নৌ-দুর্ঘটনা: কারণ ও প্রতিকার

বদরুল হুদা সোহেল
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯১২ সালে টাইটানিক জাহাজ-ডুবির ধ্বংসযজ্ঞের মর্মন্তুদ কাহিনী আমরা শুনেছি এবং পরে চলচ্চিত্রের বড় পর্দায় দেখেছি। আরো অবগত হয়েছি অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত জোনাথন সুইফটের ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ কিংবা ডেনিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’র কাহিনী। উভয় ঘটনায় জাহাজ দুর্ঘটনার হৃদয়বিদারক দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে। তেমন মর্মন্তুদ-দৃশ্য যেন বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে নদীমাতৃক আমাদের এই বাংলাদেশে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়। তা হলো সাহিত্যের ভ্রমণকাহিনীতে জাহাজ দুর্ঘটনার কারণ বৈরি আবহাওয়া হলেও আমাদের দেশে এর অধিকাংশ কারণ আমাদের নিজেদের অবহেলা ও অদক্ষতা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট বড় ৭০০’র বেশি নদী জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। দেশে এখনো ত্রিশ শতাংশের বেশি লোক সুদীর্ঘ প্রায় ২৪১৪০ কিলোমিটার নদীপথ ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নগর, বড় শহর বা বাণিজ্যিক এলাকাগুলো কোনো না কোনো নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বিশেষত বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে নৌপথই হলো গণপরিবহন বা পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। এখনো অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে সড়ক বা রেলপথের সুবিধা না থাকায় নৌপথই যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, প্রতিবছর নৌ-দুর্ঘটনা শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান হলেও নৌ-দুর্ঘটনার ফলাফল তীব্রতর ও অধিক ভয়াবহ। যেমন ৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি বাস দুর্ঘটনা কবলিত হলে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ জনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু একই সংখ্যক যাত্রী নিয়ে কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনার শিকার হলে যাত্রী সংখ্যার অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর খবরই আসে। গত ২৯ জুন তারিখে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এসে “মর্নিং বার্ড” জাহাজটির দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

নৌ-দুর্ঘটনায় শোকের মাতম আরো বেশি এই কারণে যে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত দেহ উদ্ধার বা শনাক্ত করা গেলেও নৌ-দুর্ঘটনায় অনেক মৃতদেহ পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভবপর হয় না। চিরদিনের মতো সলিল সমাধি লাভ করে দুর্ঘটনা কবলিত মানুষেরা। তারা হারিয়ে যায় চিরদিনের মতো। স্বজনরা শেষ দেখা বা কবরের চিহ্ন দেখতে পায় না।

পত্রিকার বিবরণ বলছে, বিগত ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ছোট বড় ৫৭০টি জলযান পানির নিচে তলিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এগুলোতে প্রাণ যায় ৩৬৫৪ জনেরও বেশি লোকের। এদের মধ্যে ৪৮৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ হিসেবে থেকে বোঝা যায় যে, আহত ব্যতিরেকে বছরে অন্তত গড়ে ১৩০ জনকে প্রাণ দিতে হচ্ছে আমাদের নৌপথে। মৃতের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরো বেশি। কারণ, সব দুর্ঘটনা মিডিয়ায় আসে না।

২০০৯ সালে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার দায়রা নদীতে ফেরি দুর্ঘটনায় ৪৭ জনের প্রাণহানি, একই সালে ভোলাগামী এমভি কোকো-৪-এর দুর্ঘটনা, ২০১২ সালে মুন্সিগঞ্জমুখী ২০০ যাত্রী নিয়ে নৌকাডুবি, একই সালে মেঘনা নদীতে এমভি শরীয়তপুর-১-এর দুর্ঘটনা, ২০১৪ সালের এমএল পিনাক-৬ ও এমভি মিরাজ-৪-এর দুর্ঘটনায় ১০৩ জনের মৃত্যু, ২০১৫ সালে পদ্মা নদীতে ফেরি দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু, ২০১৬ সালে কীর্তনখোলা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, ২০১৯ সালে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার-ডুবিতে মৃত্যু ও গত ২৯ জুনে বুড়িগঙ্গায় ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চ ডুবে মৃত্যুর দৃশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর নৌ-দুর্ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ডিপার্টমেন্টে অব শিপিং (ডিওএস) বাংলাদেশের অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনার পেছনে এক যানের সাথে অন্য যানের সংঘর্ষকে দায়ী করেছে। উপরোল্লিখিত দুর্ঘটনাগুলোর কারণ ভিন্ন হলেও এক্ষেত্রে অনেক সাধারণ কারণও লক্ষণীয়। এগুলো হলো—১. ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মালামাল বা যাত্রী বহন। ২. চালকদের অবহেলা ও অদক্ষতা। ৩. যন্ত্রাংশে ত্রুটি। ৪. বৈরি আবহাওয়া। ৫. যানের ত্রুটিযুক্ত গঠন। ৬. অনিরাপদ নৌ রুট। ৭. যানের মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস। ৮. নৌযানের মধ্যকার সংঘর্ষ। ৯. লাইসেন্সবিহীন অপারেটর। ১০. রাডার বা রেডিও সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা। ১১. অত্যধিক স্রোত। ১২. নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণজনিত ঘাটতি ও ১৩. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগহীনতা ইত্যাদি।

আমাদের দেশে অতীতের দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে চালকদের অদক্ষতা আর অবহেলিত দুর্ঘটনার মাত্রা বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। বুড়িগঙ্গায় ‘মর্নিং বার্ড’-এর সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পেছনেও অপর নৌযান ময়ূর-২-এর চালকের অদক্ষতা ও অমনোযোগিতার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি আবহাওয়া ও যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত কারণও অন্যতম, যার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও কম দায়ী নয়।

নৌ যাত্রা সুরক্ষার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মিনিস্ট্রি অব শিপিং (এমওএস), ডিপার্টমেন্টে অব শিপিং (ডিওএস) ও বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআইডব্লিওটিএ) নামে সরকারের তিনটি বিভাগ রয়েছে। মিনিস্ট্রি অব শিপিং এর ওপর নৌপথ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত। আর সরকারের ক্ষমতাবলে সব ধরনের নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ যানের ফিটনেস পরীক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং (ডিওএস)। অপরদিকে বিআইডব্লিওটিএ নৌপথ ও যান নোঙ্গর-সংশ্লিষ্ট স্থানের নিরাপত্তা ও আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্যাদি প্রেরণ নিশ্চিতকরণের জন্য নিয়োজিত। লোকবল ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে বিভাগগুলোতে আশানুরূপ কাজের অগ্রগতিতে বিঘ্ন ঘটছে বলেও জানা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্রমতে দেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা মাত্র ৯৭২৫টি। এর বাইরে অনিবন্ধিত বহু নৌযান নৌপথে নিয়মিত যাতায়াত করছে এবং এদের দ্বারাও অনেক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ।

নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিতের জন্য ‘আভ্যন্তরীণ শিপিং অধ্যাদেশ -১৯৭৬’ রয়েছে, যেখানে নৌযান বা পরিবহন সংক্রান্ত আইন ও অমান্যকারীর শাস্তির বিধান সংক্রান্ত সকল বিষয় লিপিবদ্ধ আছে। আমার ধারণা এ বিষয়ে যানচালক, যান-মালিক বা যাত্রী কেউ তেমন অবগত নয়। তাই যান-মালিক, চালক ও যাত্রীদের স্বেচ্ছাচারী চলাচলের কারণে আমাদের বারবার দুর্ঘটনার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হচ্ছে।

নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একে অপরকে না দুষে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণের পথ। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রশাসনিকভাবে আরো সক্রিয় হতে হবে। নৌচালক, মাস্টার, বন্দর তত্ত্বাবধায়ক ও যান মালিকদের কর্মকাণ্ডও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সবিহীন চালক ও যানগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের নৌ পরিবহন সংক্রান্ত কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। আইন অমান্যকারীদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহায়তায় আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ বা এ জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাস্টার, চালক ও যান চালনায় সম্পৃক্ত সকলকে বাৎসরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বছরে একবার হলেও যানের ফিটনেস পরীক্ষা করতে হবে। বড় যাত্রীবাহী নৌকাসহ সকল লঞ্চ, জাহাজ বা স্টিমারে ওয়াটারপ্রুফ কক্ষ নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীবাহী বড় জাহাজ বা জলযানে জীবন রক্ষাকারী ছোট নৌকাসহ আনুষঙ্গিক উপকরণ আছে কিনা যাত্রার পূর্বেই তা পরীক্ষা করতে হবে।

যাত্রার অব্যবহিত আগে দুর্ঘটনার কবল থেকে উদ্ধার হওয়ার উপায় সংক্রান্ত নির্দেশনা যাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রদান করতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় লঞ্চে বা ফেরিতে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও যাত্রী সাধারণের অজ্ঞতার কারণে তা অব্যবহৃত থেকে যায়। সাঁতার না জানা যাত্রীদের জীবন রক্ষাকারী জ্যাকেট সরবরাহের ব্যবস্থাও করতে হবে।

অতিরিক্ত যাত্রী বহন কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে যাত্রীদের নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। কারণ ঈদ বা পুজাপার্বণে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখে বোঝা যায় যে, যাত্রীদেরও দোষ কোনো অংশে কম নয়। নৌযান কর্তৃপক্ষের বাধা উপেক্ষা করেও অনেকে অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করে দুর্ঘটনার পথকে ত্বরান্বিত করে থাকে। তাছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় অধিকতর দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালকসহ ভালো মানের যান চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ইঞ্জিনচালিত ছোট বড় অনেক নৌকা যাত্রী ও মালামাল পারাপারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এদের বেশিরভাগ যান বা চালকের নেই কোনো সনদ, নেই কোনো অভিজ্ঞতা ও লাইসেন্স। তাদের যত্রতত্র নৌ-চালনায় ছোট বড় দুর্ঘটনা লেগেই রয়েছে। এগুলোর প্রতি নজরদারি জোরদার করতে হবে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার দৃশ্য। বুড়িগঙ্গার তীরের কাছাকাছি এলাকায় ‘মর্নিং বার্ড’ ডুবে যাওয়ার পরবর্তীতে তা উদ্ধার করতে আসা উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’-এর পথিমধ্যে ব্রিজের সাথে সংঘর্ষ আমাদেরকে আরো ভাবিয়ে তুলেছে। উদ্ধারকারী জাহাজ নিজেই দুর্ঘটনার শিকার হলে উদ্ধার তৎপরতা প্রলম্বিত হবে। তাই দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর কাছাকাছি জায়গায় উদ্ধারকারী জাহাজের অবস্থান সর্বদা নিশ্চিত করতে হবে। উদ্ধারকারী জাহাজের ঘাটতি থাকলে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে মনোযোগী হতে হবে।

আমাদের দেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশে ভাড়ার স্বল্পতার কারণে মানুষ যাত্রা হিসেবে নৌপথ বেছে নেয়, এটাই স্বাভাবিক। আর আমাদের নৌপথ তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেলে সড়কপথে যানবাহনের ওপর চাপ, দূষণ ও দুর্ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। নৌপথের দুর্ঘটনাজনিত কারণে আমরা আর স্বজন হারানোর হাহাকার বা আর্তনাদ শুনতে চাই না। নৌপথ ও নৌযান যেন হয় নিরাপদের, নৌপথ ও নৌযান যেন হয় শান্তির, এটাই সকলের প্রত্যাশা।


বদরুল হুদা সোহেল
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।