হয় কারফিউ দিন, নয় সবকিছু খুলে দিন

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কারওয়ানবাজারে আমাদের অফিস ভবনটি ১২ তলা। আমি বসি ৮ তলায়। আমার রুম থেকে তাকালে বাংলামোটর পর্যন্ত দেখা যায়। মেট্রোরেলের কাজ শুরুর আগে দৃষ্টিসীমা ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় পর্যন্ত চলে যেতো। সাধারণ সময়ে যত দূর চোখ যায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি দেখা যায়। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর সেই রাস্তাই হয়ে যায় সুনশান। কিন্তু এই সুনশান অবস্থা প্রথম ২/৩ দিন ছিল। তারপর আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে থাকে।

এই লেখা যখন লিখছি (বৃহস্পতিবার, দুপুর ৩টা) জানালায় দাঁড়িয়ে দিগন্তে দৃষ্টি মেলে চমকে গেলাম। বাংলামোটর পর্যন্ত অন্তত একশ গাড়ি গোনা যাবে। এ কি সাধারণ ছুটি নাকি সাধারণ সময়ের ছুটির দিনের দুপুর? আমাকে প্রতিদিনই অফিসে আসতে হয়। তাই সাধারণ ছুটির এই আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ার চিত্র দেখেছি চোখের সামনেই। আজ সকালে অফিসে আসার সময় মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সামনের পার্কিংয়ে কোনো খালি জায়গা ছিল না। আর কোনো গাড়ি এলে সেটি রাস্তায় পার্ক করতে হতো। ট্রাফিক পুলিশ চাইলে এই সাধারণ ছুটির সময়েও রং পার্কিংয়ের জন্য জরিমানা করতে পারবেন। বাজারের সামনের ছবি দেখে ভেতরের অবস্থাটা আন্দাজ করা কঠিন নয়। আমাদের রিপোর্টার প্রতিদিন ঢাকার রাজপথে ঘুরে ঘুরে রিপোর্ট করেন। তার ছবিতেই কোনো কোনো বাজারের চিত্র দেখেছি। আর্মি বা পুলিশ গিয়ে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করে। তারা চলে এলেই আবার বাজার বাজারের মতো। আর অফিসে দাঁড়ালে তো কারওয়ানবাজারের চিত্র দেখাই যায়।

বাজারের ছবি দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না, এটা এখনকার ছবি। মনে হবে পুরোনো কোনো ছবি। দেখেশুনে আমার মনে হয়েছে, সরকার সাধারণ ছুটি দিয়েছে, প্রতিদিন বাজার থেকে টাটকা মাছ-মাংস-সবজি কিনে ভালোমন্দ খাওয়ার জন্য। বাজার থেকে ফিরে খেয়ে দেয়ে আয়েশ করে বিকেলে একটু ঘুরে বেড়ানো আর রাতে সিনেমা দেখার জন্য।

বাজারে গেলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই দেশ করোনার ভয়ংকর থাবার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই হাসিখুশি, কথা বলছেন, আড্ডা মারছেন। কারো কারো মুখে নামকাওয়াস্তে একটা মাস্ক আছে বটে। আর কোনো স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, শারীরিক দূরত্বের ভাবনা নেই। পুরান ঢাকার লোকজন বিকেল হলেই আড্ডা জমাচ্ছেন। মজাটা হলো আড্ডার সময় সবাই মাস্কটা নামিয়ে কাছে এসে কথা বলছেন। আড্ডা শেষে আবার মাস্ক লাগিয়ে নিচ্ছেন। এক সিগারেট তিনজনে ভাগ করে খাচ্ছেন। পাড়ার দোকানে চা খাচ্ছেন। তারপর করোনা মোকাবিলায় সরকারের কী কী ব্যর্থতা; তা নিয়ে বিশাল লেকচার দিতে দিতে বাসায় ফিরছেন আর মনে মনে ভাবছেন আমার করোনা হবে না।

শুরু থেকেই সরকারের সাধারণ ছুটি নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর অনেকে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবানসহ বিভিন্নস্থানে বেড়াতে গেছেন। আর সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর তো মানুষ ঈদের ছুটি ভেবে দলে দলে গ্রামে চলে গেছেন, সাথে নিয়ে গেছেন করোনাভাইরাস। দিন দশেক পরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে লারেলাপ্পা খেলে আমরা আরেকদফা করোনাভাইরাস ছড়িয়েছি সারাদেশে। একটা গ্লাসে ময়লা পানি নিয়ে অনেকক্ষণ রেখে দিলে আস্তে আস্তে ময়লাটা থিতিয়ে নিচে চলে যায়। তখন চাইলে আপনি ময়লাটা আলাদা করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু ময়লাটা ছড়ানো থাকলে কখনোই আলাদা করা যাবে না। কমপ্লিট লকডাউন করা গেলেই করোনাকে থিতিয়ে কোনঠাসা করে ফেলা সম্ভব। করোনা আক্রান্ত মানুষদের আলাদা করতে পারলে তাদের চিকিৎসা দেয়াও সহজ হবে। আর তাদের আলাদা করতে পারলে, করোনা ছড়াতেও পারবে না। কিন্তু আমরা করোনাকে থিতানোর কোনো সুযোগ দেইনি। বারবার ঘুটা দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে করোনাকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন সারাদেশকেই করোনার মহামারির ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। এই লেখা পর্যন্ত দেশের ৫৮ জেলায় করোনা রোগী পাওয়া গেছে। সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার পর এখন করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দৈত্যকে বোতলবন্দি রাখা সহজ। একবার বের করে ফেললে সেটাকে আবার বোতলবন্দি করা কঠিন।

কিছু ঘটলে আমরা সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আগে থেকে পরিকল্পনা করতে পারি না। পারি না বলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আল্লামা জুবায়ের আহমেদ আনসারীর জানাযায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম এবং আইনমন্ত্রী আনিুল হকের মায়ের জানাযায় শ' দুয়েক মানুষের জানাযা নিয়ে আমরা সমালোচনায় মেতে উঠি। দুটিই ভুল। এই সময়ে সব ধরনের জনসমাগমই বিপদজনক। দুই লাখ মানুষের সমাবেশ থেকেও করোনা ছড়াতে পারে, দুইশ মানুষের সমাবেশ থেকেও ছড়াতে পারে। কিন্তু তাই বলে এটা তো আর সম্ভব নয়— যে কেউ মারা গেলে তার জানাযা হবে না। এমনকি করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলেও তার জানাযা হয়। তাই এই সময়ে কেউ মারা গেলে তার জানাযায় সর্বোচ্চ কয়জন অংশ নিতে পারবে, নিলে তার নিয়ম কী হবে; এই বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। থাকলে এটা নিয়ে এত বিতর্ক হতো না।

সারাদেশে সাধারণ ছুটির মেয়াদ বারবার বাড়ানো হচ্ছে। পঞ্চমবার বাড়িয়ে আগামী ৫ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। আমার ধারণা এই ছুটি আরো বাড়ানো হবে। পরিস্থিতি যদি নাটকীয়ভাবে উন্নতিও হয়, তাতেও ঈদের আগে জীবনযাপন স্বাভাবিক হবে না হয়তো। কিন্তু অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিনের পর দিন এই সাধারণ ছুটি দিয়ে লাভটা কী হচ্ছে। সব ধরনের জনসমাগই করোনা ছড়াতে পারে। তবে করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে বড় দুটি জায়গা হলো মসজিদ আর বাজার। অনেক দেরিতে হলেও সরকার মসজিদে বাইরের লোকের প্রবেশাধিকার বন্ধ করেছে। কিন্তু আমরা সরকারকে ফাঁকি দিয়ে বাসার ছাদে জামাতের ব্যবস্থা করছি। এখন শুনছি বাসায় বাসায় তারাবির জামাতের আয়োজন করা হচ্ছে। আমরা আসলে কাকে ফাঁকি দিচ্ছি। সরকারকে না নিজেকে?

মসজিদ তাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। কিন্তু বাজারের ব্যাপারে যেন সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। আমি বুঝি না, মসজিদের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু সামাল দিতে পারলে সরকার বাজারের ব্যাপারে এত নরম কেন? কেউ ভাববেন না, আমি বাজার বন্ধ করার কথা বলছি। কারণ বাজার বন্ধ করলে মানুষ খাবে কী? কিন্তু বাজারে একটা নিয়ন্ত্রণ দরকার। স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব, পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার। বাজারে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক মনিটরিং দরকার। বাজার খোলা জায়গায় স্থানান্তর করা দরকার। আমি এমন অনেককে জানি, যারা পর্যাপ্ত বাজার করে রেখেছেন। অন্তত তিনমাস বাসা থেকে একেবারে না বেরুলেও চলবে। কিন্তু কাউকে আবার দেখি প্রতিদিনিই বাজারে যাচ্ছেন। বাজারে যাওয়াটা আসলে সবার অজুহাত। বাস্তবতা হলো এদের বাসায় থাকতে ভালো লাগে না। এই ‘ভাল্লাগে না’ গ্রুপ ঢাকায় বেশি। তাই ঢাকায় সংক্রমণও বেশি, মৃত্যুও বেশি। ঢাকার রাস্তায় বেরুলে এই ‘বেশি বেশি’র কারণ অনুসন্ধানে কোনো একাডেমিক গবেষণা লাগবে না। মানুষ বিনা কারণে বাসার বাইরে যায়। খলের যেমন কখনো ছলের অভাব হয় না। এই ‘ভাল্লাগে না গ্রুপের’ও অজুহাতের শেষ নেই।

টাউন হলের সামনে পার্ক করা এক গাড়িতে দেখলাম বড় করে ‘কিডনি রোগী’ লেখা। আমার কৌতুহল কিডনি রোগী তো হাসপাতালে যাবে, বাজারে কেন? আরেক গ্রুপ গাড়ির সামনে লাল কাপড়ে ‘জরুরি ঔষধ সরবরাহ’ লিখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পুলিশ আটকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে এবং এক মাসের জন্য গাড়ি জব্দ করেছে। আরেক জামাই শনির আখড়া থেকে মিরপুর শশুর বাড়ি যাচ্ছিলেন বেড়াতে। চতুর অনেকে পকেটে ব্যাংকের একটি চেক বা ডাক্তারের কোনো পুরোনো প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এক তরুণকে পুলিশ আটকালো, বললো, বাচ্চার খাবার আনতে যাচ্ছে। দয়ালু পুলিশ ছেড়ে দিল। কিন্তু সন্দেহ হওয়ায় দৌড়ে গিয়ে আবার আটকালো। জিজ্ঞাসাবাদে তরুণটি জানালো, সে আসলে বিড়ালের বাচ্চার খাবার আনতে যাচ্ছে। বিড়ালের বাচ্চার খাবার আনতে যাওয়াটাও আমাদের কাছে ‘অতি জরুরি’ কাজ।

এই ‘ভাল্লাগে না’ গ্রুপকে ঠেকাতে না পারলে আমাদের কপালে অনেক দুর্ভোগ আছে। আমাদের মানুষদের একটা বড় অংশ ‘আমরা করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী’ ওবায়দুল কাদেরের এই কথায় বা ‘করোনা সর্দি-জ্বরের মতো প্যারাসিটামল খেলে ভালো হয়ে যায়’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কথা বিশ্বাস করে বেড়িয়ে পড়েছে। আবার আরেক গ্রুপ ‘করোনা হলো আল্লাহর সৈনিক, মুসলমানদের করোনা হবে না, ইহুদি-নাসারাদের ধ্বংস করতে করোনা এসেছে, বাংলাদেশ নিয়ে করোনার প্ল্যান নাই’ হুজুরদের এসব কথায় বিশ্বাস করে বসে আছে। আর ‘রাখে আল্লাহ, মারে কে’ বা ‘হায়াত মউত আল্লাহর হাতে’ থিউরিতে বিশ্বাস করা লোকেরও কমতি নেই।

তবে এটা ঠিক একটা বড় অংশের মানুষ নিজেদের ঘরে আটকে রেখেছেন। কিন্তু তাতেও লাভ নেই। ‘অতি জরুরি কাজে’ বিড়ালের বাচ্চার খাবার আনতে বাইরে যাওয়া ‘ভাল্লাগে না’ গ্রুপ আপনার জন্য বাইরে থেকে করোনা নিয়ে আসবে ঘরে বা আপনার বিল্ডিংয়ে। তাই লখিন্দরের বাসর ঘরে থেকেও আপনি নিরাপদ নাও থাকতে পারেন। মজাটা হলো যে তরুণ বাইরে থেকে করোনা নিয়ে আসবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় সে হয়তো বেঁচে যাবে; কিন্তু জীবন-সংকটে ফেলবে বাসার বা ভবনের কোনো প্রবীণ সদস্যকে।

সরকারও বোধহয়, বিপুল সংখ্যক মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। পুরাই বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো দশা। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ না দিয়ে হাসপাতাল বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। অথচ করোনার বিস্তার ঠেকাতে পারলে হাসপাতাল অত লাগতো না। কিন্তু ঘনবসতির বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে গেলে হাসপাতাল বাড়িয়ে সামাল দেয়া কঠিন। সবসময় আমরা সহজ কাজটা ফেলে কঠিন কাজে মনোনিবেশ করি।

এখন সরকার দুটি কাজ করতে পারে। প্রথম কাজ হলো ‘সাধারণ ছুটি’র মতো মোলায়েম টার্ম ব্যবহার না করে লকডাউন বা কারফিউ জারি করা। জনগণকে বোঝাতে হবে ছুটি দেয়া হয়েছে, ঘরে থাকার জন্য, বাজারে যাওয়ার জন্য নয়। কেউ বাইরে বের হলেই তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করতে হবে, গ্রেফতার করতে হবে, কান ধরে ওঠবস করাতে হবে নইলে মাইর দিতে হবে। আসলে মাইরের ওপর ওষুধ নাই। নরম কথায় বোঝানোতে কাজ হবে না, হচ্ছে না।

আমি কথা দিচ্ছি, জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময়ে মানবাধিকারের প্রশ্নটিও স্থগিত রাখবো। বেঁচে থাকলে পরে পুলিশকে মনের খায়েশ মিটিয়ে গালাগাল করে দেবো। বাঁচতে হলে, বাঁচাতে হলে ঘরে থাকতে হবে, ঘরে রাখতে হবে। বিএনপি-জামাতকে ১২ বছর সাফল্যের সঙ্গে ঘরে আটকে রাখা পুলিশ চাইলে মানুষকে দুই মাস ঘরে আটকে রাখতে পারবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।

আর যদি মানুষকে ঘরে আটকাতে নাই পারেন, তাহলে সব খুলে দিন। ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিন। অর্থনীতিকে পঙ্গু করে সাধারণ ছুটির নামে এই প্রহসনের কোনো মানেই হয় না। যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো, সে টিকে থাকবে। সারভাইভাল অব দ্যা ফিটেস্ট। জো জিতা ওহি সিকান্দার।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিনএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :