৭১ এর আতঙ্কের মাঝেও বিনোদনের মাধ্যম



শম্পা আক্তার
৭১ এর আতঙ্কের মাঝেও বিনোদনের মাধ্যম

৭১ এর আতঙ্কের মাঝেও বিনোদনের মাধ্যম

  • Font increase
  • Font Decrease

“১৯৭১ থেকে ২০২১ সাল ‘’ স্বাধীনতার এই ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন বাংলাদেশের জন্য সত্যিই আনন্দের।  এই ৫০ বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলায় তৈরি হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও নাটক, লেখা হয়েছে হাজারো গান, কবিতা এবং রচিত হয়েছে অনেক সাহিত্য। এগুলো আমাদের বিনোদন ছাড়াও ১৯৭১ সালের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে যুদ্ধের ওই দিনগুলোতে এত ভয় ও আতঙ্কের সাথে লড়াই করতে আমাদের দেশের মানুষ কিভাবে এই বিনোদন উপভোগ করত?

ইউনিভার্সিটি অব লিবেরার আর্টস বাংলাদেশে সাংবাদিকাতা বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী জানান, ব্যক্তির শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে দায়িত্ব, দায়িত্ব এবং বোঝার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে বিনোদন প্রয়োজন। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা বাঙালির দায়িত্ব ছিল। তাই আমার মনে হয় এত ভয় ও আতঙ্ক থেকে একটু স্বস্তি পেতে ১৯৭১ সালে বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিসীম। তবে তখনকার বিনোদনের মাধ্যম নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের ধারনা খুবই সীমিত।

ঢাকায় বসবাসরত ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ২২ বছর। পাকিস্থানি বাহিনীর ভয়ে তখন অনেকেই গ্রামে চলে যায়। আমিও চলে যাই শ্রীণগর। দেশের খোঁজ খবর রাখার  মাধ্যম ছিল কেবলমাত্র গ্রামে থাকা গুটি কয়েক রেডিও…

রেডিও তে তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতেন বাংলার আতঙ্কিত মানুষ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত একটি অস্থায়ী সম্প্রচার কেন্দ্র ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এবং অবরুদ্ধ এলাকার জনগণের মনোবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে এটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আনোয়ার হোসেন আরও জানান, বাংলাদেশ বেতার তখন জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক “জল্লাদের দরবার” সম্প্রপ্রচার করত। যেখানে হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তার স্ত্রী ও সাঙ্গপাঙ্গদের আলাপ। এছাড়া আমাদের এলাকায় একজন  অভিনেতা ছিলেন যার নাম নারায়ন চক্রবর্তী। এই ভদ্রলোক অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছে। সপ্তাহে দুই একদিন গ্রামের যুবকরা তার বাড়িতে এক সাথে হয়ে যাত্রাপালার আয়োজন করতাম। কখনো বা  এক সাথে স্বাধীনতার গান শুনতাম। হটাৎ পাকিস্থানি বাহিনি গ্রামে আসলে আতঙ্কের সৃষ্টি হত, আমরা যে যার মত পালিয়ে যেতাম।

ফরিদপুরের আব্দুল হান্নান শেখ জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র । স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এই অনুষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দানের জন্য রচিত ও পরিবেশিত হতো। তখন আমি কিশোর ছিলাম। রেডিও তে চরমপত্র শোনার জন্য সকল বয়সের মানুষ  এক জায়গায় ভীর জমাতাম। যখন মুক্তিবাহিনীর কথা বলা হত তখন আনন্দে সবাই চিৎকার করে উঠতাম। একদিকে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করার আনন্দ। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রশস্ত্রে পিছিয়ে থাকলেও মনের জোরে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তাঁদের মনের জোর আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এই ধরনের অনুষ্ঠান।

তিনি আরও জানান, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত দেশাত্মবধক গানগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। এই গান মুক্তিযুদ্ধাদের প্রেরণা এবং সাধারন মানুষের মনোবল যুগিয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে ওই সময়ে প্রচার হওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলোই ছিলো জনজাগরণের মূল হাতিয়ার-শক্তি।

সর্বোপরি, এ দেশের মাটি থেকে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি যে যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ, উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছে এবং হানাদার বাহিনীকে সার্বক্ষণিক রেখেছে ভীতসন্ত্রস্ত তা হল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।১৯৭১ সালে মানুষের মধ্যে এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের শক্তি যুগিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত উপন্যাস , চলচ্চিত্র, চরমপত্র, গান, কথিকাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ৭১ এর আতঙ্কের মাঝেও মানুষকে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিনোদনের মাধ্যম।

লেখক: শম্পা আক্তার, শিক্ষার্থী, মিডিয়া স্ট্যাডিস অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউল্যাব