চট্টগ্রামের অগ্রণী সম্পাদক



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন

দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন

  • Font increase
  • Font Decrease

দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নামাজে জানাজা শেষে তাকে রাউজান উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী হাজীবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ৬৪ বছরে চিরবিদায় নিলেও তিনি মানুষের মনে অবস্থান করে আছেন তার কাজের মাধ্যমে। ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে চট্টগ্রামের এই অগ্রণী সম্পাদক শ্রদ্ধায় ও স্মরণের আলোয় উজ্জ্বল।   

বছরের পর বছর তসলিম চৌধুরী দুরারোগ্য রোগের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কিন্তু জীবনবাদী মানুষটি বেদনার কাছে হার মানেন নি। কর্মস্পৃহার উজ্জ্বলতায় সমাজে আলো ছড়িয়েছেন তিনি। অসুস্থতা সত্ত্বেও  কত প্রতিষ্ঠানে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। মানুষ ও সমাজের জন্য ঢেলে দিয়েছেন নিজের মেধা, শ্রম। 

স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী জীবদ্দশায় চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিউট চট্টগ্রাম চাপ্টারের সাবেক সভাপতি ছাড়াও বহু শিক্ষা, সামাজিক, বাণিজ্যিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও তিনি আরো বহু ব্যক্তি ও সংস্থাকে সুপরামর্শ দিয়ে পথ প্রদর্শন করেছেন।

নিজের অসুস্থতা ও বহুবিধ সামাজিক দায়িত্বের পরেও দৈনিক পূর্বকোণ ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। বলতে গেলে দিন ও রাতের অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকতেন পূর্বকোণ পরিবারের সঙ্গে। পিতার প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম রঙিন, ফটোকম্পোজে প্রকাশিত পত্রিকাকে দেশসেরা দৈনিকে পরিণত করতে তার প্রচেষ্টা ছিল দৃষ্টান্তমূলক।

শুধু চট্টগ্রামে কেন, পুরো বাংলাদেশের সম্পাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন কর্মে ও চিন্তায় অগ্রগণ্য। সংবাদপত্র যে কেবলমাত্র সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম ও নিছক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সামাজিক দায়িত্বশীল সার্বজনীন ইন্সটিটিউশন, তা তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। ফলে চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক-শিক্ষা-স্বাস্থ্য বিষয়ক অগ্রগতির বিষয়টি ছিল তার প্রধান বিবেচ্য বিষয়। পত্রিকাকে তিনি মনে করতেন সমাজ প্রগতির অনুঘটক।

প্রতি সপ্তাহে নানামুখী আলোচনা, গোলটেবিল আয়োজন করে তিনি একজন সমাজমনস্ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে ছিলেন অগ্রণী। দৈনিক পূর্বকোণ এ কারণেই চট্টগ্রামের মানুষ ও সমাজের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিল।

প্রায় তিরিশ বছর একটানা দৈনিক পূর্বকোণে 'সমকাল দর্পণ' নামে সাপ্তাহিক উপসম্পাদকীয় কলাম লেখার কারণে প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী সময় থেকে পত্রিকাটির সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরীর সময়ে আরো সুদৃঢ় হয়। তিনি একাধিক গোলটেবিল আলোচনায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি আরো কি কি বিষয়ে ভূমিকা পালন করা দরকার, সেসব বিষয়ও আলাপ-আলোচনা করতেন।

শিক্ষায়, চিন্তায়, নান্দনিকতায় তিনি কতটুকু ঋদ্ধ ছিলেন, তার সঙ্গে আলাপে টের পাওয়া যেতো। চট্টগ্রামে বসে আন্তর্জাতিক পরিসরে চিন্তাভাবনা করার সামর্থ্য ছিল তার। তার সঙ্গে আলাপের নানাভাবে তথ্যগত দিক থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। বিশেষত, প্রায়-নিয়মিতভাবে তার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন 'রিডার ডাইজেস্ট' উপহার পাওয়া ছিল চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা।

পিতার হাতে চট্টগ্রামের নেতৃস্থানীয় 'দৈনিক পূর্বকোণ'-এর জন্ম ও বিকাশকে তসলিম চৌধুরী যোগ্যতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তার সম্পাদনকালে পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। তিনি ছিলেন একজন সফল সম্পাদক।     

তিনি ছিলেন দৈনিক পূর্বকোণ এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী ও মরহুমা জহুরা বেগম চৌধুরীর বড় ছেলে। তার অপর দুই ভাইয়ের মধ্যে জসিম উদ্দিন চৌধুরী দৈনিক পূর্বকোণ-এর প্রকাশক ও পরিচালনা সম্পাদক এবং ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক ও বর্তমানে সম্পাদক। 

মরহুম তসলিম উদ্দিন চৌধুরী ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি নগরীর আন্দরকিল্লার রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে (সাবেক মেটারনিটি হাসপাতাল) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।  কর্ম ও কীর্তির মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের ইতিহাসে একজন যোগ্য সম্পাদকের আসনে অধিষ্ঠিত। আর সমাজের অসংখ্য মানুষের মনে স্মরণের আলোকমালায় প্রতিষ্ঠিত।