ভূখণ্ডের পরিবর্তন হলেও, পরিবর্তন ঘটেনি তাঁর!

মো. রায়হান কবির শুভ্র
বাড়ির আঙ্গিনায় টঙ্ক আন্দোলনের নেত্রী কুমুদিনী হাজং

বাড়ির আঙ্গিনায় টঙ্ক আন্দোলনের নেত্রী কুমুদিনী হাজং

  • Font increase
  • Font Decrease

কুমুদিনী হাজং। বিপ্লবের জীবন্ত কিংবদন্তী। সংগ্রাম করেছেন ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে। এই কুমুদিনী হাজংকে ঘিরেই সেদিন ছড়িয়ে পরেছি লোটঙ্ক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৫০ সালে বাতিল হয় টঙ্ক প্রথা। সময়ের সাথে সাথে একে একে বিদায় নিয়েছেন সেই অগ্নি সময়ের বিপ্লবী সন্তানেরা। তাঁদের ভেতর শুধুমাত্র কুমুদিনী হাজং বেঁচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে।

বিরিশিরির উৎরাইল বাজার ধরে খানিক এগুলেই সোমেশ্বরী নদী। স্নিগ্ধ সোমেশ্বরী পার হয়ে পথেই পরলো টঙ্ক আন্দোলনের শহীদ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। সৌধের উঠানে রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে সোনালী ধান। এই ধান আর জমির জন্যই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিলো কুমুদিনী হাজংদের। সৌধকে পেছনে ফেলে কুমুদিনী হাজং এর বাড়ির পানে যাত্রা। সূর্য তখন মধ্য গগনে আলো ছড়াচ্ছে। এক পথিকের সহায়তায় সন্ধান পাওয়া গেলো কুমুদিনী হাজং এর বাড়ি। ছোট একখানা টিলার উপর ছোট্ট তিনটি ঘর। সেই ছোট মাটির ঘর আর একটি টিনের ঘরে সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর বাস। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে ভারতের কোনো এক আশ্রমে থাকে। আর দুই ছেলে দিন মজুরের কাজ করে। এদের নিয়েই আছেন তিনি। উঠান জুড়ে বাহারি ফুলের হাতছানি। বাড়ির উঠানে প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম তিন পতাকা তলের সংগ্রামী মুখ কুমুদিনী হাজং পাটায় পান সুপারি বাটছেন।

বারান্দায় বসে হামান দিস্তায় পান সুপারি বাটতেছিলেন কুমুদিনী হাজং

তাঁর সাথে দেখা করতে আসছে ঢাকা থেকে, এমন খবর পেয়ে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বলতেছিলেন, “ওমায়াগো কিতা করছুইন” ওনি তখন নিজেই ভারি ভারি পিঁড়ি এগিয়ে দিতে চাইলেন। এ যেন শাশ্বত বাংলার চিরায়ত আতিথেয়তার মনোলোভা দৃশ্যপট। বয়সের ভারে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন এই মহীয়সী, স্মৃতি ও বেশ ধূসর, আন্দোলনের সেই আগুন ঝরা দিনের কথা ভুলে গেছেন। কথা শুরু হতেই ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘আমি কেমনে কইতাম? সেই সব কিমনে আছে? এখন বয়স হইছে আর কত? এই বার আমারে বিদায় দাও। কোনোদিকে যাইতাম পারিনা আমি” কিছুক্ষণ থেমে বলতে লাগলেন, ‘এক বারতো আমি গেছিলাম গা ,ডাক্তার আমারে সুই ভরলো, আমি দেইখা রাগ হইছি। কইছি এটা কিতা দিছো? কিচ্ছু দরকার নাই। আমার এখন যাওনের সময়।’ 

ঘুরেফিরে কুমুদিনী হাজং শুধু বিদায়ের কথা বলছিলেন। নানা কথায় আলাপ অলিগলি অ্যাভিনিউ পেরিয়ে মহাসড়কে চলে গেলো। কথার ফাঁকে টঙ্ক আন্দোলন সম্পর্কে জানতে চাইলাম তবে বার্ধক্যজনিত কারণে বেশির ভাগ স্মৃতিই বিস্মৃতির অতল গভীরে তলিয়ে গেছে। এর মাঝেই তাঁর নাতনী লিপি হাজং ইতিহাসের স্বর্ণালী দিনের স্মৃতিচারণ করলেন। তাঁর আলোচনায় উঠে আসলো সংগ্রামের দিনগুলি।

১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি। শীতের সকালে গ্রামের বেশির ভাগ নারী-পুরুষ কৃষিকাজে ক্ষেতে খামারে কাজে গেছে। সকাল ১০টার দিকে বিরিশিরি থেকে ৪ মাইল উত্তর-পশ্চিমের এই বহেরা তলী গ্রামেই তৎকালীন ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর একটি দল কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজং এর খোঁজে বাড়িতে হানা দেয়। টঙ্ক আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ের নেতা লংকেশ্বর হাজং ও তাঁর ভাইদের গ্রেফতার করাই ছিল সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশ্য। ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার বাহিনীর বহেরা তলীর দিকে আসার সংবাদ পেয়েই লংকেশ্বর হাজং ও তাঁর তিন ভাই আত্মগোপন করে বিপ্লবী নেতা কমরেড মনি সিংহের গোপন আস্তানায় চলে যান। তাঁদের ধরতে না পেরে ক্ষিপ্ত সশস্ত্র সেনারা বাড়ির নারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে লংকেশ্বর হাজং এর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনীর কাছে জানতে চায় লংকেশ্বর হাজং কোথায়। কুমুদিনী হাজং ‘জানিনা’ বললে সেনারা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা কুমুদিনী হাজংকে বিরিশিরি সেনা ছাউনিতে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এই অবস্থায় বাড়ীর আরেক নারী সদস্য পাশের বাড়িতে গিয়ে কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ পৌঁছায়। এ সংবাদ হাজং অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষরা শিমনি হাজং এর নেতৃত্বে দিস্তা মনি হাজং, বাসন্তি হাজংসহ লাঠি, কাস্তে, দা, বটি নিয়ে প্রতিরোধ করে দাঁড়ায় এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কুমুদিনী হাজংকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে সশস্ত্র সেনারা নৃশংসভাবে তাঁদের ওপর গুলি চালায়। এতে রাশিমনি হাজং গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সুরেন্দ্র হাজংসহ আরও বেশ কয়েকজন এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় অন্যান্য হাজং নারী পুরুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সশস্ত্র সেনাদের উপর বল্লম ও রামদা দিয়ে হামলা চালায়। তাঁদের হামলায় ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর দুই সেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। বাকি সেনারা দৌঁড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। কৃষক নারীদের মধ্যে শহীদ হিসেবে রাশিমনি হাজং এর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। নিঃসন্তান হয়েও হাজংদের অধিকার ও নারী সংগ্রামের প্রতীকরা শিমনি হাজং সম্প্রদায়ে হাজং মাতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, আর কুমুদিনী হাজং হয়ে ওঠেন টঙ্ক আন্দোলনের প্রেরণার উৎস।

টঙ্ক আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গারো পাহাড়ের বহেরাতলী গ্রামে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ

কুমুদিনী হাজং সংগ্রাম করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও। এমন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জন্ম নিলো বাংলাদেশ। আমরা পেলাম স্বাধীন রাষ্ট্র। এই কিংবদন্তীরা জন্মেছিলেন বলেই আমাদের রয়েছে মাথা নত না করা সংগ্রামী ইতিহাস। যাদের শাসনে আজ ধরণী হলো সুন্দর কুসুমিতা মনোহরা তাঁরাই আজ কুসম শয্যা থেকে বঞ্চিত। তাঁদের ভাগ্যে জোটেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। তিন পতাকার রাষ্ট্র ব্যবস্থা, দুই শাসকের পতাকার পরাজয়ও ঘটেছে তাঁর চোখের সামনেই। তাঁর সামনেই উড়ে চলেছে লাল সবুজ পতাকা, পেয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ কিন্তু খুব বেশি কিছু পরিবর্তন ঘটেনি তাঁর জীবনের। রোগ শোক দুঃখ দৈন্য দশা তাঁর নিত্যসঙ্গী। হাত পায়ে মাঝে মাঝেই তীব্র ব্যথা উঠে, অসহ্য যন্ত্রণা পোহাতে হয় তখন। আর্থিক টানা পোড়নের কারণে সু-চিকিৎসা করাতে পারে না। রোগে শোকে ক্লান্ত তিনি। দারিদ্রতা থাকলেও যে জীবন তিনি বয়ে চলছেন এক কিংবদন্তীর জীবন। বন বিভাগের আওতাধীন এক টুকরো জমির উপর তাঁর বসবাস। ক্ষুধা আর দারিদ্রতা নিয়েই কেটে গেলো পুরো জীবন। সরকারী সুযোগ সুবিধা বলতে মাসিক বয়স্ক ভাতা ঐটাই সম্বল। শতভাগ বিদ্যুতায়নের এ যুগে তাঁর বাড়িতে নেই বিদ্যুৎ এর সুবিধা। জমি-ধানের জন্য তাঁদের লড়াই করতে হয়েছিলো সেই জমিও শেষ পর্যন্ত দখল হয়ে যায় পাকিস্তানি শাসন আমলে। তবুও মাথা নত করেননি। সংগ্রাম করেই কাটিয়ে দিলেন পুরোটা জীবন। এক বুক হাহাকার আর উদাস চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন ‘জমি জমা নাই, কিচ্ছু নাই। সব গেছে গা, এইখানে জঙ্গল ছিলো। সব সাফ কইরা সুন্দর কইরা যখন ঘর উঠাইছি তখন ফরেস্টার (বন বিভাগের কর্মী) আইসা কয় এইটা বন বিভাগের জমি। কি কই তাম?’ কিংবদন্তীর এই হাহাকার “রাষ্ট্র” শুনতে কি পায়?

পশ্চিম আকাশের সূর্য লাল আভা ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে ফিরতে হবে নীড়ে। আলোচনার ইতি টেনে বিদায় নিয়ে তাঁর বাড়ির ঢাল বেয়ে নেমে আসতে থাকি সমতল পথের দিকে, পেছনে ফেলে আসি অসমতল এক সংগ্রামী মুখ, যার ললা টেত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয়নি ডালি ভরে। বারেক ফিরে দেখি হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছেন সংগ্রামী এই নারী, যেন কোনো বিরান বন্দরে দাঁড়িয়ে জাহাজ ভর্তি স্বজনদের বিদায় দিচ্ছেন নিঃসঙ্গ এক মানুষ।

মো. রায়হান কবির শুভ্র, শিক্ষার্থী, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

আপনার মতামত লিখুন :