মোঃ আরিফ জীবন নদীর অপর পাড়ের মানুষ

রেজা সেলিম
মোঃ আরিফ

মোঃ আরিফ

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা তরুণ সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আরিফ আকস্মিকভাবে মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে ’৯৮ সালের ১৮ জুলাই তারিখে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থাসমূহের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ভলান্টারি হেলথ সার্ভিসেস সোসাইটির (ভিএইচএস) কমিউনিকেশন শাখার প্রধান ছিলেন।

মোঃ আরিফ ছিলেন বহু-বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ প্রাণবন্ত একজন মানুষ। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আগে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একজন উল্লেখযোগ্য কর্মী ছিলেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে এমএ পাশ করে জনাব আরিফ সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সংবাদ সংস্থা এনা, মর্নিং পোস্ট এবং পরে দীর্ঘদিন কাজ করেন বাংলাদেশ অবজারভার-এ।

উল্লেখযোগ্য যে, ’৭৫ পরবর্তী পরিবর্তিত পটভূমিতে তৎকালীন সরকারের মধ্যস্থতায় স্বাধীনতা-বিরোধী হামিদুল হক চৌধুরী ‘অবজারভারে’র মালিকানা ফিরে পেলে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আরিফ দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ‘অবজারভার’ ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে ‘বাংলাদেশ ইকোনোমিস্ট’ নামে একটি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে যোগ দেন ভিএইচএসএস-এর প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবে। সে-সময়ে এই সংস্থার ক্রান্তিলগ্নে অপরাপর তরুণ কর্মীদের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ভিএইচএসএস-কে অচিরেই স্বাস্থ্য বিষয়ক উপকরণ তৈরি ও প্রকাশনাক্ষেত্রে এবং উন্নয়ন সাংবাদিকতায় নেতৃত্বদানকারী সংস্থায় পরিণত হতে সহায়তা করেন।

মোঃ আরিফ ১৯৮৮ সালে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এইডস শিক্ষা বিষয়ক একটি বাংলা বই প্রণয়ন করেন ‘এউডস কী’ শিরোনামে। প্রচুর বিরূপ সমালোচনার সত্ত্বেও বইটি তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। পরবর্তীকালে ভিএইচএসএস-এর এইডস কর্মসূচি প্রণয়ন, এইডস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠাসহ এইডস বিষয়ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে তিনি সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

১৯৮৮-এর বন্যায় তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে জাতীয় সমন্বয়কারী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ ইপিআই কার্যক্রম বাস্তবায়নে তাঁর অবদান ব্যাপক। ইউনিসেফের সহায়তায় তিনি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সামাজিক জাগরণে বিশেষ নিউক্লিয়াস ব্যক্তিত্ব হিসেবে কাজ করেন। এ সময় অসংখ্য উদ্বুদ্ধকরণ প্রকাশনার সাথে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এমনকি শিশুদের জন্য এ যাবৎকালে বাংলাদেশের সর্বাধিকসংখ্যক প্রচারিত স্বাস্থ্যবিষয়ক পত্রিকা ‘মিতালী’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও তিনি সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের গুরুদায়িত্ব পালন করেন সাফল্যের সঙ্গে।

পরবর্তীকালে মোঃ আরিফ ভিএইচএসএস-এর কৈশোর জীবন শিক্ষা কার্যক্রম প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যদিও এই সকল দায়িত্ব ছিল তার পেশাগত কাজেরই অন্তর্ভুক্ত, তথাপি তিনি এসব দায়িত্ব পালন করতেন সুগভীর দেশপ্রেম ও জাতীয় উন্নয়নের অকৃত্রিম কমিটমেন্ট থেকে। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ভিএইচএসএস-এর মাসিক বাংলা পত্রিকা ‘যোগাযোগ’ ও ইংরেজি ‘ইনটাচ’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ছিলেন।

মোঃ আরিফ ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সদালাপী ও সুরসিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তিনি সর্বক্ষেত্রেই ছিলেন সক্রিয়। অফিসের ভেতরে বাইরে যেখানেই হোক তিনি কখনোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে আপোস করেননি। প্রগতিশীল চেতনা ও উদার অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরিফ ছিলেন সহকর্মী ও পেশাগত সহযাত্রী বন্ধুদের জন্য বিশেষ অনুকরণীয়।

বেঁচে থাকলে মোঃ আরিফ এ সমাজকে আরো অনেক কিছু দিতে পারতেন। জীবদ্দশায় অনেক রচনা, প্রকাশনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনি সমাজের অগ্রযাত্রাকেই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। যে স্বাস্থ্যবান জাতির স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি আরিফ ছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিবেদিত প্রাণ এক মানুষ। আমাদের স্বাস্থ্য ও সমাজ উন্নয়নের ইতিহাস বর্তমানে জীবন নদীর অপর পাড়ে বসবাসরত এই মানুষটিকে নিশ্চয়ই তার যোগ্য আসনে সমাসীন রাখবে।


রেজা সেলিম
পরিচালক, আমাদের গ্রাম
ই-মেইলঃ e-mail: [email protected]