‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ লোকজ গান, কপিরাইট হীন উদ্দেশ্যে নেওয়া!



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি নতুন করে গেয়েছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ও শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন। গানটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে ইউটিউবে দেয়া ক্রেডিট লাইনে গানটির কথা ও সুর ‘লোকজ সঙ্গীত ও সংগৃহীত’ উল্লেখ করা হলে বাধে বিপত্তি। কপি রাইট অভিযোগ দেয় সরলপুর নামে একটি ব্যান্ড দল।

এরপর সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকে গানটি সরানো হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে এখনও বিতর্ক। সরলপুর ব্যান্ডের ‘কপিরাইট স্বত্ত্ব’ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। বিতর্কের শুরুতে অনুমতি না নিয়ে শাওন ও চঞ্চল গানটি গাওয়ায় সমালোচনার সম্মুখীন হন। তবে গানটিকে লোকজ সঙ্গীত দাবি করে আস্তে আস্তে তাদের দিকেই জল গড়াতে শুরু করেছে।

এদিকে ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি ‘লোক সঙ্গীত’ বলে দাবি করেছেন-লোক সংস্কৃতির গবেষকরা। এক্ষেত্রে গানটির কপিরাইট পুনঃবিবেচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


লোক সংস্কৃতি গবেষক ও নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটির কপি রাইট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই সঙ্গে সরলপুর ব্যান্ড ‘হীন উদ্দেশ্য চারিতার্থ করতে’ লোকজ একটি গানকে নিজেদের দাবি করে কপি রাইট স্বত্ব নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।


তথ্য-উপাত্ত, গ্রন্থের আলোকে ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি কোথা থেকে এসেছে, কোন সময়কার-এসবের উৎস নিয়ে এক ভিডিও প্রকাশ করেন সাইমন জাকারিয়া।

তার ভাষ্য মতে, রাধা-কৃষ্ণের গান লোকায়িত পরিমণ্ডলে এত চর্চিত হয়, তা ভাবাও যায় না। আর অনেক সময় এসব গানের রচয়িতার নামও পাওয়া যায় না।  

সরলপুর ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা, ভোকালিস্ট তরিকুল ইসলাম তপন গানটি তার রচিত বলে দাবি করেন। তার দাবির বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সাইমন জাকারিয়া জানান, বঙ্গীয় লোকসঙ্গীত রত্নকার, বাংলা লোকসঙ্গীতের কোষগ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য, ১৯৬০ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ৫৭৫-৭৬ পৃষ্ঠার শুরুতে আছে-


‘সর্ব জয় মঙ্গলা রাধে বিনোদিনী রায়/বৃন্দাবন মন্দিরে গাইব ঠাকুর কানাই/আজকে/রাধে কুম্ভ কক্ষে জল ভরিতে যায়/ ধীরে ধীরে চিকন কালা পিছে পিছে যায়’।  


গবেষক জাকারিয়া স্বপন জানান, এই লাইনগুলো ছাড়াও গানটিতে অপূর্ব কিছু শব্দ চয়ন আছে যা ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানে ব্যবহার করা হয়েছে।


এছাড়াও এই গ্রন্থের আরেকটি অংশে ‘বেজার কেন হব, কানাই, বেজার কেন হব/ভালো মন্দ দু’টি কথা কাছে কাছে বলিব’। এই গানটির অংশও সরলপুর ব্যান্ডের একটি গানে পাই যা ভোকালিস্ট তুরিন গেয়েছিলেন।


এখানে লক্ষ্য করা যায়, আশুতোষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত পাণ্ডুলিপির সঙ্গে কিভাবে মিলে যায় তুরিনের গাওয়া অংশটুকু। এতে বোঝা যায়, ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি লোকজ সঙ্গীতের ঐতিহ্য থেকে নেওয়া।

আরেকটু পরিষ্কার করার জন্য যদি আমরা দেখি- আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখা ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’ (২য় খণ্ড) গ্রন্থটি, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে।  বইটির ২১২ ও ২১৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে:


‘‘ছান করিয়া আইস্যা রাধে মেইলা দিলেন চুল/পিছন হইতে কিষ্টঠাকুর মেইলা মারলেন ফুল/ক্যানে কর কিষ্ট, অমন ক্যানে কর?/যমুনার জলে গিয়া তুমি ডুইব্যা মর।/কোথায় পাইমু হাড়ী কলসী, কোথায় পাইমু দড়ী?/রাধে, তুমি হও যমুনার জল, আমি ডুইব্যা মরি।”


পরবর্তীতে  ড. দীনেশচন্দ্র সেন এই গানটি ‘মহুয়া’ পালায় ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় গ্রন্থভুক্ত করেছেন।

‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি শুধু গ্রন্থে নয় হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিতেও পাওয়া যায় জানিয়ে সাইমন জাকারিয়া আরও জানান, আমরা বিভিন্ন প্রকাশনায় এই গানটির মিল পেয়েছি, এছাড়া প্রকাশনার বাইরেও হাতে লেখা খাতাতেও পেয়েছি। যা গ্রামের গায়করা তাদের পরিবেশনায় ব্যবহার করত। পাবনা থেকে আবিষ্কৃত শ্রী নেপাল চন্দ্র দাসের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির দুইটি খাতার ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় এ গানের দৃষ্টান্ত পাই ‘বাঁশি চুরি’ নামে একটি কবিতায়। ওই সময় চৈত্র সংক্রান্তিতে বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে উঠানে ঢাক বাজিয়ে পরিবেশন করা হত এসব গান।


বাংলা একাডেমির ফোকলোর উপবিভাগের সহপরিচালক জাকারিয়া বলেন, নিশ্চয় এই গানের সঙ্গে লোকজ সঙ্গীতের হুবহু মিল পাচ্ছেন আপনারা। তাহলে এ গানের স্বত্বাধিকারীর সম্পর্কে প্রশ্ন আসে না। এটি গ্রাম অঞ্চলের প্রচলিত একটি লোকজ গান। স্বত্বাধিকারীর দাবি চলে না।


‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ নিজেদের দাবি করলেও ২০১২ সালে চ্যানেল নাইনে দেওয়া এক সাক্ষৎকারে সরলপুর ব্যান্ডই গানটির উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার করে দিয়েছে বলে জানান সাইমন জাকারিয়ার। ওই সাক্ষাৎকারে ব্যান্ড দলটির ম্যানেজার আল আমিন গানটি বাউল সাধক থেকে সংগৃহীত বলে জানিয়েছিলেন। আল আমিন বলেছিলেন, ‘একজন বাউল সাধক ও তার স্ত্রী গানটি করত। লীলা কীর্তন নামে গানটি গাওয়া হত, তবে সাধকরা বলতেন এটা সমাপনী সঙ্গীত’।

তবে ব্যান্ড দলটি বাউল ও তার স্ত্রীর নাম বলেননি, তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল বাউলের নাম উল্লেখ করাটা। আসলে সরলপুর ব্যান্ড বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কপি রাইট নিয়ে হীন উদ্দেশ্য চারিতার্থ করেছে। আশা করব, ব্যান্ড দলটি ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’কে লোকায়িত গান বলে স্বীকার করে তাদের আগের বক্তব্যে ফিরে যাবেন।

তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে সবশেষে সাইমন জাকারিয়া ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি যে সমাপনী সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করা হত- বাউলদের পরিবেশনায় তার একটি ভিডিও ক্লিপ দেখান।

তিনি দাবি করেন তার ভিডিওর মাধ্যমে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-লীলা নিয়ে রচিত ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এরপর থেকে কেউ আর এ গানের স্বত্বাধিকার দাবি করবেন না। সবাইকে লোকজ গান হিসেবে ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি  গেয়ে উঠার আহ্বান জানিয়েছেন লোকজ সঙ্গীতের এ গবেষক।