সুরসাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

নিশীথ দাস, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
শুভ জন্মদিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

শুভ জন্মদিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

  • Font increase
  • Font Decrease

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতজগতে একজন বিশ্ববিখ্যাত দিকপাল সাধক। তিনিই প্রথম বাঙালি হিসেবে পাশ্চাত্যে এ উপমহাদেশের রাগসংগীতকে পরিচিত ও প্রসার লাভের ব্যবস্থা করেন। অনেক উঁচু মাপের এই সংগীতকলাকার ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামে ১৮৬২ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতাও ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ। আলাউদ্দিনের সংগীতগুরু ছিলেন ওস্তাদ কাশিম আলী খাঁ।

আলাউদ্দিন খাঁ মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা শিল্পী হিসেবে কিছুদিন চাকরি করেন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎকিশোরের আমন্ত্রণে সংগীত পরিবেশন করতে গিয়ে ভারতের বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁর সরোদবাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হন। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে সরোদে তালিম নেন। এক সময় তিনি প্রচুর গান রচনা করেন। সেই সাথে গানে ‘আলম’ ভনিতাও ব্যবহার করেন। আলম ছিল তার ডাকনাম।

রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁর সঙ্গীত গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছ থেকে আলাউদ্দিন খাঁ দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেনী ঘরানায় সংগীতের অনেক কষ্টসাধ্য কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। ১৯১৮ সালে নবাব তাঁকে মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যে পাঠালে সেখানকার রাজা ব্রিজনারায়ণ আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সঙ্গীতগুরুর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। বেরিলির পিরের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রাণায়াম ও ধ্যান শেখেন।

বাল্যকালে ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছেই সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি হয়। তিনি সুরের সন্ধানে দশ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে একটি যাত্রাদলে যোগ দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। এ সময় জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি প্রভৃতি গানের সঙ্গে তিনি পরিচিত হন। পরবর্তীতে কলকাতায় সংগীতসাধক গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। শিষ্যত্ব গ্রহণের পূর্বে গোপাল কৃষ্ণ একটি শর্তারোপ করেন যে, তাকে শিষ্যত্ব গ্রহণ করলে কমপক্ষে ১২ বছর একনাগাড়ে সংগীত সাধনা করতে হবে সেখানে থেকে। আলাউদ্দিন খাঁ রাজি হয়ে যান। কিন্তু সাত বছরের শেষ দিকে মৃত্যুবরণ করেন সংগীতসাধক গোপাল কৃষ্ণ। এই শোকে আলাউদ্দিন আকস্মাৎ কণ্ঠসংগীত সাধনা ছেড়ে যন্ত্রসঙ্গীতে নিজেকে নিমগ্ন করলেন। স্টার থিয়েটারের সংগীত পরিচালক অমৃত লাল দত্তের কাছে তিনি বাঁশি, পিকলু, সেতার, ম্যাডোলিন, ব্যাঞ্জু প্রভৃতি দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। এছাড়া তিনি লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের কাছ থেকে পাশ্চাত্য রীতিতে এবং সংগীতজ্ঞ অমর দাসের কাছ থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে বেহালা বাজানো শেখেন। এই সময়েই তিনি মিসেস লবোর নিকট স্টাফ নোটেশনও শেখেন। হাজারী ওস্তাদের কাছ থেকে সানাই, নাকারা, টিকারা, জগঝম্প এবং নন্দবাবুর নিকট মৃদঙ্গ ও তবলা শেখেন।

◤ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বহু রাগ-রাগিণী সৃষ্টি করেন ◢


১৯৩৫ সালে নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করসহ তিনি বিভিন্ন দেশ সফর করেন। উদয়শঙ্কর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ‘কল্পনা’ নামে একটি ছায়াছবিতে তিনি আবহসংগীতে সরোদ পরিবেশন করেন। তিনি সরোদবাদনে ‘দিরি দিরি’ সুরক্ষেপণের পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেতারে সরোদের বাদনপ্রণালি প্রয়োগের মাধ্যমে সেতারবাদনেও আমূল পরিবর্তন আনতে সফল হন তিনি। সংগীতজগতে ‘আলাউদ্দিন ঘরানা’ বা ‘মাইহার ঘরানা’ নামে এক নতুন ঘরানা প্রবর্তন করেন।

আলাউদ্দিনের চিন্তাভাবনার ফলে নতুন বাদ্যযন্ত্র চন্দ্রসারং, সুরশৃঙ্গার প্রভৃতি উদ্ভাবিত হয়। তিনি বহু রাগ-রাগিণী যেমন: হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, হেম-বেহাগ, মদন-মঞ্জরী, মোহাম্মদ (আরাধনা), মান্ঝ খাম্বাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চন্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার মান্ঝ, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি সৃষ্টি করেন।

তাঁর সফল শিষ্যদের মধ্যে তিমিরবরণ, পুত্র আলী আকবর খান, জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর হোসেন খান, কন্যা রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), ফুলঝুরি খান, মীর কাশেম খান, খাদেম হোসেন খান, পান্নালাল ঘোষ, পণ্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পৌত্র আশীষ খান ও ধ্যানেশ খান, খুরশীদ খান, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, শরণরাণী, দ্যুতিকিশোর আচার্য চৌধুরী, যামিনীকুমার চক্রবর্তী, রণেন দত্ত রাজা রায়, শচীন্দ্রনাথ দত্ত, শ্রীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামকুমার গাঙ্গুলী, সন্তোষ প্রামাণিক এবং রাজা ব্রিজনারায়ণ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

তিনি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রার স্টাইলে ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’ নামে একটি যন্ত্রীদল গঠন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতের সংগীত আকাদেমি পুরস্কার পান। ১৯৫৪ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক প্রথম সংগীত নাটক আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে ‘পদ্মভূষণ’ ও ১৯৬১ সালে তিনি বিশ্বভারতী কর্তৃক ‘দেশীকোত্তম’ এবং ১৯৭১ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল তাঁকে আজীবন সদস্যপদ দান করে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলতেন, সংগীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র। মাইহার রাজ্যে, ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অবদান। তিনি ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারে মৃত্যুবরণ করেন।

আপনার মতামত লিখুন :