পার্সি সম্প্রদায়: মৃত্যুর 'মৌন শিখর' যাদের শেষ আশ্রয়



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
পার্সি সম্প্রদায়: মৃত্যুর 'মৌন শিখর' যাদের শেষ আশ্রয়

পার্সি সম্প্রদায়: মৃত্যুর 'মৌন শিখর' যাদের শেষ আশ্রয়

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনায় যে মৃত্যুর শীতল থাবা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে মুসলিম কবরগাহ, খ্রিস্টান গ্রেভিয়ার্ড, হিন্দুদের চিতা প্রতীকী আবহে চিত্রিত হচ্ছে। মানুষের শেষ বিশ্রামের প্রসঙ্গে আরেকটি ক্ষুদ্র অথচ সুপ্রাচীন ধর্মগোষ্ঠী পার্সিদের অদ্ভুত শেষকৃত্য স্থান 'টাওয়ার অব সাইলেন্স' বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য, যা মৃত্যুর 'মৌন শিখর' রূপে পরিচিত। অনেকে যাকে বলে 'আকাশের কবরস্থান'।

কলকাতার 'মৌন শিখর'

পার্সিরা মৃতদেহকে কবরে দেয় না, চিতায় পোড়ায় না। মৃত্যুর পর তাদের লোকালয়ের বাইরে একটি উঁচু মিনারের উপর রেখে আসে। সেখানে মাংসাশী পাখির দল আত্মসাৎ করে মৃত মানুষটির শরীর। এভাবেই প্রকৃতির মধ্যে সেই শরীর মিশে যায়। এই মিনারকেই তাদের ভাষায় বলা হয় 'দখমা' আর ইংরেজিতে 'টাওয়ার অব সাইলেন্স'।

ঔপনিবেশিক কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চলে জঙ্গলের মধ্যে 'দখমা' তৈরির কাজ শুরু হয় ১৮২২ সালে। খরচ পড়েছিল তখনকার দিনে ৩৫ হাজার টাকা। মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রবীণ পার্সি নেতা নওরোজি। সঙ্গে অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও এগিয়ে এসেছিলেন। ১৮২৮ সালের ২৮ জানুয়ারি উদ্বোধন হয় টাওয়ার অফ সাইলেন্স। পূর্ব এশিয়ায় এটাই পার্সিদের প্রথম শেষকৃত্যভূমি। রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, মালয় থেকেও মৃতদেহ বয়ে আনা হত বহুদিন। এখন আর সেই প্রথা নেই বললেই চলে। পার্সিদের অনেকে বিকল্প সৎকারের ব্যবস্থা করছেন। তাছাড়া চিল-শকুনও আর নেই। মৃতদেহ সৎকারের জন্য এই 'দখমা'র চূড়াতেও বসানো হয়েছে সৌরচুল্লি। কিন্তু দুশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে 'মৌন শিখর'।

কলকাতার সমস্ত কোলাহলের সীমানা পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন টাওয়ার। চারপাশটা বদলে গিয়েছে অনেকটা। এখন আর আশেপাশে চিল-শকুনের দেখা মেলে না। কিন্তু একটা সময় তারাও এখানে অপেক্ষা করে থাকত। কখন একটি মৃতদেহ আসবে, পল-বিয়ারারের দল সেটিকে নীরবে তুলে দেবে মিনারের চূড়ায়। আর তারপর সেই মৃতদেহের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে এগিয়ে আসবে মাংসাশী পাখিরা। তখন ডানার ঝাপটে আর অবিরাম চিৎকারে সমস্ত নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে যাবে। এখন আর চিল-শকুনেরা অপেক্ষা করে থাকে না। মৃতদেহও আসে না বললেই চলে।

আসবে কেমন করে? কলকাতায় আর পার্সি মানুষের সংখ্যাই বা কত! সব মিলিয়ে বড়জোর ৪০০ হবে। তবে উনিশ শতকে এই কলকাতা শহরেই এক লক্ষ পার্সি নাগরিক বাস করতেন।

শুরুটা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহাদুরের কৃপায়। কলকাতা তখন নতুন কসমোপলিটান। আইনি-বেআইনি নানাধরনের ব্যবসার কেন্দ্রে তখন কলকাতা। আর সেই ব্যবসার টানেই পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ এসে আস্তানা তৈরি করছেন এখানে। আর তার মধ্যে অগ্নি-উপাসক পার্সিরা ধনে-বিদ্যায়-ঐশ্বর্যে এগিয়ে ছিল সকলের থেকেই।

পার্সি ব্যবসায়ী দাদাভাই বেহরামজি বানাজি সুরাট থেকে কলকাতা এসেছিলেন ১৭৬৭ সালে। তবে ব্যাপকভাবে পার্সি বসতি গড়ে উঠতে থাকে উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। মূলত প্রত্যেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় তাঁদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল একাধিক এন্টারপ্রাইজ। তবে বাঙলা ও বাঙালির সঙ্গে মিলেমিশে যেতে তাঁদের বেশি সময় লাগেনি। অনেকের তো পদবীর শেষে 'বেঙ্গলি' শব্দটাও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

কলকাতায় তেমনই একটি পরিবার ছিল সোরাবজি পরিবার। কলকাতার পার্সিদের মধ্যে একজন অগ্রণী ব্যবসায়ী ছিলেন নওরোজি সোরাবজি বেঙ্গলি। এদেশের পার্সি জনজাতির মানুষদের একজোট করতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। আর সেই সূত্রেই কলকাতায় তৈরি করেছিলেন একটি দখমা। ইংরেজিতে যাকে বলে 'টাওয়ার অফ সাইলেন্স'।

কলকাতার বুকে এমন কত ইতিহাস আজও রয়ে গিয়েছে। আমরা রাস্তায় ব্যস্ত চলাফেরার মধ্যে মাঝে মাঝে সেসবের সামনে থমকে দাঁড়ান অনেকেই। কিন্তু ইতিহাসের কতটুকুই বা খোঁজ রাখি আমরা? অনেক অনেক বছর আগে, যখন বেলেঘাটার খালটাও ছিল না, তখন কেমন ছিল এই এলাকা। সেই জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র নীরবতার চেহারা কেমন ছিল? আজ আর কিছুই জানা যাবে না। টাওয়ার অফ সাইলেন্সের আশেপাশে তার খানিকটা আভাস হয়তো পেতে পারেন।

ভারতে পার্সি সম্প্রদায়

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীন ইরানি জনগোষ্ঠী পার্সি নামে পরিচিত হলেও এরা মূলত 'জরোয়াস্ট্রিয়ানিজ্ম' বা 'জরাথ্রুস্টবাদ' নামক ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। রাজনীতিবিদ দাদাভাই নওরোজি, সিনেমা জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব দাদাসাহেব ফালকে, বিসনেস টাইকুন টাটা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির স্বামী ফিরোজ গান্ধি, অভিনেতা বোমান ইরানি প্রমুখ পার্সি সম্প্রদায়র মানুষ, যাদের প্রধান আবাস বোম্বে নগরে। ভারতের বিভিন্ন শহরে এবং পাকিস্তানেও কিছু পার্সি বসবাস করেন, বিশ্বে যাদের মিলিত সংখ্যা ১/২১০ লাখের বেশি নয়।

উল্লেখ্য, ভারতের ছয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এসব সম্প্রদায় হচ্ছে মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পার্সি ও জৈন। ইহুদিসহ আরও কয়েকটি সম্প্রদায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। তাদের আবেদন বিবেচনাধীন।

প্রাচীন ইরান বা পারস্যদেশের সাম্রাজ্যগুলোর রাষ্ট্রধর্ম একদা ছিল জরাথুস্ট্রবাদ। এরা প্রধানত 'অগ্নি-উপাসক' নামে সংজ্ঞায়িত হলেও তারা একটি অতিপ্রাচীন ইরানীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম বা ধর্মীয় মতবাদ। ভারতীয় উপমহাদেশে এটি পার্সি ধর্ম নামেও পরিচিত। জরথুস্ত্রীয় বা পারসিক ধর্মের প্রবর্তক জরথুস্ত্র। তার নাম অনুসারেই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় এই ধর্মের নাম হয়েছে "জরোয়াস্ট্রিয়ানিজ্ম" বা জরাথ্রুস্টবাদ। এ ধর্মে ঈশ্বরকে অহুর মজদা বা আহুরা মাজদা ("সর্বজ্ঞানস্বামী") নামে ডাকা হয়। এদের ধর্মগ্রন্থের নাম আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা । এই ধর্ম গ্রন্থের সঙ্গে প্রাচীন ঋগ্বেদ এর অনেক মিল আছে, তাই এদের উভয়ের উৎপত্তি একই উৎস থেকে বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে পৃথিবীতে জরথুস্ত্রীয়দের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষের মধ্যে। ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ইরান, আর্মেনিয়া সহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশে এদের বাস। তবে ধর্মটির অনুসারী বা পারসীদের অর্ধেকই বর্তমানে ভারতে বসবাস করছে। ভারতে বসবাসকারী এসব পার্সিদের ৯০ শতাংশ থাকেন বোম্বে নগরে। বাকি ১০ শতাংশ ছড়িয়ে রয়েছেন সারা ভারতে। কলকাতায় পারসিক জনসংখ্যা প্রায় চারশো।

খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে জরথুস্ত্রীয় ধর্মালম্বী পারসিকরা পারস্য তথা বর্তমান ইরান থেকে ভারতে গণঅভিবাসনের মাধ্যমে চলে আসেন। ভারতে এসে এরা প্রথম পা রাখে বর্তমান গুজরাতের উপকূলবর্তী সঞ্জান এলাকায়। এদের এই আগমন সম্পর্কে একটি চমৎকার ঘটনা প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে জানা যায়। পার্সিদের আগমনের পর সঞ্জানের শাসক একটি কানায় কানায় পূর্ণ দুধের পাত্র নবাগত পার্সিদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন তার রাজ্যে আর কাউকে ঠাঁই দেয়ার জায়গা নেই। পারসিরা ঐ পাত্রে চিনি ঢেলে দেখিয়ে দেন পাত্র উপচে পড়ছে না। অর্থাৎ বোঝানোর চেষ্টা করেন, চিনি যেমন দুধে মিশে যায় তেমনি তারাও ওই এলাকার মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকবেন। এরপর শাসক পার্সিদের আশ্রয় দেন।

যে পথে এসেছিল পার্সি জনগোষ্ঠী

ভারতে আগমনকালে পার্সি সম্প্রদায়ের জীবন ও অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তা জানার একমাত্র সুত্র কিসসা এ সানজান নামক গ্রন্থটি । তৎকালীন সময়ে পার্সি জীবন বৃত্তান্তের অন্য কোনও উৎসের খোঁজ মেলে না। জরথ্রুষ্টদের ভারত আগমনের অন্তত ছয়শ বছর পরে রচিত কিসসা এ সানজান গ্রন্থটি ।

গ্রন্থটির ভাষ্য মতে, জরথ্রুষ্ট ধর্মানুসারীদের যে গোষ্ঠীটি সর্ব প্রথম ভারতে এসেছিল তাঁদের আদি নিবাস স্থল ছিল মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম খোরাশান অঞ্চলে। ইতিহাস খ্যাত খোরাশান অঞ্চলটির ভৌগোলিক ব্যাপ্তি বিশাল । কয়েকটি রাষ্ট্র জুড়ে এর ব্যপ্তি। তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তানের অংশবিশেষ সহ এটি ইরান ও আধুনিক আফগানিস্তান রাষ্ট্রের বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত । বর্তমান ইরানের অন্তর্গত অংশটি খোরাশান প্রদেশ নামেই পরিচিত ।

কিসসা এ সানজান গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী জাদি রানা নামক একজন ভারতীয় শাসক ভারতে আগত জরথ্রুষ্ট গোষ্ঠীটি কে নিজ রাজ্যে বসবাসের অনুমতি দেন। তবে তাঁর বিনিময়ে তাঁদেরকে ঐ রাজ্যের প্রচলিত ভাষা এবং পোষাক-পরিচ্ছেদ গ্রহণ করতে বলা হয় । প্রদত্ত শর্ত দুটি মেনে নিয়ে গোষ্ঠীটি ভারতে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করে। তাঁদের এই বসতিই পরবর্তীতে সানজান নামক জনপদে পরিণত হয়।

বলা হয় পারস্যে নিজেদের আদিনিবাসস্থল সানজান নগর এর নামানুসারে তাঁরা এই বসতির নামকরণ করেন। ইতিহাসের প্রাচীন সেই সানজান নগর বর্তমানে তুর্কমেনিস্তান রাষ্ট্রের মারভ নামক অঞ্চল এর সংলগ্ন। এরও প্রায় পাঁচ বছর পর ইরানের বৃহত্তর খোরাশান অঞ্চল থেকেই জরথ্রুষ্টদের আরও একটি গোষ্ঠী ভারতেবর্ষে আগমন করে। এই গোষ্ঠীটি নিজেদের সঙ্গে সাথে কিছু ধর্মীয় উপকরণ (আলাত) ও নিয়ে এসেছিল । এই দুই গোষ্ঠী কে অনেকসময় একত্রে খোরাস্তানি বা কোহিস্তানি বলে ডাকা হত, যার অর্থ পাহাড়ী। এঁদের পরেও ইরানের সারি অঞ্চল থেকে জরথ্রুষ্ট দের আরও একটি গোষ্ঠী ভারতে এসেছি বলে জানা যায়।

ধারণা করা হয়, সানজান জনপদ স্থাপনাকারী জরথ্রুষ্ট ঐ গোষ্ঠীটিই ভারতের প্রথম স্থায়ী জরথ্রুষ্ট অভিবাসী । তবে তাঁদের আগমনের সময়কাল নিয়ে মতভেদ আছে। কোনও নির্ভর যোগ্য তথ্য সুত্র না থাকায়, ঐতিহাসিকেরা কিসসা-এ-সানজান - গ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাবলী থেকেই আগমনের সময়কাল নির্ণয় করার প্রয়াস করেন। কিসসা এ সানজান এ বর্ণিত অনেক ঘটনার সময়কাল অস্পষ্ট হওয়ায় এবং উল্লেখিত অনেক তারিখে অসঙ্গতি থাকায়, ঐতিহাসিকেরা কোনও তারিখকেই নির্ভুল দাবী করতে পারছেন না।

ঐতিহাসিকেরা ধারণা করছেন, সানজান অভিবাসীদের আগমনের তিনটি সম্ভাব্য তারিখ থাকতে পারে- যেগুলো হলঃ ৭১৬, ৭৬৫ এবং ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁরা এই তিনটির মধ্যে যে কোনো একটি তে এসে থাকবেন। আগমনের তারিখ নিয়ে এহেন মতভেদ পার্সি সমাজেও তুমুল বাক বিতন্ডা এমনকি লড়াই সৃষ্টি করেছে। তবে শেষ কথা হল এই যে ১৮ শতকের পূর্বে রচিত পার্সি কোনও লেখাতেই সাল তারিখ উল্লেখ নেই, তাই তারিখ নিয়ে কোনও দাবিই সন্দেহাতীত নয়। যে যাই দাবি করুক না কেন, সবগুলোই প্রকৃতপক্ষে অনুমান ভিত্তিক।

সুনিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, সানজান অধিবাসীদের আগেও বিভিন্ন সময়ে উপমহাদেশে জরথ্রুষ্টদের আগমন ঘটেছিল ও পদচারনা ছিল। ইরান বা পারস্যের সর্ব পূর্ব সীমান্তে আছে বালোচিস্তান প্রদেশ। আর বালোচিস্তান প্রদেশ ঘেঁষে অবস্থিত সিন্ধু উপ্যতাকা। এই সিন্ধু প্রদেশও কিছু কাল ইরান পারস্যের শাসকদের শাসনাধীন ছিল। সেই সময়টাই পারস্যে সাসানিদ সাম্রাজ্যের (২২৬-৬৫ খ্রিস্টাব্দ) অধীনে। ফলে সাসানিদ সাম্রাজ্যের বহু সামরিক প্রতিনিধি ও শিবির ছিল সিন্ধু প্রদেশে। সিন্ধু প্রদেশ হাতছাড়া হবার পরও ইরানীদের প্রতিপত্তি ও প্রভাব ফুরিয়ে যায় নি সিন্ধ প্রদেশে। ইরান ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় নি। নবম শতাব্দীর আরব ইতিহাসবিদ আল-মাসুদির গ্রন্থে জরথ্রুষ্ট সম্প্রদায়ের ভারতে বসবাসের অবস্থানের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ পাওয়া যায় । তিনি উল্লেখ করেন যে আল-হিন্দ ও আল-সিন্ধ এ এই ধর্মনুসারীদের অগ্নি মন্দির ছিল। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও জনা কয়েক পার্সি ব্যক্তিদের সিন্ধ প্রদেশে বসবাসের প্রমাণ মেলে। তবে বর্তমানে যে সম্প্রদায় টি সিন্ধ এ অঞ্চলে এ বাস করেন তাঁদের আগমন অনেক পরে, সম্ভবত ব্রিটিশদের আগমনের সময় থেকে। প্রাচীন ভারতবর্ষ ও পারস্যের মধ্যে বানিজ্য চলত, সমুদ্র পথ ও স্থল পথে। খ্রিষ্টের জন্মের অনেক পূর্ব থেকেই ইরান ও ভারত মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় যোগাযোগ ছিল। হিন্দু পুরাণ ও মহাভারতে সিন্ধু নদের পশ্চিমের অধিবাসীদের অভিহিত করা হয়েছে পারসিক নামে।

জাত-ব্যবাসায়ী ও শিক্ষিত পার্সি সম্প্রদায়

ভারতের পার্সিদের সম্পর্কে সতের শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চ্যাপলিন হেনরি লর্ড মত প্রকাশ করেন যে, পার্সিরা চেতনার বিকাশ ও উন্মুক্তির খোঁজে ভারতগামী হয়েছিল । কিন্ত একই সাথে তিনি এও মন্তব্য করেন যে, 'জাত ব্যাবসায়ী পার্সিরা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার সুত্রে ভারত অভিমুখী হয়েছিলেন।' মুঘল আমলেই তারা ব্যবসায় এগিয়ে আসেন। ব্রিটিশ আমলে তা প্রবলভাবে বৃদ্ধি লাভ করে।

নবাগত কোম্পানির জন্য নানা কাজে স্থানীয় লোকের দরকার ছিল। সমুদ্রতটের বন্দর এলাকায় ব্যবসার সহযোগী ও নির্মাণকাজে পার্সিরা তখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একই সূত্রে পার্সিরা গুজরাতের গ্রামাঞ্চল ছেড়ে ব্রিটিশ কোম্পানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাজ, বোম্বে ও বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি শহরগুলোতে আসতে থাকে। ফলে ভারতের নগরায়নের ইতিহাসে সামনের কাতারে পার্সিদের দেখতে পাওয়া যায়।

আধুনিক  শিক্ষায়ও তখন দ্রুতবেগে এগিয়ে আসেন পার্সিরা। একসময় পার্সি সমাজে শিক্ষা গ্রহণ ও জ্ঞান চর্চা শুধুমাত্র পুরোহিত ও ধর্মযাজক শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ পরিচালিত স্কুলগুলোতে প্রথমবারের মত পার্সিসমাজের সাধারণ তরুণরাও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান। লিখতে ও পড়তে শেখার পাশাপাশি তাঁরা সত্যিকার অর্থে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। ব্রিটিশ সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথেও তাঁদের পরিচয় ঘটে। ফলে তাঁরা নিজেদের আধুনিক ও ‘ব্রিটিশ’ ঢঙে গড়ে তুলতে শুরু করেন। নিজেদেরকে তাঁরা “ব্রিটিশদের মতই একটি জাতি” হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন, এবং নিঃসন্দেহে ব্রিটিশদের অনুসরণ ও অনুকরনে তাঁরা “উপমহাদেশের অন্যান্য সকল জাতির চেয়ে বেশি সফল ছিলেন।“।

এর সুফলও তাঁরা পেয়েছিলেন। উপমহাদেশের অন্যান্য জাতিগুলোকে যেখানে ব্রিটিশরা অনেকটাই অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতেন ও তাঁদের সমন্ধে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন, সেখানে পার্সিদের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। বিট্রিশদের মতে সাধারণ ভারতীয়রা ছিলেন, “অলস, অজ্ঞ, অযৌক্তিক, ও নতমস্তক তবে অন্তরে স্পর্ধা পোষণকারী”। কিন্ত পারসিদের সাথে নিজদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করেন তাঁরা । তাঁদের ভেতরে এমন কিছু গুণাবলী খুঁজে পান যা নিজেদের ভেতরেও বিদ্যমান। জোহান অ্যালব্রেক্ট ডি ম্যান্ডেলস্লো পার্সিদের আখ্যায়িত করেন পরিশ্রমী “নিষ্ঠাবান”, বিবেকসম্পন্ন ও তুখোড় ব্যাবসায়ী” একটি জাতি হিসেবে যারা বাণিজ্যে অগ্রগতি করার ব্যাপারে সদা তৎপর। জেমস ম্যকিন্টশের পর্যবেক্ষণেও ফুটে উঠে একই সুর, “ভারতের পার্সি সম্প্রদায় পৃথিবীর একদা পরাক্রমশালী একটি জাতির বংশধর যারা হাজার বছর পূর্বে নিষ্পেষণ ও অত্যাচার থেকে পালিয়ে ভারতবর্ষে এসে বসতি গেড়েছিলেন । বহু শতাব্দী দারিদ্রতা আর অবহেলার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকার পর অবশেষে তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন পেয়েছেন বর্তমান শাসকদের দ্বারা। কাছে। এই শাসক দের অধীনে তাঁরা দ্রুত এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী শ্রেণীর একটি হয়ে উঠতে পেরেছেন।"

এমন সফল ব্যাবসায়ীদের মধ্যে ছিলেন উদ্যমী এক এজেন্ট যার নাম রুস্তম মানেক। ১৭০২ সালে তিনি ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম ব্রোকার হিসেবে নিয়োগ পান। কোম্পানীর প্রথম ব্রোকার হিসেবে তাঁকে শেঠ উপাধি দেওয়া হয়। অবশ্য এই পদে যোগ দেওয়ার পূর্বেই, ওলন্দাজ ও পর্তুগিজ শাসনামলে মানেক নিজের অবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন এবং আর্থিকভাবে যথেষ্ট সম্পদ ও সাফল্য অর্জন করেন। অঢেল সম্পত্তির মালিক হন। বিস্তর টাকা-কড়ি ছিলেন। তিনি ও তার কিছু সহযোগীদের বদৌলতে পার্সি সমাজের বহু লোক ব্যাক্তি কর্ম সংস্থানের সুযোগ পান। ফলে বছর খানেকের ভেতরে পার্সি সমাজের পেশাগত উন্নতির দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

ব্রোচ (বর্তমানে ভরুচ) অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কালেক্টর পদে নিযুক্ত জেমস ফোরবস তাঁর রচিত অরিয়েন্টাল মেমোয়ার্স (১৭৭০) গ্রন্থে লেখেন, বোম্বে ও সুরাট অঞ্চলের মুখ্য বিশিষ্ট প্রথম সারীর ব্যাবসায়ী ও জাহাজ মালিকদের তালিকায় অনেকেই পার্সি। শক্ত সমর্থ, কর্মতৎপর, সৎ এবং অধ্যাবসায়ী এই জাতিটি নিঃসন্দেহে কোম্পানির গর্ব ও জন্য বড় সম্পদ। হিন্দুস্তানের পশ্চিম তটের বহু জাতির মধ্যে তাঁরা অনন্য। তাঁরা কোম্পানির গর্ব এবং আপন নিজ সমাজেও যথেষ্ট সমাদৃত।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে চীন এবং ভারতের মধ্যে জলপথে বাণিজ্য শুরু হলে জাহাজ নির্মাণে পারদর্শিতা ও তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিকে পুঁজি করে পার্সিরা এই বাণিজ্যে দ্রুত সাফল্যের মুখ দেখেন। মূলত কাঠ, সিল্ক, তুলা ও আফিমের জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। ব্যবসা বানিজ্য চলত বেশি। আফিম ও তুলার সওদাগরি জামশেদজি জেজিভয় নামক এক পার্সি ব্যাবসায়ী বণিককে দ্রুত সাফল্য এনে দেয়।  যার ধারাবাহিকতায় সোরাবজি, মোদী, কামা, ওড়িয়া, জিজিভোয়, রেডমনি, দাদিসেথ, পেটিট, প্যাটেল, মেহতা, অলিব্লাস, টাটা  প্রমুখ পরিবারগুলো বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধি লাভ করে।

বোম্বে শহরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পার্সি সমাজের যে ধরনের অবকাঠামোর প্রয়োজন ছিল তার অনেকটাই তাঁরা দিয়ে তৈরি করেন। ১৭২০ এর দশকে পার্সি সমাজের জীবন ও জীবিকার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে জায়গা করে নেয় বোম্বে শহর। যেখানে ১৭০০ সালে “শহরের বণিকে ও ব্যাবসায়ীদের নাম তালিকায় মুষ্টিমেয় কিছু পার্সি ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, সেখানেই, মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে, পার্সি ব্যবসায়ীরা শহরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়ান।“

সামরিক বাহিনীতে পার্সি সম্প্রদায়

ব্রিটিশ আমল থেকেই সামরিক বাহিনীতে পার্সি সম্প্রদায় রেখেছেন উজ্জলতার স্বাক্ষর। সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে পার্সি সম্প্রদায় ভারতকে উপহার দিয়েছে বিভিন্ন বিশিষ্ট সামরিক কর্মকর্তা । ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম ফিল্ড মার্শাল একজন পার্সি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারত মিত্র বাহিনীর জয়ের মূল পরিকল্পনাকারী ও কারিগর এবং প্রধান নায়ক একজন পার্সি, নাম স্যাম হরমাসজি ফ্রেমজি জামশেদজি ম্যানকেশ। তিনি ব্রিটিশ সামরিক সম্মাননা মিলিটারি ক্রস প্রাপ্ত।

নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রথম পার্সি সামরিক ব্যাক্তিত্ব অ্যাডমিরাল জল কুরসেটজি। ভারতীয় বিমানবাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান এয়ার মার্শাল অ্যাস্পি ইঞ্জিনিয়ার ও একজন পার্সি। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তীতে ভারতে চীফ অফ এয়ার স্টাফ পদে দায়িত্ব পালন করেন ও পরবর্তীতে এয়ার চিফ মার্শাল হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর এই একই পদে নিযুক্ত হওয়া ১৮তম ব্যাক্তিটিও আর এক জন পার্সি, নাম ফালি হোমি মেজর। 

ভারতীয় কোস্ট গার্ড বাহিনী প্রধান প্রধানের পদে দায়িত্ব পালন করা ১৭তম ব্যাক্তিও পার্সি, নাম আর. এফ. কনট্রাক্টর। এছাড়া আছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরদেশির বুর্জোরজি । তিনি ১৯৬৫ সনে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শত্রুর হাতে নিহত হন, যার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে “পরম বীর চক্র” পদকে ভূষিত করা হয় (মরণোত্তর)। এটি ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক পুরষ্কার/পদক । লেফটেন্যান্ট জেনারেল এফএন বিলিমোরিয়া ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা সিনিয়র অফিসার এবং কোবরা বিয়ার সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা লর্ড করণ বিলিমোরিয়ার পিতা।

প্রাচীন পারস্যে ঋষি জরথ্রুষ্ট  ধর্মীয় মত প্রচার করেন যে জগতে শুভ এবং অশুভ দুই শক্তির বিচরণ রয়েছে। এই দুই শক্তি ক্ষমতা ও বলে একে অপরের সমকক্ষ । কিন্তু এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দী এবং সর্বদা লড়াই এ লিপ্ত। প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব শুভ শক্তির বা আলোর পথে আসা এবং অশুভ শক্তির কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা । জীবদ্দশায় মানুষ যে পথ অনুসরণ করবে মৃত্যুর পর সেই অনুযায়ী তাঁর গন্তব্য নির্ধারিত হবে। ফলে পার্সিরা একটি কর্মমুখী সম্প্রদায়। জন্মভূমি থেকে শত শত বছর পূর্বে চলে এসেও তাঁরা ভিন্ন সমাজ ও মানুষের মধ্যে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। শিক্ষায় ও আর্থিক দিক থেকে ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের শতভাগ মানুষ সফল। তদুপরি, স্বদেশের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না থাকার পরেও চমৎকারভাবে তাঁরা ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও সংরক্ষণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।