নতুন উচ্চতায় ইসলামী ব্যাংক

মো: মোসলেহ উদ্দিন
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই জুন ২০২০ প্রান্তিক ব্যাংকিং খাতের জন্য সবেচেয়ে কঠিন ক্রান্তিকাল। একদিকে, বিনিয়োগ/ ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯% আদায় হার এবং আমানতে সর্বোচ্চ ৬% মুনাফা/ সুদাহার বাস্তবায়ন পরবর্তী ষান্মাসিক সমাপনী, তদুপরি কোভিড-১৯-এ বিধ্বস্ত অর্থনীতির ধাক্কা। পরিস্থিতি সামলাতে বিভিন্ন ব্যাংকের নানা হিসেব নিকেশের মাঝেই খবর—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এক লক্ষ কোটি টাকার আমানতের মাইল ফলক অতিক্রম করেছে, যা শুধু ব্যাংকের নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

১৯৮৩ সালে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সতের বছর অর্থাৎ ২০০০ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩২০০ কোটি আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। এরপর নয়া শতাব্দীর গত দু দশকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর আমানতের কলেবর দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেতে পেতে এই নয়া উচ্চতায় পৌঁছায় ব্যাংকটি।

আমানতের পাশাপাশি এ বছরের মে ও জুন মাসে অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে সর্বোচ্চ বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণ করেছে ইসলামী ব্যাংক। যার পরিমাণ মে মাসে ৪৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জুন মাসে ৫৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রেমিট্যান্স আহরণে ২০১৯ সালের জুন মাসের তুলনায় ২০২০ সালের জুন মাসে ইসলামী ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১৬ শতাংশ।

বর্তমানে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের মার্কেট শেয়ার ৩২ শতাংশ। বিধ্বস্ত আন্তর্জাতিক রেমিটেন্স বাজার পরিস্থিতিতে এমন সাফল্য—ব্যাংকটি নিজস্ব আমানত ও মুনাফা প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আহরণ বাড়িয়ে জাতীয় রিজার্ভে (বিদেশি মুদ্রার মজুদ) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

পথচলা যেখান থেকে
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটেই ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেসময় বাংলাদেশ তো বটেই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রথম ইসলামী ব্যাংকিং হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। কল্পনা থেকে বাস্তব এবং বাস্তব থেকে সফলতার মহাসোপানে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ব্যাপ্তি এখন জাতীয় পরিমণ্ডল পেরিয়ে আন্তজার্তিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত।

২০১২ সালে পৃথিবীসেরা হাজার ব্যাংকের তালিকায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক স্থান করে নিয়ে র‌্যাংকিং উন্নতির পাশাপাশি এ যাবত টানা অবস্থান ধরে রেখেছে।

প্রতিষ্ঠার এক দশক ইসলামী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সকলকে বলতে গেলে এক্সিপেরিমেন্ট এবং ‘ঠেকে শেখা’র মতো অধ্যায়গুলো পার করতে হয়েছে ধৈর্যের সাথে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ‘থিউরি থেকে বাস্তবে’ আসার প্রথম ঝুঁকিটা যেমন IBBL নিয়েছিল সে কারণে IBBL ব্যর্থ হলে কার্যত বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যত বলে আর কিছু বাকি থাকত না।

ফলে সমস্যার পাহাড় জয় করে IBBL-কে নিজের ভবিষ্যত যেমন রচনা করতে হয়েছে তেমনি রচনা করতে হয়েছে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভবিষ্যতও। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮টি ব্যাংক পরিপূর্ণ ইসলামিক ব্যাংক ও প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং ১৯টি শাখা মিলিয়ে প্রায় দশ হাজার শাখা এবং ১৯টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো খোলা ও সফল পরিচালনার পেছনের গল্পটা মূলত বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের সাফল্যের পরবর্তী ধাপ।

যে পথ দেখায় সে এগিয়ে থাকে
কথায় আছে “যে পথ দেখায় সে এগিয়ে থাকে”। IBBL বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পথ প্রদর্শক হিসেবে নিজেরা অর্জন করেছে হিমালয়সম সাফল্য। পাশাপাশি তৈরি করেছে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নয়া ভারসাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclussive) ব্যাংকিং ও গ্রাহক আস্থার নয়া মান। আমানত আহরণে তথাকথিত বিত্তবানদের উপগ্রহ না হয়ে সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে ব্যাংকিং সেবায় সম্পৃক্ত করাই ছিল সাফল্যের প্রথম ধাপ।

আন্তরিক সেবার মনোবৃত্তি এবং নিবেদিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের সাথে ব্যাংকটির সম্পৃক্ততায় এর আমানতের ভিত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানে কঠিন কংক্রিটের মানে উন্নীত। ব্যাংকটির এই আমানতের বড় অংশীদার দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ। সহজ প্রবেশাধিকার, স্বচ্ছন্দ সেবাপ্রাপ্তি, সহযোগিতামূলক আচরণই এ ব্যাংকটির সাধারণ গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ। তাই আজও এ ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা দিনদিন বেড়েই চলছে।

দারিদ্র্যের কষাঘাত জয় করে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় থাকা দেশীয় অর্থনীতির আদি ও সর্ববৃহৎ ভিত কৃষি খাতে বিনিয়োগের ধারণায় প্রাইভেট সেক্টর ব্যাংকিং-এ প্রথম উদাহরণ IBBL এবং এখনো এককভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণে অর্থায়নকারী। দেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের পথে বড় নিয়ামক “পোশাক শিল্প” উন্নয়ন বিকাশ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকায়।

অগ্রণী ভূমিকায়—বৈদেশিক রেমিটেন্স আহরণ সহজীকরণ এবং হুন্ডির বদলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স লেনদেন জনপ্রিয়করণেও। একক ব্যাংক হিসেবে সর্বাচ্চ পরিমাণে জাতীয় রেমিটেন্সের একতৃতীয়াংশ আহরণের রেকর্ডও এই ব্যাংকটির।

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচনে দেশে কোনো ব্যাংক হিসেবে এই ব্যাংকটির সাফল্য আকাশচুম্বী। এসএমই খাতের উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংক রোল মডেল। উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবা ও অর্থায়ন সহজীকরণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকার ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে দেশের অর্থনীতির সর্ববৃহৎ পাটাতন এই এসএমই খাত। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পায়নে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকাও অনন্যসাধারণ। আছে আমদানী-রফতানী খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য। সর্বোপরি কর্মসংস্থানবান্ধব এবং কল্যাণমুখী বিনিয়োগ নীতির অনুসরণের ফলে এ যাবত ব্যাংকের অর্থায়নের পরিচালিত ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে কোটির মানুষেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।


মো: মোসলেহ উদ্দিন
কবি, কলামিস্ট ও ব্যাংকার

আপনার মতামত লিখুন :