ঘুমের, অন্ধত্বের, পাখিদের আত্মহত্যার ও এক বাসিন্দার চার অদ্ভুত গ্রাম



জাভেদ পীরজাদা, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
এমন চারটি গ্রামের গল্প শোনা যাক

এমন চারটি গ্রামের গল্প শোনা যাক

  • Font increase
  • Font Decrease

বিচিত্র এ জগত। রহস্যময় দুনিয়ায় এমনও চারটি গ্রাম রয়েছে যেখানে কোনো গ্রামে বাসিন্দারা হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে। কোনো গ্রামে অন্ধ হতে হয়। কোনোবা গ্রামে পাখিদের যেন আত্মহত্যা করাই নিয়তি। আর কোনো একটা গ্রামে মাত্র একজনই এখন বাস করছেন। এমন চারটি গ্রামের গল্প শোনা যাক।

ঘুমের গ্রাম
কাজাখস্তানের এক আজব গ্রাম কালাচি। এই গ্রামের বাসিন্দারা হঠাৎ করেই ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ঘুম একদিন, দুইদিন এমনকি কারো কারো এক সপ্তাহ পরে গিয়েও ভাঙে। শিশু থেকে বুড়ো সকলের মধ্যেই একই প্রবণতা দেখা যায়। কেউ কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ছেন, কেউবা কথা বলতে বলতে! আর ঘুম থেকে ওঠার পর কারোই কিছু মনেও থাকে না। তারা সব ভুলে যান। শুধু মানুষ নয়, ওই গ্রামের পশু-পাখিরাও নাকি দীর্ঘ ঘুমে তলিয়ে যায়। গবেষকদের প্রাথমিক ধারণা, নিকটস্থ ইউরেনিয়াম খনির প্রভাব পড়ছে গ্রামবাসীদের ওপর। প্রচুর পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড সৃষ্টি হওয়ার ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ কারণেই যখন তখন ঘুমিয়ে পড়েন কালাচি গ্রামের বাসিন্দারা।

যখন তখন ঘুমিয়ে পড়েন কালাচি গ্রামের বাসিন্দারা

অন্ধদের গ্রাম
মধ্য আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর বিচিত্র একটি গ্রাম টিলটেপেক। গ্রামটিতে জাপোটেক নামের একটি জাতির তিন শতাধিক মানুষ বাস করে, যাদের প্রত্যেকেই অন্ধ। মানুষ নয় গ্রামের গৃহপালিত পশুগুলোও অন্ধ। বিষয়টি এমন নয় যে, গ্রামের অধিবাসীরা সবাই জন্মগত অন্ধ। এই গ্রামে জন্ম নেওয়া নবজাতকরা আর পাঁচটা নবজাতকের মতোই সুস্থ-সবল অবস্থাতেই জন্মায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে তারা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল এ খবর দিয়েছে। এ খবর গণমাধ্যমে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে মেক্সিকোর প্রশাসন ও বিজ্ঞানীরা। কারণ অনুসন্ধানে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে গবেষকদের হাতে। যে ঘন অরণ্য গ্রামটিকে ঘিরে রেখেছে সেখানে বসবাস রয়েছে ‘ব্ল্যাক ফ্লাই’ নামের এক প্রজাতির বিষাক্ত মাছি। টিলটেপেক গ্রামে এই মাছির অবাধ বিচরণ রয়েছে। এই বিষাক্ত মাছির কামড়ে জীবাণু শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলেই শিশু থেকে বুড়ো এবং পশুরাও ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। আবার আরেকদল বিজ্ঞানী বলছেন, লাবজুয়েলা নামে একটি গাছই তাদের এই অন্ধত্বের পেছনে দায়ী। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ওই লাবজুয়েলা গাছই তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়। লাবজুয়েলা গাছটি নিয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।

টিলটেপেক গ্রামের বাসিন্দারা প্রায় সবাই অন্ধ

কিন্তু অদ্ভুত কারণে টিলটেপেক গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি হচ্ছেন না গ্রামবাসী। এক মায়ার জাদুতে অন্ধত্বকেই বরণ করে নিতে রাজি তারা। তাছাড়া মাছির কামড়ে তারা অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন বিষয়টিও মেনে নিচ্ছেন না গ্রামবাসীর অনেকেই। তবে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে মেক্সিকো সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পাখিদের আত্মহত্যার গ্রাম
ভারতের আসামের ডিমা হাসাও জেলার হাফলং থেকে ২০ কিঃমিঃ দূরে আছে জাটিঙ্গা নামের গ্রাম। প্রতি বছর আগস্ট থেকে জানুয়ারি মাসের কোনো কোনো রাতে এই গ্রামে পাখিরা এসে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মহত্যা করে। এ মাসটি চলছে আত্মহত্যার শেষ মাস। সূত্র জিনিউজ ও দ্য ওয়াল।

ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা এসে এই গ্রামে আত্মহত্যা করে

১৯০৫ সালে জাটিঙ্গা গ্রামে বর্ষা শেষে সেই রাতে নাগারাই দেখেছিল পাখিরা আত্মহত্যা করছে। সেই শুরু। কিন্তু বিশ্ববাসী জানত না ১৯৫৭ সাল অব্দি। ব্রিটিশ চা ব্যবসায়ী ও পক্ষীবিশারদ E.P.Gee ঘটনাটি জানতে পেরে এসেছিলেন জাটিঙ্গাতে। তিনি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত গি সাহেবের বই The Wildlife of India থেকে বিশ্ব জানতে পারে জাটিঙ্গা রহস্যের কথা। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিজ্ঞানীরা আসেন। এখনো চলছে গবেষণা। গত বছরের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ পাখি বিজ্ঞানী ফিলিপ গ্র্যান গবেষণা শেষে সুধীন সেনগুপ্তের সঙ্গে সহমত হয়েছেন। জুলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষীবিশেষজ্ঞ ডঃ সুধীন সেনগুপ্ত দাবি করেন, এর পেছনে রয়েছে—আবহাওয়া ও বায়ুচাপের আকস্মিক পরিবর্তন, ভূ-চুম্বক, মাধ্যাকর্ষণ টান ও উপত্যকার বায়ুমণ্ডলের বৈদ্যুতিক গোলযোগ। তার মতে, জাটিঙ্গা গিরিশিরার পাথরে থাকা উচ্চ চুম্বকশক্তিযুক্ত খনিজ পদার্থ, উপত্যকার নিচে বর্ষার পর মাটিতে বেড়ে যাওয়া জলের স্তর, এই বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়ে এলাকাটির মাধ্যাকর্ষণ ও চুম্বকশক্তির অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গিরিশিরার অত্যন্ত খামখেয়ালি আবহাওয়া। এ সবের প্রভাব পড়ে পাখিদের স্নায়ুতন্ত্রর ওপর। ফলে পাখিরা আত্মহত্যা করে।

এক গ্রাম এক মানুষ
নেব্রাস্কার বয়েড কাউন্টির ছোট্ট গ্রাম মনোউই। ০.২১ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। গ্রামের বাসিন্দা মাত্র একজন। ৮৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা এলসি এইলার। ১৯০২ সালে গড়ে ওঠা এই গ্রামটি একটা সময় বেশ সমৃদ্ধ ছিল। ১৯৩০-এর লোক গণনায় গ্রামের বাসিন্দা ছিলো ১৫০ জন। কিন্তু গ্রামের যুব সম্প্রদায় একে একে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়।

মনোউই গ্রামের একমাত্র বাসিন্দা এইলার

পরে ২০০০ সাল নাগাদ দেখা যায়, গ্রামে মাত্র দুজন পড়ে রয়েছেন—এইলার ও তার স্বামী রুডি। ২০০৪-এ রুডি মারা যাওয়ার পর গ্রামে একাই বসবাস করছেন এইলার। স্বামীর মৃত্যুর পর একটা লাইব্রেরি আর রেস্তোরাঁ খোলেন তিনি। এই লাইব্রেরির দুর্মূল্য বইয়ের টানে ১০০ কিলোমিটার দূর থেকেও বইপ্রেমীরা ছুটে আসেন এখানে।