ইউরোপের সবচে সুন্দর ও পুরনো গ্রাম হলস্ট্যাট

জাভেদ পীরজাদা, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
আশ্চর্য গ্রাম হলস্ট্যাট

আশ্চর্য গ্রাম হলস্ট্যাট

  • Font increase
  • Font Decrease

অস্ট্রিয়া। দেশটির ৬০ ভাগ জুড়ে আছে আল্পস পর্বতমালা। এবং দক্ষিণ থেকে পূর্বে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথে বয়ে চলছে ঐতিহাসিক দানিউব নদী। সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে দেশটিতে। কেউ আসেন আল্পস পর্বতমালার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। শীতকালে প্রবল তুষারপাত অস্ট্রিয়াকে সাদা চাদরে মুড়ে দেয়। গ্রীষ্মে বরফ গলে গেলে, শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য নিয়ে জেগে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে পুরনো গ্রাম। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জনপদ। উত্তর অস্ট্রিয়ার সালসকামার্গাট লেক জেলার পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট গ্রামটি।

◤ হলস্ট্যাট গ্রামের স্থানীয় পাড়া ◢


৩৫০০ বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বুকে নিয়ে বাঁচছে হলস্ট্যাট ভিলেজ। যেতে হলে ভিয়েনা-সালসবার্গ লাইনের ট্রেনে উঠে নামতে হবে Attnang-Puchheim স্টেশন। সেখান থেকে Bad Ischl-Obertraun লাইনের ট্রেন ধরে হলস্ট্যাট স্টেশনে। Hallstättersee হ্রদের পূর্ব তীরে এই স্টেশন। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ঢালু রাস্তা দিয়ে নেমে একটু এগিয়ে গেলে হ্রদের ধার।

◤ হলস্ট্যাট রেলওয়ে স্টেশন ◢


এখান থেকে হলস্ট্যাট যাওয়ার বোট ছাড়ে। দুদিকে পাহাড়, তাদের মধ্যে দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের হ্রদটি। লেকের ওপারে আশ্চর্য গ্রাম হলস্ট্যাট।

◤ হলস্ট্যাট যাওয়ার বোট ◢


কেউ বলেন, বিশ্বের সুন্দরতম গ্রাম। কেউ বলেন ‘হিমবাহের বাগান শহর’। কেউ বলেন ‘অস্ট্রিয়ার মুক্তো’, কেউ বলেন ছবি তোলার শ্রেষ্ঠ গ্রামের নাম হলস্ট্যাট। Hallstättersee হ্রদের চারিদিক জুড়ে সবুজ পাহাড়। পাহাড়দের বলা হয় Guardian of the Hallstättersee বা হ্রদের অভিভাবক।

◤ হ্রদ ও হ্রদের অভিভাবক পাহাড় ◢


পাহাড়ের ধাপে ধাপে ‘বারোক’ শৈলির আঙ্গিকে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রামের বাড়িগুলি। এখানকার প্রতিটি বাড়ি, দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁগুলো সবুজ অর্কিড আর নানা রঙের মরশুমি ফুলে মুড়ে রাখা হয়। দেখলে মনে হবে সেগুলি যেন ফুলেরই দোকান। হ্রদের পাড় থেকে আঁকাবাঁকা গলি পথ উঠে গেছে পাহাড়ের উপর দিকে। রাস্তার দুপাশে শত শত বছরের পুরনো বাড়ি। কিন্তু এতটাই সুন্দর অবস্থায় সাজিয়ে রাখা, যেন কয়েক মিনিট আগে বাড়িগুলোতে গৃহপ্রবেশ হয়েছে।

◤ বাসিন্দাদের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিই হলস্ট্যাটের সৌন্দর্যের গোপন রহস্য ◢


শুধুমাত্র অর্থ থাকলেই আস্ত একটা পাহাড়ি গ্রামকে ছবির মতো সাজিয়ে রাখা যায় না। এখানকার বাসিন্দাদের উন্নতমানের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিই হলস্ট্যাটের সৌন্দর্যের গোপন রহস্য। শীতকালে বরফে সাদা হয়ে যায় এ গ্রাম। হ্রদ, পাহাড়, গ্রামের রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ, পুরু বরফের চাদরে মোড়া থাকে।

◤ এই গ্রামে বিত্তবান পর্যটকরাই রাত কাটাবার সামর্থ্য রাখেন ◢


২০০১ সালের জনগণনার হিসাবে হলস্ট্যাটে থাকেন ৮৫৯ জন গ্রামবাসী। আধুনিক জীবনের সব উপকরণ নিয়ে। বাসিন্দারা সবাই অবস্থাপন্ন। তাই এখানে থাকার খরচও বেশ চড়া। সাধারণত বিত্তবান পর্যটকরাই রাত কাটাবার সামর্থ্য রাখেন। বাকিরা সালসবার্গ থেকে এসে দিনে দিনে ঘুরে নেন হলস্ট্যাট।

◤ ১৯৯৭ সালে হলস্ট্যাটকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করে UNESCO ◢


১৯৯৭ সালে হলস্ট্যাট এবং ডাশ্চটেইন সালসকামার্গাট অঞ্চলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বলে ঘোষণা করে UNESCO. তারপর থেকে যেন পর্যটকদের ঢল নেমেছে এই কয়েকশো লোকের গ্রামটিতে। অস্ট্রিয়ার অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ আজ হলস্ট্যাট।

◤ অস্ট্রিয়ার অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ আজ হলস্ট্যাট ◢


১৮৪৬ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় খনন চালিয়েছিলেন একদল প্রত্নতাত্ত্বিক। আবিষ্কৃত হয়েছিল এক অজানা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। জানা গিয়েছিল আল্পসের প্রত্যন্তে লুকিয়ে থাকা এই এলাকাটিতেই ব্রোঞ্জ যুগের সমাপ্তি ও লৌহ যুগের সূত্রপাত ঘটেছিল। তাই, ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহ যুগের সংস্কৃতির নাম হলস্ট্যাট সংস্কৃতি। মধ্য ইউরোপে বিস্তার করা এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ হয়েছিল এই এলাকাটি থেকেই।

◤ ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহ যুগের সংস্কৃতির নাম হলস্ট্যাট সংস্কৃতি ◢


চাষের ওপর ভিত্তি করে সভ্যতাটি গড়ে উঠলেও, ধাতু শিল্পে যথেষ্ট উন্নত ছিল এলাকাটি। ইউরোপের সেল্টিক এবং প্রোটো-সেল্টিক মানুষেরা এখানে বাস করতেন। দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বাণিজ্য চালাতেন তাঁরা। ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যোগাযোগ ছিল হলস্ট্যাট সংস্কৃতির মানুষদের।

◤ ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহ যুগের উদ্ধারকৃত গহনা ◢


এলাকাটিতে আছে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাকৃতিক লবণ খনি। যা বিশ্বের প্রথম লবণ খনি হিসেবে পরিচিত। তখনকার দিনে লবণ ছিল একটি মূল্যবান সম্পদ। তাই সেই খনি থেকে লবণ সংগ্রহের অর্থনীতি, হাজার হাজার বছর আগে জন্ম দিয়েছিল এক জনপদের। তার নাম ছিল হলস্ট্যাট। তার নামেই এখানকার সংস্কৃতির নাম।

◤ প্রাচীন হলস্ট্যাট সংস্কৃতির তৈজসপত্র ◢


প্রত্নতাত্ত্বিকরা এলাকাটির বিভিন্ন জায়গায় খনন করে ব্রোঞ্জ এবং লোহার তৈরি প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেয়েছিলেন। লবণের খনির পাশেই তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন প্রায় ২০০০ মানুষের সমাধি। সমাধিগুলিকে সময়ের বিচারে দুটি স্তরে ভাগ করেছিলেন। প্রথম স্তরটি খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৮০০ সাল এবং দ্বিতীয় স্তরের সমাধিগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪৫০ সাল জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

(সূত্র: দ্য ওয়াল)

আপনার মতামত লিখুন :