করোনার তাণ্ডব ও ‘হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত’



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
করোনায় মৃত্যুপুরী দিল্লি। ছবি- সংগৃহীত

করোনায় মৃত্যুপুরী দিল্লি। ছবি- সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

১৩২৪ সালের শীতকাল। বাংলা অভিযান শেষ করে দিল্লি অভিমুখে রওনা দিয়েছেন তৎকালের ভারতের অধিপতি, দিল্লি ও গৌড়-বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক। ফরমানও জারি করেছেন, সেখানে পৌঁছে যেন তিনি নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে আর দেখতে না পান। শুনে মুচকি হেসে সুফি দরবেশ বলেছিলেন, 'হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত'। মানে, দিল্লি এখনো দূরে।

কেন দিল্লির দুর্বিনীত ও উদ্ধত শাসক গিয়াস উদ্দিন তুঘলক শায়েস্তা করতে চেয়েছিলেন সুফি সাধক নিজামউদ্দিন আওলিয়াকে? যুদ্ধরত দিল্লির সুলতান তাকে হত্যা করতে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছেন আর অন্যদিকে, শান্ত ও দৃঢ় নিজামউদ্দিন আউলিয়া কেবল এতটুকু বলেছিলেন, ‘হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত’। দিল্লি এখনো দূরে।

ইতিহাসের পাতায় ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ আছে। মূলকথা হলো, সুলতান তুঘলক এরপর আর তার সাধের দিল্লি নগরীতে আসতে পারেননি। পথেই তার মৃত্যু হয়। আউলিয়া সাহেবের উচ্চারিত  'হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত’ তথা দিল্লি এখনো দূরে, কথাটিই বাস্তবে সত্যে পরিণত হয় দাম্ভিক সুলতানের ভাগ্যে।

একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, দিল্লির সিংহাসনে বসেছেন নতুন এক রাজা। নাম তার গাজি মালিক। সদ্যই বসেছেন তিনি দিল্লির মসনদে। মনমেজাজ তার ফুরফুরে। নিত্যনতুন ফরমান জারি করছেন। যেহেতু নতুন রাজা হয়েছেন, নামটাও তার নতুন হওয়া চাই। তাই তিনি হুকুম দিলেন, উপাধিসহ তার নতুন নাম হবে সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক। রাজার ইচ্ছে বলে কথা। চালু হয়ে গেল নতুন নাম। সেটা প্রায় ৭০০ বছর আগের কথা।

শুধু নামকরণ নয়, সেকালের রাজাদের মাথায় চাপত নানান রকমের খেয়ালখুশি। খেয়ালের বশেই অনেক রাজা করতেন যা খুশি তা-ই। এতে কার কী অসুবিধা হলো, তাতে তাদের ছিল থোড়াই পরোয়া। 

দিল্লির নতুন রাজারও শখ জাগল নতুন রাজধানী বানানোর। এ তো অন্য কারও নয়, রাজার শখ। তাই সভাসদ, পারিষদ, উজির-নাজির সবার এক ধ্যান। নতুন রাজধানী বানাতে হবে। হলোও তৈরি নতুন নতুন প্রাসাদ, কেল্লা এই সব। রাজার নামের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রাজধানীর নাম দেয়া হলো তুঘলকাবাদ।

যে চারটি শহর নিয়ে আদি দিল্লি নগরী গড়ে উঠেছিল, তার একটি ছিল এটি। বিশ্ব পর্যটক ইবনে বতুতাও এ কথা লিখেছেন তার ভ্রমণকাহিনিতে। যদিও জাঁকজমকের কোনোই অভাব ছিল না, কিন্তু রাজার মৃত্যুর বছর দুয়েকের মধ্যেই শহরটা পরিত্যক্ত হলো।

কেন টিকল না শহরটা, তা নিয়ে একটা কাহিনি এই ৭০০ বছর ধরে চালু আছে। তা হলো, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার অভিশাপে শহরটা টেকেনি। তুঘলকাবাদ দুর্গ তৈরির সময় দিল্লির সব মজুরকে জোর করে কাজে লাগিয়েছিলেন রাজা। এই জবরদস্তি পছন্দ করেননি নিজামউদ্দিন আউলিয়া। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, 'ওই শহর টিকবে না'।

তুঘলক রাজার আমলে বাংলাদেশ ছিল ধনসম্পদে ভরা এক দেশ। সেকালে বাংলাদেশের সিলেট, সোনারগাঁ প্রভৃতি এলাকা ভ্রমণ করেছিলেন ইবনে বতুতা। যন্ত্রযান আবিষ্কৃত হওয়ার আগেকার পৃথিবীতে তার চেয়ে বেশি দেশ আর কেউই সফর করেননি। বাংলাদেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন: ‘সারা পৃথিবীতে আমি এমন কোনো দেশ দেখিনি, যেখানে জিনিসপত্রের মূল্য বাংলার চেয়ে কম।’

হাজার হাজার বছর আগে থেকেই বাংলার কাপড়, চিনি, মুক্তা প্রভৃতি রপ্তানি হতো সারা দুনিয়ায়। তাই বাংলার ওপর নজর পড়ল দিল্লির সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের। তিনি ঠিক করলেন, বাংলা দখল করবেন। রাজার কথা খণ্ডাবে কে? তলোয়ারের ঝনঝনানিতে কেঁপে উঠল দিল্লি-তুঘলকাবাদ। হাতি, ঘোড়া, সৈন্যসামন্তের মস্ত বাহিনী নিয়ে স্বয়ং রাজা রওনা দিলেন বাংলার দিকে। চারদিকে সাজ সাজ রব উঠল। শেষ পর্যন্ত রাজা পৌঁছালেন বাংলায়। সোনারগাঁ-লক্ষণাবতী-গৌড়ের শাসকদের বশে আনলেন। এভাবেই কবজা করলেন তিনি বাংলাকে।

অবশ্য খুব বেশিদিন দখলে রাখা যায়নি। বাংলায় কিছুকাল পরেই শুরু হয়েছিল স্বাধীন সুলতানদের রাজত্ব। তো, এই তুঘলক বংশের এক রাজার বাংলায় আগমন নিয়ে একটা গল্প চালু আছে। তা হলো, বাংলায় এসে ইলিশ খেয়ে সেই রাজা এমন মজাই পেলেন যে ইলিশ ছাড়া অন্য কিছু খেতেই চাইলেন না এবং শেষ পর্যন্ত ইলিশ খেতে খেতে মরেই গেলেন।

যা-ই হোক, বাংলা দখল করে সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের দিল্লি ফেরার সংবাদে আমোদ-উল্লাস আর তোরণ বানানোর ধুম পড়ে গেল। রাজধানীতে তখন অবস্থান করছিলেন রাজকুমার মুহম্মদ অর্থাৎ পরবর্তীকালের দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক। তো তুঘলক রাজারা যখন দিল্লির সুলতান অর্থাৎ রাজা হয়েছিলেন তখন খামখেয়ালির বশে যেসব কাণ্ডকারখানা করেছিলেন, তাতে আজও কোনো খামখেয়ালিপূর্ণ কাজকারবার দেখলে লোকে বলে তুঘলকি কারবার।

সেই তুঘলকি আমেজে বাংলা জয় করে সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক দিল্লি ফেরার পথে, তাকে বরণে প্রস্তুত যুবরাজ এবং পুরো দরবার। দিল্লির নিকটবর্তী আফগানপুরে রাজার সম্মানে নতুন বানানো মহলে এসে রাজা দুপুরের খাবারের জন্য বসলেন। আর যেইনা অন্যরা বাইরে গেছেন, অমনি হুড়মুড় করে মহলের ছাদ ভেঙে পড়ল চার পাঁচজন সঙ্গীসহ রাজার মাথায়। সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্গীদের নিয়ে মারা গেলেন রাজা। এই ঘটনা এমন হঠাৎ করে ঘটেছিল, কেউ ভাবতেও পারেনি যে এমন ঘটনাও ঘটতে পারে।

কিন্তু রাজার দিল্লি পৌঁছানো  যখন ছিল নিশ্চিত, তখনই নাকি নিজামউদ্দিন আউলিয়া প্রথমে বলেছিলেন, ‘দিল্লি দূর আস্ত’ অর্থাৎ দিল্লি অনেক দূরে এবং পরে বলেছিলেন, ‘হুনুজ দিল্লি দূর আস্ত’—মানে দিল্লি এখনো অনেক দূরে। এর অর্থ হলো, সবাই যখন ভেবেছিল দিল্লিতে তো তিনি পৌঁছাবেনই, কিন্তু নিজামউদ্দিন বুঝিয়েছিলেন, দিল্লি পৌঁছানো মোটেই সহজ নয়। এই কাহিনি থেকেই বাংলা ভাষায় ‘দিল্লি বহুদূর’ প্রবাদের প্রচলন হয়েছে। তবে যে কারণেই হোক বাংলা দখল করে ওই রাজার আর দিল্লি যাওয়া হয়নি। তার নিজের ও প্রিয় শহর তার কাছে দূরের অধরা শহর হয়েই রইলো।

মধ্যযুগের গতির তুলনায় সেই দিল্লি আর দূরের শহর নয়। দুই-আড়াই ঘণ্টার উড়ানে দিব্যি পৌঁছে যাওয়া যায় এই প্রাচীন শহরে। ফলে, বিশ্বায়নের নিকটবর্তী পৃথিবীতে 'হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত'। মানে, দিল্লি এখনো দূরে, কথাটি অচল। শুধু কাছেই নয়, নানাভাবে দিল্লি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারেও সক্ষম, যার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ভালো-মন্দের প্রভাব বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও আলোচনার বিষয়।

যেমন কিছুদিন আগে প্রবলভাবে আলোচনায় এসেছিল দিল্লির পরিবেশ তথা বায়ু দূষণের বিষয়টি, যা দিল্লিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল শহরে পরিণত করেছে। সেই দিল্লি এখন করোনার তাণ্ডবে মৃত্যুপুরী। করোনায় বিশ্বের চরম বিপর্যস্ত দেশ ভারতের বিপন্নতম রাজধানী এখন দিল্লি।

গত কয়েক দিন ধরেই দিল্লিতে কোভিড রোগীদের মৃত্যুমিছিল অব্যাহত। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দিল্লিতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১২ জনেরও বেশি রোগির মৃত্যু হয়েছে। দিল্লির করোনা পরিস্থিতি যে কতটা সঙ্গীন, তা বোঝা যাচ্ছে আরও একটি তথ্যে। গত সপ্তাহে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৫ জন করে আক্রান্তের মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছিল। তবে চলতি সপ্তাহে সে সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অক্সিজেনের জন্য চলছে হাহাকার। হাসপাতাল উপচে পড়ছে রোগি।

রোববার (২৫ এপ্রিল) দিল্লির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিগত ১৯ থেকে ২৪ এপ্রিল শহরে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭৭৭ জন আক্রান্ত রোগি। অর্থাৎ, ঘণ্টাপ্রতি গড়ে ১২ জনেরও বেশি রোগি মারা গিয়েছেন। অন্য দিকে, গত সপ্তাহে ১২ থেকে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে দিল্লিতে ৬৭৭ জনের মৃত্যু নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। প্রতি ঘণ্টার হিসাবে গড়ে যা ১০ জনের বেশি।

শুধু দিল্লি নয়, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারতের মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত-সহ একাধিক রাজ্যে দৈনিক সংক্রমণ হু হু করে বাড়ছে। রাজধানী দিল্লিতেও নতুন সংক্রমণ দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে। কোভিড রোগিদের ভিড়ে দিল্লির হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। করোনার চিকিৎসায় শুরু হয়েছে অক্সিজেনের হাহাকার। এই আবহে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৩৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কত দ্রুত গতিতে মৃত্যুমিছিল চলেছে, তা একটি পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়। স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, দিল্লিতে গড়ে ঘণ্টাপ্রতি মৃত্যুর হার হু হু করে বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যাচ্ছে। দিল্লিতে মৃ্ত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দৈনিক সংক্রমণের গতিকে বশে আনা যাচ্ছে না। চলতি সপ্তাহে তা ২৬.১২ থেকে ৩২.২৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।

করোনা মানুষে মানুষে, এমনকি বাতাসেও ছড়ায় বলে বিশেষজ্ঞরা যে দাবি করছেন, তা ভয়ের কারণ। ইউরোপে একদেশের কঠিন করোনা পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী দেশেও বিপদ ডেকে এনেছিল। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন পড়েছিল চরম বিপদে, করোনার যে বিপদ এখনো কেটে যায় নি। বরং ঘুরেফিরে আসছে।

ভারতের করোনার ভয়াল থাবাও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য অশনিসংকেত স্বরূপ। ফলে কঠিন ও এগ্রেসিভভাবে যদি সেফটি প্রটোকল না মানা হয়, তাহলে, বাংলাদেশে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ভারতের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। এজন্য মাত্র সপ্তাখানেক লাগবে।

বিশেষত ভারতের সঙ্গে লোক চলাচল অব্যাহত থাকলে এবং সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মান্য না করা হলে মারাত্মক বিপদ নেমে আসতে পারে। এরই মাঝে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা শতকের ঘরে রয়েছে এবং আক্রান্তের হারও ঊর্ধমুখী। সামনেই ঈদ। ফলে উৎসবের আবহে মেলামেশা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কাও বেশি।

চূড়ান্ত সতর্ক না হলে অনিবার্য এক ট্রাজেডি বন্যার মত ধেয়ে আসতে পারে। কারণ,  ভারতে যে দুটো ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে- ডাবল বা ট্রিপল মিউটেশন ভাইরাস, তা সারাবিশ্বে বিস্ময় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভারতের এই ডাবল কিংবা ট্রিপল মিউটেশন ভাইরাস যেন কোনোভাবেই দেশে আসতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কিন্তু মানুষ কতটুকু সতর্ক ও সচেতন? সমাজ ও মার্কেটের দিকে তাকালো এ প্রশ্ন আসতেই পারে। কারণ, দেখা যাচ্ছে সবাই মনের আনন্দে ও কেয়ারলেস ভঙ্গিতে সবকিছু করছে। যেন কোথাও কিছুই হয়নি!

এ কথা বলার কারণ হলো, রোববার (২৫ এপ্রিল) শপিংমল খুলবার আগেই যে ড্রেস রিহার্সাল ঢাকায় দেখা গেল, তাতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো চিত্র দেখা গেছে। করোনার তাণ্ডবে দিল্লির নিদারুণ অভিজ্ঞতাটি কেউ গ্রাহ্য করছে বলেও মনে হয় না। বরং সবাই যেন ৭০০ বছর আগের মতোই ভাবছে, 'হনুজ, দিল্লি দূর অস্ত', দিল্লি এখনো দূরে।

কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাস্তব পরিস্থিতি দিল্লির থেকে খুব দূরে নয়! তুঘলক বাদশাহর মাথায় ছাদ ভেঙে পড়ার মতো করোনার বিপদ যেকোনো সময় এসে আপতিত হতে পারে সবার মস্তকে। ফলে সকল স্তরে এবং সকলের কাছে সর্বাধিক সতর্কতা ও সাবধানতাই কাম্য।