হিটলারপন্থী নাৎসি গ্রাম!



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
হিটলারের স্মৃতি এখনও জাগ্রত। ছবি: সংগৃহীত

হিটলারের স্মৃতি এখনও জাগ্রত। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

হিটলার মরে গেছেন এবং নাৎসিদের পরাজয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটেছে ৭৬ বছর আগে। অবাক কাণ্ড হলো, খোদ জার্মানিতে এখনও রয়েছে হিটলারপন্থী নাৎসি মতাদর্শিক একটি গ্রাম!

গ্রামের সমস্ত মানুষ নাৎসি-ভঙ্গিতে ডান হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন ‘হেইল হিটলার’! জার্মানির পূর্বাঞ্চলে রয়েছে এমনই এক গ্রাম। জার্মানির পুলিশের খাতায় সেই গ্রামের পরিচয় ‘নিও-নাৎসি ভিলেজ’। বালটিক সাগরের অদূরে এমনই হিটলাপ্রেমী গ্রামের নাম ইয়ামে।

পুরনো পার্সি ইঁটের মাত্র ১২টি বাড়ি নিয়ে গঠিত ইয়ামে গ্রাম। আর তাকে ঘিরে আছে গভীর বনভূমি এবং বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। এমনিতে বেশ মনোরম। তবু জার্মানির কোনো মানুষ এই গ্রামের আশেপাশে যাওয়ার সাহস পান না।

তবে তিন দশক আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। বাকি সমস্ত গ্রামের মতোই এখানেও নিশ্ছিদ্র শান্তি বিরাজ করত। ঠিক এই সময় নাৎসিপন্থী নেতা স্বেন ক্রুগারের উত্থান হয় ইয়ামে গ্রামে। নাৎসি আদর্শকে সামনে রেখে তিনি তৈরি করে ফেলেন একটি রাজনৈতিক দলও। জার্মানিতে সেই দলের গ্রহণযোগ্যতা শূন্য হলেও ইয়ামে গ্রামের প্রত্যেকেই তাঁর আধিপত্য মেনে নিয়েছেন।

পুলিশের খাতায় একাধিক কেসে নাম আছে স্বেন ক্রুগারের। খুন, রাহাজানি থেকে শুরু করে দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেওয়া, যাবতীয় অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন একাধিকবার। কখনও তিন বছর, কখনও পাঁচ বছর কারাগারে দিন কাটিয়েছেন। আবার ফিরে গিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছেন।

এই নব্য হিটলারপন্থী নেতা পুরো গ্রামকে সাজিয়েছেন নাৎসি পোশাকে। প্রবেশপথেই চোখে পড়বে এক বিরাট দেয়ালচিত্র। একটি আর্য পরিবারের ছবি। আপাত নিরীহ এই ছবিটিই ছিল নাৎসিদের আর্য জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতীক। এই দেয়ালচিত্রের কিছু দূরেই আছে এক বিরাট কাঁচের শো-কেস। তার মধ্যে নিপুনভাবে সাজানো নাৎসি শাসনের সময়কার নানা দলিল। হলোকাস্টের যাবতীয় নির্মমতার তথ্য। আছে গুয়েরিনের নেতৃত্বাধীন বাছাই করা গেস্টাপোদের ছবিও। এই সমস্ত ছবি সামনে রেখেই নাৎসি আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রুগার।

শুধুই বড়োরাই নয়, ছোটোদের মধ্যেও ক্রমাগত নাৎসি আদর্শের বিষ ছড়িয়ে চলেছেন ক্রুগার। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থাও বাকি জার্মানির থেকে আলাদা। হিটলারের হাতে যে নাৎসি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তাই এখনও চলে ইয়ামে গ্রামে। প্রতিদিন বিকালে পার্কে দাঁড়িয়ে চলে মিলিটারি প্রশিক্ষণ। সব মিলিয়ে হিটলারের শাসনাধীন জার্মানিকেই দেখতে পাওয়া যাবে এই গ্রামে।

তবে এর মধ্যেও একটিমাত্র নাৎসি বিরোধী পরিবার বাস করে ইয়ামে গ্রামে। বহু অত্যাচার এবং হুমকিতেও তাঁরা গ্রাম ছেড়ে যাননি। বরং ক্রুগারের আধিপত্য থেকে ইয়ামেকে মুক্ত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৪ সালেই এখানে বাসা বাঁধেন হোর্স্ট এবং বিগিট লোহমিয়ার। বারবার তাঁদের বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। তবে এই সময়েই লোহমিয়ার পরিবারের সুরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে পুলিশবাহিনী। ক্রুগারকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করতে না পারলেও সবসময় গ্রামের উপর নজর রেখেছে পুলিশ। অন্যদিকে ক্রুগারও তাঁর বিরাট বাড়িকে রীতিমতো দুর্গে পরিণত করেছেন। ২০০টি অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে সবসময় প্রস্তুত থাকে তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী।

লোহমিয়ার পরিবার অবশ্য এই যুদ্ধে সংস্কৃতিকেই হাতিয়ার করে তুলতে চান। আর তাই নিজের বাড়ির বাগানে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে আয়োজন করেন এক বিরাট নাৎসি-বিরোধী সঙ্গীতানুষ্ঠান। ২০০৭ সাল থেকেই এই অনুষ্ঠান চলে আসছে। জার্মানির এমন কোনো রকস্টার নেই, যিনি এই অনুষ্ঠানে কোনোদিন আসেননি। দুদিনের অনুষ্ঠানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমান। আর তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে বিরাট পুলিশ বাহিনী। এই অনুষ্ঠানও নানাভাবে বানচাল করার চেষ্টা করেছেন ক্রুগার। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগেই লোহমিয়ার পরিবারের বাড়ির একটা অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কোনো অত্যাচারেই তাঁদের দমানো যায়নি।

আশ্চর্যজনকভাবে আস্ত একটি গ্রাম ও একটি প্রতিবাদী পরিবার নিয়ে হিটলার শাসিত নাৎসি জার্মানির স্মৃতি এখনও টিকে আছে। হিটলারপন্থী একটি নাৎসি গ্রাম ৭৬ বছর পরেও পরাজিত স্বৈরশাসক হিটলারের অতীত-ইতিহাসকে বাস্তবে জাগ্রত রেখেছে।