থাইল্যান্ডে সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা



মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পর্যটন এলাকাগুলো ছাড়লে থাই জনগোষ্ঠীর ইংরেজি ভীতি উল্লেখযোগ্য। বরং কখনো ঔপনিবেশিক শাসনে না থাকায় ইংরেজিকে গ্রহণ করতে হয়নি বলে গর্বও করেন অনেকে। ফলে গত ১০ জুন যখন আমার স্ত্রী থাই পিবিএস টিভির সাংবাদিক কানালাওয়াই ওয়াক্লেহংকে ট্রাট হাসপাতালে ভর্তি করা হলো, আমার মৌখিক যোগাযোগেরও প্রায় সব পথ বন্ধ হয়ে গেলো। কম্বোডিয়া সীমান্ত ঘেষা ট্রাট থাইল্যান্ডের একটি বিভাগীয় শহর। বাংলাদেশে আমার অভিজ্ঞতায় ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া হলেই ইংরেজিতে মৌলিক শব্দ নাগরিকরা বলতে পারেন। অথচ এখানে বিরাট সব ডিগ্রিধারী চিকিৎসক বা আইনজীবীর পেট চেপে ধরলেও অন্য ভাষা বের হবে না। এদিকে আমার শ্বশুরবাড়িতেও স্ত্রী ছাড়া কারো পক্ষে ইংরেজিতে যোগাযোগ অসম্ভব। আর আমার থাই ভাষার জ্ঞানও হাটু ভাঙ্গা। তাই আধুনিক সময়ে গুগল ট্রান্সলেটেই ভরসা করতে হয়।

ট্রাট হাসপাতালে এর আগে ৩১ মে এবং ৭ জুন এসেছিলাম স্ত্রীকে গর্ভাবস্থার পরীক্ষা করাতে। আমার স্ত্রী যখন সন্তান সম্ভবা হয় তখন আমরা বাংলাদেশে। আমার দেখামতে থাইরা পরিচ্ছন্নতার ওপর বেশ গুরুত্ব দেয়। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা সর্ম্পকে একটা পরিষ্কার ধারনা দেওয়ার জন্য তাকে পরীক্ষা করাতে ইউনাইটেড এবং ডাক্তার দেখাতে পরবর্তীতে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। দুটো হাসপাতালেরই আঙ্গিনা দেখে স্ত্রী আমাকে বলেছিলো, ‘এতো নোংরা কেন তোমাদের হাসপাতালগুলো!’ এখানে মানুষ সুস্থ হয়ে আসলেও তো অসুস্থ হয়ে যাবে! আর ইউনাইটেডে ২ হাজার ১০০ টাকা ভিজিট দিয়ে যখন ৫ মিনিটের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিলাম, সেটা শুনে ও বললো, এমন জানলে থাইল্যান্ডের সব চিকিৎসকরাইতো বাংলাদেশে চলে আসবে!

ইউনাইটেড বা এভারকেয়ারকে নোংরা বলার কারণ খুঁজে পেলাম এখানে একটি বিভাগীয় হাসপাতালে এসে। সব মিলিয়ে মাত্র আড়াই লাখ মানুষের বাস ট্রাট বিভাগে। তবে প্রতিবেশী দেশের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে এই সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে পারেন কম্বোডিয়ার সাধারণ জনগণও। যদিও এক্ষেত্রে তাদের স্থানীয়দের তুলনায় বাড়তি খরচ গুণতে হয়। তবে ট্রাট হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা দেখে আমি মনে মনে ভাবি, ভাগ্য ভাল স্ত্রীকে দেশের সরকারি হাসপাতালে নেইনি। নিলে হয়তো মূর্ছা যেতো!

২০০২ সালেই ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ গ্রহণ করে থাইল্যান্ড। এর ফলে স্থানীয়রা সরকারি হাসপাতালগুলোতে মাত্র ৩০ বাথ বা ৮০ টাকায় বাচ্চা জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের চিকিৎসা পর্যন্ত হয়। শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ খরচ নয়, এই খরচে ওষুধ, পরীক্ষা এবং ডায়াগোনসিসের খরচও বহন হয়।

আমার স্ত্রী চাকরি সূত্রে থাকেন ব্যাংককে। এর আগে গত ডিসেম্বরে সেখানে চুলাবরন ক্যান্সার হাসপাতালে তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম গর্ভাবস্থার নিয়মিত চেক-আপে।

চুলাবরন হাসপাতালটি সরকারি হাসপাতাল নয়, বর্তমান রাজার বোন বা ভ্যালেড রাজকন্যার অনুদানে চলা একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। সেখানে ৮ মাস পর্যন্ত নিয়মিত চেকআপ করা হতো পে’র। সেখানে যে চিকিৎসক ছিলেন, ওয়টসিলা, প্রতিবার তার কাছে গেলে তিনি প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট গল্প করতেন। আমার অবস্থা, স্ত্রীর চাকরির অবস্থা, দেশের অবস্থা এসব নিয়ে। কারণ হচ্ছে একটাই, ডাক্তার হিসেবে রোগীকে আরও সহজ করা। চুলাবরনের চিকিৎসকই ৩২ সপ্তাহ হয়ে গেলে স্ত্রীর ফাইল ট্রাট হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় ইমেইলে। আমরা যখন হাসপাতাল থেকে বের হই দেশে, আমাদের হাত ভর্তি যেমন অনেক ফাইল আর টেস্টের ফলাফল থাকে, এখানে আমার স্ত্রী বা সন্তানের এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজ চোখে পড়েনি। কারণ সবই আছে হাসপাতালের নির্দিষ্ট সার্ভারে।

ট্রাট থাইল্যান্ডের ধনী প্রদেশগুলোর মধ্যে একটি। এখানে মানুষের মাথাপিছু আয় থাইল্যান্ডের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় ভাল। তবে সেই অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই। সরকারি হাসপাতালের বাইরে শুধু রয়েছে বেসরকারি ‘ব্যাংকক হাসপাতাল।’ যেহেতু পর্যটন স্থান হিসেবে ট্রাট পশ্চিমাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়, তাই তাদের জরুরি সেবা ও মেডিকেল ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করে এই বেসরকারি হাসপাতালটি। রয়েছে কয়েকটি ক্লিনিকও, সেখানে একজন বা দুজন করে চিকিৎসক রয়েছেন শুধু পরামর্শ দেওয়ার জন্য। তবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালের বাইরে একটিও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চোখে পড়েনি। আর প্রেসক্রাইবড ওষুধ নিতে হলেও শহরের ৫টি ফার্মেসির বাইরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ট্রাট হাসপাতালেও যখন স্ত্রী চেক আপে যেতো, এখানকার চিকিৎসক অনেকক্ষণ সময় দিতেন, গল্প করতেন। এতো সময় পেতেন কিভাবে চিকিৎসক? এখানে কি রোগীর চাপ কম? না, বরং এখানেও রোগীর চাপ রয়েছে। পাশের দেশের রোগীর চাপও অনেক। বিষয়টা হচ্ছে এই চিকিৎসকের হাতে সময় রয়েছে। দুপুর ২টা বা ৩টা বাজলেই নিজের চেম্বার বা বেসরকারি ক্লিনিকে যাওয়ার তাড়া নেই। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিকেও আলাদা করে সময় দিতে হচ্ছে না।

১০ তারিখ রাতে যখন স্ত্রীর গর্ভধারণের ব্যথা উঠলো সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। থাইল্যান্ডকে ইউনিফর্মের দেশও বলা যেতে পারে। যেখানে স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে, সরকারি কর্মকর্তা, বাস চালক, সবারই আলাদা আলাদা পোশাক রয়েছে। আর হাসপাতালেতো সেটি আরও কঠোরভাবে মানা হয়। চিকিৎসক, নার্স, আয়া, ট্রলিম্যান, কর্মচারী, কর্মকর্তা সবার আলাদা আলাদা পোশাক রয়েছে। তাই কে কোন কাজে নিয়োজিত সেটি বুঝতে সমস্যা হয় না।

দেশে অনেককে দেখেছিলাম, গর্ভধারণের রুমের সামনে বসে অপেক্ষা করতে। আমিও সেই প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলাম। তবে আমাকে ফেরত পাঠালেন কর্তব্যরত নার্স, গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে বললেন, ওকে লেবার রুমে নেওয়া হয়েছে। যখন বাচ্চা হবে, তোমাকে খবর দেওয়া হবে। এখানে বসে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। আমাকেও সহজভাবে মেনে বাসায় ফিরে আসতে হল।

১১ জুন স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে আমার ছেলে সন্তানের জন্ম হলো। মা ও ছেলে দুজনেই সুস্থ রয়েছেন। আমি আবার তাড়াহুড়ো করে ছুটে চললাম হাসপাতালের দিকে মা ও ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসতে। কিন্তু যেয়ে আবারও হতাশ হতে হলো। ছেলে ও মা’কে দেখলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য। বাধ্যগতভাবেই অবস্টেট্রিক ওয়ার্ডে থাকতে হবে দুই দিন।

দেশ থেকে যারা ফোন দিচ্ছিলেন, তারা অনেকেই জানতে চাচ্ছিল, কেন দুই দিন থাকতে হবে? আসলে কি সাধারণ নিয়মে প্রসব হয়েছে সন্তান? নাকি সার্জারি প্রয়োজন হয়েছিল? আবার অনেকেই বললেন, দেখো দুই দিন কি বেশি টাকার জন্য রাখছে নাকি হাসপাতাল? আসলে বাংলাদেশের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই ধরনের প্রশ্ন আসে আমাদের। আমারও এসেছিল। অবস্টেট্রিক ওয়ার্ডে শুধু মা ও সন্তানরা থাকে এখানে। আর কোন এটেনডেন্টকে থাকতে দেওয়া হয়নি। কেন? উত্তরে জানা যায়, এতে মা ও সন্তানের বাঁধনটা শক্ত হয়। আর বেশি মানুষ আসলে রোগ জীবাণু প্রবেশের সম্ভাবনাও বাড়ে। আর করোনার মধ্যেতো সেটা আরও বেশি কঠোরভাবে মানা হয়। তাই অগত্যা আরও দুইদিন অপেক্ষা করতে হলো মা ও ছেলেকে দেখতে।

তবে মা ও সন্তানকে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ার সময় দেখলাম এই দুইদিন বাধ্যতামূলক থাকার কারণে আমাকে কোন বাড়তি খরচ বহন করতে হয়নি। প্রসবের জন্য যে ৮০ টাকা খরচ করেছিলাম, সেটি সর্বসাকুল্যে খরচ। আর মা ও সন্তানকে বিভিন্ন হাইজিন সামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে। এরও তিন দিন পরে যখন আবার আমরা সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করাতে গেলাম এবার সন্তানের মাকে দেওয়া হলো ৩৪৫ বাথ, যা বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার টাকার সমান। এটা সরকারি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া সকল সন্তানদের দেওয়া হয় প্রাথমিক খরচ হিসেবে।

এছাড়াও যেসব মা ও বাবার আয় বছরে ১ লাখ বাথ বা প্রায় ৩ লাখ টাকার নিচে তাদেরকে প্রতি মাসে দেওয়া হয় ১ হাজার ৮০০ বাথ বা প্রায় ৫ হাজার ৪০০ টাকা। এই ক্যাটাগরিতে আমার স্ত্রী না পড়ায় সে এই অর্থ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

১৭ জুন সকাল থেকে স্ত্রী বলছিলেন, তার মনে হচ্ছে ছেলের চেহারা হলুদ হয়ে রয়েছে। আমরা আবারও দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, সেখানে তার বিলুরুবিন পরীক্ষা করা হলো এবং চিকিৎসক জানালেন ভয়ের কারণ নেই। সন্তান সুস্থ আছে। এবং এবার আমি জানতে পারলাম, এই শহরে আগামী ৬ মাস সন্তানকে চিকিৎসা করাতে এবং কোন পরীক্ষা নিরীক্ষাতে আমাদের আর কোন খরচ বহন করতে হবে না।

ট্রাট ছোট শহর। সবাই প্রায় সবাইকে চেনেন। এখানে ডাক্তার যাযারিকপাতি সিনথু’র অধীনে আমার সন্তান জন্ম নিয়েছে, তার সঙ্গে এক বিকেলে দেখা হলো পার্কে। দৌড়াতে গিয়েছিলেন তিনিও। বললাম, আপনারা রোগীদের অনেক সময় দেন। এই পেশাটাকে আসলেই মহৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন আপনারা। উত্তরে তিনি বললেন, আমি যখন এই পেশায় আসি, তখন আমি সেবা করার জন্য এসেছি। এখানে আলাদা কোন মহত্ব নেই। শিক্ষক, সাংবাদিকের মতো পেশাই এই চিকিৎসা। তবে অতি অর্থের পেছনে দৌড়ালে কোন পেশাই আর মহৎ থাকে না।

ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজকে ২০০২ সালেই গ্রহণ করেছে থাইল্যান্ড। এর কারণ হিসেবে দেখা গিয়েছে, জনগণকে যদি স্বাস্থ্য সুবিধা কম মূল্যে দেওয়া যায়, এতে সরকারেরই ব্যয় কমে। সাধারণ মানুষ যদি স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বহন করতেই জীবন অতিবাহিত করে দেয়, এতে রাষ্ট্রেরই অগ্রগতি থেমে থাকে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন বড় সংখ্যক রোগী ভারতের পরই ব্যাংককে আসে চিকিৎসা করাতে। এখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কয়েকগুণ বেশি খরচে চিকিৎসা করান। কিন্তু এই রোগীরা বিদেশে আসছে, তার কারণ কিন্তু স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদেরই বের করতে হবে। আমি শুধু একটি কেস স্টাডি উল্লেখ করেছি।

উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর



ড. মাহফুজ পারভেজ
উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর

উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৪৭ সালের বাটোয়ারা শুধু সিরিল র‌্যাডক্লিফের তৈরি সীমারেখা নয়, ছিন্নমূল মানুষের মনেরও দ্বিধাদীর্ণ বিভাজন, দেশভাগ এবং ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা। মধ্য আগস্টে এতোগুলো রাজনৈতিক ঘটনার রক্তাক্ত ধারায় সংগঠিত হয়েছিল 'পার্টিশান', 'দেশভাগ' কিংবা 'বাটোয়ারা, যা দক্ষিণ এশিয়ার হাজার বছরের সভ্যতা ও মানববসতি তছনছ  করে এনেছিল এমন এক স্বাধীনতা, যাকে বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদির ভাষায় বলা যায় 'মিডনাইট'স চিলড্রেন' বা 'মধ্যরাতের সন্তান'।

আক্ষরিক অর্থেই দেশভাগের পটভূমিতে মধ্যরাতের স্বাধীনতা প্রাপ্তিকালে সমগ্র উপমহাদেশ  জুড়ে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। হিন্দুদের জন্য ভারত আর মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান- এমন ধারণা ও সিদ্ধান্ত রক্তারক্তির উপসংহারে বদলে দিয়েছিল ভূমি ও মানুষের ভাগ্য। গান্ধী তখন আশাহত। নেহেরু ও জিন্নাহ যথাক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পুরো শক্তিতে দেশভাগ ও বাটোয়ারায় মত্ত। কংগ্রেসের হাইকমান্ডের মধ্যে দুইজন মাত্র দেশভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। একজন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং অন্যজন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল গাফফার খান। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার আবেগে উন্মত্ত বৃহত্তর নেতৃত্বের কাছে তাঁদের মত ছিল সংখ্যালঘু।

তারপরের ঘটনা সবারই জানা। কয়েক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন। দাঙ্গা ও হানাহানিতে নিহত হতে হয়েছিল হাজার হাজার অসহায় মানুষকে। নারী ও শিশুকে। যে কোনো যুদ্ধ ও দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়েও প্রচুর নারীকে নির্যাতিত হতে হয়েছিল প্রতিপক্ষের হাতে। শত শত বছর একই সাথে বসবাস করা মানুষগুলো রাতারাতি কীভাবে হিংস্র দানবে রূপান্তরিত হয়েছিল তা দেখে শুধু শান্তিপ্রিয় উপমহাদেশবাসী নয়, সদ্য ভারতত্যাগী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরাও দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

ভাগাভাগি ও বাটোয়ারার সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে পাঞ্জাব, বাংলাকে। কারণ এ দুইটি প্রদেশও বিভক্ত অর্থাৎ ভাগ হয়ে পড়েছিল দুই দেশে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে এপার থেকে ওপারে, ওপার থেকে এপারে পাড়ি জমাতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। এদের অনেকেই হয়ে পড়েছিলেন ঠিকানাহীন। এক কোটিরও বেশি  মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে গিয়েছিল। অনেকে রাতারাতি রাজা থেকে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল মানবতা। সে মৃত্যু, দেশত্যাগ, লাঞ্ছনা, অত্যাচার আর ভয়াবহ নির্যাতনের ক্ষত উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে এখনো শুকায়নি। সেই অসভ্যতা, বন্যতা চিরস্থায়ী ক্ষত রেখেই ক্ষান্ত হয়নি, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে প্রায়শই দূষিত ও রক্তাক্ত করছে পুরো উপমহাদেশে এবং উপমহাদেশের বিভাজিত দুই জনপদ, ভারত ও পাকিস্তানকে।

১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার ফলে সৃষ্ট চরম নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিলেন উপমহাদেশের মানবিক ও মুক্তমনা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। এসব ঘটনা নিয়ে রচিত হয় অনেক কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। সে ভয়াবহ দাঙ্গার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন উর্দু সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য লেখক কৃষণ চন্দর, খাজা আহমদ আব্বাস, সাদত হাসান মান্টো, রাজেন্দ্র সিং বেদী, আহমদ নাদিম কাসমী, ইসমত চুগতাই, রায়নাল কুদরউল্লাহ, অমৃতা প্রীতম প্রমুখ। বাংলা ভাষার পাঠকরা এই লেখকদের অধিকাংশের লেখার সঙ্গে পরিচিত।

১৯৪৭ সালের নির্মম,  নিষ্ঠুর পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এরমধ্যে সম্প্রতি নির্মিত 'পার্টিশান ১৯৪৭' একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। ১৯৪৯ সালে মুম্বাইয়ে পরিচালক এম এন আনন্দ তৈরি করেন 'লাহোর' ছবিটি। এরপর বিজয় রায়ের পরিচালনায় মুক্তি পায় 'ক্যায়া দিল্লি ক্যায়া লাহোর'। এরপর সলিল সেনের 'নতুন ইহুদি' (১৯৫৩)  শান্তিপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়ের 'রিফিউজি' (১৯৫৪)।  ঋত্বিক ঘটকই এই বিষয়টাকে তার তিন-তিনটি ছবিতে অত্যন্ত শিল্পসম্মত ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। ছবি তিনটি, 'কোমল গান্ধার', 'মেঘে ঢাকা তারা' এবং 'সুবর্ণরেখা'। 

ঋত্বিকের পরে বেশ কিছু ছবি তৈরি হয়েছে দেশভাগকে কেন্দ্র করে। 'বিপাশা', 'আলো আমার আলো' ইত্যাদি ছবিতে দেশভাগ প্রসঙ্গ এসেছে। রাজেন তরফদার তার 'পালঙ্ক' ছবিতে দেশভাগের প্রসঙ্গটিকে চমৎকারভাবে নিয়ে আসেন।

তবে ইদানিংকালে নতুন করে দেশভাগকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গৌতম ঘোষের 'শঙ্খচিল', বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কাঁটাতার', বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের 'তাহাদের কথা', সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'রাজকাহিনি' কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'বিসর্জন',  'বিজয়া' দেশভাগের ছবি।

১৯৪৭ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায় ৭৫ বছর পেরিয়ে এলেও কিছুকাল আগে পর্যন্তও তথ্যনিষ্ঠ, লেখ্যাগার-নির্ভর/ আর্কাইভনির্ভর, তথাকথিত উচ্চমার্গীয় ইতিহাস দেশভাগজনিত ব্যথা, বেদনাবোধ এবং সর্বোপরি মানসিকতার ইতিহাস রচনার কলাকৌশল ঠিক আয়ত্ত করতে সমর্থ ছিল না। সুখের কথা, মহাফেজখানার দলিল-দস্তাবেজের বাইরে অন্য ধরনের তথ্যসূত্রের সাহায্যে এই মানবিক ট্র্যাজেডিকে ধরার প্রয়াসও শুরু হয়েছে ক্রমশ।

গবেষণার ধারায় ভাগাভাগি বা দেশভাগের গল্প বলতে গিয়ে কান্তি পাকড়াশির দ্য আপরুটেড (১৯৭১) উদ্বাস্তু মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়। ভারত ও পাকিস্তানে দুই পাঞ্জাবের উদ্বাস্তু মহিলাদের অভিজ্ঞতাকে উলটেপালটে দেখে সেই প্রয়াসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন উর্বশী বুটালিয়া, রিতু মেনন, কমলা ভাসিনরা, আর প্রায় একই সময়ে জ্ঞানেন্দ্র পান্ডেও তার লেখায় বলেন যে, "দেশভাগের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন এমন মানুষদের দৃষ্টিকোণ থেকেই খুঁজে পেতে হবে দেশভাগের অন্যতর মানবিক ইতিহাস।"

মৌলিক গবেষণার বাইরে স্মৃতিকথাকে ভিত্তি করে উদ্বাস্তুদের ইতিহাস লিখলেন নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, যশোধরা বাগচি, শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, দীপেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। জয়া চ্যাটার্জি রচনা করেছেন দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত।

এভাবেই তৈরি হওয়া দেশভাগের বিভিন্ন প্রান্ত ও পর্বের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে স্মৃতিকথনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রের ধারায় আনাম জাকারিয়া নামের এক তরুণী হারপার-কলিন্স থেকে প্রকাশ করেছেন একটি গবেষণাগ্রন্থ, যার নাম দ্য ফুটপ্রিন্ট অব পার্টিশান, যাতে ১৯৪৭ সালের পর চার প্রজন্মের স্মৃতি-সত্তা-অভিজ্ঞতায় বিভাজনের নানা দাগ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আন্তরিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

১৯৪৭ সালে বাটোয়ারা ও ভাগাভাগিতে প্রাপ্ত ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি অবশ্যই সেসব দেশে উদ্‌যাপন করার মুহূর্ত, কিন্তু একই সঙ্গে দু’দণ্ড থমকে দাঁড়িয়ে এটাও ভাবা প্রয়োজন যে, এতটা পথ পেরিয়ে আসতে গিয়ে কোন কাজগুলো ঠিক, আর কোনগুলো ভুল হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজ উপমহাদেশ একটা পথসন্ধিতে দাঁড়িয়ে— রাজনীতির মেরুকরণ সম্পূর্ণ, সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত।  সমাজে তার ছাপ প্রকট, অর্থব্যবস্থা গতি হারিয়েছে এবং একই সঙ্গে চড়া বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি চলছে।

উপমহাদেশের এই সর্বব্যাপী অস্থিরতা কি নতুন উচ্চতায় পৌঁছনোর জন্য যাত্রা শুরু করার প্রাক্‌মুহূর্ত, না কি এ এক পতনের সূচনালগ্ন? পঁচাত্তর বছরের অভিজ্ঞতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো নিয়ে স্ব স্ব দেশের নেতৃত্ব ও নীতিপ্রণেতারা  নিশ্চয় ভাববেন। স্বীয় ইতিহাস বিশ্লেষণ করে অতীতের সূত্র ধরে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকেও বোঝার চেষ্টা করবেন। তাতে ভবিষ্যতের পথটি আবার কালো, রক্তাক্ত, বিভাজিত অন্ধ-গহ্বরের বদলে আলোর দিশা পেতে পারবে।

যখন নেতৃত্বের লালসা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ক্ষমতার মোহ, ধর্মীয় মেরুকরণ, সাম্প্রাদায়িকতার রণহুংকার উপমহাদেশের উদার, বহুমাত্রিক, ধর্ম ও সমাজের মানবিক যাত্রাকে গতিরোধ করে দাঁড়াচ্ছে; বাক্‌স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে; সংখ্যালঘু-দলিত-ভিন্নমত প্রতিনিয়ত আক্রান্ত, কোণঠাসা ও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে; তখন গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ সমুন্নত রাখা এবং জাত-পাত ও ধর্মীয় বিভাজন, জাতিভেদ প্রথা দূর করার আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই অপরিহার্য। ১৯৪৭ সালের ভাগাভাগি, বাটোয়ারা ও সহিংস বিভাজনের প্রতিধ্বনি প্রগতি, মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের জন্য মোটেও সহায়ক ও কল্যাণকর হয় নি এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের কখনোই হতে পারে না, ৭৫ বছরের ইতিহাস এই সত্যেকেই সত্যায়িত করছে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম। 

;

নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩



আমান-উদ-দৌলা
নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩

নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩

  • Font increase
  • Font Decrease

১. 'সাটেনিক ভার্সেস' গ্রন্থের প্রখ্যাত লেখক সালমান রুশদীকে (৭৫) গত শুক্রবার নিউইয়র্ক রাজ্যের বাফেলোতে এক সভায় বক্তৃতা করার সময় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তার একটি চোখ, হাত ও পেটে কিডনী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।

তাকে আঘাতকারী নিউজার্সির অধিবাসী হাদি মাতারকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্ত চলছে।

ঘটনার পর পরই হেলিকপটারে করে নিয়ে যাওয়া হয় পেনসিলভেনিয়ার একটি হাসপাতালে। তিনি শনিবার দুপুর পর্যন্ত অজ্ঞান অবস্থায় ভেন্টিলেশনে আছেন। তার অবস্থা খুব ভাল নয় বলে জানা গেছে।

এদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়ার সরকার প্রধানসহ অনেকেই এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে ও তার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

২. ১৩ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আগাম প্রাইমারী ইলেকশন নিউইয়র্ক স্টেটে। আগামী ২৩ আগস্ট ভোটের দিন। এর ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। সমগ্র নিউইয়র্ক রাজ্য প্রায় বাংলাদেশের সমান। ৫৪ হাজার ৫৫৫ বর্গমাইল। এর মধ্যেই নিউইয়র্ক সিটি অবস্থিত।

বর্তমান ডেমোক্রেট গভর্নর ক্যাথী হকুলের সংগে রিপাবলিকান প্রার্থী এন্ড্রু জুলিয়ানীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য এন্ড্রুর বাবা রুডি জুলিয়ানী একসময় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র ছিলেন। পরে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন।

৩. কংগ্রেসের সিনেটে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হলো। ডেমোক্রেট সিনেটরদের ৫১ ভোটে পাশ হলো। ইকনোমিক বিল এর নাম। এতে জলবায়ু সমস্যার কার্বন অপসারনের ৪০ ভাগ সমাধান, সব পেট্রল চালিত গাড়ি ইলেক্ট্রিক গাড়িতে রুপান্তর, প্রত্যেক বাড়িতে সোলার প্য্যনেল দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুত- পানির বিকল্প ব্যবস্থা। বড় লোকেরা ১৫ পার্সেন্ট ট্যাক্স দেয়ার ব্যবস্থা। আরও অনেক ব্যবস্থা চালু হবে। সব মিলে প্রায় ৩৬৯ বিলিয়ন ডলারের বিল পাশ হলো সোমবার ভোরে। সারারাত লবিং করে ভোরে ভোট করে পাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইতিমধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাশ হওয়া এই বিলে সই করে আইনে পরিনত করেছেন।

৪. অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রী হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। এতো যাত্রী যে তার জন্য যত ফ্লাইট চালু করতে হবে। তার জন্য প্লেন নাই। প্লেন আছে তো পাইলট নাই এবং স্টুয়ার্ড নাই। পেন্ডামিকে সব কলেজ-ইউনিভার্সিটি বন্ধ ছিল। পাইলট ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে লোক আসেনি। স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। এখন এই সামারে যখন অনেকে প্লেনে বেড়াতে যেতে চাইছে। তখনই অজস্র ফ্লাইট বাতিলের খবর আসছে।

৫. শুধু কি ফ্লাইটে পাইলট সংকট? অনেক স্কুল ও কলেজে মাস্টার নাই। সবাই নতুন শিক্ষক হায়ার করতে চাচ্ছে। কিন্তু যত চাহিদা তত নেই। সর্বত্র এই ক্রাইসিস। ঠিক হতে কয়েক বছর লাগবে।

৬. ১৫ আগস্ট শোক দিবসে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশি অরাজনৈতিক সংগঠন জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী। তারা ৫ হাজার লোকের মধ্যে তবারক বিতরণ করবে। এতে থাকবে সাদা ভাত, গরুর মাংসের তরকারি, পানি ও ড্রিংস। নিউইয়র্কের যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগও কর্মসূচি নিয়েছে। একটি পার্টি হলে দিনটি পালন করবে। এছাড়া বাংলাদেশ দূতাবাস ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্কের কন্সুলেট অফিস ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনেও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার শোক দিবস পালন করবে।

৭. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে আসছেন। জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনে তিনি ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলায় ভাষণ দেবেন। তার আগে সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখে নিউইয়র্ক পৌঁছাবেন। সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের একটি সূত্র প্রধানমন্ত্রীর এ সফর কনফার্ম করেছেন।

৮. সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের ফ্লোরিডায় রাষ্ট্রের দেয়া বাড়ি অবস্থিত। মার-এ-লাগো নামের এই বাড়ি থেকে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই তল্লাশি চালিয়ে ১৫ বাক্স কাগজপত্র নিয়ে এসেছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় হোয়াইট হাউজের এই জিনিসপত্র আর্কাইভে রাখার নিয়ম। যদি তা প্রমাণ হয় তাহলে আগামি নির্বাচনে তিনি দাড়াতে পারবেন না। ট্রাম্প এক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এটা 'অসদাচরণ' তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঠেকাতে 'বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে'।

৯. ৪৯ জন কংগ্রেসমেন বিল উত্থাপন করেছে। এতে বাংলাদেশি সহ ৮০ লাখ কাগজপত্রহীন গ্রীনকার্ড পেতে যাচ্ছে। 'দ্য রিনিউইং ইমিগ্রেশন প্রভিশন অফ দ্য ইমিগ্রেশন এক্ট অফ ১৯২৯' নামের বিলটি পাশ হলে তারা গ্রীনকার্ড পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৯২৯ সালের ৯৩ বছর পর ১৯৭০ সালে এবং ১৯৮৬ সালে লাখ লাখ লোককে গ্রীনকার্ড দেয়া হয়। বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে এরপর কিছু কিছু করে দেয়া হলেও এবার ৮০ লাখ লোককে আবারও গ্রীন কার্ড দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে। যারা কোনো অপরাধে দণ্ডিত হন নি। বিভিন্ন কাজে নিরলস কাজ করে আসছেন। তারাই পাবেন গ্রীনকার্ড।

(bbc, nytimes, cnn, ws,j apnews এইসব সহ প্রধান প্রধান অনলাইন পত্রিকা ও নিউজ এজেন্সি থেকে গত ৭ দিনের রিপোর্ট দেখে, তা সংক্ষিপ্ত আকারে 'নিউইয়র্কের দিনলিপি'তে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য পরিবেশন করা হচ্ছে।)

* আমান-উদ-দৌলা, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক-বাংলা বিভাগ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ( ২০১৪-১৬)। সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার-দৈনিক জনকন্ঠ ( ১৯৯৪-২০০০) One of the founders and First GS of DCAB in 1998. ( Dilpomatic Correspondent Association, Bangladesh)

;

ভ্রমণক্লান্ত পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী শকুন



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

  • Font increase
  • Font Decrease

একপ্রাপ্ত থেকে আরেক প্রান্তে দীর্ঘ পরিযানের পথ। এর ফলেই অনেক শকুন অসুস্থ হয়ে হারায় উড়ার শক্তি। মাটিতে পড়া এই বিশাল আকৃতির পাখিটাকে দেখে ভয় পেয়ে যায় অনেকেই। ঠিক তখনই ভয়ে ভীত মানুষেরা বা অতি উৎসাহী এলাকাবাসীর আঘাতে এসব শকুনদের অসুস্থ হওয়াসহ প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে ব্যাপক।

পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে নিরাপত্তা ও খাদ্যের লোভে যেসব পরিযায়ী পাখিরা পরিযান করে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম ‘হিমালয়ী গৃধিনী’ (Himalayan Griffon Vulture)। প্রতি বছর শীতকালে এই শকুনগুলো মাইগ্রেট বা পরিযায়ন করে বাংলাদেশের সমতল ভূমিগুলোতে চলে আসে।

কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তিতে তারা আমাদের দেশে এসে অনেক সময় উড়তে পাড়ে না। মাটিতে পড়ে যায়। তখন গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অনেক সময় অতি উৎসুক হয়ে অথবা ভয়ে সেই হিমালয় গৃধিনী শকুনদের মেরে ফেলে।

শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু বলেন, আমরা কয়েক বছর আগে সিলেট অঞ্চলেও পেয়েছিলাম এমন অসুস্থ হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের। আমরা এগারোটা অসুস্থ শকুনদের সুস্থ করে প্রকৃতিতে ছেড়েছি। আমাদের ক্যাপভিট সেন্টারে গড়ে বিশ থেকে ত্রিশটা শকুন খাওয়াই-দাওয়াই, ট্রিটমেন্ট দিই, পরিচর্যা করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেই।

প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে আহত শকুনটিকে। ছবি: সীমান্ত দীপু

তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে আমরা প্রায় শতাধিক শুকুন সুস্থ করে ছেড়েছি। আগে যখন আমরা হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের নিয়ে কাজ করতাম না তখন কি পরিমাণ শকুন মারা পড়তো। প্রতি বছর শীত মৌসুমে গড়ে প্রায় ৫০টা শকুন বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে।

তাদের খাবারের অভাব সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, এরা সুদূর হিমালয়ের এরিয়া থেকে আসে। এরা অনেক অনেক দূর জার্নি করে এসে খাবার পায় না। খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইংরেজিতে একে বলে ‘সর্টেজ অফ ফুড’ অর্থাৎ খাদ্যের সংকট। অনেক দূর জার্নি করার ফলে তাদের খাবারের প্রয়োজন পড়ে; এই জিনিসটা সঙ্গে সঙ্গে ওরা পায় না। তখন খুব দুর্বল হয়ে যায় এবং উড়তে পারে না। গ্রামের উৎসুক মানুষ এমন অবস্থায় শকুনদের বেঁধে রাখে, আহত করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলে। কারো কারো পালক ওঠে যায়, কারো কারো পাখা ভাঙে, কারো কারো আবার পা ভাঙে। তখন আমারা এসব অসুস্থ শকুনদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি।

শকুন গবেষণা প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হিমালয়ী গৃধিনী পরিচর্যার জন্য দিনাজপুরের সিংড়াতে একটি রেসকিউ সেন্টার তৈরি করেছে বনবিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।

এ জাতের পাখি দেশের যেকোন জায়গায় আটকা পড়লে দ্রুত স্থানীয় বন বিভাগ বা আইইউসিএন দলকে জানান। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করছি এবং সবার সহযোগিতায় পেলে এবছরও হিমালয়ী গৃধিনী শকুনগুলোকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু।

;

পদ্ম বিলে সৌন্দর্যের হাতছানি



ছাইদুর রহমান নাঈম, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্ম। মৃদু হাওয়াতে দুলছে ফুলগুলো। ভোরে যেন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে রয়েছে বিলে ৷ নৌকা দিয়ে ঘুরে এমন দৃশ্য দেখার আনন্দটাই অন্য রকম। হাতের কাছে, চোখের সামনে ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। কাছ থেকে তাকিয়ে দেখলে স্বপ্নের দেশে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও বিলে সাদা বক, পাতি হাঁসের সাঁতার কাটা, বিভিন্ন পাখির শব্দ মনকে উদ্বেলিত করে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের নওভাগা, খামা বিলসহ কয়েকটি স্থানে রয়েছে পদ্ম ফুল। এসব বিলে প্রায় আট থেকে ১০ মাস থাকে পানি। বিলে সৌন্দর্যের আভা ছড়াচ্ছে ফুটে থাকা রাশি রাশি গোলাপি পদ্মফুল। প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন কাছে-দূরের দর্শনার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক যুগ আগে থেকে বর্ষাকালে এ বিলের অধিকাংশ জমিতেই প্রাকৃতিকভাবে জন্মে পদ্ম ফুল। আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত এই বিলে পদ্ম থাকে। এসময় পুরো বিল গোলাপি রঙের পদ্মে ভরে ওঠে, যা দেখলে যে কারও মন জুড়িয়ে যায়।

শীত মৌসুমে বিলটি প্রায় শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। তখন সেখানে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। আর বাকি সময় থইথই পানিতে ভরা থাকে বিলটি। সেইসঙ্গে দেশি মাছের ছড়াছড়ি এ বিলে। ফলে বছরজুড়ে এ বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে গোলাপি রঙের পদ্মফুল ফুটে আছে। বিলের পানিতে শাপলা-শালুক আর পদ্মফুলের ছড়াছড়ি। বিশাল এ বিল জুড়ে এখন শুধুই গোলাপি-লাল-সাদার সংমিশ্রণে ফোটা রাশি রাশি পদ্ম ফুল। ফুলগুলো যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। শরতের ফুল হলেও বিলে বর্ষাতেই তার সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক নিয়ে হাজির হয় ‘পদ্ম’। প্রকৃতিতে নিজের রূপ বিলিয়ে দিচ্ছে ফুটে থাকা এ জলজ ফুলের রাণী।

জেলা-উপজেলা ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা বিলটিতে আসছেন। ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। পাশাপাশি তুলছেন ছবি-সেলফি, করছে ভিডিও।

সারা বছর পানি থাকে এমন জায়গায় পদ্ম ভালো জন্মে। তবে খাল-বিল, হাওর-বাওড়ে এ উদ্ভিদ জন্মে। এর বংশবিস্তার ঘটে কন্দের মাধ্যমে। পাতা পানির ওপরে ভাসলেও এর কন্দ পানির নিচে মাটিতে থাকে। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে গাছ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাতা বেশ বড়, পুরু, গোলাকার ও রং সবুজ। পাতার বোঁটা বেশ লম্বা, ভেতর অংশ অনেকটাই ফাঁপা। ফুলের ডাঁটার ভেতর অংশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ছিদ্র থাকে। ফুল আকারে বড় এবং অসংখ্য নরম কোমল পাপড়ির সমন্বয়ে সৃষ্টি পদ্মফুলের। ফুল ঊর্ধ্বমুখী, মাঝে পরাগ অবস্থিত। ফুটন্ত তাজা ফুলে মিষ্টি সুগন্ধ থাকে। ফুল ফোটে রাত্রিবেলা এবং সকাল থেকে রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির পূর্ব পর্যন্ত প্রস্ফুটিত থাকে। রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুল সংকুচিত হয়ে যায় ও পরবর্তী সময়ে প্রস্ফুটিত হয়। ফুটন্ত ফুল এভাবে অনেক দিন ধরে সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়।

এর পাতা বড় এবং গোলাকৃতি। কোনো কোনো পাতা পানিতে লেপ্টে থাকে, কোনোটা উঁচানো। বর্ষাকালে ফুল ফোটে। হাওর-ঝিল-বিল বা পুকুরে বিভিন্ন ফুলের মতো শুভ্রতার প্রতীক সাদা পদ্মফুল ফোটে। ফুল বৃহৎ এবং বহু পাপড়িযুক্ত। সাধারণত বোঁটার ওপর খাড়া, ৮-১৫ সেমি চওড়া। ফুলের রং লাল, গোলাপি, সাদা ও সুগন্ধিযুক্ত। হিন্দুদের দুর্গাপূজার প্রিয় এ ফুল। ফুল ও ফলের ভেষজ গুণ আছে। পদ্মের মূল, কাণ্ড, ফুলের বৃন্ত ও বীজ খাওয়া যায়। পুরোনো গাছের কন্দ এবং বীজের সাহায্যে এদের বংশবিস্তার হয়। তিন ধরনের পদ্মফুল রয়েছে যেমন- শ্বেতপদ্ম, লালপদ্ম, নীলপদ্ম।

আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের জন্য খুবই উপকারী। ঔষধি গুণ ছাড়াও পদ্মচাক, বীজ ও বোঁটা সুস্বাদু খাবার। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পুকুর-জলাশয়, লেক ও হাওর-বিলে গোলাপি পদ্ম বেশি চোখে পড়ে। সে তুলনায় সাদা পদ্ম বা পদ্মকমল অনেকটাই অপ্রতুল। আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে সাদা পদ্ম বিলুপ্তির পথে। সাদা পদ্মের উৎসস্থল জাপান ও নর্থ অস্ট্রেলিয়া।

এর ফলের বীজ হূৎপিণ্ড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং ডায়রিয়া রোগ সারাতে এর বোঁটা কাঁচা খেলে উপকারে আসে। পদ্মফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি লোটাস চা গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া ও হার্টের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। হাইব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণ করে। পদ্মের শুকনো মূল গুঁড়া করে খেলে ফুসফস, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে।

;