ফের খবরের শিরোনামে 'সুয়েজ খাল'



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
সুয়েজ খালে আটকে পড়া  এমভি এভার গিভেন। ছবি: সংগৃহীত

সুয়েজ খালে আটকে পড়া এমভি এভার গিভেন। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলজনক সমুদ্রপথ সুয়েজ খাল ফের খবরের শিরোনাম হয়েছে। অতীতে নানা রাজনৈতিক বা যুদ্ধের কারণে সুয়েজ খাল বন্ধ থাকলেও এবার প্রাকৃতিক কারণে জট দেখা দিয়েছে খালে। আর এতেই বিশ্বমিডিয়ার নজর পড়েছে সুয়েজ খালে।

বুধবার (২৪ মার্চ) বালিঝড়ের তোড়ে একটি কন্টেইনার শিপ নোঙ্গর ছিঁড়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আলোকচিত্রে দেখা যায়, মরুভূমির মাঝদিয়ে প্রবাহিত সুয়েজ খালের তীর ঘেঁষে একটি বিশালাকার কন্টেইনার জাহাজ আড়াআড়িভাবে মুখথুবড়ে রয়েছে এবং পাশে একটি ট্রাক্টর উদ্ধারকারীর ভূমিকা পালন করছে।

৪০০ মিটার লম্বা ও ৫৯ মিটার প্রশস্ত, দুই লাখ ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজটি উত্তরদিকে ভূমধ্যসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরে গিয়ে সংকীর্ণ খালটিতে আড়াআড়িভাবে আটকে যায়। এতে ওই এলাকায় মালবাহী জাহাজগুলোর জট তৈরি হয়।

এই ঘটনায় সুয়েজ খালের উভয়মুখে শতশত নৌযান আটকে যায় এবং খালের চলাচল ব্যাহত হয়। বিশ্বের নৌচলাচলের ১০% ভাগই সামাল দেয় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার যোগাযোগের নাভিমূল নামে খ্যাত সুয়েজ খাল। সুয়েজ খাল লোহিত সাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করেছে। এই খালটির কারণেই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সংক্ষিপ্ততম জলপথ উন্মুক্ত হয়েছে। এটি এশিয়া ও আফ্রিকাকে যুক্তকারী সরু ভূখণ্ড সুয়েজের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। ১৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথটিতে তিনটি প্রাকৃতিক হ্রদ আছে। সুয়েজ ছাড়া বিশ্বের অন্যন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হলো পানামা খাল, পারস্য উপসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগর।

সুয়েজে সঙ্কট সৃষ্টিকারী 'এমভি এভার গিভেন’ নামের জাহাজটিকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করার জন্য অনেকগুলো টাগ বোট কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু এটিকে সরাতে কয়েকদিন লেগে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। পানামায় রেজিস্ট্রিকৃত এভার গিভেন চীন থেকে মালবাহী কন্টেইনার নিয়ে নেদারল্যান্ডের বন্দর শহর রোটেরডামে যাচ্ছিল। প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার কারণে বালিঝড়ের তোড়ে জাহাজটি আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে। পূর্ণ জোয়ারের সময় জাহাজটিকে আড়াআড়ি অবস্থান থেকে সোজা করা না গেলে মাল নামিয়ে তা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে কয়েকদিন লেগে যেতে পারে, যা বিশ্ববাণিজ্য ও সমুদ্র-যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী  সুয়েজ খাল মিশরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত একটি কৃত্তিম সামুদ্রিক খাল। এটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। দশ বছর ধরে খননের পর পথটি ১৮৬৯ সালে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। উত্তরে ইউরোপ থেকে দক্ষিণে এশিয়া, উভয়প্রান্তে পণ্যপরিবহনে সুয়েজ খাল একটি জলপথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, এতে করে সম্পূর্ণ আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে আসতে হয়না।

সুয়েজখাল উন্মুক্ত হবার পূর্বে, কখনো কখনো পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে মিশরের স্থলপথ অতিক্রম করে, ভূমধ্যসাগর হতে লোহিত সাগরে এবং লোহিত সাগর হতে ভূমধ্যসাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজে পারাপার করা হত। এর ব্যপ্তি ভূমধ্যসাগরের পোর্ট আবু সাঈদ হতে লোহিত সাগরের সুয়েজ (আল-সুওয়েজ) পর্যন্ত।

ফার্দিনান্দ দে লেসেপ্স নামক একজন ফরাসি প্রকৌশলী এই খাল খননের উদ্যোক্তা। শুরুতে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১৬৪ কিলোমিটার (১০২ মাইল) এবং গভীরতা ছিল ৮ মিটার (২৬ ফুট)। বেশ কিছু সংস্কার ও সম্প্রসারণের পর ২০১০ সালের হিসাব মতে এর দৈর্ঘ্য ১৯০.৩ কিলোমিটার (১২০.১১ মাইল), গভীরতা ২৪ মিটার (৭৯ ফুট) এবং সর্বনিম্ন সরু স্থানে এর প্রস্থ ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট)। এর মধ্যে উত্তর প্রবেশ চ্যানেল এর দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার/১৪ মাইল, মূল খালে দৈর্ঘ্য ১৬২.২৫ কিলোমিটার/১০০.৮২ মাইল এবং দক্ষিণ প্রবেশ চ্যানেল এর দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার/৫.৬ মাইল।

সুয়েজ খাল একটি এক-লেন-বিশিষ্ট খাল, যাতে দুটি বাই-পাসের স্থান আছে, এগুলো হল বাল্লাহ বাইপাস এবং গ্রেট বিটার লেক। সুয়েজ খালে কোন লক বা ভিন্ন উচ্চতার নৌপথে জলযান নেবার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ গেট নেই। তাই সমুদ্রের পানি অবাধে এই খালের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সাধারণত, বিটার লেকের উত্তরদিকের খালে শীত কালে উত্তরমুখী স্রোত প্রবাহিত হয় এবং গ্রীষ্মে দক্ষিণমুখী স্রোত প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে লেকের দক্ষিণ দিকের খালে স্রোত সুয়েজের জোয়ার-ভাটার সাথে পরিবর্তিত হয়।

অনেক যুদ্ধ ও উত্তেজনার অতীত পেরিয়ে সুয়েজ খালের মালিকানা ও পরিচালনা মিসরের সুয়েজ ক্যানেল অথরিটির ওপর ন্যাস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, সুয়েজ খাল সব সময়েই যে কোন দেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত।