মৃত্যুর ১৩৮ বছর পরেও জাগ্রত মার্ক্সের চিন্তাধারা



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লবে মিশে আছেন কার্ল মার্ক্স। সংগৃহীত

আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লবে মিশে আছেন কার্ল মার্ক্স। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পুরো নাম কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স। শুধু কার্ল মার্ক্স নামে তাবৎ দুনিয়ার রাজনৈতিক চিন্তার জগতে আলোড়ন জাগিয়েছেন। দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবেত্তা, সমাজ বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী, এমনই বহু পরিচয়ে ভূষিত তিনি। মানব ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয় তাকে। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ১৩৮ বছর পরেও বিশ্বব্যাপী জাগ্রত মার্ক্সের চিন্তাধারা।

মার্ক্স জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮১৮ সালের ৫ মে জার্মানির এক ইহুদি পরিবারে। তার বাবা হাইনরিশ মার্ক্স ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। মার্ক্স যখন বার্লিনের 'বন বিশ্ববিদ্যালয়'-এ পড়েন, তখন তিনি বাবাকে একটি চিঠি লেখেন, যার জবাবে মার্ক্সের বাবা লিখেছিলেন, 'তুমি শুধু ব্যক্তিগতভাবে তোমার এবং তোমার পরিবারের কথা ভাববে না, সমগ্র মানবজাতির কথা ভাববে।'

মার্ক্স জন্মগ্রহণ করেন জার্মানির তৎকালীন ৩৮ প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল প্রদেশ প্রুশিয়ায়। যদিও প্রুশিয়া জার্মানির সাথে পরবর্তীতে যুক্ত হয়। তার সহযোদ্ধা ছিলেন আরেক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, যিনি ছিলেন তাঁত শিল্পের মালিকের ছেলে। জীবনভর দুজনই একই রকম ভাবনা, চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। মার্ক্স যখন প্যারিসে তখন তার সাথে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয় এবং প্যারিসেই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়। পরবর্তীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাউদ্দীপক রচনা তারা যৌথভাবে প্রণয়ন করেন।

মার্ক্সের জীবন ছিল কঠিন, কষ্টকর ও সংগ্রাম মুখর। অধিকাংশ সময়েই তাকে কর্তৃপক্ষের সাথে নীতির প্রশ্নে আপোষহীন অবস্থানের জন্য পেশা বদল করতে হয়েছে। সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতা করলেও জার্মানি থেকে ব্রিটেনে দেশান্তরিত হয়ে শেষজীবনে তিনি পূর্ণকালীন লেখালেখিতে লিপ্ত হন। লন্ডনে থাকাকালীন কনকনে শীত এবং বাতাসের মধ্যে বাসা ভাড়া দিতে না পারার কারণে স্ত্রী জেনিকে- তিন সন্তানকে সাথে নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেও হয়। আর্থিক অনটনের কারণে বিনা চিকিৎসায় নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন কারণে তিনটি সন্তানেরই মৃত্যু ঘটে। এই অবস্থায় দাফন কাফন করার অর্থও ছিল না। এঙ্গেলস অর্থ না পাঠানো পর্যন্ত সন্তানদের দাফন-কাফন যেমন করতে পারেনি, তেমনি অভুক্ত থেকেছেন।

এমনই বিরূপতার মধ্যেও মার্ক্স চিন্তায় ছিলেন সজিব, যার প্রমাণ তার বিশাল রচনাবলীতে পরিস্ফুট। বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি 'দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী' দর্শনের দ্বারা। তিনি তার দর্শনের উপলব্ধিতে পৌঁছান 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ'কে গভীরভাবে উপলব্ধি ও ব্যাখা করার মধ্য দিয়ে।

পুঁজি, মূলধন, উদ্বৃত্ত মূল্য, শোষণ, বিপ্লব ইত্যাদি নানাবিধ মৌলিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিষয়ে কার্ল মার্ক্সের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখা-বিশ্লেষণে আকৃষ্ট হয়েছিল পৃথিবীর কোটি কোটি শোষিত, বঞ্চিত, সর্বহারা জনতা। মার্ক্সবাদের মতাদর্শে লাল পতাকা নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রক্তাক্ত পথে ঝাঁপিয়ে পড়েন লক্ষ লক্ষ মানুষ। কমিউনিজমের বৈজ্ঞানিক আবেদনে উদ্বুদ্ধ হন হাজার হাজার শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী। বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক-কমিউনিস্ট সরকার।

স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত ও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রায়নের সূচনা হলেও কালজয়ী রাজনৈতিক মতাদর্শ রূপে মার্ক্সের চিন্তাধারার আবেদন অদ্যাবধি অক্ষুণ্ন। বিশ্বব্যাপী লক্ষ-কোটি মেহনতি মানুষের আন্দোলন-সংগ্রাম-বিপ্লবে মিশে আছে কার্ল মার্ক্সের নাম। মৃত্যুর ১৩৮ বছর পরেও বিশ্বব্যাপী জাগ্রত মার্ক্সের রাজনৈতিক চিন্তাধারা