কোচবিহার: জনস্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য



ড. রূপ কুমার বর্মণ
কোচবিহার: জনস্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য

কোচবিহার: জনস্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য

  • Font increase
  • Font Decrease

পূর্বতন দেশীয় রাজ্য ‘কোচবিহার’ বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা। একসময় সমগ্র তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এই রাজ্য। সূচনালগ্ন (ষোড়শ শতক) থেকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির সময় পর্যন্ত (আগস্ট ২৮, ১৯৪৯), ‘কোচবিহার’ ছিল এই রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র।

খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রায় পাঁচশ বছর ধরে চলতে থাকা কোচবিহার রাজ্য সম্পর্কে এখানকার জনমানসে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনী, উপাখ্যান ও কিংদন্তি। রাজ-আমলে নির্মিত এখানকার রাজবাড়ি (The Cooch Behar Palace), বিভিন্ন সৌধ, মন্দির ও প্রতিষ্ঠান; সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতির ধারা কোচবিহারবাসীর (কোচবিহারি) কাছে পরম শ্রদ্ধা ও গর্বের বিষয়। কোচবিহারিগণ এখনও কোচবিহার রাজ্যের ((The Cooch Behar State) ইতিহাসকে বিশেষ মর্যাদার চোখেই দেখেন। স্বাভাবিকভাবেই  কোচবিহারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এখানে ইতিহাস ও জনস্মৃতি এবং ভাষার বর্ণালী অনেক বেশি জীবন্ত।

সাধারণভাবে কোচবিহারের আদি রাজনৈতিক ইতিহাস ‘প্রাগজ্যোতিষ-কামরূপের’ (পশ্চিম আসাম এবং বাংলার উত্তর অংশ) সঙ্গে যুক্ত করে আলোচনা করা হয়। পুরাণ-বর্ণিত নরক, ভগদত্ত ও বাণাসুরের প্রসঙ্গও চলে আসে কোচবিহারের ইতিহাসচর্চায়। তবে কোচবিহারের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রামাণ্য যুগের সুচনালগ্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে কামরূপের বর্মণ রাজবংশের উত্থানকে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে সৃষ্ট বর্মণ রাজবংশ, ভাস্করবর্মণের (আ: ৬০০-৬৫০ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের (আ:৬০০-৬৩৬) সঙ্গে সংঘাত ও উত্তর ভারতের রাজা  হর্ষবর্ধনের (৫৯০-৬৪৭) সঙ্গে মিত্রতার ফলে সমগ্র ভারতের ইতিহাসে গুরুত্ব অর্জন করেছিল।

বর্মণদের পতনের পর, সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শালস্থম্ভ নামে একজন উপজাতি-প্রধান (ম্লেচ্ছ) কামরূপে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ম্লেচ্ছ রাজ্যের (যা নবম শতক পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল)।  দশম শতকের শেষের দিকে কামরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় পাল রাজাদের শাসন। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় আদিবাসী গোষ্ঠী-প্রধানদের নেতৃত্বে বেশ কিছু  রাজনৈতিক সত্তার জন্ম হয় পালদের পতনের পর। ত্রয়োদশ শতকে কামরূপের রাজনৈতিক কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় ‘কামতা’ (অর্থাৎ কামরূপের পশ্চিম অংশে) অঞ্চলে। এখানে আমরা খুঁজে পাই পৃথু এবং সন্ধ্যার মতো দুই জন স্থানীয় রাজার নাম [যারা তাঁদের রাজধানী কামরূপ থেকে কামতাপুরে (বর্তমানে কোচবিহার জেলায় অবস্থিত) স্থানান্তরিত করেছিলেন]। এরপর থেকে এই অঞ্চলের শাসককে ‘কামেশ্বর’ বা ‘কামতেশ্বর’ (কামতার প্রভু) হিসাবে বর্ণনা করা শুরু হয়। তবে কামতাপুরে তখন কোন একজন রাজার একছত্র আধিপত্য ছিল না। তৎকালীন ঐতিহাসিক উপাদানগুলিতে কামতাপুরের বেশ কিছু রাজার নাম উল্লিখিত হয়েছে। এদের মধ্যে সিংহধ্বজ (আ: ১৩০০-১৩০৫), দুর্লভ নারায়ণ (আ: ১৩৩০-১৩৫০), অরিমত্ত (১৩৬৫-১৩৮৫),  গজাঙ্ক (১৩৮৫-১৪০০), শুক্রাঙ্ক (১৪০০-১৪১৫), এবং মৃগাঙ্ক (১৪১৫-১৪৪০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে তাঁদের রাজ্যের আঞ্চলিক বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ ছিল কামতার পশ্চিম অংশের মধ্যেই ।

পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় খেনবংশীয় নীলধ্বজ (আ: ১৪৪০-১৪৬০) কামতায় একটি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি চক্রধ্বজ (১৪৬০-১৪৮০) কামতা রাজ্যের সীমা করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরেও সম্প্রসারণ করেছিলেন। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের শেষ লগ্নে  বাংলার সুলতান হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) কামতাপুর দুর্গ আক্রমণ করেন। কামতাপুরের রাজা নীলাম্বর (১৪৮০-১৪৯৮) পরাজিত হলে, হুসেন শাহ কামতাপুর দুর্গ ধ্বংস করেন (১৪৯৮-১৪৯৯)। তবে কামতাপুরে হুসেন শাহের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কামতার স্থানীয় গোষ্ঠিপ্রধানেরা (রূপনারায়ণ, মাল কানওয়ার, লক্ষ্মীনারায়ণ, প্রমুখ) এই অঞ্চল থেকে হুসেন শাহের শাসনকে উৎখাত করেছিলেন। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকের এমন একটি পটভূমিতে পশ্চিম আসামের পার্বত্য অঞ্চলের মেচ ও কোচ জনজাতি তাঁদের গোষ্ঠী-প্রধান, হারিয়া মেচের (মন্ডল) নেতৃত্বে একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল।


হারিয়া মন্ডলের পুত্র বিশ্বসিংহ ও শিষ্যসিংহ পশ্চিম কামরূপ ও হিমালয়-সংলগ্ন বাংলায় জন্ম দেন কোচ রাজ্যের। মহারাজা নরনারায়ণ (১৫৪০-১৫৮৭) এবং তাঁর মহাসেনাপতি চিলারায়ের নেতৃত্বে এই রাজ্য সমগ্র নিম্ন-আসাম ও হিমালায়-সংলগ্ন বাংলায় সম্প্রসারিত হয়েছিল। কিন্তু কোচ রাজ্য বেশিদিন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেনি। ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে এই রাজ্যটি রঘুদেব নারায়ণ (চিলারায়ের পুত্র) এবং নরনারায়ণের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। দুই শাখার মধ্যে অবিরাম সংঘাত, কোচ-রাজ্যকে মুঘলদের আজ্ঞাবহ শক্তিতে পরিণত করে। তবে প্রাণ নারায়ণের (১৬৩২-১৬৬৫) সিংহাসনে আরোহনের সঙ্গে সঙ্গে কোচরা তাঁদের হারানো অঞ্চল এবং রাজনৈতিক প্রাধান্য ফিরে পায়। মীর জুমলার সেনাপতিত্বে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মুঘলরা কোচবিহার আক্রমণ করলেও কোচবিহারের স্বাধীন স্বত্তার বিনাশ ঘটেনি।

প্রাণ নারায়ণের মৃত্যুর (১৬৬৫) পর রাজদরবারের অন্তর্কলহ ও দক্ষিণ দিক থেকে মুঘলদের আক্রমণ কোচবিহারে ভুটানের আধিপত্য বিস্তারের সহায়ক হয়। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে কোচবিহারের উপর ভুটানের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ভুটানি সেনাদের বিতাড়নের জন্য কোচবিহার, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (The East India Company)  স্মরণাপন্ন হয়। ১৭৭৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় The Anglo-Cooch Behar Treaty (1773)।

১৭৭৩ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারের করদমিত্র হিসেবে কোচবিহার তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। ব্রিটিশ-শাসকদের তত্বাবধানে আধুনিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে কোচবিহারে বিকাশ ঘটেছে পাশ্চাত্য শিক্ষার। পাঁচটি মহকুমায় (কোচবিহার সদর, তুফানগঞ্জ, দিনহাটা, মাথাভাঙ্গা ও মেখলিগঞ্জ) বিভক্ত কোচবিহার রাজ্যের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা, শাসক-শাসিত সম্পর্ক, রাজনৈতিক চেতনা ও সমাজব্যবস্থা বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। কোচবিহারের নির্মিত বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (দেবীবাড়ি, মদনমোহন মন্দির, ব্রাহ্মমন্দির, বানেশ্বর শিবমন্দির, জল্পেশ মন্দির, বড় মহাদেব মন্দির, ইত্যাদি); দীঘি (সাগর দীঘি, রাজমাতা দীঘি, বৈরাগী দীঘি, ইত্যাদি), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (জেঙ্কিন্স স্কুল, সুনীতি একাডেমি, ইন্দিরাদেবী স্কুল, নৃপেন্দ্রনারায়ণ স্কুল, ইত্যাদি), মহারাজা জীতেন্দ্রনারায়ণ হাসপাতাল ও কোচবিহার বিমানবন্দর; নারায়ণী সেনা, চিলারায় ব্যারাক ও বিভিন্ন ধরনের উৎসব ও সাংস্কৃতিক-পরম্পরা কোচবিহারের প্রজাদের রাজভক্তির ধারাকে সচল রেখেছিল। রাজা ও রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যাক্তির নামাঙ্কিত রাস্তা ও তাঁদের মূর্তি কোচবিহারের ভারত-ভূক্তির পরও রাজ-আমলের স্মৃতিকে সজীব রেখেছে।

ভারতের স্বাধীনতার পর কোচবিহারের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। পাল্টে গেছে তাঁর জনবৈচিত্র ও প্রথাগত উৎপাদন-ব্যাবস্থা। সামাজিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধরণের টেনশন। স্বাভাবিকভাবেই রাজ-আমল ও ভারতভূক্তির-পরবর্তী কোচবিহারের তুলানামূলক আলোচনা মাঝে মঝেই প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে। এই প্রাসঙ্গিকতাই কোচবিহারের ইতিহাসকে কোচবিহারিদের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে।

রাজপরিবার ছাড়াও কোচবিহারের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এই জেলার জনস্মৃতির মধ্যে ভীষণভাবে প্রবাহমান। এক্ষেত্রে যাঁদের কথা বারবার উঠে আসে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মা (১৮৬৬-১৯৩৫), উপেন্দ্রনাথ বর্মণ (১৮৯৮-১৯৮৮) ও পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দিন আহমদ (১৯০১-১৯৬০)। পঞ্চানন বর্মার নেতৃত্বে ক্ষত্রিয় আন্দোলন, সমাজসংস্কার ও শিক্ষা-আন্দোলন এবং পরবর্তীকালের নির্বাচনী-রাজনীতি উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের একটি শক্তিশালী সম্প্রদায়ে পরিণত করেছে। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো কোচবিহারের মানুষও পঞ্চানন বর্মাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে চলেছেন। কোচবিহারের বিভিন্ন স্থানে (মাথাভাঙ্গা, কোচবিহার, হরিপুর,  ইত্যাদি) স্থাপিত হয়েছে বেশ কয়েকটি মূর্তি । পঞ্চানন বর্মার নামে নামাঙ্কিত হয়েছে কোচবিহারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও সেতু। ফলে রাজপরিবারের চিলারায় ও আরোও অনেকের সঙ্গে পঞ্চানন বর্মা জনপ্রিয় ঐতিহাসিক ব্যাক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।     অন্যদিকে ভাওয়াইয়া সঙ্গীতের শিল্পী হিসাবে আব্বাসউদ্দিন আহমদও কোচবিহারের জনস্মৃতির পাশাপাশি বৃহৎ বঙ্গে অমর হয়ে আছেন।

ড. রূপ কুমার বর্মণ কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও আম্বেদকর চর্চা কেন্দ্রের সমন্বয়ক।

মুহসীন হল মাঠে কেবল আয়োজন নয়, পরিচ্ছন্নতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে নগদ



ঢাবি করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
পরিচ্ছন্নতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে নগদ

পরিচ্ছন্নতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে নগদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ভেন্যুতে বিশ্বকাপ দেখার আয়োজন করে হইচই তৈরি করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ। বিশেষ করে মুহসীন হলের মাঠে খেলা দেখার যে আয়োজন, তা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক প্রশংসা হচ্ছে।

নগদ বলছে, তারা কেবল এই আয়োজন শুরু করেই থেমে থাকেনি। এই ভেন্যুগুলোর পরিচ্ছন্নতার দিকেও জোর দিয়েছে তারা। সে জন্য প্রতিদিন এখানে একটি দল নিয়ম করে কাজ করে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র যে তিনটি ভেন্যুতে খেলা দেখাচ্ছে নগদ, তা হলো- মুহসীন হলের মাঠ, টিএসসি এবং সোপার্জিত স্বাধীনতা। তিনটি স্থানেই এলইডি জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখানো হচ্ছে। সেই সাথে সুন্দর খেলা দেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ দেখানো হয়েছে। তবে সেসব হয়েছে মূলত প্রজেক্টরের মাধ্যমে। এই প্রথম জায়ান্ট এলইডি স্ক্রিনে দেশে খেলা দেখানো হচ্ছে। এই তিন ভেন্যুতে এতো সুন্দর সম্প্রচার দেখতে প্রতি রাতে ভিড় করছেন হাজার হাজার মানুষ। ফলে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

মুহসীন হলের মাঠে খেলা দেখতে আসা বিশাল জনসমাগম নিয়ে দুই দিন টুইটারে ছবি পোস্ট করেছে ফিফা। এ ছাড়া স্পেনের গাবিসহ কয়েকজন তারকা খেলোয়াড় এ নিয়ে টুইট করেছেন। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের নামকরা পত্রিকাগুলো এই আয়োজন নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে।


মুহসীন হলের মাঠে খেলার আগে, দিনের বেলায় দর্শকদের জন্য আছে বিভিন্ন মজার খেলা। এখানে গোল করে বা ডার্ট নিক্ষেপ করে পাওয়া যায় পুরস্কার। অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আছে নির্ধারিত কিছু স্থান। যেখানে অ্যাকাউন্ট খোলার পর নতুন গ্রাহকদেরকে তাদের প্রিয় দলের পতাকার রঙের রিস্ট ব্যন্ডসহ আরো কিছু গিফট দেওয়া হচ্ছে।

নগদ কেবল এই আয়োজন করেই সন্তুষ্ট থাকছে না। তারা এই ভেন্যুগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিয়েও ভাবছে। এখানকার প্রতিদিনের আবর্জনা পরিষ্কার করার ব্যাপারেও কাজ করছে তারা। প্রতিদিন সকালে এই ভেন্যুতে কাজ করছে নগদ-এর একটি দল কাজ করছে। তারা পুরো মাঠ পরিষ্কার করে আবর্জনা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যাগে ভরে রাখছেন। এরপর সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।

এই পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে নগদ-এর চিফ বিজনেস অফিসার শেখ আমিনুর রহমান বলছেন, ‘আমরা চাই সুন্দর ও সুষ্ঠু আয়োজন। রাতে এখানে খেলা দেখে সবাই উৎসব করবেন। পরদিন এসে আবার পরিচ্ছন্ন একটা জায়গা পাবেন। এটাই আমরা চাই। সে জন্য প্রতিদিন সকালে এই ভেন্যু পরিষ্কার করার জন্য আমরা একটা দল নিয়োগ দিয়েছি।’

 

;

রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় ল্যাঞ্জা রাতচরা



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

নির্জন নিশাচর পাখি এসে সেই পথে বসে থাকে। তবে কলাহলতার কারণে সেদৃশ্যগুলো এখন অতীত। শহরতলীর নির্জনতাটুকুও মুছে গেছে সেই কবে। বনের নির্জনতাটুকু খুঁজে পাওয়া যায় না আর। নির্জনতায় বেঁচে থাকা পাখির নাম ল্যাঞ্জা-রাতচরা। তার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।     

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা নিশাচর পাখি। বাংলাদেশে অন্য রাতচরা প্রজাতিগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি আছে। পৃথিবীতে ৯৭ প্রজাতি এবং আমাদের দেশে দেশে ৬ প্রজাতির রাতচরা পাখি বিচরণ। এর ইংরেজি নাম Large-tailed Nightjar. তবে বর্তমানে এরা আমাদের দেশে খুবই খারাপ অবস্থায়। পাহাড়ি এলাকা, নির্জন বাঁশঝার, গ্রামের কবরস্থান প্রভৃতি এলাকায় সন্ধ্যায় গেলেই ওদের ডাক এখন আর শোনা যায় না।’

এর বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাতচরা পাখিদের সবার একটি অদ্ভুত অভ্যাস হলো- এরা রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় এবং এরা দিনে মাটিতে থাকে। মাটিতেই ঘুমায়। গাছের ডালে না। মাটিতেই বসবে। মাটিতেই ডিম পাড়বে এবং মাটিতেই বাচ্চা তুলবে। পৃথিবীতে তো আগে এতো উৎপাত ছিল না। তখন থেকেই তাদের এ অভ্যাস হয়েছে যে, সারাদিন সে মাটিতে ঘুমায়। রাতে সে উড়ে উড়ে উড়ন্ত পোকা ধরে এবং গাছের ডালে বসে। নিজের খাবার জন্য রাতে উড়ে উড়ে ৪/৫টা উড়ন্ত পোকা ধরা তো সহজ কথা নয়। আর যদি ছানা হয় তবে তো আরো বেশি পোকা তাকে ধরতে হয়। ফলে সে সারারাত জেগে থাকে এবং দিনে তাকে ভালোভাবে ঘুমাতে হয়।


গায়ের রং এবং গন্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওর গায়ের রঙও কিন্তু ঝরাপাতার মতো। ঝরাপাতা পড়ে থাকলে যে রকম দেখায় সেরকম। ওর বেঁচে থাকার বড় উপায় হলো যে, ওর শরীরের রংটা ঝরাপাতার মতো এবং ওর শরীরে কোনো গন্ধ নেই। ডিমে ওর বাচ্চা শরীরে কারোই কোনো গন্ধ নেই। পাখির তুলনায় ওর চোখ অনেক বড়। ওই চোখটা বন্ধ করে দিনে সে ঘুমিয়ে থাকে। এদের পা এতো ছোট যে, ও ঠিকমতো মাটিতে বসতে পারে না।’

স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি বেশ কয়েকবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ অন্যান্য স্থানে এই পাখিটাকে দেখেছি। কিন্তু গত ১০/১৫ বছরে এদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে সন্ধ্যার দিকে লাউয়াছড়া যাবার সময় এখন যেখানে গ্রেন্ড সুলতান নামক রিসোর্ট হয়েছে এর পাশের মোড়েই দেখতে পেতাম। সন্ধ্যার দিকে রাস্তায় এসে ওর বসে থাকতো। এছাড়াও লাউয়াছড়ার ভেতরে প্রবেশ করলেই ‘ট্রাক ট্রাক ট্রাক’ স্বরে ডাকতো।

‘এছাড়াও গ্রামেগঞ্জে আগে সব সময় বাঁশবন থেকে এই পাখির ডাক শুনতাম। এখন বহু গ্রামে গিয়ে আমরা একটি শব্দও শুনতে পাই না। এর একটি কারণ। আমরা সমস্ত পোকা মেরে ফেলেছি। ফলে এ পাখিটা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল। আগামী ১০ বছরের মধ্যে হয়তো সারাদেশে ১টিও দেখতে পাবো না।’

অবস্থান সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘ওর সংখ্যা অনেক কমে গেলেও সে হয়তো টিকে থাকবে আরো কিছুদিন। কারণ সে নিশাচর পাখি বলে মানুষের হাতে সরাসরি মারা পড়ছে না। তবে মানুষের কারণে ওর থাকার জায়গা এবং খাদ্য কমে যাচ্ছে। ওদের বিলুপ্তির অধগতিটা ধীরে হবে বলে আমরা আশা করি। তাই এই প্রজাতিটিকে বিপন্ন এর তালিকায় এখনো উঠেনি। তবে ওরা এখন বিরল প্রজাতি নিশাচর পাখি।’

‘ঝরাপাতার রঙে ডিম পাড়ে এরা। বাচ্চাগুলোও হয় ওই রঙের। ওরা যদি মাটিতে বসে থাকে তবে আপনি সহজে তাদের দেখতে পাবেন না। এভাবেই সে টিকে ছিল এতো কাল। এই সুন্দর পাখিটা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সে যখন উড়ে উড়ে পোকা ধরে তখন ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয় যেন একটা ঘুড়ি যে বাতাসে উড়ছে’ বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

;

ব্রাজিলের বিস্ময়



ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
ব্রাজিলের বিস্ময়

ব্রাজিলের বিস্ময়

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রাজিলের নাম শোনেনি এমন লোক পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যাবে। সেই কবে কোন ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকের কল্যাণে পেলের নাম শুনে বড় হয়েছি। পৃথিবীতে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী দেশের স্থল যোগাযোগ রয়েছে। চিলি ও ইকুয়েডর ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের বর্ডার রয়েছে। দেশগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, পেরু, কলম্বয়িা, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ফ্রেঞ্চ গায়ানা। ব্রাজিলের আয়তন ৮৪৫৬৫১০ বর্গ কি.মি., যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৫২ গুণ বড়। পৃথিবীতে ৫ম বৃহত্তম। শুধু দেশ হিসাবে তারা বড়ই নয়, আরোও অনেক কিছু রয়েছে যার কৃতিত্ব শুধু ব্রাজিলের।

UNWTO এর আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম দক্ষিণ আমেরিকার আজেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েতে একটি কনফারেন্সে যোগদান করি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে। কনফারেন্স শেষে তিন মাসে ল্যাটিন আমেরিকার পাঁচটি দেশ আজেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি ঘুরে আসি। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। ভবিষৎতে আবারো সুযোগ পেলে ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বাকী দেশগুলো ঘুরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।


বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত রয়েছে ব্রাজিলে। নাম ক্যাসিনো বিচ যা ব্রাজিলের Rio Grand do Sul- এ অবস্থিত। এটি ২১২ কি.মি থেকে ২৫৪ কি.মি বিস্তৃত Longest Uninterrupted sandy seashore in the world এবং এটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখেছে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। এটি দেখতে বছরে ১৫ লক্ষাধিক পর্যটক আসেন।

ক্যাসিনো বিচের পরেই দীর্ঘতম বিচ হিসেবে রয়েছে Padre Island, Texas, USA, যা ১৮২ কি.মি. এটাকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা Drivable Beach। নাইনটি মইল বিচ ১৫১ কি.মি. (৯৪ মাইল) লম্বা। তারপরেই রয়েছে আমাদের কক্সবাজার বিচ যা ১৫০ কি.মি. (৯৩ মাইল)। বিশ্বের দীর্ঘতম নদের নাম নীল নদ (মিশর) এবং তারপরই রয়েছে আমাজন। তবে নীল নদের চেয়ে আমাজনের পানির ধারণ ক্ষমতা বেশী। সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রজাতির গাছ ও প্রাণির দেখা পাওয়া যায় ব্রাজিলে। ব্রাজিল সম্পর্কে ছোট করে লিখা অসম্ভব কারন সৃষ্টিকর্তা ব্রাজিলকে দিয়েছেন দু’হাত ভরে অকৃপনভাবে। আর তাই হয়তো ব্রাজিলিয়ানরা বলে থাকেন, সৃষ্টি কর্তা হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান (Deus e brasileiro)।


ব্রাজিলে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে কার্নিভালের সময়। আবহাওয়া বিবেচনায় এপ্রিল-জুন আর আগষ্ট-অক্টোবরও সেরা সময়। তবে মনে রাখবেন, করোনার টিকার পাশাপাশি Yellow Fever টিকা আবশ্যক। যারা আমাজনে যাবার পরিকল্পনা করবেন তাদের জন্য হেপটাইসিস, টিটেনাসের টিকা ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিয়ে যাওয়া উচিত।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলের (Foz do lguagu) ফজ দ ইগুয়াজুতে যাই যা ইগুয়াজু ফলস নামে পরিচিত। ফলসটি ২.৭ কি.মি এবং সেখানে ২৫টি একক ঝরনা রয়েছে যা এটিকে New Natural Seven Wonders of the World এ খেতাব এনে দিয়েছে। ল্যাটিন বা দক্ষিণ আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে এবং আমাদের বাংলাদেশি লোকজন ও খুব বেশী নেই। যদিও গত ১০ বছরে বেশ লোকজন ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির বিপর্যয়ে ও অর্থনৈতিক ধসে বেশীর ভাগ লোকজন অবৈধভাবে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০০-১৫০০ বাংলাদেশি রয়েছে ব্রাজিলে।


সাও পাওলো টু রিও

একটা শহর যে এত বড় হতে পারে সাও পাওলো না এলে বিশ্বাসই হতো না। ৪১ মিলিয়ন লোকের বসবাস। সারা বিশ্বের লোক সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ১০টি শহরের একটি। সাও পাওলোতে কামরুলের বাসায় অবস্থান করছি। কামরুলের সাথে ঢাকায় পরিচয় হয়েছিল। কামরুলের বড় ভাই কামাল দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলে রয়েছে। বিয়ে করেছেন এক ব্রাজিলিয়ানকে। যে অল্প কয়েক জন বাংলাদেশি ব্রাজিলের পাসপোর্ট পেয়েছেন কামাল তার অন্যতম। ব্রাজিলের পাসপোর্টে পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে ভিসার ঝামেলা ছাড়াই যাওয়া যায়। বিশ্বের বিশতম শক্তিশালী পাসপোর্ট।

২০১৫ এর দিকে সাও পাওলোতে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ছিলেন। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কারণ কিছু লোক যেমন প্রতিদিন ব্রাজিলে আসছেন, ঠিক তেমনি কিছু লোক ব্রাজিল ত্যাগ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। সাও পাওলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এয়ারপোর্টের নাম Guarulhos যা শহর থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। এতবড়  শহর আরও বড় মনে হতো ভাষাগত সমস্যার কারণে। ব্রাজিলের ভাষা পুর্তগীজ। ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশেই স্প্যানিশ ভাষা চলে, শুধু ব্রাজিলে পর্তুগীজ।


এ দেশ আয়তনে যেমন বড়, তেমনি এর খাবার, পোশাক, আবহাওয়া, জীববৈচিত্যও অনন্য। টাইম জোন রয়েছে ৪টি। মজা করে অনেকে বলেন, যখন একজন ব্যক্তি চারটি ঘড়ি পড়ে কোথাও যান তখন বুঝতে হবে তিনি ব্রাজিলে যাচ্ছেন। এ যেনো একের ভেতরে অনেক দেশের মিলিত রূপ।

সাও পাওলোকে অনেকে ডাকেন সাম্পা। ব্রাজিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইমিগ্র্যান্টদের বসবাস এই সাও পাওলো শহরে। সাও পাওলোর আয়তন ৭৯৪৩ বর্গ কি.মি.।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে অনিকের সাথে প্যারাগুয়েতে পরিচয় হয়েছিল এবং বর্তমানে সে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে রয়েছে (২০১৫)। অনিকের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সে স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ভাষায় পারদর্শী। তার ওখানে খায়রুলের সঙ্গে পরিচিত হই। সেও ভালো পর্তুগীজ বলতে পারে। একসময় বাংলাদেশে ভালো ক্রিকেট খেলতো। খায়রুল আমাকে বেশ সময় নিয়ে সাও পাওলোর দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখালো।

সাও পাওলোর Liberdade এলাকাটি মূলত জাপানীজ, চাইনীজ ও কোরিয়ানদের দখলে। তবে শহরটির ভিতর ইতালীয়ন প্রভাব অনেক। ৬ মিলিয়ন লোকের রয়েছে ইতালীয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড। তবে সংখ্যায় অল্প কিন্তু প্রভাবশালী কমিউনিটির মধ্যে আরব ও ইহুদীদের প্রভাব রয়েছে। যদিও শহরের ৪০ শতাংশ লোক এসেছে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের। তাদের বলা হয় Paulistanos।


পরিশ্রমী হিসেবে সাও পাওলোর লোকদের সুনাম রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যখন সাও পাওলোর লোকেরা কাজ করে তখন বাকী ব্রাজিলিয়ানরা আরাম করে। আরও বলা হয়ে থাকে, দেশটির ৪৫ শতাংশ উৎপাদনের আয় আসে এই সাও পাওলো প্রদেশ থেকে। সাও পাওলোর অবশ্যই দর্শনীয় স্থান হচ্ছে Avenida Paulista সেখান থেকে হেটেই Ibirapuera এবং Park Centro যাওয়া যায়। Sao Paulo Stock Exchange হচ্ছে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম স্টক একচেঞ্জ। পিৎজার জন্যও সাও পাওলো বিখ্যাত। Sao Paulo is the second largest consumer of pizza in the world। ৩০৫ বিলিয়ন ডলারের স্টক একচেঞ্জ হয় প্রতিদিন সাও পাওলোতে। খাইরুলের সাথে পাউলিস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিশাল বড় রাস্তা পথচারীদের হাঁটার জন্য। দুপাশে নয়ন জুড়ানো সুউচ্চ অট্রালিকা আকাশ পানে চেয়ে আছে। কিছু জায়গায় দেখলাম সুভ্যেনির নিয়ে রাস্তায় বিক্রি করছেন কিছু লোক, পর্যটক সমাগম রয়েছে এই এলাকটিতে। ব্রাজিলিয়ান বিখ্যাত আর্কিটেক্ট অস্কার নেইমার একটি স্থাপত্য দেখলাম। অস্কার নেইমা একজন পৃথিবী বিখ্যাত আর্কিটেক্ট। সারা ব্রাজিল জুড়েই যার স্থাপত্য নির্মাণ শিল্পীর নিপুন কাজ রয়েছে। সাও পাওলোতেই তার ৮/১০টি কাজ রয়েছে এবং সম্প্রতি আরেকজন বিখ্যাত আর্টিস্ট Eduardo kobra যিনি Street Art এর জন্য বিখ্যাত, সাও পাওলোর সন্তান এবং ব্রাজিল ছাড়াও ৫টি মহাদেশে ৩০০০ মুরাল তৈরি করেছেন। পাউলিস্তার রাস্তায়ও কোবরার তৈরি করেছেন ওস্কার নেইমারের ম্যুরাল। খুবই আকর্ষণীয়। সারা ব্রাজিলের রাস্তায় প্রচুর Street Printing এবং গ্রাফিতি আর্ট।  Banksy নামের একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট এই গ্রাফিতি আর্টকে জনপ্রিয় করেন।


১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিল স্বাধীনতা লাভ করে পর্তুগাল থেকে। বর্তমানে রাজধানী ব্রাসিলিয়া, এর আগে রাজধানী ছিল রিও ডি জেনেরিও এবং সালভাদর। ব্রাজিলে যত আন্তজাতিক কোম্পানির অফিস রয়েছে তার ৬৩ শতাংশ সাও পাওলোতে। সাও পাওলো বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরগুলির একটি। অভিজাত শপিং বা উইনডো শপিংয়ের জন্য যেতে পারেন Jardins, JK শপিং মল ও Iguatemi তে।

ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল পাগল জাতি আর তাইতো সাও পাওলো শহরে রয়েছে ফুটবলের জাদুঘর। ফুটবল প্রেমীদের জন্য আবশ্যই দর্শনীয় স্থান। ১৯৫০ ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় এই শহরে। ফর্মুলা ওয়ান ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় স্পোর্টস। তারা তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে রেসে।

এত বড় যে, আনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায় Sao Paulo Tiete Bus টার্মিনালে। বিশ্বের ২য় বৃহত্তম বাস টার্মিনাল। খায়রুল আমাকে নিয়ে সেই বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে রিওর কাছাকাছি পারিবা দ্যা সল যাব। দুরত্ব ৪২৩ কি.মি. যেতে ৬/৭ ঘণ্টা লাগবে। পারিবা দ্যা সেল এ রাখাল বাবু নামে এক বাংলাদেশি থাকেন। তার কাছে যাব। রাখাল মালয়েশিয়া থেকে ব্রাজিলে এসেছে। একটি গ্লোভস তৈরির কারখানাতে চাকুরি করে। বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। রাখাল বলে দিয়েছিলো। রাতে কামরুল ও তার রুমমেট রুমান আমাকে মসজিদ পার্কের সামনে থেকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিলো।

;

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা



লেখা ও ছবি: মনিরুল ইসলাম
বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রথম যেবার "আউটডোর বিডি" তাঁবুর মেলা আয়োজন করেছিলো সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। সে প্রায় দু’বছর আগের কথা আর এবার বসেছে রাস পূর্ণিমায়। যদিও রাস পূর্ণিমা দিন তিনেক আগে গত হয়েছে তবুও তার রেশ এখনো বিদ্যমান। আগেরবার এই তাঁবুর মেলা বসেছিল পাদ্মহেম ধামে আর এবার গাজীপুরের মাওনার অদূরের ক্যাম্পসাইট ও রিসোর্ট বৃন্দাবনে। তবে মজার ব্যাপার হল এখানেও একটি সাধুসঙ্গ আছে যার নাম “সত্য নিকেতন”।

হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে বৃন্দাবন একটি তীর্থস্থান। বৃন্দাবন আর রাস পূর্ণিমা একে অপরের পরিপূরক। রাস পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনেশ্বরী রাধা ও বৃন্দাবনেশ্বর কৃষ্ণা গোপীদের নিয়ে মত্ত হয়ে উঠতেন লীলা খেলায়। আমাদের তাঁবুবাসের উদ্দেশ্য সেরকম কিছু না হলেও, ভ্রামণিকদের সাথে প্রকৃতির কোলে আনন্দময় আড্ডার  সাথে নিভৃতে রাত্রিযাপনই ছিল মুল উদ্দেশ্য।   

বিগত দুবছর ক্যাম্পিং-এর মৌসুম শুরু করেছিলাম আউটডোর বিডি আয়োজিত তাঁবুবাসের মাধ্যমে, এবছরও তার ব্যাতিক্রম হচ্ছেনা। আউটডোর বিডির স্বত্বাধিকারী জুয়েল রানা আগেই ক্যাম্পিং এর দিনক্ষণ জানিয়ে রেখেছিল যাতে করে মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকতে পারি। প্রথমবার একা অংশগ্রহণ করলেও দ্বিতীয়বার নিয়েছিলাম প্রিয়তয়া স্ত্রী কানিজকে। আর এবার নতুন সদস্য হিসেবে যোগ হয়েছে আমার ছোট মেয়ে "প্রকৃতি"। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আমার মেয়ে প্রক্ক্রিতির এতাই প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা, হ্যামক, তাঁবু , স্লিপিং ব্যাগ এইসব নিয়ে সে খুব উত্তেজিত হয়ে ছিল। তিনজনের সরঞ্জামের লটবহর নিয়ে যাত্রা শুরু হল  ১১ নভেম্বর সকাল ৮ টায়।  ঢাকা ছেড়ে কোথাও যেতে গেলে পথের ভোগান্তির চিন্তায় রাস্তার মত আঁকাবাঁকা ভাঁজ কপালেও ফুটে উঠে , পরিবহন ও রাস্তার কথা চিন্তা করে । তার উপরে যেতে হবে গাজীপুর জেলার  শ্রীপুর উপজেলায়! অনেকগুলো বিকল্প পথ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেও শেষমেষ উত্তরা , টঙ্গী হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা ধরেই যাত্রা স্থীর করলাম। শ্লথগতির উন্নয়নের তোড়জোড়ে রাস্তা ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ। অনেক শংকা নিয়ে রওনা হলেও সৌভাগ্যের এলবাট্রস উড়ে এস বসেছিল আমাদের গাড়ির উপর। তাই হবে হয়তো, কেননা অনুমিত সময়ের আগেই মাওনা চৌরাস্তা পৌঁছে গেলাম। তারপর এমসি বাজার থেকে ইউটার্ন নিয়ে অতঃপর বামের রাস্তা ধরে টেঁপির বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম । “টেঁপির বাড়ী” নামটার মধ্যে একটা আদর আদর ভাব আছে! এই টেঁপির বাড়ীর এলাকায় অবস্থিত আমাদের ক্যাম্প সাইট “বৃন্দাবন”। কয়েক কিমি এগিয়ে সেই রাস্তা ছেড়ে হাতের ডানের খানিকটা অপ্রসস্থ কিছুটা আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা ধরলাম। অসম্ভভ নির্জন, স্নিগ্ধ এবং সবুজে ঘেরা সেই রাস্তা।  রাস্তার দুধারের গাছেরা যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আচ্ছা গাছেরাও কি মানুষের মত সর্বক্ষণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার! নাকি বেঁচে থাকার জন্য যটুকু আলো, বাতাস বা পানির দরকার ততটুকুর জন্যই শুধু প্রতিযোগিতা করে। কি জানি বাপু , ওদের মনস্তত্ত্ব বোঝা আমার কম্ম নয়। যাইহোক দার্শনিক ভাব ছেড়ে গল্পে ফেরা যাক। 

বৃন্দাবনে ঢোকার পথ

রিসোর্টের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান দিকটায় সবুজ ঘাসে মোড়ানো এক প্রস্থ মাঠ। এই মাঠকে ঘিরেই রিসোর্টের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। বাদিকটায় পরিকল্পিত বন, আর বনের ভিতরে ক্যাম্প সাইট। ইতিমধ্যে অনেকই হাজির হয়েছেন মোটর বাইক, গাড়ী , বাইসাইকেল সওয়ারি হয়ে। রঙ বেরঙের তাঁবু আর হ্যামকে রংধুনুর রঙে সেজেছে পুরো বন। আমর' সময় নষ্ট না করে তাঁবু খাটানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমার মেয়ে প্রকৃতি অস্থির হয়ে আছে হ্যামকে গা এলানোর জন্য তাই হ্যামক টানাতে ব্যাতিব্যস্ত হতে হলো। হ্যামক টানাতে গিয়ে রোপ-৪ এর মাহি ভাইয়ের দেখা পেলাম, তিনি সদ্য ইয়েলা পিক আরোহণ করে দেশে ফিরেছেন । ঊনার থেকে সাহায্য চাইলাম হ্যামক টানাতে। তিনি সহজেই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে হ্যামক বাধতে হয়। আগে যে পারতাম না তা নয়, সে ছিল দড়ি পেঁচিয়ে কিছু একটা করা। বোনাস হিসেবে শিখলাম হ্যামকে উঠার সবচেয়ে নিরপাদ পদ্ধতি। আমার মত ঘরকুনোদের ক্যাম্পে আসার ফায়দা হল সবসময় নতুন কিছু জ্ঞান অর্জন।

আমার মেয়ের হ্যামক বিলাস

লাঞ্চ সেরে বড়রা দলপাকিয়ে আড্ডা দিচ্ছি আর ছোটরাও দল বানিয়ে নানাও খেলার ব্যস্ত হইয়ে পরলো। বেলা পরে এলে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখবো বলে রওনা হলাম, কিন্ত মাঠের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম প্রকৃতি ব্যথা পেয়ে ফুটবল খেলা ক্ষান্ত দিয়ে মাঠের পাশে বসে আছে। আমাকে দেখে তার ব্যথার অনিভুতি গেলো বেড়ে, জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। ক্ষুদে ফুটবলারদের নেতৃত্বে ছিলেন শাহিন ভাই, ঔষধ পত্র নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরলেন। আমার মেয়ে এর আগে এত বড় ব্যথা কখনো পায়নি। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা খানিকটা ফুলে উঠেছে, তবে আমি অন্য সময়ের মত বিচলিত হলাম না। কানিজ বরাবরই আমার চেয়ে শক্ত মনের অধিকারী। খেলতে গেলে এরকম একটু আধটু ব্যথা পেতেই হয়। ছোট বেলায় খেলতে গিয়ে আমারা কত ব্যথা পেয়েছি বলে সে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলো সব।

সন্ধ্যা নেমে এলে বরাবরের মত কবির আর সুজন চায়ের আয়োজনে নেমে পড়লো। ক্যাম্পের জন্য বিশেষায়িত চুলা নিয়ে যাওয়াতে সুবিধা হয়েছে, চাইলেই চা বানিয়ে ফেলা যাচ্ছে। ওদিকে আউটডোর বিডি'র বার্ষিকী সেল শুরু হয়েছে ততক্ষনে। ক্রেতাদের ভিড়ে হট্টগোল লেগে গিয়েছে কিন্তু বিক্রি-বাট্টা আশানুরূপ নয়। অনেকটা আলী হুসেনের মত করে বলতে হয় “ আইয়া খালি হাতায় বাজান, দাম হুইন্না আর কিনে না”।

এর মধ্যেই শাহিন ভাই হাত ধরে নিয়ে গেলেন সত্য নিকেতনের গানের আসরে। সেখানে গদিতে আসীন এই রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা। এদিকে গান গেয়ে চলেছেন নুরু পাগলের এক ভক্ত। শুধু ভক্ত নয় সে একজন নুরু পাগলের দর্শনের প্রচারক । আমীর হামজা নিজেও গান লিখেন এবং সুর দেন। একসময় আমীর হামজার মৌলিক কয়েকটা গানও শোনা হলো।  শুভ্র চুল ও শশ্রুশোভিত সফেদ পাঞ্জাবি পরিহিত এক রহস্যময় পুরুষ এই মৃধা সাহেব । জীবন সম্পর্কে তার কিছু নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে যেগুলো ব্যানার ও ফেস্টুনে লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছেন রিসোর্টের বিভিন্ন স্থানে । এমনকি নিজের কবরের স্থানটিও ঠিক করে রেখেছেন আগেভাগেই আধ্যাত্মিক এই লোকটি ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা

ততক্ষণে সন্ধ্যায় গড়িয়ে রাতের আকাশের দখল চলে গিয়েছে  চাঁদ আর তারাদের হাতে। কিন্তু আমাদের ঘোরা নেশা তখনো মিটে যায়নি, মাহি ভাইকে অনুসরণ করে পিঁপড়ের লাইনের মত করে বনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা কয়েকজন।  খানিক বাদে  কিছুটা দূরে একটা পুকুর পারে খোলা আকাশের নীচে এসে হাজির হলাম । উদ্দেশ্য মাহি ভাই আমদেরকে তারাদের সাথে পরিচিত করাবেন। পকেট থেকে লেজার পয়েন্টার দিয়ে দেখালেন দ্রুবতারা কিভাবে খুঁজে বের করতে হয়! সপ্তর্ষী মন্ডল এর প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতু-কে সরলরেখায় বাড়ালে ধ্রুবতারাকে নির্দেশ করে। দিক নির্ণয়ে এই ধ্রুবতারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন কালে দিক নির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমূদ্রে জাহাজ চালাবার সময় নাবিকরা এই তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতো। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এক অঞ্চল হতে বছরের যে কোন সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। এরপর দেখালেন কালপুরুষ তারামন্ডলী যা দেখতে অনেকটা শিকারীর মত মনে হয়। তার এক হাতে ঢাল আর আরেক হাতে মুগুর, কটিতে রয়েছে খাপ খোলা তলোয়ার। এ সব কিছুই ছিল আমার কাছে নতুন। মাহি ভাই এতো সুন্দর করে দেখালেন একদম অভিভূত হয়ে গেলাম। যদিও জানি কিছুক্ষণ পরেই যদি আমকে এই তারা গুলো আবার খুঁজে বের করতে বলা হয়, আমি পারবো না।

তারা সম্পর্কে বেশ খানিকট আজ্ঞান অর্জন করে ক্যাম্প সাইটে ফিরলাম। খাওয়া দাওয়ার পর শুরু হল ক্যাম্প ফায়ার এবং আড্ডা। শত অনুরোধেও আমাদের মধ্যে লুকায়িত প্রকৃত শিল্পীরা গলা ছাড়লেন না। অগত্যা সুযোগ বুঝে সবুজ ভাই গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করলেন । তার গলা যতই বেসুরো হোক, প্রচেষ্টা যখন হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় তখন তা হয়ে উঠে মধুর ও স্বপ্নময়- তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সবুজ ভাই। যাইহোক তার গান নিয়ে বেশী কিছু বলা যাবে না। এদিকে তিনি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছে যে তার সংগীত প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তাকে আং ফ্রেং (মানে ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করে দিবে, সান্দাকফু ট্রেকে তিব্বতি ও ভুটিয়া ভাষা রপ্ত  করে এসেছে সে) করে দিবে । পরিশেষে পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন বেশ কয়েকজন সত্যিকারের শিল্পী। তাদের সংগীতের মাঝে মাঝেই শিয়াল পণ্ডিতেরা দোহারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে , যা ছিল আমার মেয়ের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। নানান অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে শুরু হলো আমদের তাঁবুবাস।

ক্যাম্প ফায়ার ও রাতের আড্ডা

সকাল হতেই মাহি ভাই স্বরূপে আবির্ভূত হলেন। কিছু রশি ও পেরেক দিয়ে একটা খেলার বোর্ড বানিয়ে ফেললেন। আমার মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল তিনি বললেন এটা টিক-ট্যাক-টো খেলা, তবে আমার একটু অন্যভাবে মজা করে খেলবো।  উনার কোন কার্যকলাপ কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শেষ হবে, উনার সম্পর্কে পূর্বধারণা রাখে এমন কেউ সাধারণত বিশ্বাস করে না।  তাই আমিও উনার এই সহজ সরল কথায় ভুললাম না, সিধান্ত নিয়ে ফেললাম যে যাই বলুক এই খেলার ভিতরে আমি ঢুকছি না। যখন নিয়মকানুন বুঝিয়ে দেওয়া হলে তখন আমি যে সঠিক ছিলাম তা বিলক্ষণ বুঝতে পারলাম। যাতে কেউ জয়ী হতে চালাকির আশ্রয় না নেয় সেই বিবেচনায় আমার দায়িত্ব পড়লো বিচারকের।  খেলা শুরু হতেই বিচার বিবেচনা শিকেই তুলে খেলা দেখায় মত্ত হয়ে গেলাম।

খেলা শেষ হতেই তাঁবুর এই মিলন মেলা ভাঙ্গার বিউগলের সুর বেজে উঠলো। নাস্তা সেরে রওনা হতেই হলো সেই চিরচেনা ঢাকা শহরের জীবনে। শত সমস্যায় জর্জরিত এই শহরে, ফিরে আসি, আসতে হয়, ভালোবেসেই আসি, স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্তের  মত।

;