কার্তিকের শুরুতে এলো হেমন্ত

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
শীতের আগাম নরম ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে

শীতের আগাম নরম ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে

  • Font increase
  • Font Decrease

কার্তিকের হাত ধরে চিরায়ত বাংলায় আজ বুধবার (১৬ অক্টোবর) হেমন্ত এসেছে। আসন্ন শীতের আগাম নরম ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে।

শরতের তরুণ শিশির বিন্দুগুলো হেমন্তে এসে যৌবন লাভ করে। কুয়াশার হাল্কা বুনন ভারী হয় এই ঋতুতে। আজ কার্তিকের নতুন হৈমন্তি সকালে মনে হচ্ছে, ভোরগুলো ভেসে এসেছে অনেক অনেক দূর থেকে, শিশির মেখে, কুয়াশা চাদর জড়িয়ে। তাপহীন মায়াবী আলোর ভোর স্বাগত জানাচ্ছে নতুন দিনকে।

হেমন্ত আসে চুপি চুপি। কাতির্ক আর অগ্রহায়ণ দু’টি মাস পেলেও হেমন্ত বড়ই নিশ্চুপ আর সংক্ষিপ্ত ঋতু। শুরুটা মিশে থাকে শরতের উষ্ণ-উজ্জ্বলতায়; শেষটা চলে যায় শীতের শরীরে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে হেমন্তকে টের পাওয়া যায় না খুব একটা। মানুষ ও প্রকৃতিকে আলগোছে ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেমন্ত আসে, আবার চলেও যায়।

বাংলার প্রকৃতির মতো সাহিত্যেও হেমন্ত জাগায় মায়াবী দোলা। জীবনানন্দ দাশ হেমন্তকে নানাভাবে দেখেছেন। ব্যবহার করেছেন এমন অনেক শব্দ, যা হেমন্তের সমার্থক।

জীবনানন্দকে বলা হয় ‘ধূসর ঋতু হেমন্তের কবি’। তাঁর আরেক পরিচয় হলো ‘নির্জনতম কবি’। এই কবি বলেছেন, ‘যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে/পথের পাতার মতো তুমিও তখন/আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে।’

জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় ‘নবান্ন’, ইদুঁর’, ‘শালিক’, ‘লক্ষ্মীপেঁচা’, ‘নির্জন স্বাক্ষর’, কার্তিকের নীল কুয়াশায়’ ইত্যাদি শব্দ ও উপমা এমন যুৎসইভাবে প্রয়োগ করেছেন যে, তাঁর কবিতা পাঠে হেমন্তের সমগ্র আবহ মানসপটে চলে আসে।

কবি নিজেও ভারাক্রান্ত আবেগে উচ্চারণ করেছেন, ‘যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়/যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে-ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে/যখন চড়াই পাখি কাঁঠালীচাপাঁর নীড়ে ঠোটঁ আছে গুজে/যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে খয়েরী পাতায়/যখন পুকুরে হাঁস সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়/শামুক গুগলিগুলো পড়ে আছে শ্যাওলার মলিন সবুজে-।’

হেমন্তের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে নতুন ধানের উৎসব ‘নবান্ন’। মাঠ ভর্তি ধানের পাশাপাশি গাছ ভর্তি হয়ে থাকে চালতা আর কামরাঙা। নারকেলও প্রচুর পাওয়া যায়। নতুন ধানের চাল দিয়ে নারকেল সহযোগে নানা পিঠা, পুলি হেমন্তের অনুসঙ্গ, যা শীতেও বহাল থাকে।

শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ, মল্লিকা, দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, ধারমার, রাজঅশোক ফুল পূর্ণতায় ভরিয়ে দেয় প্রকৃতি ও পরিবেশ। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় পাখির কল-কাকলি আর ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা হৈমন্তি দিনগুলো চিরায়ত বাংলার রূপ, রস ও সৌরভ সঞ্চিত সম্পদ।

গ্রাম-বাংলায় হেমন্ত নিয়ে আসে জীবনের উল্লাস। মাঠে মাঠে ফসলের সমারোহ। ধান কাটার আয়োজন। ধানের মৌ মৌ গন্ধে জীবন জেগে উঠে কার্তিকে, এবং তারপর অগ্রহায়ণে, হেমন্তে। শুরু হয় আত্মীয় বাড়ি বেড়ানোর পালা। মেয়ে, বৌদের ‘নাইয়ব’ যাওয়ার ধুম লাগে এ সময়ে। মেলা, পার্বণ, উৎসবে ছেয়ে যায় চিরায়ত গ্রাম-বাংলা।

শাশ্বত গ্রামীণ ঐতিহ্যও তখন নবপ্রাণ পায়। পিঠা, পুলির সঙ্গে নানা ধরনের গ্রামীণ খাদ্য ও সামগ্রী, কুটির শিল্পজাত দ্রব্যাদিতে ভরপুর হয়ে যায় গ্রাম্য মেলা আর হাট-বাজারগুলো। মাছ ধরার আয়োজনও চলে তখন। গ্রীষ্মের খরতাপহীন আর শীতের তীব্রতাহীন জীবন-যাপন মোহনীয় আলো-ছায়ার মায়ায়-মায়ায় বয়ে চলে যায় হৈমন্তী  অমরাবতীর অমৃতলোকে।

হেমন্তে সন্ধ্যাগুলো খুব তাড়াতাড়ি চলে যেতে চায় রাতের কোলে। দিন ও রাত্রির প্রহরে প্রহরে হেমন্ত এঁকে দেশ প্রকৃতির নিজস্ব বৈভব ও স্বাতন্ত্র্য। মখমল মসৃণ হাওয়ার স্বিগ্ধতায় ঋদ্ধ হয় মন-প্রাণ। প্রকৃতি বড় বেশি মায়াবী রূপ লাভ করে হেমন্তে। গ্রীষ্মের রূঢ়তা নেই, নেই শীতের আড়ষ্ঠতা, মাঝামাঝি এক অনির্বচনী পুলক স্পর্শ দিয়ে হেমন্ত  মানুষের দেহে ও চৈতন্যে আনে স্বর্গীয় অনুভূতি। প্রকৃতি ও মানুষ  জীবনের আনন্দধ্বনি ও মঙ্গলালোকে স্নাত হয় কার্তিকে, হেমন্তে।

আপনার মতামত লিখুন :