রাস পূর্ণিমা: প্রেমরসে সিক্ত চাঁদের গল্প



অসীম নন্দন, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম
রাস উৎসব

রাস উৎসব

  • Font increase
  • Font Decrease

রাতের খাবার খেয়ে একটু হাঁটতে বের হয়েছি। হেমন্তের হিমেল বাতাসে শীতের আগমনী জানান দিচ্ছে। আর আকাশে উঠেছে তখন রাস পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের স্বচ্ছ মায়াবী আলোয় বিশ্বচরাচর সিক্ত হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকেরা যুগে যুগে এই চাঁদের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে সৃষ্টি করেছেন কত-শত অপূর্ব সাহিত্যকর্ম; তার কোনো হিসেব আমরা জানি না!

এই মায়াবী চাঁদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েই কখনো বিশ্বকবি রবিঠাকুর বলে গেছেন, ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো, ও রজনীগন্ধা তোমার, গন্ধসুধা ঢালো।’ আবার কখনো রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ বলে গেছেন, ‘বেবিলন কোথা হারায়ে গিয়েছে-মিশর-অসুর কুয়াশাকালো; চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক, মেঘের পালকে ঢালিছে আলো!’

আর কখনো সকল রোমান্টিকতাকে ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে কঠিন বাস্তবতার নিরিখে কবি সুকান্ত বলেছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’

চাঁদের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা ভাবছিলাম। তখনই মনে পড়লো, আমার বাড়ির থেকে ৫/৭ মিনিটের হাঁটা-পথের দূরত্বেই রাস-উৎসব হচ্ছে। ভাবলাম হাঁটিহাঁটি পা-পা করে একটু দেখেই আসি। চলে গেলাম মধুপুরের ‘মদন গোপাল আঙিনায়’। টাংগাইলের মধুপুর উপজেলায় ‘শ্রী শ্রী মদন গোপাল বিগ্রহ মন্দির’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১২৯৮ বঙ্গাব্দে। প্রায় ১৩০ বছর পুরানো এই মন্দির। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজশাহী জেলার পুঠিয়া নিবাসী মহারাণী শ্রীমতী হেমন্ত কুমারী দেবী।

প্রতি বছরই এই মন্দিরে রাস-উৎসব পালিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালি বৈষ্ণব মতাদর্শীদের প্রাণের উৎসব এই রাসপূর্ণিমা। এছাড়া মণিপুরীদের প্রধান উৎসব এই রাসপূর্ণিমা। মন্দিরে গিয়ে দেখি লীলা-কীর্তন হচ্ছে। একদল কীর্তনীয়া লীলা-কীর্তন গাইছে আর ভক্তেরা শ্রীকৃষ্ণের সেই লীলা'র মহিমা ভক্তিভাবে গানে গানে সুরে সুরে শুনছে।


কীর্তন শেষে অনুষ্ঠিত হলো রাধাকৃষ্ণের পূজা। পূজা শেষে দেখলাম, ভক্তরা রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহকে চক্রাকারে ঘোরাচ্ছে। বিগ্রহটা মূলত রাধাকৃষ্ণ এবং গোপিনীদের মাটির মূর্তি দিয়ে তৈরি। রাধাকৃষ্ণের মূর্তিকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে গোপিনীদের মূর্তি। আর এই পুরো বিগ্রহটি একটা চাকাযুক্ত চক্রাকার কাঠামোতে উপবিষ্ট করা। যাকে সহজেই চক্রাকারে ঘোরানো যায়।

গোপিনী সংবলিত রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহকে এইভাবে চক্রাকারে ঘোরানোর মাঝেই রাসলীলার মাহাত্ম্য নিহিত। সবশেষে প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটলো।

রাসপূর্ণিমা'র মাহাত্ম্য:
পদ্মপুরাণে শারদরাস এবং বাসন্তীরাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বাসন্তীরাসের উল্লেখ থাকলেও শারদরাসের উল্লেখ নেই। শারদরাসের কথা বলা আছে শ্রীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণে। শারদরাস মূলত কার্তিক মাসের শেষ পূর্ণিমাতে পালন করা হয়। বস্ত্রহরণের দিন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গোপিনীদের কথা দিয়েছিলেন, পরবর্তী পূর্ণিমা-তিথিতে তিনি গোপিনীদের সাথে রাস-উৎসব করবেন।

কৃষ্ণের বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে গোপিনীরা সংসারের কর্তব্যজ্ঞান ভুলে বৃন্দাবনে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পায়ে নিজেদেরকে নিবেদন করেছিল। কৃষ্ণ তাদেরকে বারবার স্ব-গৃহে ফিরে যেতে বললেও, গোপিনীবৃন্দ সেই অনুরোধ মানে নাই।

গোপিনীদের একমাত্র কামনা ছিল শ্রীকৃষ্ণকে একান্তে নিভৃতে পাওয়া। তাদের বিশেষ ভক্তি আর অনুরোধে কৃষ্ণ তাদের নিকটে এলেই তারা ভাবছিল, কানাই শুধু তার একার। যখনই এরকম ভাবছিল তখনই কৃষ্ণ তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। আর গোপিনীরা গভীর বিরহে কাতর হচ্ছিল। ভগবান কারো একার সম্পত্তি নয়। ঈশ্বর সকলের। এই সারকথা বোঝানোর জন্যই কৃষ্ণ এই রাসলীলা করেছিলেন।


গোপিনীরা ভক্তিভাবে আচ্ছন্ন হয়ে যখন শ্রীকৃষ্ণের এই সারকথা অনুধাবন করতে পারলো, তখন তিনি 'যতজন গোপিনী ততজন কৃষ্ণ' রূপে সকলের সাথে রাসনৃত্য করলেন। রাস-উৎসব মূলত জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের কথা। এটি দৈনন্দিন জীবনের সুখানুভূতিকে আধ্যাত্মিকতায় রূপায়িত করার উৎসব। মানুষের কামপ্রবৃত্তিগুলোকে প্রেমসূচক করে তোলার উৎসব এই রাসপূর্ণিমা।

কীভাবে শুরু হলো এই উৎসব?:
জনশ্রুতি আছে, বৈষ্ণব মতাদর্শের প্রবক্তা শ্রীচৈতন্যদেবের হাত ধরেই এই উৎসব প্রথম শুরু হয়। সেই দিক থেকে দেখলে ১৬ শতকের দিকে এই উৎসব নবদ্বীপে পালিত হওয়া শুরু হয়। যদিও চৈতন্যদেবের পরবর্তী সময়ে নবদ্বীপে বৈষ্ণবীয় ধারার চক্র-রাস উৎসব পালন একটু ফিঁকে হয়ে যায়। এবং চক্ররাসের পরিবর্তে শাক্ত-রাস উৎসবের সূচনা ঘটে। শাক্ত-রাস মূলত মদ-মাংস এবং আড়ম্বরপূর্ণ জৌলুস সমৃদ্ধ উৎসব।

প্রধানত যেসব জায়গায় রাস-উৎসব পালিত হয়:
ভারতের মথুরা, বৃন্দাবন, নবদ্বীপ, নদীয়ার শান্তিপুরে এই উৎসব খুব ধুমধামের সাথে পালন করে ভক্তরা। এটাকে মূলত শান্তিপুরের ভঙ্গারাস বলা হয়ে থাকে। এছাড়া ওড়িশা, আসাম এবং মনিপুরে এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের অংশ হিসেবে অঞ্চলভেদে কথ্থক, ভারতনাট্যম, ওড়িশি, মণিপুরি প্রভৃতি শাস্ত্রীয় ও লোকায়ত নৃত্যসুষমার ব্যবহার দেখা যায়।

নবদ্বীপে শাক্তরাস খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়ে থাকে। এখানে রাধাকৃষ্ণ ছাড়াও সকল দেবদেবীরই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটি নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠ উৎসব। এখানে এই উৎসবকে ঘিরে নির্মিত হয় চমৎকার সব মূর্তি। অপরূপ কারুকার্যময় নির্মাণশৈলী এবং বিচিত্র রূপকল্পে নানান শক্তিরূপের নির্মিত মূর্তিকে পূজা করার মধ্য দিয়েই এই উৎসব নবদ্বীপে পালিত। এছাড়া নবদ্বীপের কোথাও কোথাও অনাড়ম্বরভাবে চক্র-রাসও পালিত হয়।

আগেই বলেছি, এটি মণিপুরিদের সবচেয়ে বড় উৎসব। কথিত আছে, আঠারো শতকের দিকে মণিপুরের রাজা মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র বাংলাদেশে এই উৎসবের প্রথম প্রচলন করেন। সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুর জোড়ামন্ডপে প্রতি বছর এই উৎসব বিরাট কলেবরে পালিত হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে এই উৎসবে।

এইদিন কৃষ্ণের বিগ্রহকে ঘিরে কুমারী মেয়েরা নৃত্য পরিবেশন করে থাকে। ১৭৭৯ খ্রীস্টাব্দের দিকে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নৃত্যগীতের সমন্বয়ে এই উৎসবের প্রচলন ঘটান মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র। ভাগ্যচন্দ্রের মৃত্যুর পর মহারাজ চন্দ্রকীর্তির শাসনামলে রাসনৃত্যকে আচৌকা, বৃন্দাবন, খুড়ুম্বা, গোস্ট, গোস্ট বৃন্দাবন ইত্যাদি ভঙ্গিমায় মণিপুরিদের মাঝে রাসনৃত্য ছড়িয়ে দেন।

রাসলীলা উৎসব শুরু হয় মূলত গোষ্ঠলীলা থেকে। গোষ্ঠলীলায় ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেরা গোপালের মতন রাখাল সেজে গোষ্ঠনৃত্য করে এবং গরু চড়াতে যায়। পাশাপাশি চলতে থাকে মণিপুরিদের নিজস্ব সংস্কৃতির উৎসব। মণিপুরি সমাজে রাসনৃত্য ছয় ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো মহারাস, নিত্যরাস, বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, গোপীরাস ও উদুখলরাস।

এবং সুন্দরবনের দুবলার চরে রাস উপলক্ষে ভক্তদের জন্য তীর্থ-স্নানের আয়োজন হয়ে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালি অধ্যুসিত বিভিন্ন অঞ্চলে এই রাস-উৎসব পালন করা হয়।

রাধাকৃষ্ণ হচ্ছে সেই নাম যাঁদের সাথে অমর প্রেমকাহিনী জড়িয়ে আছে। তখনও রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমকাহিনী মানুষের কাছে পৌঁছায় নাই। আর সেই মধ্যযুগ থেকেই এই প্রেমকাহিনী বাঙলার মানুষের হৃদয়ের গল্প হয়ে আছে। আমাদের বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগের কবিগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে তাদের শৈল্পিক ভাষা আর ছন্দে করে তুলেছেন অমর।


ভক্তিবাদীরা আর বৈষ্ণব মতাদর্শের মানুষেরা রাধাকৃষ্ণকে ঈশ্বরের সিংহাসন থেকে নামিয়ে নিজেদের ঘরের আসনে রক্তমাংসের মানুষের মতন প্রেমের-প্রতীক হিসাবে স্থান দিয়েছে। আমাদের বাংলাসাহিত্যের অন্যতম সোনালী যুগ হচ্ছে বৈষ্ণব-পদাবলীর যুগ। বৈষ্ণব-পদাবলীর মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি মহাকালের মহান মহান কবিদের। যাঁরা ভক্তিভাবে প্রেমের কথা বলে গেছেন যুগের পর যুগ ধরে।

কবি বৃন্দাবন দাস'র একটি পদের কথা এইখানে বলবার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি লিখেছিলেন; কৃষ্ণ রাধাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘শুন রাধে এই রস আমি যে তোমার বশ, তোমা বিনে নাহি লয় মনে। জপিতে তোমার নাম ধৈরয না ধরে প্রাণ, তুয়া রূপ করিয়ে ধেয়ানে।’ গল্প বলতে শুরু করেছিলাম পূর্ণিমার চাঁদকে নিয়ে, কথা বলতে বলতে নিতাই-চাঁদের গল্পে এসে থামলাম।

চাঁদের গল্প বলতে গেলে তো প্রেম আসবেই। যুগে যুগে রোমান্টিকতার কথায় যখনই চাঁদ এসেছে তখনই তো প্রেমের কথাও উঠেছে। ভবা পাগলার সেই গানের কথা মনে পড়ছে। মনসুর ফকির সুন্দর করে গেয়েছিলেন-‘আমার নিতাই চাঁদের বাজারে, গৌর চাঁদের দরবারে, একমন যার সেই যেতে পারে। ও ভাই সেই যেতে পারে।’

প্রেম তো তাই, যা একমনে একপ্রাণে করতে হয়। কায়মনোবাক্যে নিষ্কামভাবে প্রেমই তো মানুষকে শান্তি দেয়। জীবনের দিকে হাঁটতে আস্বস্ত করে।

ছবি কৃতজ্ঞতা: শুভ্রা গোস্বামী

‘গৈইলত থাকি, মোক ঘর করি দেয় কাই’



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের সুরিরডারা গ্রামের বাসিন্দা মহেছেনা বেগম। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ায় অসহায় জীবন যাপন করছেন এই ষাটোর্ধ্ব নারী। সন্তানরা থেকেও নেই। ফলে গোয়ালঘরে গরুর সাথে কয়েকমাস ধরে বসবাস করছেন মহেছেনা বেগম।

জানা যায়, তার স্বামী ছেড়ে গেছেন প্রায় ছয় বছর আগে। এরপর দুই ছেলে নিয়ে স্বামীর বাড়িতেই বসবাস করছিলেন মহেছেনা। ৫/৬ মাস আগে বড় ছেলে দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। সাথে নিজের করা ঘরটাও ভেঙে নিয়ে গেলেও নিজের প্রথম পক্ষের ছেলেকে রেখে যান মা মহেছেনার কাছে। গৃহহীন মহেছেনার আশ্রয় হয় ছোট ছেলের গোয়াল ঘরে, গরুর সাথে। এই তীব্র শীতেও দশ বছর বয়সের নাতিসহ গরুর সাথে একই ঘরে বসবাস ষাটোর্ধ্ব মহেছেনার।

মহেছেনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গোয়াল ঘরের একদিকে একটি মাঁচান আর একদিকে শোবার বিছানা। মাঝখানের কোনায় গরু রাখার স্থান। গোবর-মূত্রের গন্ধ নিয়ে সেই ঘরেই বসবাস মহেছেনার। যেন নিজ ভূমিতে পরবাসী তিনি। ছোট ছেলে বাড়িতে থাকলেও স্বল্প আয়ে মায়ের জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়ার ‘সামর্থ’ নেই তার। বিকল্প না থাকায় ছেলের গোয়ালঘরে আশ্রয় হয়েছে মহেছেনার।

মহেছেনা বলেন, ‘বড় বেটা প্রথম বউ ছাড়ি দিয়া ফির বিয়া করি অন্যটেই থাকে। নাতিটাক মোর কাছত রাখি গেইছে। ছোট বেটা দিন আনি দিন খায়। মোক ঘর করি দেয় কাই? নাতিটাক নিয়া ছোট বেটার গৈইলত (গোয়ালে) থাকি।’

গরুর গোবর আর মূত্রের গন্ধে সমস্যা হয় কি না, এমন প্রশ্নে মহেছেনা বলেন, ‘ সমস্যা হয় কিন্তু কী করমো বাবা, ঘর করারতো সামর্থ নাই!’

অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের ও নাতির খাবার জোগান মহেছেনা। নিজের বয়স কত সেটাও ঠিকমতো বলতে পারেন না। তবে গোয়ালঘরে থাকা নিয়ে তাঁর ছোট ছেলের প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। বরং ছেলের জন্য অনেকটা সাফাই গাইলেন ষাটোর্ধ্ব এই নারী।

‘নাতিসহ যাওয়ার আর জায়গা নাই। মাইনষের বাড়িত কামাই করি আনি নাতিসহ খাঙ। ছোট বেটা নিজে চইলবার পায় না মোক কেমন করি দিবে। উয়ারও (ওরও) একটায় ঘর। কাইয়ো ঘরও দেয়না, সাহায্যও করে না।’

মহেছেনার ছোট ছেলে কাজে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মহেছেনা যে বাড়িতে কাজ করেন সেই বাড়ির বড় ছেলে মারুফ আহমেদ মহেছেনা ও তার নাতির জন্য আলাদা ঘর করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সেজন্য সমাজের সামর্থবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মারুফ আহমেদ বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনের সাড়া পেয়েছি। আরও কিছু সহায়তা দরকার। সকলের সহায়তা পেলে আগামী মাসেই মহেছেনা ও তার নাতির জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো।’

;

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় পান্না কায়সারকে খেলাঘরের শুভেচ্ছা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা

  • Font increase
  • Font Decrease

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সভাপতি মণ্ডলীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় পান্না কায়সারকে শুভেচ্ছা জানাতে খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা হাজির হন।

প্রথমে খেলাঘরের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান সংগঠনের নেতাকর্মী ও ভাইবোনরা।

এসময় শহীদ শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন, আমার স্বপ্ন মুক্তিযুদ্ধে চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তোলা। সে লক্ষে আরো বেশি বেশি কাজ করে যাব। আগামী প্রজন্মকে যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তোলা যায় তাহলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে ঠিক অন্যরকম।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিজ্ঞান মনষ্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে খেলাঘরের মাধ্যমে সারাদেশে আরো বেশি কাজ করতে চাই। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নতুন নতুন বই ও গবেষণার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এসময় উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রণয় সাহা, প্রেসিডিয়াম সদস্য মামুন মোর্শেদ, রাজেন্দ্র চন্দ্র দেব মন্টু, সাংবাদিক অশোকেশ রায়, সাংবাদিক রাজন ভট্টাচার্য, আশরাফিয়া আলী আহমেদ নান্তু, হাফিজুর রহমান মিন্টু, আব্দুল মান্নান, কোহিনুর আক্তার শিল্পী, নাদিয়া রহমান মেঘলা প্রমুখ।

গত রবিবার বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা হয়। এবারে পান্না কায়সার সহ ১৫ গুণীজনকে পুরস্কার সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হবে। অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করবেন।

;

শীতের সকালে কৃষকের খাবার



ফটো স্টোরি, বার্তা২৪.কম
শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

শীতের সকালে কৃষকের খাবার/ ছবি: মেহেরাব হোসেন নাঈম

  • Font increase
  • Font Decrease

আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কৃষকের খাবার-দাবার। কাজের ফাঁকে সকালে নাস্তা আর দুপুরের খাবার সারেন তারা। এই প্রথা চলে আসছে আদিকাল থেকে।


ভোর বা সকালে কৃষক ও শ্রমিক চলে যান মাঠের ক্ষেতের কাজে। কাঁধে থাকে লাঙ্গল-জোয়াল, মই।কারো হাতে কাস্তে বা হাসুয়া। কেউবা কোদাল হাতে মাঠে চলে যায়। রোদ, ঝড়-বৃষ্টিতে একমনে কাজ করেন তারা।


সকালে বাড়ি ছাড়েন বলে নাস্তা ও দুপুরের খাবারটি মাঠে সারেন তারা।

কৃষাণ বধূরা গামছায় বেঁধে নাস্তা নেন। কোনো সময় দুপুরে খাবার পোটলায় বেঁধে প্রিয় মানুষটির খাবার নিয়ে যান। সঙ্গে থাকে বাসি তরকারি, ভর্তা, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ।


তরকারি বাসি কিংবা টাটকা এবং পদ যাই থাক পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ থাকতেই হবে পাতে। কর্মজীবী মানুষটির অপেক্ষায় থাকেন খাবারের।


অবশেষে আসে সেই মহেদ্রক্ষণ। কাজের ফাঁকে মাঠের ক্ষেতে বা আইলে কিংবা উঁচু জায়গায় বসে খাবার খান। খাওয়া-দাওয়া শেষে কৃষাণী বধূ বাড়ির পানে ফিরেন।

;

খেজুর রস-গুড়ে ব্যস্ত গাছিরা



শিরিন সুলতানা কেয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কুয়াশামাখা ভোর। এক হাতে হাঁড়ি নিয়ে ৪০ ফুট লম্বা খেজুর গাছে তর তর করে উঠে গেলেন আবদুল হান্নান। রসে টইটুম্বুর গাছের হাঁড়িটা ধরলেন এক হাতে। আরেক হাতে গাছে লাগিয়ে দিলেন ফাঁকা হাঁড়িটা। নেমে এসে সাইকেলে লাগানো জারকিনে ঢেলে দিলেন হাঁড়ির রস।

হান্নানের সঙ্গে দেখা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামে। ২১ জানুয়ারি, সকাল ৭টায়। একটু কথা বলতে চাইলে হান্নান বললেন, ‘এখুন কথা বুলার সুমায় নাই যে ভাই। আরও ২০টা গাছের রস নামান্যা বাকি।’ সত্যিই খেজুরের রস নিয়ে রোজ ভোরে হান্নানের খুব ব্যস্ততা। রস নামান, সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানান। খেজুরে আলাপ করার সময় কোথায়!


হান্নান একা নন। রাজশাহীর পুঠিয়া, চারঘাট আর বাঘা উপজেলার অসংখ্য গাছির ব্যস্ততা এখন খেজুর রস এবং গুড় নিয়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঘের শীত গায়ে মেখে তাঁরা এখন বেরিয়ে পড়ছেন সাইকেল নিয়ে। একটার পর একটা গাছের রস নামিয়ে ফিরছেন বাড়ি। তারপর রস জ্বাল দিয়ে শুরু হচ্ছে গুড় বানানোর কাজ। এই কাজটা অবশ্য করে দিচ্ছেন বাড়ির নারীরা। পুরুষেরা আবার সেই গুড় বেচে আসছেন হাটে।

রসের জন্য খেজুর গাছ কাটা, হাঁড়ি লাগানো, রস নামানো, গুড় বানানো ও বেচে আসার কাজটা করছেন শিক্ষিত তরুণেরাও। এই যেমন ফতেপুর গ্রামের রতন আলী শান্ত স্নাতক দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র হয়েও এসব কাজ করছেন। কুয়াশামাখা ভোরে রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের এই ছাত্রকেও সেদিন গাছ থেকে নামতে দেখা গেল হাঁড়িভর্তি রস নিয়ে। বললেন, ‘অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই কাজই করি। রোজগারও ভাল।’


ভোরের মিষ্টি রোদে তাউয়ার দু’পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাপড় ধরে ছিলেন কালুহাটি গ্রামের মাসুরা বেগম আর তাঁর ছেলের বউ শিউলী খাতুন। কাপড়ের ওপর বড় জারকিন থেকে খেজুরের রস ঢেলে দিচ্ছিলেন মাসুরার ছেলে শহিদ রানা। জ্বাল দেওয়ার আগে সবাই এভাবেই রস ছেঁকে নেন কাপড়ে। চুলোর কাছে যেতেই বাড়ি থেকে চেয়ার এনে বসতে দিলেন মাসুরা। ‘এক গ্লাস রস খান’ বলে গ্লাসভর্তি করে খেতে দিলেন খেজুর রস। সকালে গাছিদের বাড়িতে কেউ গেলে এভাবেই খেজুর রস আর মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। অতিথিদের জন্য খেজুরের জ্বাল দেওয়া রস দিয়ে রান্না হয় পায়েস। খাঁটি খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো হয় নানারকম শীতের পিঠা।

গাছিদের সবারই যে নিজের খেজুরের গাছ আছে তা নয়। মালিকদের কাছ থেকে তাঁরা এক মৌসুমের জন্য ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় গাছ ইজারা নেন। তারপর গাছ কেটে প্রস্তুত করেন শীতের শুরুতেই। রস নামার সময় হলে গাছে গাছে নলির সঙ্গে বেঁধে দেন মাটির হাঁড়ি। গাছিরা এসব হাঁড়িকে বলেন ‘কোর’। টলটলে রস পেতে কোরের ভেতরে মাখিয়ে দেন কিছুটা চুন। ভোরে রস নামাতে গাছিরা সাইকেলে বাঁধা জারকিন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বাড়িতে রস আনার পর কাপড়ে ছেঁকে তা দেওয়া হয় চুলোয় বসানো তাউয়ায়।

তারপর বাড়ির নারীরা জ্বাল দিতে থাকেন চুলোয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাষ্প হয়ে উড়তে থাকে রস। আর বাষ্পের সঙ্গে উড়ে যায় খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ। জ্বাল দিতে দিতে একটা সময় তাউয়ায় থাকে শুধু নালি গুড়। অনেকে এই নালি গুড়ই বয়ামে ভরে বিক্রি করেন। কেউ কেউ আবার এই নালিকেই ফর্মাই বসিয়ে করেন খেজুর গুড়ের পাটালি। পুঠিয়া, চারঘাট ও বাঘার বাড়ির উঠোনে উঠোনে চলে এমন কর্মযজ্ঞ। এসব এলাকার প্রায় চার লাখ খেজুর গাছ থেকে আট হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

রাজশাহীতে শুধু যে খাঁটি খেজুর গুড় তৈরি হয় তা নয়। কেউ কেউ চিনি মিশিয়েও করেন খেজুর গুড়। তাই খাঁটি খেজুর গুড় দিয়ে পায়েস খাওয়ার আশায় অনেকেরই গুড়ে বালি হয়। তবে ইদানিং গ্রামের তরুণরা অনলাইনে গুড় বিক্রি করছেন। তাঁরা গাছিদের সঙ্গে চুক্তি করে ক্রেতাদের জন্য চিনিমুক্ত খাঁটি গুড়ই তৈরি করে নিচ্ছেন। সে কথা জানিয়ে বাঘার ভানুকর গ্রামের আফতাব আলী বললেন, ‘যাঁরা অনলাইনের লাইগি গুড় কিনে তাঁরা তো বেশি ট্যাকাই দ্যায়। লাভও ভালই হয়। তাইলি পারে গুড়ে চিনি মিশিয়্যা লাভ আছে?’

আফতাব জানালেন, হাটে চিনিযুক্ত গুড় পাইকারীতে বিক্রি হয় ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। আর তিনি খাঁটি গুড় বেচেন ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। হাটে যেদিন গুড় বেচেন সেদিন বাজার করে আনেন। বাড়িতে ভাল রান্না হয়। ঈদ ঈদ ভাব থাকে বাড়িতে।

;