্য ব্যক্তি ও বয়স্ক নাগরিকদের পেনশন দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেজরিওয়াল। এ সিদ্ধান্তের সুবিধা ভোগ করবে দিল্লির সাড়ে আট লাখ বাসিন্দা।

২৭ মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী, দিল্লি সরকার ২ লাখ আশ্রয়হীনকে প্রতিদিন দুপুর ও রাতের খাবার সরবরাহ করবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো নিয়মিত বেতন পাবেনই, বেসরকারি খাতে নিয়োজিত কর্মীদের এই সংকট সময়ে বেতন চালু করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছে দিল্লি সরকার।

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের রাজ্য সরকার আট কোটি মানুষকে বিনামূল্য চাল-ডাল-গম দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছেন, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন জনগণকে করোনা মুক্ত রাখা। এজন্য জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও জনসমাগম এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ লকডাউন চলতে পারে। কেননা, বাংলাদেশে এখনো করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে জানা যাচ্ছে না, যেহেতু শনাক্তকারী যন্ত্রের অভাব রয়েছে। সংকট রয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার। দীর্ঘদিনের লকডাউনে অনেক মানুষ করোনায় আক্রান্ত না হলেও না খেয়েই ‘মারা’ যেতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার ২৫ মার্চ রপ্তানিমূলক শিল্পখাতে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন-ভাতার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। কর্মী-শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করলে সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু কেনো রপ্তানিমূলক শিল্পখাতের জন্য এ প্রণোদনা? রপ্তানিমূলক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকেরা কেন তাদের কর্মীদের অব্যাহতভাবে বেতনভাতা দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছে না? সরকারিভাবে কেন তাদের কঠোর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে না?

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে বা জনবলকে সবল রাখতে সরকারকে সংকটকালীন সার্বিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে। শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পখাত টিকিয়ে রাখার জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করে বসে থাকলে চলবে না। দেশের জনগণের প্রাণ বাঁচানোই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একথার বাস্তবায়ন করতে হবে। ভিক্ষুক, আশ্রয়হীন, নিম্ন মধ্যবিত্তদের লক্ষ্য করে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের জন্য জরুরি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে বিনামূল্য বা নামমাত্র মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে চাইলে এই সংকটের সময়ে এই শ্রেণীর মানুষদেরকেও সচল রাখা চাই।

করোনায় সৃষ্ট সংকটে জনবলই প্রথমত হুমকির সম্মুখীন। এই জনবলকে সচল রাখতে হবে খাইয়ে, চিকিৎসা সেবা দিয়ে। এটি করা গেলে ধীরগতির হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকা ফের গতিময় করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। খাদ্যের অভাবে বা চিকিৎসার অভাবে কারও পরিবারের কোনো সদস্যের মারাত্মক ক্ষতি হলে সেটি অর্থনৈতিকভাবে হিসাব অসাধ্য। সেই পরিবারের স্বাভাবিক কর্মে ফিরতে লাগবে অনেক সময়, যেটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীর প্রাপ্তি সহজলভ্য করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারি খাদ্য দ্রব্য ও পণ্য সামগ্রী মজুদ করে সেগুলো সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুশৃঙ্খলভাবে সরবরাহ ও বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।  

এই সংকটকালে দেশের শিল্পপতি ও বিত্তবানদের জনসেবায় এগিয়ে আসা উচিত। সরকার দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতিদের অনুদান প্রদানের জন্য আহ্বান জানাতে পারে। এ জন্য ‘জরুরি তহবিল’ নামে একটি তহবিল গঠন করতে পারে যেখানে দাতারা অর্থ প্রদান করতে পারে। দান করতে শিল্পপতি ও বিত্তবানদের বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদানের কথা বিবেচনা করতে পারে, যেমন তাদেরকে সরকারিভাবে সম্মাননা ও স্বীকৃতি দিতে পারে, নির্দিষ্ট অনুদানের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণে কর মওকুফ করা যেতে পারে। সেই অর্থ মৌলিক সুবিধা বঞ্চিত মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও ওষুধ প্রদানে ব্যয় করতে পারে।

একই সঙ্গে সরকারকে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনা ঘোষণা করা উচিত। রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা অসম্ভব হলে, তাদের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা, নির্ধারিত সময়ের জন্য আয়কর মওকুফ করার কথা সরকার বিবেচনা করতে পারে। এসব ঘোষণার জন্য সরকারকে এও ঘোষণা দিতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের ছাটাই বা বেতন দেয়া বন্ধ করবে না।

সরকারের পাশাপাশি এই অতীব সংকটকালে দেশের প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের উচিত, তাদের প্রতিবেশী ও দেশবাসীর সহায়তায় আর্থিকভাবে এগিয়ে আসা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সম্প্রদায়ভিত্তিকভাবে মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত ও যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক কর্তব্য।

শরিফুল ইসলাম, পিএইচডি শিক্ষার্থী, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি

আপনার মতামত লিখুন :