মাটিতেই জীবন কাটানো বিপন্ন পাখি ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
ল্যাঞ্জা রাতচরা। ছবি: ইনাম আল হক

ল্যাঞ্জা রাতচরা। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

সব পাখি যে শুধু গাছের ডালে বসে বা পাতার আড়ালে থেকে জীবন কাটায়- তা কিন্তু নয়। কিছু পাখি মাটিতেও বসবাস করে। মাটিকে আশ্রয় করেই পরিচালিত হয় তাদের জীবনপ্রবাহ। তবে এমন পাখি প্রজাতির সংখ্যা খুবই সীমিত।

আরেকটা কথা। আমাদের চারপাশ থেকে আজ নির্জন ঝোপঝাড়, পাহাড়ি জনমানুষহীন বনভূমি, দিনে লোকসমাগম কম হয় এখন এলাকাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্জন এলাকার মাটিকে কেন্দ্র করে টিকা থাকা এই পাখিটির অস্তিত্ব আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

শুধু তা-ই নয়, ডিম পাড়া থেকে ডিমে তা দেয়া এবং তারপর ছানাগুলোকে খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলার মাঝে মা পাখিদের রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রম। বন্যপরিবেশে পারিপার্শ্বিক সব ধরণের শত্রুর হাত থেকে নিজের ছানাকে রক্ষা করা মা পাখিদের কঠিন চ্যালেঞ্জ। শত শত বছর ধরে আর তারা এই চ্যালেঞ্জ গভীর মমতায় অসীম ধৈর্য্যের সাথে পালন করে তাদের প্রজনন এবং বংশধারাকে টিকিয়ে রেখেছে।

তবে দেশব্যাপী বন ও প্রকৃতিক পরিবেশ ক্রমশ বিপন্ন হওয়ায় কিছু কিছু পাখিদের টিকে থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ছানা তুলতে না পারায় বনের পাখিরা ক্রমশই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

দুই ছানার সঙ্গে ল্যাঞ্জা রাতচরা। ছবি: ইনাম আল হক

দুই ছানার সঙ্গে ল্যাঞ্জা রাতচরা। ছবি: ইনাম আল হক


 

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে যে কয়েকটা পাখি মাটিতে বাস করে তাদের মধ্যে ‘ল্যাঞ্জা রাতচরা’ (Large-tailed Nightjar) অন্যতম। মাটিতে বসবাস করা পাখিদের অবস্থা আজ খুবই খারাপ। কারণ আমাদের দেশে নিরাপদ মাটি নেই। এরা ‘সুলভ আবাসিক পাখি’ হলেও বিপন্ন হয়ে গেছে। নিরাপদ মাটি মানে নির্জন অবস্থান বা যেখানে মানুষসহ অন্যান্য পশু-পাখির উপস্থিতি নেই। শিশু থেকে মানুষ কিংবা বিভিন্ন পশুর উপস্থিতি সত্ত্বেও ল্যাঞ্জা রাতচরা একদম মাটির উপরে বাসা করে চিরকাল ধরে ছানা ফুটিয়ে আসছে। কিন্তু এখন আর পারছে না। এভাবেই তার জীবন অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে গেছে।’

যখন পৃথিবীতে মানুষ কম ছিল কিংবা অন্যান্য প্রাণি কম ছিল তখন থেকেই তারা এভাবেই করে এসেছে। এই অভ্যাস তো সে আর বদলাতে পারবে না। ফলে তার জীবন এখন অতি সংকটাপন্ন হয়ে গেছে বলে জানান ইনাম আল হক। 

তিনি আরো বলেন, ‘পোকা-মাকড় ধ্বংস করে পোকাখাওয়া পাখিদের জীবন তো এমনিতেই আমরা শেষ করে ফেলেছি। ল্যাঞ্জা রাতচরাও একটি পোকা খাওয়া পাখি। খাদ্য সংকটের পরেই রয়েছে তার প্রজনন সংকট। মাটিতে তাদের ডিম হলেও নানা কারণে তার ডিমটি টেকে না। কোনোক্রমে যদিওবা ডিমটি টেকে  কিন্তু ছানা ফুটলেও শেষ পর্যন্ত ওই ছানাটিও টেকে না। এমনি চরম অবস্থা তাদের।’

ল্যাঞ্জা রাতচরার ডিম। ছবি: ইনাম আল হক

ল্যাঞ্জা রাতচরার ডিম। ছবি: ইনাম আল হক


 

‘ল্যাঞ্জা রাতচরার ছানা বড় না হওয়া পর্যন্ত পুরো দুই মাস তাকে বনজঙ্গলের মাটিতেই বসে থাকতে হয়। কিন্তু আজ এমন নির্জন-র্নিঞ্ঝাট বনজঙ্গল কোথায় বলুন? একটি বনবিড়াল আসলেই শেষ! একটি কুকুর আসলেই শেষ!’

অন্যান্য দেশে এর অবস্থান সর্ম্পকে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তারা ভালই আছে এ জন্য যে সেখানে পতিত জমি অনেক পড়ে রয়েছে। সেখানে তারা র্নিঞ্ঝাট জীবন কাটাতে পারে। তাছাড়া পর্যাপ্ত খাদ্যসম্ভারও রয়েছে। ওখানে কেউ পোকা-মাড়ক দমনের কীটনাশক ছিটাচ্ছে না। সারাদিন তারা মাটিতেই থাকে। মাটিতেই ঘুমায়। প্রজনন সময়ে মাটিতেই বাসা তৈরি করে ডিম পেড়ে ডিমে তা দিয়ে ছানা ফোটায়। ছেলেপাখিটি খাবার এনে তা দিতে বসা মেয়েপাখিকে খাওয়ায়। আবার মাঝে মাঝে ছেলেপাখিটিও ডিমে তা দেয়।

ল্যাঞ্জা রাতচরা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৩ সিন্টিমিটার। এরা প্রশস্ত লেজের নিশাচর পাখি। ভোরে এবং গোধুলিতে এরা বেশি তৎপর থাকে এবং ডাকাডাকি করে। রাতে বন, তৃণভূমি এবং শষ্যক্ষেতের উপর উড়ে উড়ে পোকা খায়। দিনের বেলা কবরস্থান, বনের রাস্তা, ঝরাপাতার উপরে অথবা গাছের কান্ডে বুক লাগিয়ে ঘুমায় বলে জানান পাখি বিজ্ঞানী ইনাম আল হক।