নিভৃতচারী খয়রা শুমচা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
রঙের বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এর শারীরিক সৌন্দর্য। ছবি: মুনির খান

রঙের বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ এর শারীরিক সৌন্দর্য। ছবি: মুনির খান

  • Font increase
  • Font Decrease

শরীরে তার দৃষ্টিনন্দন রঙের বাহার। বিচিত্র রঙিন শোভা দেহের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। সেই রঙের শোভাই এ পাখিটিকে দান করছে দারুণ নান্দনিকতা। প্রখ্যাত পাখি গবেষক শরীফ খান এ পাখি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘তার শরীরে আছে মোট ১৭টি রঙের আশ্চর্য-সুন্দর শৈল্পিক কারুকাজ। উড়লে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে রংধনুর সাতটি রঙের ঝলমলে আভা।’

এ পাখিটি লাজুক ও নিভৃতচারী। মানুষের আগমনসহ অপ্রত্যাশিত কোনো কিছুর উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না। মুহুর্তেই পালিয়ে যায়। পাতার ফাঁকে কিংবা ডালের আড়ালে। এ কারণেই হয়তোবা অনেকেরই দেখা হয়নি - এই অপূর্ব সুন্দর পরিযায়ী পাখিটিকে। কিছুটা সময় এরা আমাদের দেশে কাটিয়ে ডানায় ভর করে আবার ফিরে যায় অন্য  কোনো দেশের নিভৃত স্থানে। এই পাখিটির ইংরেজি নাম Hooded Pitta এবং Pitta sordida। এ পাখির অন্য বাংলা নামগুলো হলো- হালতি, রুমালমাথা শুমচা এবং নীল ফক্কি।

পাখি গবেষক ও আলোকচিত্রী মুনির খান বলেন, ‘এই পাখিটির নাম খয়রামাথা শুমচা। আমাদের দেশে এরা গরমকালের পরিযায়ী পাখি। শীতকালে এরা হিমালয় এলাকায় থাকে। এরা নিভৃতেই বিচরণ করে থাকে। চট্টগ্রামের হিলট্রেক এবং সিলেটের বিভিন্ন বনে এরা ঘুরে বেড়ায়। আমি মধুপুরেও এ প্রজাতির পাখিকে দেখেছি। চওড়া পাতাযুক্ত চিরসবুজ বন কিংবা পাতাঝরা বনের বাসিন্দা এরা। অল্প সংখ্যায় এরা আমাদের দেশে আসে। পনের, বিশ বা ত্রিশটি। এই অনুপাতে লাউয়াছড়ায় আমি এদের দেখেছি।

রঙের সৌন্দর্যের জন্য শুধু দেখতে মন চায় পাখিটিকে। ছবি: মুনির খান

শারীরিক বর্ণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এদের মাথাটা কালো। মাথার উপরের অংশ গাঢ় খয়েরি। লালচে বাদামি-জলপাই রঙের আভা ছড়ানো। পেটের নিচ নিচ দিকটা গাঢ় লাল। বুক-পেট সবুজ। ঘাড়-গলা কালো। ঠোঁট কালো। চোখ কালচে বাদামি। ডানার উপরের অংশ হালকা নীল। এদের দৈর্ঘ্য ১৯ সেমি. এবং ওজন ৬৫ গ্রাম। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর এদের প্রজননকাল। সাদা রঙের ৪ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। মেয়ে-ছেলে উভয় পাখি পালা করে ডিমে তা দিয়ে থাকে।’

তিনি আরো জানান, ‘এই খয়রামাথা শুমচা পাখির ছবিটির ছবি আমি ক’বছর আগে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে তুলেছি। মাটি থেকে এরা আড়াই ফুট-তিন ফুটের মধ্যেই বিচরণ করে থাকে। বেশি উপরে উড়াউড়ি করে না। ভেজা মাটি বা ভেজা বনতল এদের অধিকতর প্রিয় স্থান। এরা দেড় থেকে দু’শ স্কোয়ার মিটার এলাকায় উড়াউড়ি বা দৌঁড়-ঝাপ করে। তবে ওই এলাকা অবশ্যই তাদের খাদ্যে পরিপূর্ণ থাকতে হবে। প্রজনন মৌসুমের সময় ওদের ওই এলাকা ছেড়ে ওরা কোথাও যায় না। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে নানা জাতের কীটপতঙ্গ। এরা অন্য পরিযায়ীদের সাথে মেশে না। আলাদা নিভৃতে ঘুরে বেড়ায় এরা।’

পাখিটি খুব নিভৃতে বনে বিচরণ করে থাকে। ছবি: মুনির খান

মুনির আরো বলেন, ‘মজার ব্যাপার হলো, এরা বাংলাদেশে এসে ডিম পাড়ে এবং ছানা ফুটায়। এপ্রিলে আসে এবং সেপ্টেম্বরের দিকে চলে যায়। আমাদের দেশে এরা ৪ থেকে ৫ মাস অবস্থান করে। আমাদের দেশে এসেই এরা সন্তান উৎপাদনের জন্য পাগল হয়ে যায়। প্রচন্ড ডাকাডাকি করে তখন। বাঁশঝাড়ের গোড়ায় কিংবা নিচুগাছের গোড়ায় ঘাস ও পাতা দিয়ে বাসা করে। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

পৃথিবীতের ত্রিশটি প্রজাতির ‘Pitta’ বা ‘শুমচা’ পাখি থাকলেও আমাদের দেশে এ পাখিটির মোট পাঁচ প্রজাতি দেখা মেলে। এদের মধ্যে দুই প্রজাতি হলো আমাদের দেশের আবাসিক পাখি এবং অবশিষ্ট তিন প্রজাতির হলো পরিযায়ী পাখি বলে জানান তিনি।