ইনফোসিস মাইশুরে মনোমুগ্ধকর এক বিকেল



এম এ আমিন রিংকু
ইনফোসিস মাইশুরে মনোমুগ্ধকর এক বিকেল

ইনফোসিস মাইশুরে মনোমুগ্ধকর এক বিকেল

  • Font increase
  • Font Decrease

তন্দ্রা কাটলো পাশের সিটে বসা সতীর্থের ডাকে। চোখ কচলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেশ খানিকটা আশ্চর্য হলাম। একগাদা বিস্ময় নিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম 'এ কোথায় এলাম'? আশপাশে তাকিয়ে শত প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল মাথায়। বিস্ময় সামলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। মনে মনে বলতে লাগলাম, 'ঘণ্টা খানেকের বাস যাত্রায় তো আর ভারতের মহীশুর থেকে ইউরোপের কোন শহরে চলে আসা যায় না!'

আমরা একশ তরুণ ভারতে এসেছি ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেলিগেশন টু ইন্ডিয়া প্রকল্পের আওতায় ভারত সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। আটদিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরের প্রতিটি দিনই ছিল আমাদের কাছে স্বপ্নের মত। আর আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য পরের দিন কোথায় যাচ্ছি সেটি জানানো হত না। শুধু সকালে কখন বের হতে হবে সেই সময়টা জানিয়ে দেওয়া হত।

১৭ অক্টোবর সকালের ব্যস্ত শিডিউল শেষ করে মধ্যাহ্নভোজের পর মহীশুরের বিখ্যাত হোটেল গ্র্যান্ড মার্কিউর থেকে সারপ্রাইজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম পরবর্তী চমকের জন্য উদগ্রীব থাকা শত তরুণ। ভারতের টেক হাব হিসেবে খ্যাত কর্ণাটক রাজ্যের প্রায় সব শহরই অনেক গোছানো আর পরিপাটি। তবে মহীশুরকে অনেক বেশি পরিপাটি সবুজ আর নির্মল বায়ুর শহর মনে হল। চারিদিকের সবুজের মাঝে ছুটে চলা বাসে কখন চোখ ভারি হয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। সতীর্থের ডাকে চোখ খুলে বিস্মিত হয়েছি।

ইনফোসিস ক্যাম্পাস

ভারতের টেক জায়ান্ট ইনফোসিসের মহীশুর ক্যাম্পাস প্রায় সাড়ে ৩০০ শ একর জুড়ে। মূল ফটকের পরে আমাদের ফুলেল অভ্যর্থনা জানালেন ক্যাম্পাসের কর্মকর্তাবৃন্দ। ক্যাম্পাসের ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য আছে ইনফোসিসের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। কর্মকর্তারা জানালেন প্রথমে আমাদেরকে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাবেন তারা। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে ১০০টির মত বৃহদাকার বিল্ডিং আছে। এদের কোনটি ওয়ার্ক স্টেশন, কোনটি ট্রেনিং সেন্টার আবার কোনটি থিয়েটার। বাসে করে সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাবার সময় মনে হচ্ছিল ইউরোপের কোন শহরের মধ্যে আছি। ঝকঝকে তকতকে রাস্তার দুপাশে ইন্দো ইউরোপীয় স্থাপত্য কলায় নির্মিত আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ভবনগুলোর শান শওকত দেখেই ইনফোসিসের অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্বন্ধে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল।

ভারতের সবচাইতে বড় এই তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির হেডকোয়ার্টার বেঙ্গালুরুতে। বিশ্বের ৫০টি দেশে শাখা অফিসে আছে তাদের। আর এসব শাখা অফিসে কাজ করেন ৩ লাখ ৩৫ হাজার কর্মী । ইনফোসিসের টোটাল রেভিনিউ ১৬. ৯৭ বিলিয়ন ডলার! আর ভারতের জিডিপিতে ইনফোসিস এর অবদান ৮.৩৬ শতাংশ।

এ ক্যাম্পাসের অপারেশন ম্যানেজার অনিল কার্গ । তিনি আমাদের ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানোর পাশাপাশি বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন প্রতিটি স্থাপনার সম্পর্কে। ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানে জিইসি ভবন। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল রাজপ্রাসাদ। ভেতরে ঢুকে দেখলাম এখানের পরিবেশ আর সাজসজ্জাও রাজকীয়। মি. কার্গ জানালেন এই ভবনে একসাথে দশ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ভবন জুড়ে শুনশান নীরবতা অথচ করিডোর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় দেখছিলাম প্রতিটি কক্ষে একাগ্র চিত্তে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিটি কর্মী। এখানে কাজের পরিবেশ বিশ্বমানের। আর কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থাও তারকা হোটেলের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

সবুজকে প্রাধান্য দিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে সব স্থাপনা

জিইসি ভবন থেকে বেরনোর পরে পড়ে স্পোর্টস কমপ্লেক্স। মর্ডান সুইমিংপুল, হাইলি ইকুইপড জিমনেশিয়াম আর বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ দেখে মনে হচ্ছিল একটা প্রতিষ্ঠান কতটা কর্মী-বান্ধব হলে এত সুযোগ সুবিধা দিতে পারে! মাঠ পেরুলেই সবুজে ঘেরা উঁচু নিচু টিলা। আর তার মাঝে মাঝে ইকো ফ্রেন্ডলি ভবন। এদের কোনটি শিক্ষার্থীদের জন্য আবার কোনটি কর্মকর্তাদের জন্য। ইনফোসিসের এই পুরো ক্যাম্পাসটি ইকো ফ্রেন্ডলি ও গ্রিন প্রটেকটেড। সবুজকে প্রাধান্য দিয়েই গড়ে তোলা হয়েছে সব স্থাপনা। ক্যাম্পাসের ভেতরেই- ভেহিক্যালস ছাড়া সব ধরনের যানবাহন প্রায় নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ই-বাইসাইকেল। কিছু দূর পরে পরেই আছে এসব বাইসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট স্টেশন। অ্যাপের মাধ্যমে আনলক করে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে চালানো যায় এসব ই-বাইসাইকেল।

ইনফোসিস ক্যাম্পাসের প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে মুগ্ধতা। ঘুরে ঘুরে আমরা ঠাওর করতে পারছিলাম না আসলে কোনটির চাইতে কোনটিতে বেশি মুগ্ধ হব। মনোমুগ্ধকর স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পরেই চোখ ধাঁধানো মাল্টিপ্লেক্স। উইকেন্ডে বিনোদনের জন্য কর্মীদের যেন বাইরে যেতে না হয় এ চিন্তা মাথায় রেখে বানানো হয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই মাল্টিপ্লেক্সটি। ছুটির দিনে দুটি শো দেখানো এখানে। মাস-জুড়ে মাত্র ১৫০ রুপির পাসে দেখা যায় সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সব সিনেমা। মাল্টিপ্লেক্সের পাশেই ফুড় কোর্ট। পুরো ক্যাম্পাসে ১০টি ফুড় কোর্ট আছে। যেগুলোর একেকটিতে একবারে প্রায় দুই হাজার মানুষ খেতে পারেন। বিনোদনের পুরো প্যাকেজ রয়েছে ক্যাম্পাসে।

পড়ন্ত বিকেলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল অডিটোরিয়ামে। ইনফোসিসের জন্মলগ্ন থেকে বেড়ে ওঠা ও আজকের টেক জায়ান্ট হয়ে উঠার গল্প একটা ছোট ডকুমেন্টারিতে দেখানো হল। একটা মানুষ কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ও নিবেদিতপ্রাণ হলে এমন একটা বিজনেস ইমপায়ার দাঁড় করাতে পারে সেটা ইনফোসিস এর প্রতিষ্ঠাতা নাগাভার রামরাও নারায়ণ মূর্তি সাহেবের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ই-বাইসাইকেল

ইনফোসিস শুরু করার আগে নারায়ণ মূর্তি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট আহমেদাবাদের একজন সিস্টেম প্রোগ্রামার হিসেবে এবং পুনেতে পাটনি কম্পিউটার সিস্টেমে কাজ করেছেন। একটা সময় মূর্তির মনে হয়েছে পরিবর্তিত বিশ্বের প্রযুক্তি চাহিদা মেটানোর জন্য কিছু করতে হলে সেটি নিজ উদ্যোগে শুরু করতে হবে। ভারতের পুনের ছোট একটা ফ্লাটে মাত্র আড়াইশো ডলার মূলধন নিয়ে ১৯৮১ সালে ইনফোসিস শুরু করেন তিনি। ইনফোসিসের প্রথম প্রোডাক্ট ছিল ব্যাংকিং সলিউশন সফটওয়্যার 'ফিনাকেল'। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই ফিনাকেল এতটা জনপ্রিয় হয় যে নারায়ণ মূর্তিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ইনফোসিস আজ ৭১.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কোম্পানি!

নারায়ণ মূর্তি ১৯৮১-২০০২ সাল পর্যন্ত সিইও হিসেবে এবং চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১১ সাল পর্যন্ত কাজ করছেন। ২০১১ সালে তিনি বোর্ড থেকে সরে দাঁড়ান এবং ইমেরিটাস চেয়ারম্যান হোন। ২০১৩ সালের ১ জুলাই তিনি ৫ বছরের জন্য নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। নারায়ণ মূর্তি ফরচুন ম্যাগাজিন কর্তৃক আমাদের সময়ের সেরা ১২ জন উদ্যোক্তার তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। ভারতে আউটসোর্সিংয়ে অবদানের জন্য তাকে টাইম ম্যাগাজিন ও সিএনবিসি ‘ভারতীয় আইটি সেক্টরের জনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ভারতের অর্থনীতিতে বিপুল অবদান এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নারায়ণ মূর্তি ২০০০ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ পুরস্কার লাভ করেন।

 ইনফোসিস

ডকুমেন্টারি দেখে বের হবার পরে আমাদেরকে বিকেলের নাস্তা পরিবেশ করা হল। কফি পান করতে করতে গল্প হচ্ছিল ইনফোসিস মাইসূরের অপারেশন ম্যানেজার অনিল কার্গের সাথে। জিজ্ঞাসা করলাম তাদের সফলতার মূল মন্ত্র কী। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানালেন ‘আমরা মানুষের জন্য এবং সকলের কল্যাণের জন্য কাজ করি। কর্মীদের সাথে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেই। আমাদের আজকের 'আমরা' হয়ে উঠার মূলমন্ত্র এটাই’। পিঠ চাপড়ে আরও বললেন, ‘দেখো আমিন, তুমি যখন সবাইকে ভালবাসতে শিখবে, সবার কল্যাণে কাজ করে যাবে- জীবনের প্রান্তিলগ্নে গিয়ে দেখবে মানুষের ভালবাসায় তুমি একদম আকণ্ঠ ডুবে আছো! বিশ্বাস করো এর চেয়ে পরিতৃপ্তি জীবনে আর কিছুতে হতে পারে না!’

সন্ধ্যায় যখন হোটেলে ফিরছিলাম তখন সকলের চোখমুখে সারাদিনের ক্লান্তি ছাপিয়ে চিকচিক করছিল একরাশ মুগ্ধতা। আমাদের কেউ গুগলের ক্যাম্পাস ঘুরে দেখিনি তবে আমাদের বিশ্বস্ত প্রতিবেশী ভারতের ইনফোসিস ঘুরে দেখলাম। আগামীতে অন্য কোন টেক জায়ান্টের ক্যাম্পাস ঘুরে দেখলেও এ মুগ্ধতা ছাপিয়ে যাবে না। ইনফোসিস এর স্মৃতিগুলো চিরসবুজ থাকবে; অনুপ্রাণিত করবে আজীবন।

লেখক: সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী

জুবায়ের সিদ্দিকী ছিলেন সিলেটে শিক্ষাবিপ্লবের সমর নায়ক



সাঈদ চৌধুরী
জুবায়ের সিদ্দিকী

জুবায়ের সিদ্দিকী

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) ছিলেন সিলেটে এক নীরব শিক্ষা বিপ্লবের মহানায়ক। শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। অন্তঃকরণে এই একটাই ভাবনা ছিল। স্কলার্স হোম ছিল তার স্বপ্নপূরণের গন্তব্য। তার অন্তঃকরণ কল্পনাতীত ভাবেই উদার ও সুপ্রশস্ত ছিল।

জুবায়ের সিদ্দিকী মূলত একজন অকুতোভয় সৈনিক, সফল শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান লেখক। নিয়মানুবর্তী এই মানুষটার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই হৃদয়ের কোণে জমে আছে অফুরান ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা। তার নতুন দুটি মাইলফলক অর্জন, একজন সমর নায়ক থেকে শিক্ষক ও লেখক হিসেবে সফল উত্তরণ আমাদের চোখের সামনেই। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তাকে কাছে থেকে দেখেছি। তাই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে পারি, এই বহুমুখী শিল্প সাধকের অনেকগুলো উত্তম গুণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিরল। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী, নির্লোভ ও নিরহংকার জীবনের অধিকারী।

হঠাৎ এই আলোর প্রদীপ নিভে যাবে তা ভাবতে পারিনি। ইন্তেকালের কিছুদিন আগে তার শিক্ষা বিপ্লব নিয়ে কথা হয়েছিল। এক্ষেত্রে তিনি আমাকে প্রেরণা সঞ্চারকারী ভাবতেন। সিলেটে ইংরেজি মাধ্যমে খাজাঞ্চীবাড়ি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের যাত্রা আগে শুরু হলেও আমাদের বৃটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলকে (বিবিআইএস) তিনি নতুন মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলে তার শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্যাম্পাস বৃদ্ধির সর্বশেষ অগ্রগতি শেয়ার করতেন। এ নিয়ে কিছু লেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু লেখার আগেই তিনি চলে গেলেন তার শেষ ঠিকানায়, মহান মাবুদের কাছে।

২০২০ সালের ৯ মার্চ বাহাত্তর বছরে পা রাখেন প্রবীণ এই কৃতি ব্যক্তিত্ব। বয়সের কারণে তাকে প্রবীণ বললেও এক উজ্জল তারুণ্য তার মাঝে ছিল বিদ্যমান। সৈনিক জীবন থেকে অবসরে এলেও কর্মজীবনে কোন বিরতি গ্রহণ করেননি। তার সর্বশেষ সাধনার ক্ষেত্র ছিল হাফিজ মজুমদার ট্রাস্টের শিক্ষা প্রকল্প ‘স্কলার্স হোম’।

১৯৯৭ সালে আমরা বৃটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (বিবিআইএস) প্রতিষ্ঠার পর সিলেট অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যে প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়, এরই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কলার্স হোম স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বর্তমানে এর ছয়টি শাখা রয়েছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। সেখানে হাজার হাজার কোমলমতি শিশু-কিশোরদের জীবন গড়ার প্রধান কারিগর এই জুবায়ের সিদ্দিকী। সিলেটে এক নিরব শিক্ষা বিপ্লবের তিনি ছিলেন সমর নায়ক।

কথায় আছে, রতনে রতন চেনে। মানব কল্যাণে জীবন উৎসর্গকারী হাফিজ মজুমদার ঠিকই চিনতে পেরেছেন সিলেটের দুই রত্নকে। একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) আর অন্যজন হলেন বৃটেনে সাড়া জাগানো মেইনস্ট্রিম পলিটিশিয়ান ও শিক্ষাবিদ ড. কবীর চৌধুরী। এই কৃতি ব্যক্তিত্বরা সিলেট অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে রেখেছেন অপরিমেয় অবদান। এ এক বিরাট জাগরণ।

স্কলার্স হোম যেন খুলে দিয়েছে রূপকথার দরজা৷ জুবায়ের সিদ্দিকী বুঝতে পেরেছিলেন, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে কত পিস মিগ বিমান এল তার চেয়ে কতটা ছেলে-মেয়ে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হল তা অনেক বেশি গুরুত্বপর্ণ। উন্নত বিশ্বের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছি, সেখানে আধুনিক শিক্ষার উপরে যে থিসিস হয়েছে তা জানতে গিয়ে তার আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি মনে করতেন, সিলেটে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কী হবে, যদি সেখানে স্থানীয় শিক্ষার্থী ভর্তি হতে না পারে! স্কলার্স হোমকে তিনি সে ঘাটতি পূরণের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে পেরেছেন। আরও বিশাল মহীরূহে পরিণত করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছিলেন।

জুবায়ের সিদ্দিকী সৈনিক জীবন থেকে সিভিলিয়ান জীবনে ফিরে এলেও সময় নষ্ট করার মত সাধারণ্যে তিনি ফিরে আসেননি। এজন্য পরিচিত মহলেও তার কিছুটা দূরত্ব ছিল। এটা তিনি সহজভাবে স্বীকার করতেন। সংকীর্ণতা, হীনমন্যতা ও দলাদলির এই দেশে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে জুবায়ের সিদ্দিকী সামাজিক ও রাজনৈতিক বেড়াজাল থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি কখনও কোনো দল বা মতের পক্ষে কথা বলেননি।

সৈনিক জীবনে অনেক দক্ষ ও সাহসী ভূমিকার ফলে পর্যায়ক্রমে জুবায়ের সিদ্দিকী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও কুয়েতের স্বাধীনতা রক্ষায় তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। ১৯৯০ সালে ইরাক অতর্কিতে কুয়েত দখল করলে আমেরিকা সেখানে যৌথবাহিনী পাঠায়। বাংলাদেশ থেকেও আড়াই হাজার সৈন্য অংশ নেয়। বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন জুবায়ের সিদ্দিকী।

কর্মজীবনে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জুবায়ের সিদ্দিকী ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালে ৩২ বছরের সেনাবাহিনী জীবনের ইতি টানেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.)’র আত্মজীবনিমুলক বই ‘আমার জীবন আমার যুদ্ধ’ পড়লে মুগ্ধ হতে হয়। এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রখ্যাত কবি, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মোফাজ্জল করিম বলেছিলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকীরা সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করেছেন। জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করেই মহাপুরুষে পরিণত হয়েছেন। দেশকে সুন্দর করতে সমৃদ্ধ করতে সোনালী ভবিষ্যতের জন্যে প্রয়োজন তারমত দেশপ্রেমিক নিষ্কলুষ মানুষের।

সিলেটে এক সময় আমার সহযোদ্ধা দাপুটে সাংবাদিক ও বাম রাজনীতিক শামীম সিদ্দিকীর বড় ভাই আমাদের প্রিয় জুবায়ের সিদ্দিকী ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বুধবার ভোরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। ২৪ মার্চ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সিলেটের হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ওই দিন বিকেলে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মারা যান।

জুবায়ের সিদ্দিকী স্মরণে দেশে ও প্রবাসে অনেক অনুষ্ঠান হয়। গত বুধবার (২২ মার্চ) সকালে স্কলার্সহোম শাহী ঈদগাহ ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে অধ্যক্ষ লে. কর্নেল মুনীর আহমেদ কাদেরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জুবায়ের সিদ্দিকী বৃত্তি প্রদান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ইয়াসমিন সিদ্দিকী, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, ট্রাস্টের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ছয়ফুল করিম চৌধুরী হায়াত।

ফারজানা মুর্শেদের সঞ্চালনায় এসময় আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন হাফিজ মজুমদার ট্রাস্টের যুগ্ম সচিব খায়রল আলম, মদনীবাগ ক্যাম্পাসের অধ্যক্ষ আক্তারী বেগম,পাঠানটুলা (প্রাথমিক) ক্যাম্পাসের ইনচার্জ জেবুন্নেছা জীবন, মেজরটিলা ক্যাম্পাসের নাহিদা খান, মোস্তাফিজুর রহমান ও শরিফ উদ্দিন। কবিতা আবৃত্তি করেন গণিত বিভাগের প্রভাষক বাপ্পি কুমার মজুমদার, দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাওদুরা রহমান আরিশা। জুবায়ের সিদ্দিকীর মহৎকর্ম নিয়ে ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করেন আইসিটি বিভাগের প্রভাষক জাহিদুল ইসলাম।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.) ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এবছর বিভিন্ন শ্রেণির ১৫ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা এই মহতি মানুষের অবদান স্মরণ করে নতুন প্রজন্মকে সেভাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমীন।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী। সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

;

১৩টি ‘মহাবিপন্ন’ বাংলা শকুনের মৃত্যু



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বাংলা শকুন। ছবি: বন বিভাগ

বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বাংলা শকুন। ছবি: বন বিভাগ

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি প্রাণ হারিয়েছে ১৩টি মহাবিপন্ন বাংলা শকুন (White-ramped Vulture)। তবে এদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিষক্রিয়াজনিত কারণে এদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ দাবি করেছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (২৩ মার্চ) সকালে সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়নের কালারবাজারের কাছে বড়কাপন গ্রামের বুড়িকোনা বিল থেকে বনবিভাগের কর্মকর্তারা ১০টি মৃত শকুন উদ্ধার করেন। পরে সেদিন দুপুরে সেখান থেকে আরও ৩টি মৃত শকুন উদ্ধার করা হয়।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর সর্বশেষ ২০১৪ সালে জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২৬০টি শকুন ছিল। এর মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে ছিল ৮০টি। এই ১৩টি শকুনের মৃত্যুর পর সংখ্যাটি আরও কমে গেল।

মৌলভীবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুস ছামাদ বলেন, ‘মৃত ১০টি শকুন আইইউসিএন কর্মকর্তারা বস্তায় করে আমাদের কাছে নিয়ে আসেন। এগুলো ১০-১২ দিন আগে মরেছে বলে ধারণা করছি। সব পচে-গলে গেছে। শকুনগুলোর মৃত্যুর কারণ জানতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সিলেট ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়েছি। ধারণা করছি, মৃত গরু, ছাগল, কুকুর বা শিয়ালের মাংশ খেয়ে শকুনগুলো মারা যেতে পারে। অনেক সময় গরুর চিকিৎসায় নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ইনজেকশন ব্যবহার করা হয় এবং কুকুর-শিয়াল নিধনে গ্রামগঞ্জে বিষ জাতীয় পদার্থ ব্যবহৃত হয়। এই প্রাণীগুলোর কোনোটি মারা যাওয়ার পর তার মাংস শকুন ভক্ষণ করলে তারাও বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে।’

ঘটনাস্থলে বনবিভাগের কর্মকর্তাগণ। ছবি: বন বিভাগ

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শ্যামল কুমার মিত্র বলেন, ‘মহাবিপন্ন বাংলা শকুন এক সঙ্গে এতগুলো মারা যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যাপক খোঁজাখুজির পর আরো তিনটি শকুন মৃত অবস্থায় পেয়ে উদ্ধার করেছি। এর আগে ১০টি মৃত শকুন আইইউসিএনের কর্মীরা সিলেটে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ মোট ১৩টি শকুন বা তার বেশি মারা গেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, বিষক্রিয়ায় শকুনগুলো মারা গেছে। এই শকুনগুলোর মৃত্যুর ব্যাপারে স্থানীয় কেউই তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করেনি। তবে এই শিশু আমাদের জানিয়েছে এই এলাকায় শিয়াল একাধিক ছাগল খেলে ফেলায় মৃতছাগলের পরিত্যক্ত মংশে বিষ মিশিয়ে দেয়া হয় শিয়ালদের মারার জন্য। সেই বিষ থেকে শকুনগুলো মারা যেতে পারে বলেও আমাদের ধারণা। তবে সিলেট ল্যাব থেকে রিপোর্ট পেলে শকুনগুলোর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

পাখি গবেষকেরা বলছেন, পশু চিকিৎসায় বিশেষ করে গরুর চিকিৎসায় ব্যবহার হওয়া দুটি ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন জাতীয় ওষুধের বহুল ব্যবহারের ফলেই মূলত শকুন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে। এই দুইটি ওষুধ খাওয়া প্রাণীর মাংস খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে কিডনি বিকল হয়ে মারা যায় শকুন।

পাখি বিশেষজ্ঞ, পাখিপ্রেমী এবং পরিবেশকর্মীদের জোর দাবীর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকার ২০১০ সালে পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক এবং ২০১৭ সালে দেশের দুইটি এলাকায় কেটোপ্রোফেনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

;

পাখি ও বন্যপ্রাণীদের দুঃসময়



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
সুন্দরবনের বিপন্ন প্যারাপাখি। ছবি: সংগৃহীত

সুন্দরবনের বিপন্ন প্যারাপাখি। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জলবায়ু পরিবর্তনে পাখিদের সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে। কমেছে পাখির আবাসস্থল। ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী।

বৈশ্বিক পাখি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৪২ হাজার প্রজাতি হুমকির মুখে আছে, যা মোট প্রজাতির প্রায় ২৮ ভাগ। বিগত দুশো বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। এভাবে চলতে থাকলে আগামী একশ বছরের মধ্যে এই বন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সুন্দরবনের খয়রাপাখা মাছরাঙা পাখি। ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতি বিশেজ্ঞরা বলছে, বনের ওপর মানুষের অধিক নির্ভরশীলতার কারণে ক্রমান্বয়ে এর আয়তন অতি দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। বনের আয়তনের সাথে সাথে হ্রাস পাচ্ছে এর জীববৈচিত্র। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ, ২ প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি এবং ৫ প্রজাতির স্তনপায়ী প্রাণী হুমকির মুখে। জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সুন্দরবনে একাধিক অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হলেও কাজে আসছে না তার সুফল।

পাখি বিশেজ্ঞরা বলছেন, এক দিকে বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনে পাখি সংখ্যা কমলেও ভারত অংশে সুন্দরবনে পাখির সংখ্যা বাড়ছে। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের পাখি-বৈচিত্র্যের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ‘জুওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’। ‘বার্ডস অফ দ্য সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার’ নামের সেই বইটিতে এই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রতিটি পাখি প্রজাতির ছবি-সহ বিশদ বর্ণনা নথিভুক্ত হয়েছে।

‘বার্ডস অফ দ্য সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার’ নামক বই।

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪২০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে সুন্দরবনে পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি মিলিয়ে রয়েছে ৪২৮টি প্রজাতি। দেশে প্রাপ্ত ১২টি প্রজাতির মাছরাঙার ৯টিরই দেখা মেলে এই অঞ্চলে। সেইসঙ্গে গোলিয়াথ হেরোন, স্পুনবিল স্যান্টপিপার, হুইমবেল, লার্জ ইগ্রেট, টেরেক স্যান্ডপিপার, প্যাসিফিক গোল্ডেন প্রোভারের মতো বিরল প্রজাতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে এই অঞ্চলে।

যা ইতিবাচক দিক হিসেবেই মনে করছেন ভারতের প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। ভারতে বর্তমানে ১৩০০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। যার প্রায় এক তৃতীয়াংশই বাসিন্দা সুন্দরবনের। বৈচিত্র্যের নিরিখে গোটা ভারতের মধ্যে যা রয়েছে শীর্ষস্থানে। আবাসস্থল ও অবাধে চলাচলের জন্যে বাংলাদেশ অংশের পাখিরা ভারত অংশের সুন্দরবনে নিজেদের নিরাপদ মনে করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অন্যদিকে, কমতে থাকায় বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০। এর মধ্যে পাখি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৭২১। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর অবস্থা কী - তা দেখার জন্য ২০১৫ সালে প্রকাশিত আইইউসিএন এর ‘লাল তালিকা’ দেখা যেতে পারে। সেখানে রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রায় ১২৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী হুমকি বা বিলুপ্তির মুখে আছে, যা মোট প্রজাতির প্রায় ১৪ ভাগ। গত ১০০ বছরে প্রায় ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে, যা এ দেশের মোট বন্যপ্রাণীর প্রায় ২ ভাগ।

;

হাকালুকিতে কম এসেছে পরিযায়ী পাখি



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
হাকালুকিতে পাতি-সরালির ঝাঁকও কমে গেছে। ছবি: এবি সিদ্দিক

হাকালুকিতে পাতি-সরালির ঝাঁকও কমে গেছে। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

হাকালুকিতে পাখি শিকারিদের কারণে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা দিন দিন কমছে। যার কারণে হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য অনেকটাই হুমকির মুখে।

হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, নদী দূষণ, জাল বিষ টোপ ও পটাশ দিয়ে পাখি শিকার। একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বিলে মাছ আহরণ, বিল শুকিয়ে মাছ নিধন, বিলে ২৪ ঘণ্টা পাহারা ও জলজ বৃক্ষ নিধনসহ রয়েছে নানান সমস্যা।

চলতি বছরের শীত মৌসুমের পাখিশুমারিতে সে তথ্যই জানান দিয়েছে। জানুয়ারি মাসের ২৮ ও ২৯ তারিখ দু’দিন ব্যাপী হাকালুকি হাওরে করা হয় পাখি শুমারি করে বন বিভাগ, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) যৌথ উদ্যোগে এ শুমারি করে।

বাংলাদেশে ৭১৮ প্রজাতির পাখির মধ্যে ৩৮৮ প্রজাতির পাখিই পরিযায়ী। এরা শীতকালে পরিযায়ী হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটে আসে বাংলাদেশে। আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয় হাকালুকি হাওরের মতো জলাশয়। প্রায় ১৮১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ হাওরে রয়েছে ছোট-বড় ২৭৬টি বিল। পাখিশুমারিতে তাদের জরিপে হাকালুকিতে এ বছর এসেছে প্রায় ২৫ হাজার পাখি। যা বিগত বছর থেকে অনেক কম। যা ২০২০ সালে ছিলো প্রায় ৪০ হাজার ১২৬ পাখি। মাত্র কয়েক বছর আগে দেশে ৫-৬ লাখ পরিযায়ী পাখি আসতো। এসব পাখির বেশিরভাগ মৌলভীবাজার ও সিলেটের হাওরে অবস্থান করতো।

যুগল বেগুনি কালেমের সৌন্দর্য। ছবি: এবি সিদ্দিক

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) এর পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ২০ বছরে সারা বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে ৩৫ শতাংশ। হাকালুকিতে কমেছে ৪৫ শতাংশ। ২০০০ সালের আগে হাওরে বিচরণ করতো প্রায় ৭৫-৮০ হাজার পাখি। তার ৮০ শতাংশই হাকালুকি হাওরে ছিলো।

পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাকালুকি হাওরে যে নদীগুলো মিলিত হয়েছে এখন সেই নদীগুলো প্লাস্টিক, পলিথিন, দূষিত পানি ও ময়লার ভাগাড়। পাখি কমার বিশেষ কয়েকটি কারণের মধ্যে এটি একটি। অরক্ষিত থাকায় দিন দিন কমেছে পাখির সংখ্যা। হাওরের পরিযায়ী পাখি রক্ষায় স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি করা, পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা থাকতে হবে। এতেই বাঁচবে পাখি।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, সিলেট এর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, প্রতি বছর হাওরে বিল ইজারা দেওয়া হয়। এ বছরও হয়েছে। এতে বেশ লোকসমাগম ঘটে। দিনরাত পাহারা দেওয়া হয়। এসব কারণে পরিযায়ী পাখিরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে না। বিল শুকিয়ে মাছ আহরণের কারণে নষ্ট হচ্ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। ফলে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে।

;